ঢাকা, শনিবার 14 September 2019, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬, ১৪ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে

স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের দেলপাড়ায় প্রি-পেইড মিটার বসানো নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পুরোপুরি মিটার বসানোর আগেই বিতরণকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন গ্রাহকরা। তাদের অভিযোগ প্রি-পেইড মিটারে বাড়তি বিল আসছে। এছাড়া, মিটার ভাড়া আগের চেয়ে চারগুণ বেশি। পর্যাপ্ত রিচার্জ স্টেশন নেই, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে কার্ড কিনতে হয়, প্রতি রিচার্জের সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। স্থানীয়রা কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছেন।
গ্রাহকের অভিযোগ শুনে ক্যাব তা জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-কে। কমিশন এসব অভিযোগের সুরাহা করতে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলোকে নির্দেশও দিয়েছে। তবে, গ্রাহকরা বলছেন, সেবার মান বদলায়নি। দূর হয়নি ভোগান্তিও।
এদিকে সরকার বলছে ভবিষ্যতে সব গ্রাহককেই প্রি-পেইড মিটারে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হবে। অথচ ব্যাপকভাবে প্রি-পেইড মিটার সম্প্রসারণের শুরুতেই গ্রাহকরা হয়রানির অভিযোগ তুলছেন। শুধু দেলপাড়াই নয়, ঢাকার আশেপাশের জেলা ও দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের খুলনায় রীতিমতো কমিটি করে প্রি-পেইড মিটার প্রতিরোধ করার ঘোষণা দিচ্ছেন গ্রাহকরা। প্রি-পেইড মিটার নিয়ে গ্রাহক আর বিদ্যুৎ বিতরণকারীদের মুখোমুখি অবস্থান মঙ্গলজনক নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রি-পেইড মিটারের বিদ্যুতের বিল নিয়ে কুতুবপুর ইউনিয়নের দেলপাড়ার গ্রাহক নাসির উদ্দিন অভিযোগে বলেন, ‘প্রায় ৫ মাসে আগে নতুন মিটার স্থাপন করার পর প্রতি মাসে বাড়তি বিল দিতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে যেখানে বিল আসতো ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা, এখন সেখানে এখন বিল আগে তিন থেকে চার হাজার টাকা।’
এই বিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে তার ঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কী আছে জানতে চাইলে নাসির উদ্দিন বলেন, ‘২টি ফ্যান, ৫/৬ বাতি আর দুটি ফ্রিজ। আশেপাশের সব বাসায় এখনও প্রি-পেইড মিটার বসানো হয়নি। কিছু কিছু বাসায় বসানো হচ্ছে। যাদের মিটার নেই, তাদের তুলনায় আমার বিল অনেক বেশি আসছে।’
প্রি-পেইড মিটারের বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে এই বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ শুধু ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর বিরুদ্ধে নয়, পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (আরইবি) ও পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ওজোপাডিকো)-এর বিরুদ্ধেও রয়েছে। তবে, ডিপিডিসি ও ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)-এর গ্রাহকরা বেশি প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করছেন।
এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জে ডিপিডিসির গ্রাহকদের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তারা এই মিটার নেবেন না বলে প্রি-পেইড মিটার সংযোগ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনও করেছেন।
এছাড়া, মুন্সীগঞ্জ, গাজিপুর ও খুলনাঞ্চলে অনেক দিন থেকে প্রি-পেইড মিটার প্রতিরোধে স্থানীয়রা নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে।
গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে ক্যাব সম্প্রতি বিইআরসির কাছে একটি চিঠি দিয়েছে। বিইআরসি জানিয়েছে, ক্যাবের চিঠির অভিযোগ খতিয়ে দেখবে ডিপিডিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আর ডিপিডিসি জানায়, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই এ বিষয়ে আর কোনও অভিযোগ পাওয়া যাবে না।
বিইআরসিকে পাঠানো চিঠিতে ক্যাব জানায়, বিদ্যুতের মূল্যসহ আনুষঙ্গিক চার্জগুলো গণশুনানির ভিত্তিতে বিইআরসি পুনঃনির্ধারণ করে। এ পুনঃনির্ধারণের একক এখতিয়ার বিইআরসি’র। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর গণশুনানির ভিত্তিতে বিইআরসি বিদ্যুতের মূল্য ও অন্যান্য চার্জ পুনঃনির্ধারণ আদেশ হয়। তারপর আর কোনও আদেশ হয়নি।
চিঠিতে বলা হয়, কোনও আবাসিক গ্রাহক যদি কোনও মাসে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাহলে তার বিদ্যুতের বিল হবে ৬৩ টাকা (এক ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩.৫০ ধরে ১০ ইউনিটের দাম ৩৫ টাকা+ডিমান্ড চার্জ ২৫ টাকা+ ভ্যাট ৩ টাকা)। এর বাইরে কোনও অজুহাতেই ভোক্তার কাছ থেকে কোনও অর্থ আদায়ের সুযোগ বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির নেই। অথচ এজেন্টের কমিশন, মিটারভাড়া, ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সের বিপরীতে সুদ, মাদার মিটার সংযোগ ভাড়া, মিটারের লক খোলার জন্য অর্থ জমা- এমন অজুহাতে ভোক্তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ভোক্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে ভোক্তারা সংবাদিক সম্মেলন করে এসব অভিযোগের প্রতি সব মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করেন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাব চিঠি দিয়ে বিইআরসির আদেশ বহির্ভূত কোনও অর্থ যেন কোনও ইউটিলিটি কোনও ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করতে না পারে, সে-জন্য নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়ার অনুরোধ জানায়। পাশাপাশি এর আগে ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করা বাড়তি অর্থ বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের অনুরোধও করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসির সদস্য (বিদ্যুৎ) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা ক্যাবের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে ডিপিডিসিকে কমিশনের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যদি সত্যিই কোনও বাড়তি বিল আদায় করা হয়ে থাকে, সে বিষয়েও যদি কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তারা যদি ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে কমিশনের পক্ষ থেকে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া  হবে।’
এদিকে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, ‘আমরা বিদ্যুতের বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ আর ভ্যাট ছাড়া কিছুই নেই না। এজেন্টের কোনও কমিশন কাটা হয় না। তবে যদি কোনও এজেন্ট যেমন, গ্রামীণ ফোন বা অন্য কোনও মোবাইলফোন কোম্পানি কোনও টাকা কেটে থাকে, সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এরপরও আমরা এজেন্টদের বিষয়ে এরইমধ্যে সতর্ক করেছি। তবে মিটার ভাড়া বাবদ প্রতিমাসে ৪০ টাকা করে কেটে রাখা হয়। এছাড়া, ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সের বিপরীতে সুদ নেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়। তবে, সাধারণত ছুটির দিনে যদি কোনও গ্রাহকের মিটারের টাকা ফুরিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে অটোমেটিকভাবে গ্রাহকের ফ্রেন্ডলি আওয়ার শুরু হয় অর্থাৎ শুক্রবার বা শনিবার এমনিতেই তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন।’
ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বলেন, ‘রবিবার অফিস খোলার পর মিটার কেনার পর সেই আগের দুই দিনের বাকি টাকা কেটে রাখা হয়। সেখানে সুদের কোনও বিষয় নেয়। ইমার্জেন্সি সময়ে বাকিতে ব্যবহার করা বিদ্যুতের দাম কেটে রাখা হবে, এটা তো স্বাভাবিক।’
মাদার মিটার সংযোগ ভাড়া বিষয়ে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক  বলেন, ‘মাদার মিটার হচ্ছে এমন মিটার যেখান থেকে অন্য মিটারগুলোয় সংযোগ দেওয়া হয়। এখন সব মিটার প্রি-পেইড হয়ে গেছে, কিন্তু কোনও বাড়িতে মাদার মিটার রয়ে গেছে। সেই মিটারের সঙ্গে পানির মিটার, সিঁড়ির লাইটসহ ইত্যাদি যুক্ত আছে। সেই ক্ষেত্রে মাদার মিটারের বিল তো তাকে দিতেই হবে। না থাকলে মাদার মিটারের বিল দিতে হয় না। আর মিটারের লক খোলার জন্য অর্থ জমাসহ যে বাড়তি টাকার কথা বলা হচ্ছে, তাও ঠিক নয়।’ আলাদা করে কোনও টাকা নেওয়া হয় না বলেও তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ