ঢাকা, মঙ্গলবার 17 September 2019, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

রাজনীতিতে সুবিধা নিতেই বিজেপিসহ কিছু দল এ নিয়ে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: প্রতিবেশী ভারতে নির্বাচন এলে বা কোনো রাজনৈতিক সুবিধার প্রয়োজন হলে তখন তারা বিভিন্ন কল্প কাহিনী তৈরি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ইস্যু করে বহিরাগত বা অনুপ্রবেশ। যখন নির্বাচন শেষ হয়ে যায় বা প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় তখন সেই প্রপাগান্ডাটিও হারিয়ে যায়। এই প্রপাগান্ডাকে আলোচনায় রাখতে তারা চরম মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বহিরাগত বলতে বাংলাদেশ থেকে কখনো লক্ষলক্ষ আবার কখনো দেড় কোটি, দুই কোটি, কখনো তিন কোটি মানুষ ভারতে প্রবেশ করেছে বলে প্রপাগান্ডা চালায়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল বিজেপিসহ তাদের শরীক নেতারা বলছেন, পরিশ্চমবঙ্গ, আসাম, দিল্লীসহ অন্যান্য রাজ্যে দুই কোটি বহিরাগত বাস করছে। এদের অধিকাংশই নাকি বাংলাদেশ থেকে আসা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের এই মিথ্যাচার বা প্রপাগান্ডা নতুন কিছু নয়। অনুপ্রবেশের কথাটা পুরনো হলেও সংখ্যাটা বারবার পরিবর্তন ঘটে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা হিসেবে ভারত নানা সময়ে নানাভাবে এই অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। ফায়দা হাসিল শেষ হলে বিষয়টিও হারিয়ে যায়। যার প্রমাণ মিলে ভারতীয়দের মিশ্র বক্তব্যে। কেউ বলছে, বহিরাগত আছে। আবার কেউ বলছে, ভারতে কোনো অনুপ্রবেশকারী নেই। মূলত: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ভারত যে অনুপ্রবেশের কথা বলছে সেটি মোটেও সত্য নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের জনগণ কেন ভারতে যাবে? সেখানকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা কি এখানকার চাইতে ভালো? বরং অনেক খারাপ। বাংলাদেশের হিন্দুরা পর্যন্ত ভারতে যেতে চায়না। কারণ বাংলাদেশে হিন্দুরা সরকারি সুযোগ সুবিধায় অনেক এগিয়ে আছে। এছাড়া মুসলমানরা তো যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। কারণ ভারতে মুসলমানরা সরকারি চাকরিতে যে সুযোগ সুবিধা পায় সেটি এক থেকে দেড় শতাংশের বেশী হবেনা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতের গ্রামীণ এলাকায় ৯৪.৯ শতাংশ মুসলিম দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করছে। মুসলিম মাত্র ৩.২ শতাংশ ভর্তুকিসম্পন্ন ঋণ পেয়ে থাকে। দরিদ্রদের মধ্যে অনাহার রোধে ভর্তুকিতে খাদ্যশস্য দেয়ার যে ব্যবস্থা আছে তা থেকে মাত্র ৩.২ শতাংশ মুসলিম সুবিধা পায়। মাত্র ১ শতাংশ মুসলিম চাষির হ্যান্ড পাম্প আছে। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যার হার ১৬ শতাংশ হলেও সরকারি চাকরিতে তাদের অংশ এক থেকে দেড় শতাংশ। বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার হার ৯ থেকে ১০ শতাংশ হলেও চাকরিতে তাদের অবস্থান ৩০-৪০ শতাংশ। এ অবস্থায় কেন বাংলাদেশ থেকে জনগণ ভারতে যাবে। এছাড়া তারা বলছেন, ভারতে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী রয়েছে এটি কখনোই প্রমাণিত হয়নি। ভারতও কখনো পুশইন করেনি। তাহলে বারবার কেন বাংলাদেশী বহিরাগত আছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতেই বিজেপিসহ তাদের শরীকরা নির্বাচনের আগে এমন মিথ্যাচার করে।
সূত্র মতে, সম্প্রতি ভারতের আসাম রাজ্যে বাঙ্গালী খেদাওয়ের ঘোষণা দেয় বিজেপি সরকার। নির্বাচনের আগে তারা সেখানে অবৈধ ৪০ লাখ অনুপ্রবেশকারী রয়েছে বলে ঘোষণা দেয়। পরে সেটি নেমে আসে ১৯ লাখে। তবে এখনো লাগামহীন বক্তব্য রাখছে ভারতের শাসক দল বিজেপির প্রধান অমিত শাহ। চলতি মাসের শুরুতে ঘোষণা করেছিলেন, আসামে ৪০ লাখ বহিরাগতকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। এরা ঘুণপোকার মতো, আমাদের দেশকে  ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এসব বহিরাগত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, এরা সন্ত্রাসী। এর আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে সাওয়াই মধুপুরের এক জনসভায় অমিত শাহ ঘোষণা করেন, প্রতিটি বহিরাগতকে খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানা গেছে, অমিত শাহ ও বিজেপি সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রাখার কাজে আরও এক কদম এগিয়ে গেল। সম্প্রতি ভারতের জাতীয় নাগরিক তালিকা (নাগরিকপঞ্জি) বা ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন্স (এনআরসি) প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আসামের ১৯ লাখ মানুষকে নাগরিক তালিকাবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগে ভাবা হয়েছিল প্রায় ৪০ লাখ লোক এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবে। এই সংখ্যা ক্রমে অর্ধেক হয়ে যায়। অনেকেই বলছেন, সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করলে এই সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
বিজেপির প্রধানের ঘোষণা বাস্তবায়ন শুরু হলে এদের ঠেলে পাঠানো হবে কোথায়? অমিত শাহর হুমকির লক্ষ্য বাংলাদেশ। ভারতকে কোনোভাবেই চটানো যাবে না, এই নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার এ প্রশ্নে কার্যত মুখ বুজে থাকার পথ অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ, অতএব এ নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। এমনকি বুদ্ধিজীবী-কলাম লেখকেরাও ব্যাপারটাকে ভারতের নিজস্ব ব্যাপার বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আসামের ক্ষেত্রে যে ১৯ লাখ মানুষকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, সেটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অশনিসংকেত।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেছেন, আসামে বাংলাদেশের কোন অবৈধ অভিবাসী নেই। গেল বছর নয়া দিল্লিতে ইন্ডিয়ান উইমেন্স প্রেস কোর (আইডব্লিউপিসি)-র সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। আসামে যা ঘটছে তার সঙ্গে এ বিষয়ের কোন সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশের দূত বলেন, আসামে চলমান এনআরসি কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ কিছু জানে না। বাংলাদেশ সরকার আসামের এনআরসি প্রক্রিয়াকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে রাজ্যের রাজনীতির অংশ বলে মনে করে।
অনুপ্রবেশ ইস্যু যে বিজেপির নির্বাচনী প্রপাগান্ডা সেটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতের বিরোধী দলগুলি মনে করছে, নির্বাচনের আগে স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বিজেপি আবার এই অবৈধ বিদেশীদের ইস্যু খুঁচিয়ে তুলতে চাইছে। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে ভারতে ভোটের প্রচারে নেমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন, আবারো ক্ষমতায় এলে তার সরকার অবৈধ বাংলাদেশীদের লোটাকম্বল নিয়ে ফেরত পাঠাবে। সর্বশেষ নির্বাচনের ছয়-সাত মাস আগে আবার সেই একই ধরনের কথা শোনা গেছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মুখে। রাজস্থানের গঙ্গাপুরে এক জনসভায় বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের ‘দীমক’ বা উইপোকা বলে অভিহিত করে বলেন, এরা ভারতীয় যুবকদের রুটিরুজি বা চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, গরিবের খাবারে ভাগ বসাচ্ছে। কিছুদিন আগেই বিজেপি নেতা রাম মাধব ঘোষণা করেছেন, আসামের নাগরিক তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করাটাই তাদের দলের নীতি।
কথিত অবৈধ বাংলাদেশী বলে বিজেপির প্রচারণাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখছে স্বয়ং দেশটির রাজনীতিবিদরা। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মালদা জেলা থেকে গত প্রায় দশ বছর ধরে নির্বাচিত কংগ্রেসের এমপি মৌসম বেনজির নূর বলেছেন, দেশের স্বার্থ-ফার্থ এসব একদম বাজে কথা! তার কথায় ভোট আসলেই বিজেপি এই বক্তব্য দিয়ে থাকে। এটা আসলে রাজনৈতিক ভোট-ব্যাঙ্ক তৈরির চেষ্টা। তা যদি না-হত, তাহলে এখন নয় - অনেক আগেই তারা ইস্যুটা তুলতেন। নির্বাচন এলেই তারা এটা নিয়ে কথা বলে। মিস নূর আরও বলছেন, মালদা থেকেও বহু বাংলাভাষী মুসলিম কাজের খোঁজে ভারতের নানা প্রান্তে যান, এখন অবৈধ বাংলাদেশী খোঁজার হিড়িকে আক্রমণের নিশানা করা হচ্ছে তাদেরও। আমাদের জেলারই লোক আফরাজুলকে রাজস্থানে পিটিয়ে, পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। মালদা থেকে যে অভিবাসী শ্রমিকরা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছেন, তাদের অনেককেই আসলে বাংলাদেশী বলে হেনস্থা করা হচ্ছে। তারা যে মালদারই বাসিন্দা ও ভারতের নাগরিক, সেটা প্রমাণ করতে আমরা রেসিডেন্ট সার্টিফিকেটও দিয়ে থাকি। কিন্তু তারপরও এই ধরনের হামলা চলছেই। আসলে এভাবেই বিজেপি বিভাজনের রাজনীতির মাধ্যমে দেশটা ভাগ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বলছিলেন মৌসম নূর।
গেল বছরের ১৩ অক্টোবর বিবিসি বাংলা তাদের এক প্রতিবেদনে বিজেপি কর্তৃক বাংলাদেশী খোঁজার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে। এতে তারা বলেছে, আসামের পর এবার মুম্বাইয়ে ‘বাংলাদেশী’ খুঁজছে বিজেপি। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভোটের আগে শ্রমজীবী এই গরিব মানুষগুলোকে আরও একবার রাজনৈতিক বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা চলছে? আরব সাগরের তীরে নতুন করে এই বাংলাদেশী তাড়ানোর ডাক ওঠায় শহরের বাংলাভাষী মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। কারণ মোদি সরকার নির্বাচনের মাঠে তাদেরই প্রধান বাধা মনে করে। সেখানকরার বাসিন্দা ঊষা, মুকেশরা জানাচ্ছেন তাদের কলোনির নাম বাংলাদেশের নামে হলেও সেখানে একঘর বাঙালি পর্যন্ত নেই। জানা গেল, চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে যখন পুরনো ঝোপড়পট্টি ভেঙে এই কলোনি গড়ে তোলা হয়, তখন বাংলাদেশ যুদ্ধে জেতার সম্মানেই কিন্তু বস্তির নামকরণ করা হয়েছিল বাংলাদেশের নামে। কিন্তু না, কোনওদিন কোনও বাঙালি এই তল্লাটে কখনওই ছিল না।
ভারত যখন বাংলাদেশী বাংলাদেশী বলে চিৎকার করছে তখন সেখানে অবৈধ বাংলাদেশী নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আসামে নাগরিকত্ব তালিকা প্রণয়ন এবং সেখানে অবৈধ বাংলাদেশী থাকার বিষয়ে দেশটির সরকারের অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারতে অবৈধ বাংলাদেশী থাকার বিষয়টি সত্য নয়। বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকার এক ধরনের রাজনীতি করছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গেল বছরের জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এটা বোধহয় ভারতের পলিটিক্স। এটা তাদের নিজস্ব পলিটিক্স, তারা বলছে কিন্তু আমি মনে করি না আমার কোনো অবৈধ বাংলাদেশী সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত। তবে সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে? এসময় তিনি আরো বলেন, কেউ যদি একথা বলে, তবে সেটা তাদের ব্যাপার। তবে বিষয়টা নিয়ে আমি কিছু কথা বলেছি প্রাইম মিনিস্টারের (নরেন্দ্র মোদির) সঙ্গে, তিনি বলেছেন, তাদেরকে ফেরত পাঠানো বা এমন কোনো চিন্তা তাদের নেই।
এবার পশ্চিবঙ্গ থেকে বহিরাগতদের তাড়ানোর ঘোষণা দিলেন বিজেপির বিধায়ক সুরেন্দ্র সিং। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা সত্ত্বেও আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গেও জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি) করা হবে বলে তিনি জানান। এনআরসিতে যারা অবৈধ বলে চিহ্নিত হবেন, তাদের হাতে দুই প্যাকেট করে খাবার ধরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি। গত শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেছেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী এই বিজেপি নেতা।
ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসনামলে দেশজুড়ে অশুভ সংকেত দেখতে পাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আসামের তিনসুকিয়ায় পাঁচ বাঙালিকে নির্মমভাবে নিহতের ঘটনার পর কলকাতায় একাধিক কালীপুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে নানাভাবে সেই উদ্বেগের কথা শুনিয়েছেন তিনি। মমতা বলেন, গুজরাটে বিহারি খেদাও হচ্ছে, আসামে বাঙালি খেদাও হচ্ছে। সারা দেশে অশুভ সংকেত মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। জানবাজারে বলেন, এত আনন্দের মধ্যেও মন ভাল নেই। অসহায়ভাবে আসামে গরিব মানুষগুলোকে হত্যা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কাউকে এনিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া হবেনা বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সূত্র মতে, ক্ষমতাসীন বিজেপি ভারতে অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশী বলে অভিযোগ করলেও খোদ দেশটির রাজনৈতিক নেতারাই বলছেন ভিন্নটা। নব্বইয়ের দশকে এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন আইজি শংকর সেন বলেন, বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র হওয়ায় সংখ্যালঘুদের অনুপ্রেবেশ বাড়েনি (আনন্দবাজার, ৫ জুলাই ১৯৮৮)। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটাসিং বলেন, ‘জন্মহার বাড়ার কারণে পরিশ্চমবঙ্গ সীমান্তে জনসংখ্যা বাড়তে পারে’ (আনন্দবাজার, ২১ মে ১৯৮৭)। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে কিছু লোক আসে বটে, তবে তা তেমন মারাত্মক কিছু নয়’ (আনন্দবাজার, ২১ মে ১৯৮৭)। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু ১৯৯১ সালে পুনরায় এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঢালাও অনুপ্রবেশ ঘটনা সত্য নয়। বাংলাদেশ থেকে কিছু লোক আসে, যা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের। এদের মধ্যে অবাঙ্গীলারাও আছেন। তারা আসেন কাজের সন্ধানে। আবার ফিরেও যান। পৃথিবী ব্যাপী বিভিন্ন দেশের মধ্যে যেখানে অভিন্ন সীমান্ত আছে, সেখানেও এধরণের ঘটনা স্বাভাবিক’ (দৈনিক বাংলা, ১৮ই জুন ১৯৯১)। ভারতীয় ব্যক্তিত্ব পশ্চিমবঙ্গের আইজি বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু, যিনি তিন দশক ধরে পশ্চিবঙ্গের নেতৃত্ব দিয়েছেন-তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ যেভাবে বলা হচ্ছে, সেভাবে ঘটে না।
অন্যান্য রাজ্যের ন্যায় ভারতের রাজধানী দিল্লিতেও নাগরিকত্ব নিবন্ধনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিজেপির দিল্লির প্রধান মনোজ তিওয়ারি। আসামে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরই ক্ষমতাসীন সরকারের এ সংসদ সদস্য এ দাবি তুলেছেন। সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে দিল্লি বিজেপির সভাপতি মনোজ তিওয়ারি বলেন, দিল্লির অবস্থাও ভয়াবহ, তাই এনআরসির প্রয়োজন। অবৈধ অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করে পরিস্থিতি ভয়ানক করে তুলেছে। আমরা এখানে এনআরসি প্রয়োগ করব। এনডিটিভি জানায়, ২০২০ সালে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে মনোজ তিওয়ারির এমন বক্তব্য বেশ ইঙ্গিতবহ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভারতের আসামের জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধনের চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে বাংলাদেশে ফেরত নিতে বলবেন বলে জানিয়েছেন রাজ্যটির অর্থমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা। সম্প্রতি ভারতের সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জাল দলিল প্রতিরোধে নাগরিকদের তালিকা হালনাগাদের এ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে ততদিন, যতদিন আসামের একজন আদিবাসীও তাদের আবাস খুঁজে না পাবেন। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর অন্তত ২০ শতাংশ এবং বাকি আসামের ১০ শতাংশ নাগরিকদের পুনর্যাচাইয়ের অনুমতি দিতে সুপ্রিমকোর্টের কাছে দাবি জানান আসামের অর্থমন্ত্রী। আসামের এ মন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি বাংলাদেশ সরকার।
জানা গেছে, ভারত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংখ্যায় বহিরাগতদের কথা বলছে। ২০১৬ সালে সংসদে বলা হয়েছে, দুই কোটি বাংলাদেশী অভিবাসী ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। এর আগে ২০০৪ সালে তারা বলছে, অবৈধভাবে বাঙালি অভিবাসীর সংখ্যা ১.২ কোটি। এক যুগ পর সেটি বৃদ্ধি পেয়ে দুই কোটি হয়েছে। রাজ্যসভার সংসদ সদস্য ঝর্ণা দাস বৈদ্যর এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু একথা বলেছিলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফির প্রফেসর ড. এ এফ এম কামাল উদ্দিনের একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে প্রায় ৭ লক্ষ ভারতীয় বর্তমান বাংলাদেশে রিফিউজি হিসেবে এসেছে। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে সেটা উল্লেখিত হয়েছে। এরপর ১৯৫০ সালের কলকাতা দাঙ্গায়, ১৯৬১ সালের মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে মুসলিম নিধন, ১৯৬২ সালে আসামে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা, এবং ১৯৬৪ সালে কলকাতা দাঙ্গায় লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মুসলিম আমাদের বাংলাদেশে চলে আসে। কেবল ১৯৬৪ সালের কলকাতা দাঙ্গায় ৮ লক্ষ মুসলমান পূর্বপাকিস্তানে পালাতে বাধ্য হয়। ১৯৬৭ সাল নাগাদ আরো ৫ লক্ষ ৪০ হাজার রিফিউজি আসে, যাদের অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা। যারা টাকা পয়সা, শিক্ষা, চাকুরী এবং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কোন রকমে রিফিউজি ক্যাম্পে যাওয়া থেকে বেঁচেছেন তারা উপরোক্ত সংখ্যার বাহিরে। সে হিসেবে ভারত থেকে আগত মানুষের সংখ্যা আরো অনেক বেশিই হবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে নির্যাতন ও দাঙ্গার কারনে ১৫-২০ শতাংশ মুসলমান ভারত থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আর অন্যদিকে নাগরিকত্বের জন্য ভারতে ১২% হিন্দু বাংলাদেশ থেকে চলে যায়। এদের অধিকাংশই স্বেচ্ছায় জমি জমা বিক্রি করে চলে গেছে। অনেকেই একাধিক লোকের কাছে তাদের জমি বিক্রি করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ