ঢাকা, মঙ্গলবার 17 September 2019, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

রেশনের চাল পোকা খাওয়া-পচা দুর্গন্ধ নিম্নমানের

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রেশন সুবিধাভোগী সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জন্য বরাদ্দকৃত চালের মান নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। মাস শেষে রেশন তুলতে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে পোকায় খাওয়া-দুর্গন্ধ নিম্ম মানের চাল। এমন গুরুতর একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন সরকারী দফতরের রেশন সুবিধাভোগীরা মাসের পর মাস ধরে খাওয়ার অযোগ্য চাল নিয়ে অসন্তুষ্ট।
অভিযোগে প্রকাশ, বিশেষ করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের রেশন স্টোর থেকে অত্যন্ত নিম্নমানের পোকা খাওয়া ও পচা চাল বিতরণ হচ্ছে হরহামেশাই। গন্ধযুক্ত ও নিম্ন মানের চাল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রেশন পাওয়া ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, খাদ্য অধিদপ্তর ও ঠিকাদারদের একটি শক্তিশালী চক্র পরস্পর যোগসাজশে সবার নাকের ডগায় এ ধরনের দুর্নীতি করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। অভিযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) প্রায়ই আসছে বিভিন্ন অভিযোগ। সম্প্রতি বেশকিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে সংস্থাটি। বিষয়টি অনুসন্ধানের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে যেকোনো সময় অভিযান চালানো হতে পারে।
সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর দুদকের অভিযোগকেন্দ্রের হটলাইন নম্বরে (১০৬) এ বিষয়ে একটি অভিযোগ আসে। কনস্টেবল পদমর্যাদার এক ব্যক্তি এ অভিযোগ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
ওই অভিযোগে বলা হয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের রেশন স্টোরে অত্যন্ত নিম্ন মানের পোকা খাওয়া ও পচা চাল বিতরণ করা হয়। যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং খাওয়ার অনুপযোগী। ওই চাল সবাই সেখানেই বিক্রি করে দিচ্ছে বলে রিসাইক্লিং হচ্ছে বার বার। এতে পুরনো চালই রয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। সরকার চালের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিলেও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে চালের সরবরাহকারী ও আড়তদার পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এ অনিয়ম চলে আসছে। এ অনিয়ম সম্পর্কে জেনেও যেন নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। এর আগেও পুলিশের কনস্টেবল পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের অভিযোগ দুদকে জমা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিক বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা অভিযোগের বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, রেশনের খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ কিংবা বিতরণের দায়িত্ব পালন করে খাদ্য অধিদপ্তর। তাদের মাধ্যমেই দরপত্র আহ্বান ও রেশনের পণ্য বিতরণ হয়। সরবরাহকৃত চাল আমি নিজে খাওয়ার চেষ্টা করে পারিনি। মান আসলেই অত্যন্ত খারাপ। এ বিষয়ে বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। তিনি আরো বলেন, অধিকাংশ ব্যক্তিই চাল নিয়ে তা আবার খুবই অল্প টাকায় বিক্রি করে চলে যান। ফলে ঘুরেফিরে রেশনপ্রাপ্তদের ভাগ্যে একই চাল জুটে। প্রকৃত অর্থে আমরাও এ অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও প্রতিকার চাই।
সম্প্রতি পুলিশের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়, এর মধ্যে রেশন সুবিধাও রয়েছে। দুদকসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ সুবিধা পাচ্ছেন। রেশন পণ্যের মধ্যে রয়েছে- চাল, ডাল, আটা, চিনি ও ভোজ্য তেল। এই পাঁচ পণ্যের মধ্যে চারটি নিয়ে তেমন বড় অভিযোগ না থাকলেও চাল নিয়ে বেশ অসন্তুষ্টি রয়েছে। গন্ধযুক্ত ও নিম্নমানের রেশনের চাল নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে পুলিশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশন নীতিমালায় সংশোধন করা হয়। পুলিশে কর্মরত এবং প্রেষণে নিয়োজিত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে এই নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৩ ও ২০১৮ সালে থেকে পর্যায়ক্রমে দুদকের নিজস্ব কর্মচারী-কর্মবর্তারা রেশন সুবিধার আওতায় আসেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, প্রত্যেক সদস্যকে যে পরিমাণে রেশন দেয়া হয়, তা একজন সদস্যের জন্য পর্যাপ্ত। রেশন হিসেবে দেয়া পণ্যগুলোর মধ্যে চাল ছাড়া সব উপকরণই ভালো। ডাল, আটা, চিনি ও ভোজ্য তেল নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ নেই। তবে যে চাল দেয়া হয়, সেটা অত্যন্ত নিম্নমানের। অনেক দিনের পুরনো চালে ইটের টুকরা ও পাথর থাকে। চালগুলোও থাকে ভাঙা। রেশনের চালের মান বাড়ানো ও খাবার উপযোগী চাল সরবরাহ করা হলে সরকার যে উদ্দেশ্যে রেশন সরবরাহ করছে, সে উদ্দেশ্য সফল হতো।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি পরিবারের চারজন সদস্য রেশন পাবেন। পরিবার এক সদস্যের হলে তিনি প্রতি মাসে ১১ কেজি চাল (সিদ্ধ বা আতপ), ১২ কেজি আটা, ১ কেজি ৭৫০ গ্রাম চিনি, আড়াই লিটার ভোজ্য তেল, সাড়ে তিন কেজি ডাল ও ৩৭ কেজি ৩২৪ গ্রাম জ্বালানি কাঠ পাবেন। দুই সদস্যের পরিবার হলে মাসে ২০ কেজি চাল, ২০ কেজি আটা, ৩ কেজি চিনি, সাড়ে ৪ লিটার ভোজ্য তেল ও সাড়ে ৫ কেজি ডাল পাবেন। তিন সদস্যের পরিবার হলে মাসে ৩০ কেজি চাল, ২৫ কেজি আটা, ৪ কেজি চিনি, ৬ লিটার ভোজ্য তেল ও ৭ কেজি ডাল পাবেন। চার সদস্যের পরিবার পাবে প্রতি মাসে ৩৫ কেজি চাল, ৩০ কেজি আটা, ৫ কেজি চিনি, ৮ লিটার ভোজ্য তেল ও ৮ কেজি ডাল।
যারা রেশন পান তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিজ নিজ নামে রেশন কার্ড ইস্যু করে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত হারে রেশন তোলেন। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী জেলা ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট ছাড়াও অন্য যেকোনো জেলা ও ইউনিট থেকে রেশন তুলতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে বিষয়টি নিজ নিজ ইউনিট-প্রধানকে কমপক্ষে ৩০ দিন আগে অবহিত করতে হবে। ইউনিট-প্রধানকে আবার বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করতে হবে। প্রেষণে শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বা অন্য কোনো সরকারি কাজে বিদেশে দায়িত্ব পালনের সময় একই নিয়মে রেশন তুলতে পারবেন তারা।
এক্ষেত্রে কিছু শর্ত অনুসরণ করতে হয়। তা হলো- প্রতিটি পরিবারের সর্বাধিক দুজন সন্তান রেশন পাওয়ার যোগ্য এবং সন্তানদের অনধিক ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত রেশন দেয়া হয়। কিন্তু এ সময়সীমার আগে যদি কোনো সন্তান বিয়ে করেন এবং অর্থ উপার্জনে সক্ষম হন, তাহলে ওই সন্তানকে আর রেশন দেয়া হয় না। তবে শারীরিকভাবে অসমর্থ, পঙ্গু অথবা বিকলাঙ্গ সন্তান যদি বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে যতদিন তিনি নির্ভরশীল থাকবেন, ততদিন রেশন পাবেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত থাকলে তাদের যেকোনো একজন রেশন পাবেন। অন্যজন পরিবারের সদস্য হিসেবে রেশন পাবেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যদি ভিন্ন ভিন্ন রেশন সুবিধাসম্বলিত সংস্থায় কর্মরত থাকেন, তাহলে উভয়ের যেকোনো একজন তার নিজ সংস্থা থেকে রেশন উত্তোলন করতে পারবেন এবং অন্যজন পরিবারের সদস্য হিসেবে রেশন পাবেন। এলপিআর-এ (পিআরএল) থাকার সময়ে প্রত্যেক সদস্য একই হারে রেশন পাবেন। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সদস্য নিজের এবং পরিবারের জন্য রেশন পাবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ