ঢাকা, মঙ্গলবার 17 September 2019, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আমদানি বাড়ছে, তবে সে অনুযায়ী বাড়ছে না রফতানি আয়। ফলে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাসে জুলাইয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। একইসাথে প্রথম মাসে শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে ব্যাপক হারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ চলছে। এসব বড় বড় প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি করে জোগান দিতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় যেভাবে বেড়েছে সেই হারে রফতানি আয় হয়নি। যার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাসে ইপিজেডসহ রফতানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ৪৮০ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সেই হিসেবে জুলাই শেষে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় (বিনিময় হার ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে) প্রায় ৮ হাজার ২৭২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
ঘাটতির এ অংক ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময় ছিল ১১৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ে তুলনায় এবার ঘাটতি কিছুটা কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত রয়েছে। যা গত বছরের ঋণাত্মক ছিল। জুলাইয়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ঋণাত্মক ছিল ১৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো।
এদিকে আলোচিত সময়ে সেবাখাতে বেতন-ভাতা বাবদ বিদেশিদের পরিশোধ করা হয়েছে ৮৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আর বাংলাদেশ এ খাতে আয় করেছে ৬৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। এ হিসাবে সেবায় বাণিজ্যে দেশে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। যা গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল (ঘাটতি) ১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
জুলাইয়ে প্রবাসীদের আয় রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ১৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। রেমিট্যান্সে ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, আলোচিত সময়ে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ৩৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার, এর মধ্যে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ২১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। যা গত অর্থবছরের চেয়ে এফডিআই বেড়েছে ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও নিট বেড়েছে ৭ শতাংশ।
এদিকে আলোচিত সময়ে এফডিআই বাড়লেও দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাপক হারে কমেছে। অর্থবছরের প্রথম মাসে শেয়ারবাজারে মাত্র ৭০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। যা তার আগের অর্থবছরে একই সময়ে ছিল ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
এদিকে আমদানির চাপে বেড়েই চলছে বাণিজ্য ঘাটতি। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই শেষে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ১১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার যা তার আগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১০৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছিল ১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছর প্রথম মাসে ইপিজেডসহ রফতানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৩৫২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ৪৭০ কোটি ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির দাঁড়ায় ১১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের জুলাই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি হয় ১০৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের প্রথম মাসের তুলনায় প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। জুলাইতে চলতি হিসাবে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ঘাটতি হয়েছে। আর সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি ছিল ১৮ কোটি ডলার। জুলাইয়ে রফতানি আয় ছিল ২৯৫ কোটি ডলার। যা তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এদিকে গত জুলাইয়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৭ শতাংশ। ওই মাসে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪০০ কোটি ডলার। গত বছরের জুলাইয়ে যা ছিল ২৭২ কোটি ডলার।
গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সম্প্রতি খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্পপাতি আমদানিতে ব্যয় অনেক বেড়েছে। তবে যেসব খাতে বেশি আমদানি ব্যয় হচ্ছে, বিশেষত শিল্প খাতের পণ্যগুলো, দেশে আসছে কি-না তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভালোভাবে দেখা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ