ঢাকা, বুধবার 18 September 2019, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

খুলনায় ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মাদক বিকিকিনি নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ

খুলনা অফিস : যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃত্বে চলে যাচ্ছেন মেয়াদ উত্তীর্ণ খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ইতোমধ্যে এ খবর নগরীর সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের অনুপস্থিতিতে আগামীতে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসছেন কারা? এমন কৌতূহল ঘুরপাক খাচ্ছে মহানগরীর ছাত্রলীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মাঝে। তাদের দাবি ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব মাদক ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে যেন জড়িত কেউ না হন। 
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশীর তালিকা একেবারে কম নয়। এ দু’টি পদের জন্য এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই বর্তমান মহানগর কমিটির বিভিন্ন পদে রয়েছেন। এছাড়া থানা ও কলেজ পর্যায়ের ছাত্রলীগ নেতারা রয়েছেন এ তালিকায়। 
ছাত্রলীগের মহানগর, বিভিন্ন থানা ও কলেজ সংসদের নেতা-কর্মীদের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, বর্তমান সভাপতি শেখ শাহজালাল হোসেন সুজন যুবলীগের মহানগর কমিটির যুগ্ম আহবায়ক হয়েছেন। তাছাড়া সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেল যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃত্বে। তারা দু’জনই ক্লীন ইমেজের ছাত্রনেতা বলে দাবি তৃণমূলে। এ অবস্থায় মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অর্থাৎ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কারা হচ্ছেন, এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা খোদ তৃণমূলে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৮ জুন শেখ শাহজালাল হোসেন সুজন সভাপতি ও এস এম আসাদুজ্জামান রাসেলকে সাধারণ সম্পাদক করে নগর ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। এরপর ২২১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। গঠণতন্ত্র অনুযায়ী ৩ বছরের মেয়াদের এ কমিটির ১ বছর সময় অতিরিক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের জুনে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
এদিকে খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে আগ্রহীদের তালিকায় রয়েছেন অনেকে। এদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান নগর কমিটির সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান বাবু ও সজল বাড়ৈ, যুগ্ম-সম্পাদক আলীমুল জিয়া ও সোহান হোসেন শাওন, সোনাডাঙ্গা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুম্মন আহম্মেদ, নগরের সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক এস এম রাজু হোসেন, বিএল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নিশাদ ফেরদাউস অনি, নগরের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আহানাফ ইসলাম অর্পণ ও যুগ্ম-সম্পাদক ইবনুল হাসান, নগর সাংগঠনিক সম্পাদক এম এ সবুজ, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান রাজেশ, উপ-প্রচার সম্পাদক মশিউর রহমান বাদশা, খালিশপুর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান সোহাগ। 
ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেল বলেন, প্রিয় সংগঠন ছাত্রলীগ যাতে যোগ্য নেতৃত্বে সামনে এগিয়ে চলে এ প্রত্যাশা থাকবে। এ বিষয়ে আমাদের যা যা করণীয় তা করবো।  এছাড়া ছাত্রলীগের সম্মেলনের জন্য সকল কাউন্সিলর কমিটিগুলো দ্রুত প্রস্তুত করার জন্য চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে বর্তমান সভাপতি শেখ শাহাজালাল হোসেন সুজন বলেন, তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দাবির বিষয়টি বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ক্লীন ইমেজের ছাত্রনেতাদের হাতেই আগামীতে মহানগর ছাত্রলীগের দায়িত্ব দেয়া হবে। সম্মেলনের মাধ্যমেই আগামীতে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা তাদের যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিবেন। আগামী একমাসের মধ্যে নগর ছাত্রলীগের অধিনস্থ সকল থানা, কলেজ সংসদ ও ওয়ার্ডের পুর্ণাঙ্গ কমিটি প্রস্তুত করা হবে বলেও জানান তিনি।
অর্ধশতাধিক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মাদকসহ নানা অভিযোগ : চলতি বছরে খুলনা মহানগর ও জেলা ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক বিকিকিনি, নারী কেলেঙ্কারি ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিতে দেখা গেছে সাময়িক বহিষ্কার। কারো কারো ক্ষেত্রে বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হলেও সময়ের ব্যবধানে অধিকাংশ অভিযুক্ত নেতারা ফের মিশে গেছেন মূলধারায়। সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন কর্মকান্ডে ঠিকাদারী কাজের কমিশন কেলেঙ্কারীর অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বাদ দিয়ে সিনিয়র সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অচিরেই সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এ দুই নেতা।
দলীয় সূত্র মতে, নগরীর ৩১নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাব্বি আহমেদ রানাকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। আবার গেল ৩০ জুন তার সাময়িক স্থগিত আদেশ প্রত্যাহার করে স্বপদে বহাল করেন নগর ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। এছাড়া গেল ১ সেপ্টেম্বর নগরীর দৌলতপুর (দিবা-নৈশ্য) কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম বন্দকে সংগঠন পরিপন্থী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দলীয় কর্মকান্ড থেকে সাময়িক অব্যহতি দেয়া হয়। একইদিনে নগর ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপ-সম্পাদক আকাশ দাশকে অনুরূপ অভিযোগে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ২৯ জুলাই নগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সমীর কুমার শীলকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে স্থায়ীভাবে বহিস্কারে কেন্দ্রে সুপারিশ পাঠানো হয়। ১৫ জুন ২১নং ওয়ার্ডের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সালমান জাহানকে সংগঠন পরিপন্থী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। গত ২৫ মে খালিশপুর থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পলাশ শিকদারকে সংগঠন পরিপন্থী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ১৯ এপ্রিল বিএল কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি চিন্ময় দাশ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলামকে সাময়িক বহিষ্কার করে কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, সে মর্মে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়া হয়। গত ৫ এপ্রিল খালিশপুর থানা ছাত্রলীগের উপ-বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মো. রাসেলকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি বিএল কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অচিন্ত কুমার দাশকে সংগঠন পরিপন্থী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। ২৯ জানুয়ারি নগরীর খালিশপুর থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাইফুজ্জামান সাগরকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও গোপনে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেন শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, যা প্রকাশ পায়নি। আবার, নগরীর সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ, আযম খান সরকারি কমার্স কলেজ ও আদর্শ সরকারি সুন্দরবন কলেজ ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত ও বেগবান করতে গত ২৯ মে এক বিজ্ঞপ্তিতে নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের রাজনৈতিক জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। তবে তার আলোর মুখ দেখিনি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কলেজের ছাত্রনেতাদের।
খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক মো. শাহীন আলম বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলেই নগর ছাত্রলীগ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। আবার কেউ যদি অভিযোগ থেকে নিষ্পত্তি পেয়ে থাকে তখন তার উপর থেকে সাময়িক বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহারও করা হয়েছে। গঠনতন্ত্র মোতাবেক স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের ক্ষমতা শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটির রয়েছে।’
অন্যদিকে, নগর শাখার কিছুটার বিপরীত জেলা ছাত্রলীগের অবস্থা ‘গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়লের মতোই’। গত ২ জুন সালাউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি ও সোহেল রানাকে সাধারণ সম্পাদক করে কয়রা উপজেলা ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন সংগঠণের জেলা সভাপতি মো. পারভেজ হাওলাদার ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরান হোসেন। তার মাত্র ২২ দিনের মাথায় সেই কমিটি বিলুপ্ত করে গত ২৪ জুন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় (তৎকালীন) সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী কয়রা উপজেলা ছাত্রলীগের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষনা করেন। সে কমিটিতে মো. শরীফুল ইসলাম টিংকুকে সভাপতি, হাদিউজ্জামান রাসেলকে সাধারণ সম্পাদক, মো. তরিকুল ইসলামকে সহ-সভাপতি, আমিনুল হক বাদলকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও মাসুদ রানা শেফারকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। এ কমিটি গঠনের পর খুলনা প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে সভাপতির বিরুদ্ধে বিদেশ পাঠানোর নামে বিভিন্ন মানুষের অর্থ আত্মসাৎ ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে জবর দখলের অভিযোগ তোলেন পদ বঞ্চিতরা।
এসব বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. পারভেজ হাওলাদার বলেন, জেলা নেতৃবৃন্দকে উপক্ষো করে কেন্দ্র থেকে কয়রা উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার বিষয়টি ভালভাবে নেয়নি তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। আমরা জানতামও না। যাই হোক, জেলা ছাত্রলীগের কোন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কখনোই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে কার্পন্য করিনি। সংগঠনের আর্দশচ্যুত হলে তাদের সাথে কোন আপোষ নেই।
উল্লেখ্য, গত ১ জুলাই জেলা ছাত্রলীগের সদস্য (তেরখাদার) কাজী তরিকুল ইসলাম তরুকে সংগঠন পরিপন্থী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সংগঠন থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কার করার সুপারিশ করা হয়েছিল। একাধিক সূত্র মতে, ছাত্রলীগ নেতা তরুর বিরুদ্ধে পুলিশে চাকুরি দেবার প্রলোভনে অর্থ আত্মসাৎ, মাদক বিকিকিনি ও চাঁদাবাজীর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ