ঢাকা, বুধবার 18 September 2019, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

মুন্সীগঞ্জের ভট্টাচার্যের বাগে শতবছর ধরে ফুলকপির চারা উৎপাদন করছে চাষিরা 

মোমিন বিশ্বাস, মুন্সীগঞ্জ : ফুলকপির চারা উৎপাদনে সফল মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্যের বাগ এলাকার কৃষকরা। জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলাতেও বিক্রি করছে ফুলকপির চারা। বাংলাদেশে শীতকাল সবজি চাষের উপযুক্ত সময়। আর এই মৌসুমকে সামনে রেখেই শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ফুলকপির চারা উৎপাদনে কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করে। ভট্টাচার্যেরবাগ অঞ্চলের ফুলকপির চারা উৎপাদনের ইতিহাস শতবছরের পুরানো। তাই অঞ্চলের চারার গুনগত মান ও সুনাম অন্যান্য জেলায়ও ছড়িয়ে আছে। আর এ সুনামের কারণেই কেরানীগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, সাভার, চাঁদপুর, রংপুর, বরগুনা ও সিলেট জেলার চাষীরা প্রতিবছর এ অঞ্চল থেকে চারা আমদানি করেন বলেন জানান অটল ঢালী। এ অঞ্চলে প্রায় শত বছর পূর্বে ফুলকপির চারা উৎপাদন শুরু করে সোনা ঢালী। বংশ পরম্পরায় এ চাষাবাদ করে আসছে তার ছেলে ও নাতিপুতিরা। এখন পর্যন্ত এ চাষাবাদের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ঢালী বংশের অধিকাংশ ব্যক্তিরা। ঢালী বংশের পরাগ ঢালী এই ব্যবসা করেই সফল হয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি লন্ডনে বসবাস করছেন।  

সরেজমিনে ভট্টাচার্যেরবাগ এলাকায় হোসেন ঢালী, আলমস ঢালী, কাসেম ঢালী, অটল ঢালী ও উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ অনেকের সাথে কথা বলে ফুলকপির চারা উৎপাদনের বিভিন্ন বিষয় জানা যায়। 

জমি নির্বাচন: ফুলকপির চারা উৎপাদনের জন্য সমতল ভূমি নির্বাচন করতে হয়। যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও যেন পানি না জমে। আর প্রচুর বৃষ্টিপাত চারার জন্য ক্ষতিকর। তবে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে যাওয়ার জন্য ক্যানেল করে দিতে হয় যেন পানি না জমে থাকে। বেঁলে দোঁআশ ও দোঁআশ মাটি চারা উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী। ভিটি জমিও চারা উৎপাদনের উপযুক্ত ভূমি। একটি ছোঁ শিশুকে যেমন সুন্দরভাবে পরিচর্যা করে লালন পালন করতে হয় ঠিক চারা গাছকেও সেইভাবে পরিচর্যা করতে হয় বলে জানান হোসেন ঢালী। তবে এ অঞ্চলে অধিকাংশ চাষীর নিজস্ব জমি না থাকায় বর্গা জমিতে চারা উৎপাদন করে যাচ্ছে। 

আবহাওয়া: যে অঞ্চলে খুব বেশি ঠান্ডা নয় এবং গরমও নয় এমন আবহাওয়ায় ফুলকপির চারা উৎপাদন ভালো হয়। এ অঞ্চল নাতিশীতোষ্ণু আবহাওয়ার অর্ন্তভুক্ত ফলে চারা উৎপাদনে বেশ উপযোগী। 

বীজ: ভালো ফলনের প্রধান শর্ত হলো ভালো বীজ বপণ করা। এ বিষয়টি লক্ষ রেখেই ভট্টাচার্যের বাগ এলাকার কৃষকরা দেশী ও বিদেশী উভয় জাতের বীজই বপণ করে। তারা কাইঠা, সাইঠা, পৌষা, মাঘরা ও চালানী দেশীয় জাতের বীজ এবং সিরাজী-৭৭, ফ্রেশ, হিমাদ্রি, ¯েœাহুয়াইট, কিং কাশমিরী ও হাইব্রিড জাতের বিদেশী বীজ বপণ করে। প্রতি কেজি দেশী জাতের বীজ ৪ হাজার টাকায় ক্রয় করতে হয় কৃষকদের। অন্যদিকে হাইব্রিড জাতের বীজ প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৪৮ হাজার টাকা দরে ক্রয় করে চাষীরা। 

বেড তৈরি : বেড তৈরির জন্য মুলি ও চাটাই ব্যবহার করা হয়। মুলি গোড়ার অংশ খটুটি হিসেবে মাটিতে পুতে দেয়া হয়। খটুটির সাথে মুলি লম্বালম্বিভাবে স্থাপন করা হয়। পরে মুলির উপর চাটাই দিয়ে চারাগুলো ঠেকে দেয়া হয়। দুপুরের প্রচন্ড রোদ ও বৃষ্টি থেকে চারাকে রক্ষা করার জন্যে এ ব্যবস্থা করা হয়। 

প্রতি শতাংশে ব্যয়: প্রতি শতাংশের একটি বেড তৈরিতে ১০০ গ্রাম বীজ, ৪ কেজি খৈইল, ২ কেজি টিএসপি, দেড় কেজি পটাশ, ৩০টি চাটাই, ১৫টি মুলি ও শারীরিক শ্রমের প্রয়োজন হয়। দেশী জাতের বীজ দিয়ে প্রতি শতাংশ জমিতে চারা উৎপাদনের জন্য প্রায় ২ হাজার টাকা ব্যয় হয়। অন্যদিকে বিদেশী জাতের বীজ দিয়ে প্রতি শতাংশ জমিতে চারা উৎপাদনের জন্য প্রায় ৫হাজার টাকা ব্যয় হয়। 

ফলন: প্রতিটি ১ শতাংশের বেডে দেশী জাতের বীজে প্রায় ১০হাজার চারা উৎপন্ন হয়। আর বিদেশী জাতের বীজে প্রায় ১২ হাজার চারা উৎপন্ন হয়। দেশী জাতের প্রতি হাজার চারার বাজার মুল্য প্রায় ৭০০-৮০০ টাকা। আর বিদেশী জাতের প্রতি হাজার চারার বাজার মূল্য প্রায় ৮০০-১৫০০ টাকা। এ হিসেবে প্রতি শতাংশ দেশী জাতের বীজে প্রতি এক শতাংশের বেডে একবার চাষে খরচ বাদে প্রায় ৬ হাজার টাকা এবং প্রতি শতাংশ বিদেশী জাতের বীজে প্রতি বেডে একবার চাষে খরচ বাদে প্রায় ১০হাজার টাকা আয় হয়। এভাবে প্রতিটি বেডে ৪বার চারা উৎপন্ন হয়। প্রতি শতাংশে চারবার চারা উৎপাদন করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় থাকে। এ হিসেবে প্রতি এক বিঘা অর্থাং ৩৩ শতাংশ জমিতে এক মৌসুমে প্রায় ১০লক্ষ টাকা আয় করে থাকে এ অঞ্চলের কৃষকরা।  কৃষক কাসেম ঢালী (৭৬) বলেন, প্রায় ৫৫ বছর যাবৎ আমি এ কাজের সাথে জড়িত রয়েছি। আমাদের এলাকার অনেকেই এ কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। আমার বাবাও এ কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে মৌসুম ওয়ারী ২৪ হাজার টাকা দিয়ে একজন লোক রেখেছি চারা পরিচর্যা করার জন্য। 

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলা থেকে চারা ক্রয় করতে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, গতবছর আমি চালানী সাইঠা জাতের চারা নিয়ে ২৮ শতাংশ জমিতে ফুলকপির চাষ করেছিলাম। ফলন ভাল হয়েছিল। তাই এবছরও চারা নিতে এসেছি। চারা ভালো না হলে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ জাকির হোসেন বলেন, কৃষকরা চারা উৎপাদনে ভালো বীজ বপণ করছে কিনা, মাটির গুণগত মান ঠিক আছে কিনা, আবহাওয়া কেমন হওয়া উচিত, কতটুকু সার প্রয়োগ করতে হবে এ সকল সার্বিক বিষয়ে আমরা তাদেরকে মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। কৃষকরা যেন লাভবান হতে পারে এবং সঠিক সময় ও সঠিকভাবে বীজ বপণ করে সে লক্ষে তাদেরকে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়ে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ