ঢাকা, শুক্রবার 20 September 2019, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

ক্যাসিনোর টাকার ভাগ সবার পকেটে! 

# যুবলীগ নেতা খালেদের বিরুদ্ধে ৪ মামলা  দু’মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে

# ক্যাসিনো চালাতে চীন ও নেপাল থেকে আনা হয় দক্ষ লোক

# খালেদের টর্চার সেল থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি উদ্ধার

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : পশ্চিমা ধাঁচের উন্নত জুয়া ‘ক্যাসিনো’ এর সাথে বাংলাদেশের আমজনতার পরিচয় নেই। তারা জানেও না তাতে কি হয়, কারা খেলে। কিন্তু ফুলে ফেপেঁ ওঠা অর্থবিত্তের মালিকরা ‘ক্যাসিনো’ সম্পর্কে জানেন এবং বোঝেন। দেশের বাইরে গিয়ে ক্যাসিনো আসক্তরা খেলেন, টাকা ওড়ান। তাদেরকে দেশের ভেতরে আটকাতেই ৭ থেকে ৮ বছর আগে রাজধানীর ক্লাব পাড়া খ্যাত পল্টন-মতিঝিলসহ গুলিস্তান, এলিফ্যান্ট রোড, গুলশান, বনানী ও উত্তরাতে ক্যাসিনোর ব্যবসা শুরু হয়। গত কয়েক বছর ধরে সেই ব্যবসায় চলে আসছিল রমরমা ভাব। প্রতিদিন রাজধানীর বুকে গড়ে ওঠা ক্যাসিনোগুলোতে হাতবদল হতো শতাধিক কোটি টাকা। সে সময় চলতো নানা আয়োজনও। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নাকের ডগায় প্রভাবশালীরা এসব ক্যাসিনো চালাতেন। সেখান থেকে আয়ের ভাগ যেতো অনেকের পকেটেই। যার কারনে ক্যাসিনো চলতো বছরের পর বছর ধরে। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগনের সামনে এ ক্যাসিনোর খবর আর চিত্র ভাসলেও প্রভাব আর বিত্তের কাছে তারা ছিল অসহায়। কিন্তু হঠাৎ করেই বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) র‌্যাবের সাড়াঁশি অভিযানে এগুলো তছনছ হতে শুরু করে,বের হয়ে আসতে থাকে আসল চিত্র জনসম্মুখে ।

রাজধানী কেন্দ্রিক ক্যাসিনো ব্যবসার পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারী দলের নেতাকর্মীদের হাতে। ক্লাবপাড়া কেন্দ্রিক ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রন ছিল যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ নেতাদের হাতে। তাদের একজন সাংগাঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

ক্লাবপাড়া কেন্দ্রিক ক্যাসিনোর আয়ের টাকার ভাগ পেত পুলিশের সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, ডিসি, রাজনৈতিক নেতা, ওয়ার্ড কমিশনার, সাংবাদিক ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। র‌্যাবের হাতে খালেদ মাহমুদ আটক হওয়ার পর তিনি এ তথ্য জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার র‌্যাবের বিশ্বস্ত এক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

র‌্যাবের ওই সূত্র জানায়, ‘প্রত্যেকটি ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হতো। লাভের অংশের ভাগ সবার কাছে পৌঁছায় দিতে হতো। থানার ওসির কাছে মাসিক হারে কয়েক লাখ টাকা দিতে হতো। সংশ্লিষ্ট জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার ও উপ-কমিশনারের কাছেও মাসিক হারে টাকা পৌঁছে যেত। এমনকি যারা উপ-পরিদর্শক বা পরিদর্শক লেভেলের তাদেরকেও টাকা দিতে হতো। তবে তাদের পরিমাণটা ছিল কম। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ক্যাসিনো এলাকার পুলিশের বিট অফিসারও পেত টাকার ভাগ।

সূত্রটি আরও জানায়, টাকার ভাগ রাজনৈতিক নেতার পকেটেও যেতো। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে মোটা অংকের টাকা দিতে হতো। এমনকি কাউকে কাউকে গাড়ি উপহার দিতে হয়েছে। অনেককে দিতে হয়েছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দামের মোবাইল ফোন। এমন নেতাদের তালিকাও করা হচ্ছে। টাকার ভাগ যেত অনেক সাংবাদিকের পকেটেও। এরই মধ্যে খালেদ সবার তালিকা র‌্যাবের কাছে দিয়েছে।

র‌্যাবের সূত্রটি বলছে, ক্যাসিনোর এই টাকার ভাগ দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও চলে যেত। যেসব সন্ত্রাসী দেশের বাইরে থাকেন তারাই মূলত এই ভাগ পেত।

র‌্যাবের কাছে খালেদ জানিয়েছে, মগবাজার টিএনটি কলোনির সন্ত্রাসী নাজির আরমান নাদিম ও শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হয়ে ঢাকায় কাজ করেন খালেদ। চাঁদাবাজি ও ক্যাসিনোর টাকা ওমানের মাসকটে থাকা সন্ত্রাসী নাদিমের কাছে পাঠায় খালেদ। সেখান থেকে জিসানও ভাগ পায় টাকার। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান বর্তমানে ভারতের পাসপোর্ট দিয়ে জার্মানিতে স্থায়ী হয়েছে। জিসানের দুবাইয়ের দেরাতে চারটি গোল্ডের দোকান আর আল ফজিরা সিটি জায়েদ শেখ মার্কেটে রয়েছে নাইট ক্লাব। এসব ব্যবসায় চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ীর শেয়ার রয়েছে। সেই সুবাদে জিসান জার্মানি থেকে দুবাইয়ে আসা-যাওয়া করেন। ঢাকায় জিসানের যেখানে যেখানে আধিপত্য ছিল তার সবই নিয়ন্ত্রণ করত খালেদ।

এর আগে বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টা ২৫ মিনিটে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গুলশানের বাসা থেকে আটক করে র‌্যাব-১। এরপর তাকে র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্য মতে, কমলাপুরের ইস্ট্রার্ন টাওয়ারের টর্চার সেলে অভিযান চালায় র‌্যাব। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে অথবা তার কথা মতো না চললে তাকে ডেকে এনে টর্চার সেলে নির্যাতন করা হতো বলে জানান র‌্যাবের কর্মকর্তারা। পরে সেখান থেকে একটি প্লাস, কয়েকটি হকিস্টিক ও লাঠি উদ্ধার করা হয়।

‘ক্যাসিনোগুলো থেকে পুলিশের সংশ্লিষ্ট জোনের কর্মকর্তারা টাকার ভাগ নিতেন’- এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। তবে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত হবে। এবং প্রমাণ হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে।’

বুধবার বিকেল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত পল্টন ও মতিঝিল এলাকার কয়েকটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে ক্যাসিনোগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি আটক করা হয় দুই শতাধিক ব্যক্তিকে।

ঢাকার ক্যাসিনো চালাতে চীন ও নেপাল থেকে আনা হয় দক্ষ লোক

ঢাকায় যতগুলো আধুনিক বৈদ্যুতিক ক্যাসিনো জুয়ার বোর্ড আছে, সেগুলো অপারেট করতে চীন ও নেপাল থেকে অভিজ্ঞ লোক আনা হয়েছে। তারাই এই বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করে। বিনিময়ে প্রতি মাসে বেতন পায় তারা। বুধবারের অভিযানের পর এরকম কয়েকজন নাগরিকের পাসপোর্ট ও নাম ঠিকানা পাওয়া গেছে। তাদের কাছে ওয়ার্ক পারমিট আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে র‌্যাব। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকাল থেকে মধ্যরাত পযন্ত ঢাকার বনানী, মতিঝিল, ফকিরাপুল ও গুলিস্তানের ক্যাসিনোতে অভিযান অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব-৩ ও ১। ক্রীড়া সংগঠনের নামের আড়ালে এসব ক্যাসিনোর ভেতরের রঙিন আলো ও আধুনিক সাজসজ্জা দেখলে যেকারও চোখ ঝলসে যাবে। এসি রুমের এসব ক্যাসিনোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনভাবে করা, যাতে সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতেই ভয় পায়।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘আমরা ক্যাসিনোতে চীন ও নেপালি নাগরিকদের পেয়েছি। এখানে তারা চাকরি করেন বলে জানিয়েছে। তবে সত্যি তাদের ওয়ার্ক পারমিট আছে কিনা, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’

এর আগে, বুধবার বেলা ৩টার দিকে প্রথমেই মতিঝিল থানার পেছনে ফকিরাপুল এলাকার ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব। সেসময় কয়েকজন চীনা ও নেপালি নাগরিককে সেখানে পাওয়া যায়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তাদের তথ্য রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে নেপালের দুজনার নাম হলো ভূপেস ও সঞ্জয়। তারা ক্যাসিনোতে কাজ করেন।

অভিযানে র‌্যাবের হাতে মেঘা ও লিজা নামের দুই তরুণী আটক হলেও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ক্যাসিনোতে তারা ‘ডিলার’ পদে চাকরি করেন বলে জনিয়েছেন। লিজা বলেন, ‘ক্যাসিনোতে দুই সিফটে জুয়া খেলা হয়। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা এবং রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা। জুয়ার বোর্ডগুলো চীনা নাগরিকরা চালু করে। নেপালিরা বোর্ড পরিচালনা করে। তারা এগুলো অপারেট করতে দক্ষ।’

লিজা আরও বলেন, ‘আমরা মাসিক ও দিন হিসেবে এখানে চাকরি করি। আমরা কখনও রিসিপশনে, কখনও বোর্ডে দায়িত্ব পালন করি।’

মেঘা বলেন, ‘প্রতি শিফটে ৭০-৮০ জন মানুষ খেলে। কখনও বেশিও আসে। তবে রাতের বেলায় বেশি মানুষ থাকে।’ সেখানে অনেকে মাদক সেবন করে বলেও তারা জানিয়েছে।

যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদের বিরুদ্ধে ৪ মামলা 

অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-৩-এর ওয়ারেন্ট অফিসার গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে গুলশান থানায় অস্ত্র, মাদক ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তিনটি মামলা দায়ের করেন। আর মতিঝিলি থানায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেন র‌্যাবের ওয়ারেন্ট অফিসার চাইলা প্রু মার্মা। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ চক্রবর্তী ও র‌্যাবের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) মিজানুর রহমান। 

সুদীপ চক্রবর্তী জানান, বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে গুলশানে অভিযান চালিয়ে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে আটক করে র‌্যাব। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে গুলশান থানায় হাজির করা হয়। তার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় অস্ত্র, মাদক ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে আলাদা ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গুলশান বিভাগের ডিসি আরও জানান, বুধবার খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে ১টি শটগান, দু’টি পিস্তল, শটগানের ৫৭ রাউন্ড গুলি ও ৭.৬৫ এমএম-এর ৫৩ রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়। এছাড়া, ৫৮৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১০ লাখেরও বেশি দেশি নগদ টাকা ও ৭ লাখের বেশি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জব্দ করা হয়। তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৭ সালে শেষ হয়ে গেছে বলেও তিনি জানান।

সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা দু’টি মামলায় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার দেখিয়ে ৭ দিন করে রিমান্ডের আবেদন চেয়ে আদালতে পাঠিয়েছি। আর মানিলন্ডারিং আইনে করা মামলাটি শিডিউল অনুযায়ী পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করবে। তাদের কাছে ওই মামলার কাগজপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। রিমান্ডে এনে তাকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

আসামিকে আটকের পর আদালত পাঠাতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণ সম্পর্কে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আসামির বিরুদ্ধে ৩টি আলাদা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাই মামলার তথ্য, উপাত্ত ও আইনের ধারাসহ সবকিছু বিবেচনা করে এজাহার লিখতে সময় লেগেছে।’ তাই আসামিকে আদালতে হাজির করতে দেরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, র‌্যাবের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) মিজানুর রহমান  জানান,  যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়্ন্ত্রণ আইনে মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

৭ দিনের রিমান্ডে খালেদ

অস্ত্র ও মাদকের পৃথক দুই মামলায় সাতদিনের রিমান্ডে যুবলীগ নেতা খালেদ হোসেন ভূঁইয়া। অস্ত্র মামলায় চারদিন ও মাদক মামলায় তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তাকে আদালতে তুলে অস্ত্র ও মাদকের পৃথক দুই মামলায় সাতদিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। অন্যদিকে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে অস্ত্র মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা ও মাদক মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মাদক মামলায় তাকে শোন অ্যারেস্ট দেখার আবেদন মঞ্জুর করেন ঢাকা মহানগর হাকিম দেবদাস চন্দ্র অধিকারী। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গুলশান থানা সূত্রে জানা গেছে, খালেদের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনে তিনটি মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে গুলশান থানায় মামলাগুলো করা হয়। এর আগে আটক খালেদকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় র‌্যাব। গতকাল (বুধবার) সন্ধ্যায় গুলশান-২ এর নিজ বাসা থেকে খালেদ মাহমুদকে আটক করা হয়।

র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, আটক খালেদকে র‌্যাব-৩ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। তিনি বলেন, ক্যাসিনো ও মাদক ব্যবসা নিয়ে আটক খালেদকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। 

গ্রেফতারের সময় খালেদের বাসা থেকে ৪০০ পিস ইয়াবা, লকার থেকে ১০০০, ৫০০ ও ৫০ টাকার বেশ কয়েকটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। সেগুলো গণনার পর ১০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পাওয়া যায়। এছাড়া ডলারেরও বান্ডিল পাওয়া যায়। টাকায় তা ৫-৬ লাখ টাকা হবে বলে জানায় র‌্যাব। এছাড়া তার কাছ থেকে মোট তিনটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। যার একটি লাইসেন্সবিহীন, অপর দুটি লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করে রাখা হয়েছিল।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে মতিঝিলের ক্যাসিনো পরিচালনার বিষয়টি মতিঝিল থানা পুলিশ, মতিঝিল জোন, পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সদর দফতরের কর্মকর্তারা জানতেন বলে দাবি করেন খালেদ। তবে পুলিশের সঙ্গে ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য কোনো আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি তিনি।

সূত্র জানায়, খালেদের ক্যাসিনোর বিষয়ে পুলিশ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সংস্থা এবং রাজনীতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জানতেন। তাদের ‘ম্যানেজ করে’ ক্যাসিনো চালাতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনটির প্রভাবশালী নেতা খালেদকে ধরতে অভিযান নামে র‌্যাব।

বুধবার বিকাল থেকে গুলশান ২ নম্বরের ৫৯ নম্বর সড়কে খালেদের বাসা এবং ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে একযোগে অভিযান শুরু করেন র‌্যাব সদস্যরা। শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনিতে বেড়ে ওঠা খালেদ ফকিরাপুলের ওই ক্লাবের সভাপতি।

কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ওই ক্লাবে মদ আর জুয়ার বিপুল আয়োজন পাওয়া যায়। সেখান থেকে ২৪ লাখ টাকাও উদ্ধার করা হয়। আর গুলশানের বাসা থেকে খালেদকে গ্রেপ্তারের পর তার বাসায় ৫৮৫টি ইয়াবা, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা এবং অবৈধ অস্ত্র পাওয়ার কথা জানায় র‌্যাব।

ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবের পাশাপাশি ওই এলাকার ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, বঙ্গবন্ধু এভিনিউর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র এবং বনানীর আহমেদ টাওয়ারে গড়ে তোলা একটি ক্যাসিনোতে র‌্যাবের অভিযান চলে। এসব অভিযানে মোট ১৮২ জনকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে র‌্যাবের নির্বাহী হাকিম সারোয়ার আলম জানান।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের এক বৈঠকে সহযোগী সংগঠন যুবলীগের নেতাদের নানা কান্ডের সমালোচনা করেন।

এরপর যুবলীগ নেতাদের ৬০টি জুয়ার আখড়া বা ক্যাসিনো চালানোর খবর আসে কয়েকটি সংবাদপত্রে। বুধবার তা প্রকাশিত হওয়ার পর চারটি ক্লাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলে।

তবে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এই অভিযান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিযান দেখে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট কয়েক হাজার নেতা-কর্মী নিয়ে কাকরাইলে সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থান নেন।

আরও তিন ক্লাবে অভিযান, ‘জুয়ার’ ২৪ লাখ টাকা উদ্ধার

ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবের পর ঢাকার আরও তিনটি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে জুয়ার ২৪ লাখ টাকা উদ্ধার এবং ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এই ক্লাবগুলো হল- ইয়ংমেনস ক্লাবের পাশের ঢাকা ওয়ান্ডারাস ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র এবং বনানীর আহমদ টাওয়ারের গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, ফকিরাপুলের ওয়ান্ডারাস ক্লাব থেকে নগদ ২০ লাখ ২৭ হাজার টাকা, জুয়ার সরঞ্জাম, ২০ হাজার ৫০০ টাকার জাল নোট, বিপুল পরিমাণ মদ ও মাদক জব্দ করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র থেকে জুয়ার সরঞ্জাম, চার লাখ ১৫ হাজার টাকা, একটি কষ্টি পাথরের মুর্তি উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০ জনকে। গ্রেপ্তারদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম জানিয়েছেন।

এছাড়া বনানীর আহমদ টাওয়ারে ‘গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ’ নামে একটি ক্যাসিনো চালানো হয়। সেখানে অভিযানে গিয়ে ক্যাসিনোটি তালাবন্ধ পাওয়া গেছে। সেটি সিলগালা করা হয়েছে, পরে ভেতরে তল্লাশি চালানো হবে।

যুবলীগের ঢাকা মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন। বুধবার দুপুরের পর সেখানে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, মদ, বিয়ার ও নগদ ২৪ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। পাশাপাশি ১৪২ জনকে আটকে সাজা দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র থেকে ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছেমুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র থেকে ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছেএকই সময় গুলশান-২ নম্বরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে খালেদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

ইয়ংমেনস ক্লাবে অভিযানের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর পাশের ওয়ান্ডারাস ক্লাবে যান র‌্যাব সদস্যরা। পরে মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্র এবং বনানীতে অভিযান চালানো হয়।

ওয়ান্ডারাস ক্লাবটি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. কাওসার ও ওই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাইদ চালান বলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম জানান।

পালাতে চেয়েছিলেন সিঙ্গাপুরে

ফকিরাপুলে অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) হাতে আটক হয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তবে একাধিক পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ দাপট তৈরি করে চলা খালেদ দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সিঙ্গাপুরে গিয়ে গা ঢাকা দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আটক হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি বিমানবন্দর থেকে ফিরে এসেছিলেন। গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, এদিন সকালেই সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা ছিল তার।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ পাঁচ জন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সকালের একটি ফ্লাইটে দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন। ভোরে তারা সে উদ্দেশ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও যান। তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে তাদের সন্দেহ হয়, তারা বিমানবন্দরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়তে পারেন। এ আতঙ্ক থেকে তারা বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসেন। 

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও জানান, বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে সম্রাট-খালেদসহ পাঁচ জন একসঙ্গেই ছিলেন। পরে দুপুরের দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গিয়ে যে যার মতো আলাদা হয়ে যান। সেখান থেকে খালেদ বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে ফিরে যান তার বাসায়। সেখান থেকে দ্রুতই তার বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু র‌্যাব তার বাসায় ঢুকে পড়ায় তিনি আর বাসা থেকে বের হতে পারেননি।

একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, খালেদ এরই মধ্যে র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছেন। তার সঙ্গে আরও যারা ছিলেন, তাদের ধরতেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব।

‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’র সঙ্গে সম্পর্ক খালেদের

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতে পলাতক পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার। সেই সম্পর্কে ভাঙন ধরার পর তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুবাইয়ে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে। তার সহযোগিতা নিয়ে টেন্ডারবাজিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন খালেদ। সেই টাকার ভাগ নিয়মিত পৌঁছে যেত জিসানের কাছে। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ খালেদের অবস্থান প্রমাণে সিঙ্গাপুরের অভিজাত হোটেল মেরিনা বে’র সুইমিংপুলে জিসান ও খালেদের সাঁতার কাটার ছবি দিয়ে ছাপানো পোস্টারে ছেয়ে যায় নগরী।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, একসময় টেন্ডারবাজির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে জিসানের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হয় তার। এসময় সম্রাটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার শুরু খালেদের। জিসানের কাছ থেকেও তিনি দূরে সরে আসেন। একপর্যায়ে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জিসানের বেশকিছু ক্যাডার ধরিয়ে দেন তিনি, বেশ কয়েকজন ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়। এরপর মুখোমুখি হয়ে পড়েন জিসান ও খালেদ। তখন থেকেই ‘নিরাপত্তা’র খাতিরে অস্ত্র উঁচিয়ে চলতে থাকেন খালেদ ও তার ক্যাডাররা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে খালেদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে দু’জনের মধ্যে বৈঠকও হয়েছে। থাইল্যান্ডে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী উল্লাহ নবীর সঙ্গেও রয়েছে খালেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও খালেদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, থাইল্যান্ডে পলাতক মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী উল্লাহ নবী খালেদের ব্যবসায়িক অংশীদার। ব্যাংককে একটি টু-স্টার মানের হোটেল ও পাতায়াতে ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে খালেদের। এসব দেখভাল করেন নবী। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অভিজাত সুপারমল প্যাভেলিয়নের উপরে ১১ কোটি টাকায় সম্পতি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন খালেদ। সেখানে গড়েছেন সেকেন্ড হোম। স্কটল্যান্ডেও কিনেছেন বাড়ি। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পরিবার নিয়ে ঘনঘন যাতায়াত করেন। সেখানে বিনিয়োগ ভিসায় স্থায়ীভাবে পরিবার নিয়ে থাকার প্রস্তুতিও চলছে তার।

যোগাযোগের চেষ্টা করেও এসব বিষয়ে খালেদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, চাঁদাবাজিসহ যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব অনৈতিক কাজের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিচার হবে যুবলীগের নিজস্ব ট্রাইব্যুনালে। বিচার প্রক্রিয়া শুরুর জন্য এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাটের দাবি, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, সেগুলার প্রশাসনিক তদন্ত হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আর খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচিয়ে চলার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ক্যাসিনো ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ প্রসঙ্গে সম্রাট বলেন, এগুলো কারা করে, তা তার জানা নেই।

ক্যাসিনো থেকে আয় ৩ কোটি টাকা

স্থানীয় প্রসাশন ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করেই রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবে চলছিলো জুয়ার আসর। এজন্য চীন ও নেপাল থেকে আনা হয় অভিজ্ঞ নারী-পুরুষও। ওই ক্যাসিনো থেকে মাসিক প্রায় ৩ কোটি টাকা আয় ছিলো ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার। আর এই টাকার ভাগ পেতেন অনেকেই। খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে অবৈধ ক্যাসিনোগুলোর পেছনে থাকা স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সর্ম্পকে নানা তথ্য ও টাকার ভাগ কারা কারা পেতেন জানতে পেরেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে তার দেওয়া তথ্য সঠিক কিনা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ক্লাবটিতে সব ধরনের জুয়া, মদ,ইয়াবা ও সুন্দরী নারীসহ সব ধরনের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা ছিলো।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, খালেদের নিয়ন্ত্রণাধীন আরো ক্যাসিনো আছে কিনা বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ক্যাসিনোর মতো অবৈধ ব্যবসা চালাতে গেলে অবশ্যই অর্থ ভাগাভাগির বিষয় থাকে। জুয়ার টাকার কারা কারা পেত তাদের নামও জানিয়েছে সে। বিদেশে খালেদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। তাকে গ্রেপ্তারের পর অনেকেই গাঁ ঢাকা দিয়েছে। 

খালেদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ব্যাংককে একটি টু-স্টার মানের হোটেল ও পাতায়াতে ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে খালেদের। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অভিজাত সুপারমল প্যাভেলিয়নের উপরে ১১ কোটি টাকায় সম্পত্তি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। স্কটল্যান্ডেও কিনেছেন বাড়ি। বর্তমান সরকারের আমলে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে উঠে খালেদ। জুয়ার টাকার ভাগ পেত সংশ্লিষ্ট থানা, ডিসি,রাজনৈতিক নেতা, ওয়ার্ড কমিশনার, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরাও। এছাড়া যুববলীগের তিন প্রভাবশালী ও আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাও ভাগ পেতেন।

খালেদের টর্চার সেলের আধুনিক যন্ত্রপাতি

ইয়ংমেন্স ক্লাবের নামে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার টর্চার সেলের ভেতর থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি উদ্ধার করেছে র‌্যাব। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনের উল্টো দিকে ইস্টার্ন কমলাপুর টাওয়ারে এই টর্চার সেলের সন্ধান পায় র‌্যাব-৩ এর একটি দল। তার আগে গুলশানের বাসা থেকে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেফতার করা হয় যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদকে।

খালেদের টর্চার সেলে ভেতর থেকে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার পাওয়ারফুল দুটি আধুনিক মেশিন, অস্টেড অয়েল, পেটানোর জন্য বিভিন্ন সাইজের বেত আর বেসবল স্টিক উদ্ধার করা হয়েছে। জানা গেছে, কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে তাকে টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করতো যুবলীগ নেতা খালেদ।

ইয়ংমেনস ক্লাবের ক্যাসিনোর কথা জানতেন না মেনন!

ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো চালানো হতো এটা জানতেন না বলে জানিয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। ক্লাবটি ২০১৬ সালে যখন চালু করা হয় তখন একবারই সেখানে গিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

রাশেদ খান মেনন এই ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। ক্লাবের সভাপতি গ্রেফতার হওয়া যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ ভুঁইয়া। এই ক্লাবে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানো হতো। বুবধার (১৮ সেপ্টেম্বর) ক্লাবে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব নারী-পুরুষসহ ১৪২ জনকে আটকসহ ২০ লাখের বেশি টাকা উদ্ধার করে।

ক্যাসিনো বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) জানতে চাইলে রাশেদ খান মেনন বলেন, ২০১৬ সালে যখন ক্লাবটি চালু হয় তখন ওরা আমাকে ওই ক্লাবে নিয়ে যায়। একবারই আমি ওই ক্লাবে গিয়েছি। এরপর আমার সঙ্গে ওই ক্লাবের আর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, আমি তো জানতাম না ওই ক্লাবে ক্যাসিনো চালানো হয়। আমি যদি এটা জানতাম তাহলে এটা তো আগেই বলতাম।

ক্যাসিনো চালানো ক্লাবের গর্ভনিং বডির চেয়ারম্যান মেনন, এটা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনা হচ্ছে। এই সমালোচনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মেনন বলেন, আমি ওই এলাকার মানুষ। শুধু ওই ক্লাব কেন, বহু ক্লাবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে। আমি তো জানি না এটা হয়। সমালোচনা হতে পারে, সমালোচনা হলে আমার কী করার আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ