ঢাকা, শুক্রবার 20 September 2019, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

জিডিপির প্রবৃদ্ধি সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ

 

এইচ এম আকতার: মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপির) সাথে পাল্লা দিয়ে ধনী-দরিদ্রে বৈষম্য বাড়ছেই। জিডিপি বাড়লেও প্রতি বছর সে অনুপাতে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য কমছে না। এতে করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে না সাধারনণ মানুষ। এই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও মজুরি না বাড়ায় আয়-ব্যয় অংক মিলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন। এ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও সরকার বলছে বৈষম্য কমছে।

জানা গেছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির কারণেই মূল্যস্ফীতি ঘটছে। এতে করে মূল্য পিষ্টে পদদলিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অথচ সরকার সারা বিশে^ ফলাও করে প্রচার করছে বাংলাদেশের সব চেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির দেশ। এতে করে মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়ছে। মানুষ ডাল ভাত খেয়েই কোনভাবে জীবন যাপন করছে।

এ নিয়ে নানা সময় কথা বলছেন,সরকার বলছে মূল্য নিয়ন্ত্রনে সরকার সফল হয়েছে। মূল্যস্ফীতিও অনেক কম হচ্ছে। সাধারন মানুষ নানাভাবে ডিজিটাল সুবিধা পাচ্ছে। এতে মানুষের খরচ কমছে। নানাভাবে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে।

রাজধানীর বনানী লেকের এক পাশে রয়েছে সু-উচ্চ ভবনের সারি। অন্যপাশ ঠাসা বস্তিঘরে। এখানকার মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস। আর হতদরিদ্র রয়েছে প্রায় দুই কোটি।

গত ছয় বছরে দারিদ্র্য কমার গতিও অনেকটাই ধীর। এ সময় প্রতি বছর অতি হতদরিদ্র কমেছে শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ হারে। অথচ ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ হার ছিলো দেড় শতাংশ। এ বিষয়ে কর কাঠামো পরিবর্তন, সুশাসন নিশ্চিতসহ সরকারকে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জিডিপি বাড়লেও এর সুবিধা ভোগ করছে খুব কম সংখ্যক মানুষ। শ্রম দিয়েও আয় না বাড়ায় কমছে না দারিদ্র্যের হার। তাদের মতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দুর্বল কর নীতি এ বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দিতে কাজ করছে সরকার। দরিদ্রদের আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা দিয়ে থাকি। বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ নিয়ে গেছে এটি বড় একটি উপাদান।

বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ধনীর আয় ২০০৫ সালে ছিল ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১০ সালে এসে সেটি কিছুটা কমে গিয়ে ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ হলেও ২০১৬ সালে এসে আবারও ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বিপরীত চিত্র সর্বনিম্ন আয়ের ১০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে।

তাদের আয় ২০০৫ সালে ছিল ২ শতাংশ। সেটি ২০১০ সালেও একই ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে এসে সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ১ শতাংশে। এছাড়া প্রবৃদ্ধি ঘটলেও সেই তুলনায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না। বলা চলে কর্মসংস্থান এক জায়গায় স্থির রয়েছে। 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা সম্মেলনের প্রথম দিন ‘কোয়ালিটি গ্রোথ ইন বাংলাদেশ : সাম নিউ এভিডেন্স’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।  

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের তুলনায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কম। এছাড়া কর্মস্থানের হার যেটি আছে সেটি ধরে রাখতে হলে প্রতি বছর ১১ লাখ লোকের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গুণগত মান বেড়েছে। কিন্তু সেটি খুবই কম। কারণ বৈষম্য বেড়েছে, দারিদ্র্য সেই হারে কমেনি, কর্মসংস্থানও বাড়েনি।

দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাত ও রেমিটেন্স ভূমিকা হয়তো রেখেছে কিন্তু সেখানে সরকারের ভূমিকা ওইভাবে দৃশ্যমান নয়। দারিদ্র্য নিরসনে সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় তুলনামূলক বিনিয়োগ বাড়ায়নি।

এছাড়া সম্মেলনে ‘উইমেন এন্টারপ্রেনর ইন এসএমই : বাংলাদেশ প্রসপেকটিভ’ শীর্ষক অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে মহিলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০১ সালে এ হার ছিল ২ দশমিক ৮০ শতাংশ। সেটি বেড়ে ২০১৩ সালে হয়েছে ৭ দশমিক ২১ শতাংশ। তাছাড়া আর্থিক ইউনিটগুলোর সামষ্টিক ব্যবস্থায়ও এসেছে পরিবর্তন।

এক্ষেত্রে মহিলা প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮৫ শতাংশ মহিলা কর্মী কাজ করছে। এছাড়া মহিলা প্রধান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ট্রেড লাইসেন্স ২০০৯ সালে ছিল ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ, সেটি বেড়ে ২০১৭ সালে হয়েছে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া টিআইএন ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বড় শোরুমের সংখ্যা ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

উন্নয়নের অর্থনীতিতে দেশে বৈষম্য বেড়েছে এবং এখনো বাড়ছে, এ বিষয়ে কারোরই দ্বিমত করার অবকাশ নেই। সরকারের পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করেই দেশের অর্থনীতিবিদেরা যেমন এই বৈষম্য বাড়ার বিষয়টির কথা বলেছেন, ঠিক তেমনই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরাও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার তাগিদ দিয়েছেন। 

 বাংলাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির পেছনে যাঁরা মূল শক্তি সেই কৃষক, শ্রমিক, নারী উদ্যোক্তারা বাজেটে অবহেলিতই রয়েছেন। বর্তমানে ব্যাংকগুলো লুটেরা ও খেলাপিদের হাতে বন্দী। সমৃদ্ধির পথচলায় বৈষম্যের যে সিন্দাবাদের দৈত্য জাতির ঘাড়ে চেপে বসে আছে তার থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় বাজেটে নেই। কেবল আয়বৈষম্যই নয়, আঞ্চলিকবৈষম্য, গ্রাম-শহরের বৈষম্য অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। দেশের সম্পদ এখন মুষ্টিমেয় ধনীর হাতে কেন্দ্রীভূত। 

বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যয় প্রতি ১০০ টাকার ১৯ টাকাই খরচ হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। এর সঙ্গে পেনশনের ব্যয় যোগ করলে দাঁড়াবে ২৮ টাকা। রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল দৈন্যের শিকার হয়ে পড়লে সরকার যে শুধু প্রশাসনের ওপরই নির্ভরশীল হবে, সেটা মোটামুটি সবারই জানা। অনুষঙ্গ হিসেবে কমছে প্রশাসনের জবাবদিহি। নীতিনির্ধারণে রাজনীতিকদের চেয়ে আমলাদের দাপট বাড়ছে। আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাঁদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা, যদিও প্রতিবছরেই বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনের অদক্ষতাকেই দায়ী করা হয়। কার্যকর গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে সহসাই এই ধারায় কোনো পরিবর্তনের কারণ নেই। নামে গণতন্ত্র অথচ কার্যকর বিরোধী দলহীন সংসদে জনবান্ধব বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থের অনুকূল বাজেটের প্রত্যাশা একেবারেই অর্থহীন।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সব নীতি ও কৌশলের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বলা হয় যে উন্নয়নই হচ্ছে এগুলোর মূল দর্শন। এবং এ ক্ষেত্রে জাতীয় উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হারকে বেশ বড় করে দেখানো হয়। প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার এবং মাথাপ্রতি জাতীয় আয় বৃদ্ধির বিষয়টিকে দেশের অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি বাংলাদেশের অনন্য কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক দশকে বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে যে দু’টি অর্থনীতি, তার একটি হচ্ছে চীন এবং অপরটি ভারত। কিন্তু বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে ভারতে সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর দেশটির গত দশকের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে।

একই অবস্থা বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও। এখানেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রতি বছরই বাড়ছে। সে হারে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে না। মানুষের মধ্যে আয় বৈষম্য কমছে না। মানুষ নানাভাবে ক্রয় ক্ষমতা হারাচ্ছে। কিন্তু সরকার সারা বিশে^ প্রবৃদ্ধি নিয়ে যেভাবে প্রচার করছেন সে হারে দারিদ্র্য দূরীকরণে মনোযোগি হচ্ছে না।

মানুষ এখনও ফুটপাতে রাত্রি যাপন করে। না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে হচ্ছে। তাহলে জিডিপির এই প্রবৃদ্ধি কার স্বার্থে। এই প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের দারিদ্র দূর করতে না পারে তাহলে সাধারন মানুষের কি লাভ। সরকার বলছে দারিদ্র্য কমছে। মানুষ এখন আর না খেয়ে নেই। 

প্রবৃদ্ধি যে হারে বাড়ছে তাতে দেশের কোন বেকার থাকার কথা নয়। যদি প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হতো তাহলে এতো মানুষ বেকার কেন। বিনিয়োগে এ টাকা কোথায় গেলো। পাচার হওয়া টাকার মালিক কারা। এ টাকা বিনিয়োগ না করে কেন পাচার হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ