ঢাকা, রোববার 22 September 2019, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

যুবলীগ নেতা শামীম অবৈধ অস্ত্র ও মাদক মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে

ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বেষ্টিত জিকে শামীম -ছবি সংগৃহিত

* ৭ দেহরক্ষী অস্ত্র মামলায় ৪ দিনের রিমান্ডে
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : বেশিদিন আগের কথা নয়, বেশিদিন আগের চিত্রও নয়। ছোটখাটো গড়নের ক্লিন সেভড ফর্সা রঙের মানুষটি এলেন। উচ্চ পদস্থ প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তার (পিএ) রুমে ঢুকতেই পূর্ব থেকে বসা জনা ছয়েক লোক উঠে দাঁড়ালেন। তার সাথে ওই পিএও মাথা নীচু করে লম্বা একটা সালাম দিয়ে বললেন , “আপনি বসুন, একটু অপেক্ষা করুন। আমি ভেতরে গিয়ে স্যারকে বলে আসছি। চোখের পলক পড়ার আগেই ওই পিএ তার স্যারের রুম থেকে বের হয়ে এসে জানালেন “স্যার ভেতরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন”। তিনি স্যারের রুমে ঢুকে যাওয়ার পর ওই পিএ উপস্থিত সবাইর উদ্দেশ্যে নিজ থেকেই বলে বসলেন ‘ইনিই জি কে শামীম’। পিএ‘র রুমে বসা বাকী অপেক্ষমান লোকজন একটু ক্ষুব্ধতার সাথেই বলে উঠলেন, ‘ভাই আমরা কতটা সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করছি, আপনার স্যারের সাথে দেখা করার জন্য। স্যার সময় পচ্ছেন না’। অথচ তিনি এলেন-আর ভেতরে চলে গেলেন। এসব কথা আর চিত্র রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ গণপূর্ত অধিদফতরের ভেতরের।
তাঁর আসা ও যাওয়ার সময় দেখা গেলো ছয়জন ব্যক্তিগত অস্ত্রধারী দেহরক্ষী প্রটেকশন দিচ্ছেন। সবার হাতেই শটগান। গায়ে বিশেষ সিকিউরিটির পোশাক। তাঁদের একেকজনের উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট। যাকে মাঝখানে রেখে তাঁরা পাহারা দিচ্ছেন তিনি উচ্চতায় পাঁচ ফুটের কিছু বেশি। ছোটখাটো মানুষ হলেও তাঁর ক্ষমতার দাপট আকাশসম বোঝা গেল। তিনি চলেন তখন সঙ্গেও চলে নিরাপত্তা বলয়। সামনে পেছনে থাকে তার গড়ে তোলা নিরাপত্তা বলয়।
এই মহাক্ষমতাধর ব্যক্তির নাম এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে শামীম। নিজের নাম সংক্ষেপ করে বলতেন জি কে শামীম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সের মালিক তিনি। নিজেকে পরিচয় দিতেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক বলে।
তিনি চলাফেরা করতেন গডফাদারের মতো। সঙ্গে তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়জন দেহরক্ষী। বহরে থাকত অন্তত তিনটি গাড়ি। সাইরেন বাজাতে বাজাতে রাস্তা অতিক্রম করতেন। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে দেহরক্ষীরা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখতেন। রাজধানীর নিকেতন এলাকায় তিনি প্রবেশ করলেই সবাই তাঁর উপস্থিতি টের পেতেন।
ঢাকার নিকেতনে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সে অফিসের তৃতীয় তলার একটি কক্ষ সাজানো হয়েছে কোম্পানির এমডি ও চেয়ারম্যান এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীমের নামে বিভিন্ন সংগঠনের দেয়া ক্রেস্ট আর সম্মাননা পদক দিয়ে। ‘ফিদেল কাস্ট্রো অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’, ‘মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেল ২০১৭’- এরকম ভারী ভারী নামে এসব পদক যারা দিয়েছে, সেসব সংগঠনের নাম খুব একটা কেউ শোনেনি।
অবশ্য চলতি বছর জুলাই মাসে বিসিএস পুলিশের ২৫তম ব্যাচের নামে দেওয়া একটি সম্মাননা স্মারকও এর মধ্যে রয়েছে। পাঁচ তলা ভবনের বিভিন্ন কক্ষে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে র‌্যাব মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পাশে জি কে গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীমের ছবি!
এই শামীমকে রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিল এলাকায় অনেকে চেনেন প্রভাবশালী ঠিকাদার ‘জি কে শামীম’ হিসেবে। গণপূর্ত ভবনে ঠিকাদারি কাজে তার দাপটের খবর সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামও হয়েছে।
শুক্রবার সকাল থেকে প্রায় সারা দিন শামীমের নিকেতনের অফিসে অভিযান চালিয়ে ১৬৫ কোটি ২৭ লাখ টাকার এফডিআর, প্রায় দুই কোটি নগদ টাকা, আগ্নেয়াস্ত্র আর মদ জব্দ করেছে র‌্যাব।
শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করার পর র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেছেন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মুদ্রাপাচারের পাশাপাশি বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এক সময় যুবদলের রাজনীতি করা শামীম পরে যুবলীগে ভেড়েন। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক পরিচয় দিয়েই তিনি প্রভাব খাটিয়ে আসছিলেন।
তবে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ বলেছে, জি কে শামীম নামে কেউ তাদের কমিটিতে নেই। জি কে শামীমের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই।
একজন শামীম
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার হরিহরদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আফসার উদ্দিন মাস্টারের তিন ছেলের মধ্যে শামীম দ্বিতীয়। কয়েক বছর আগেও বাসাবো কদমতলার একটি বাড়িতে থাকতেন শামীম। এখন থাকেন বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসে নিজের ফ্ল্যাটে। আর নিকেতনে ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর ভবনটি তিনি তার জি কে বিল্ডার্স অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন।
এর বাইরে বাসাবো, ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি বাড়ি এবং বিভিন্ন স্থানে শামীমের নামে প্লট ও জমি থাকার তথ্য এসেছে গণমাধ্যমের খবরে। ঢাকা চেম্বারের সদস্যদের তালিকাতেও তার নাম রয়েছে।
শামীমের চলাফেরার সময় শটগানধারী ছয় দেহরক্ষীর ‘প্রটেকশন’ নিয়ে গতকাল সকালেই কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরকম কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপূর্ত ভবনের ‘বেশিরভাগ ঠিকাদারি কাজই’ জিকে শামীম নিয়ন্ত্রণ করেন।
গণমাধ্যমের খবরে শামীমকে যুবদলের সাবেক এবং বর্তমানে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। জি কে বিল্ডার্সের অফিসে সাজানো বিভিন্ন ছবি ও সম্মাননা স্মারকে তার পরিচয় লেখা হয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক’।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু বলেন, “যুবলীগে জি কে শামীমের কোনো পদ নেই। সে নিজেই নিজেকে সমবায় বিষয়ক সম্পাদক বলে বেড়াতো। এ নিয়ে যুবলীগে কয়েকবার আলোচনাও হয়েছে।”
বাবলু বলেন, “জি কে শামীম এক সময় যুবদলের সাবেক সহ সম্পাদক ছিল। এখন সে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি বলে শুনেছি।”
তবে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই বলেন, “জি কে শামীম নামে আমাদের কোনো সহ সভাপতি বা সদস্যও নাই।”
জিজ্ঞাসায় যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, “কে এই জিকে শামীম? যুবলীগের কোনো পদে সে আছে? আমি যুবলীগের চেয়ারম্যান আমি তো তাকে নেতা বানাইনি। যুবলীগের কমিটির কোথাও তো তার নাম নেই। তাহলে আপনারা কেন বলছেন জি কে শামীম যুবলীগের নেতা?
আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া রাতে ২০১৭ সালে ঘোষিত কমিটির তালিকা দিয়ে বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে জি কে শামীম নামে কারও অস্তিত্বই নেই।
শামীমের দলীয় পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন, ২০১৭ সালের কমিটি করার সময় দলের ভেতর থেকেই সহ সভাপতি পদে শামীমের নাম প্রস্তাব করেছিলেন একজন। তবে শামীমের বিএনপি সংশ্লিষ্টতার তথ্যের কারণে সেই প্রস্তাব আর ধোপে টেকেনি। স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় এ নিয়ে তখন খবরও ছাপা হয়েছিল।
শামীমের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে র‌্যাবের নির্বাহী হাকিম সারওয়ার আলম অভিযান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, দলীয় পরিচয় দল থেকেই নিশ্চিত করা হবে। আর শামীম ঠিকাদারী ব্যবসার আড়ালে অবৈধ কিছু করেছেন কি না- সেটা তারা দেখবেন।
র‌্যাব সদরদফতর নির্মাণেও জিকেবি
নিকেতনের যে ভবন থেকে শামীমকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটির মালিক তিনি নিজেই। পাঁচ তলা ভবনের পুরোটাই জিকে গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ভবনের ভেতরে প্রতিটি ফ্লোরে যাওয়ার জন্য ডুপ্লেক্স ধাঁচের সিঁড়ি রয়েছে। পাশাপাশি আছে লিফটের ব্যবস্থা। নিচ তলায় ঢুকতেই ওয়েটিং রুম, গ্যারেজ।
দ্বিতীয় তলায় বড় কনফারেন্স রুম, পাশে কয়েকটি অফিস কক্ষ। তিন তলায় বসেন জিকে শামীম। কোম্পানি চেয়ারম্যান জি কে শামীমের চেম্বারের সঙ্গে একটি বিশ্রাম কক্ষও রয়েছে।
জিকে বিল্ডার্সের চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কক্ষ চার তলায়। বিভিন্ন ফ্লোরে কর্মীদের টেবিল চেয়ার সাজানো রয়েছে।
অফিসের বোর্ড রুম ও বিভিন্ন কক্ষে রয়েছে শামীমের ‘দলীয় ও সামাজিক’ কর্মকান্ডের নানা ছবি। তিন তলার একটি কক্ষে সাজানো রয়েছে ক্রেস্ট ও সম্মাননা পদক।
র‌্যাবের অভিযানের কথা শুনে শামীমের ফুপাত ভাই মহিউদ্দিন লিটু ছুটে আসেন নিকেতন। প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ২২টি নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ এখন জিকে বিল্ডার্সের হাতে রয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাব সদর দপ্তর, গাজীপুরে র‌্যাব ফোর্সেস ট্রেনিং সেন্টারসহ র‌্যাবের ২২টি ভবন নির্মাণে প্রায় ২২ শ কোটি টাকার কাজ রয়েছে। সচিবালয়ে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকার তিনটি ভবন নির্মাণের কাজ করছে শামীমের প্রতিষ্ঠান।
জিকেবির মার্কেটিং ম্যানেজার মো. সুজন বলেন, বেইলি রোডের পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স, আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবন, নিউরো সায়েন্স হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দীর হাসপাতালের সম্প্রসারণ কাজ এবং মহাখালীর দুটি হাসপাতালে নতুন ভবন নির্মাণের কাজও তারাই করছেন।
শামীমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম কাছে দাবি করেন, র‌্যাব যেসব টাকা ও এফডিআর জব্দ করেছে, তার ‘পুরোটাই বৈধ’। “এই মুহূর্তে প্রায় ১০ হাজার লেবার আমাদের বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করছে। আর প্রায় দেড়শ অফিস স্টাফ রয়েছে। প্রতিদিন এত লোকের বেতন দিতে, প্রজেক্টের জিনিসপত্র কিনতে নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। প্রতিদিনই কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয় এই অফিসে আর সাইটে।”
তবে র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ঠিকাদারি কাজ শামীম নিতেন প্রভাব খাটিয়ে বা ভয় দেখিয়ে। অন্য কোনো ঠিকাদার তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্ধিতার সাহস পেত না।
র‌্যাব সদরদপ্তরের কাজ শামীমের কোম্পানি কীভাবে পেল জানতে চাইলে অভিযানের নেতৃত্বে থাকা র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার বলেন, “শামীম কয়েকজন পার্টনার মিলে র‌্যাবের ভবন নির্মাণ কাজ করছে বলে জেনেছি। তবে সেটা আমাদের দেখার বিষয় না।”
যা যা অভিযোগ
জিকেবি অফিসে অভিযান শেষে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শামীমের বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবজি ও টেন্ডারবাজির’ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পরই তারা এই অভিযানে এসেছেন।
আর র‌্যাবের নির্বাহী হাকিম সারওয়ার আলম বলেন, “সুনির্দিষ্ট দুটি বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। তার একটি মানিলন্ডারিং এবং তার যে অস্ত্র রয়েছে, তার যারা দেহরক্ষী রয়েছেন সাতজন, তারা কিছু কিছু জায়গায় অস্ত্র প্রদর্শন করে টেন্ডারবাজি চাঁদাবাজি করেছেন, সেই অভিযোগগুলো রয়েছে। একই সাথে কিছু মদ পাওয়া গেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মূলত এই অপরাধের কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।”
সারওয়ার আলম বলেন, শামীমকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি নির্দোষ। তা করতে পারলে তিনি অবশ্যই ছাড়া পাবেন। না করতে পারলে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। তবে অভিযাগগুলো এখনও তদন্তাধীন। “যে অর্থ এফডিআর করা হয়েছে, তা অবৈধ পন্থায় অর্জন করা হয়েছে- এমন তথ্য রয়েছে । কীভাবে এসব অর্থ পেয়েছেন এটা প্রমাণ করার দায়িত্ব তার। তিনি বৈধভাবে অর্জন করতে পারেন, কিন্তু বৈধকাজের আড়ালে অবৈধ কিছু রয়েছে কিনা সেটা দেখার জন্য তাকে আটক করা হয়েছে।”
ভয়ে তটস্ত এলাকাবাসী
নিকেতনের ওই এলাকায় শামীমের অফিস ভবন ছাড়া আশপাশে সবগুলো বহুতল ভবনই আবাসিক। সেসব ভবনের নিরাপত্তা কর্মী বা বাসিন্দাদের অধিকাংশই নাম প্রকাশ করে শামীমের বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
পাশের একটি ভবনের একজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, “জি কে শামীম যখন অফিসে আসা-যাওয়া করত তখন তার বাহিনী বিকট শব্দের হর্ন বাজাতো। আসা-যাওয়ার সময় অন্যভবন থেকে গাড়ি বের করার চেষ্টা করলেও তার লোকজন এসে শাসিয়ে যেত; বলত- স্যার বের হবে। তোমরা পরে বের হও।”
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রাত-বিরাতে বিকট শব্দে হুইসেল শুনে ঘুম ভাঙলে তারা বুঝতে পারতেন, শামীম এসেছেন বা যাচ্ছেন। তবে ভয়ে এ নিয়ে কেউ কথা বলত না। “আমরা মনে করতাম, এখানে সরকারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ থাকেন। অনেক সময় পুলিশের অনেকে এখানে যাতায়াত করত। প্রতিদিনই একাধিকবার সে এখানে যাওয়া আসা করত। সাঙ্গপাঙ্গরাও থাকত।”
শামীমের নিরাপত্তায় তিনটি মোটর সাইকেলে ৬ জন থাকতেন সামনে পেছনে। সঙ্গে কালো কাচের এসইউভিও থাকত।
অবশ্য ওমর ফারুক আকাশ নামে একজন নিজেকে শামীমের ‘একজন ভক্ত’ দাবি করে বলেন, “শামীম ভাই অবৈধ কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত না। সরকারের বড় বড় উন্নয়ন প্রজেক্টের কাজ করেন। ভয়ের কিছু ছিল না; অন্যান্য ঠিকাদারের সঙ্গে সুস্থ প্রতিযোগিতা করেই কাজ পেতেন উনি।”
জি কে শামীম ১০ দিনের রিমান্ডে
অবৈধ অস্ত্র ও মাদক মামলায় ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। দুই মামলায় পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে তার। এছাড়া শামীমের সাত দেহরক্ষীকে অস্ত্র মামলায় চার দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। দেহরক্ষীরা হলেন- দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, সহিদুল ইসলাম, কামাল হোসেন, সামসাদ হোসেন ও আমিনুল ইসলাম। পুলিশের আবেদনে ঢাকার মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা আক্তার গতকাল শনিবার শামীম ও তার দেহরক্ষীদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে র‌্যাব সদস্যরা।
গতকাল সন্ধ্যার পর শামীম ও তার দেহরক্ষীদের আদালতে হাজির করে দুই মামলায় ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। শামীমের আইনজীবী আব্দুর রহমান হাওলাদার আসামিদের রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন।
৩ মামলা দিয়ে শামীমকে পুলিশে দিল র‌্যাব
যুবলীগের নেতা পরিচয় দিয়ে ঠিকাদারি চালিয়ে আসা গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দিয়ে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে র‌্যাব। গতকাল শনিবার দুপুরের পর জি কে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে গুলশান থানায় নিয়ে যান র‌্যাব সদস্যরা। সেখানে তাদের রাখা হয়েছে থানা হাজতে।
গুলশান থানার ওসি কামরুজ্জামান বলেন, “র‌্যাব তিনটি অভিযোগ দিয়েছে। এর একটি মাদক আইনে, একটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এবং আরেকটি অস্ত্র আইনে।” এসব মামলার আসামি হিসেবে জি কে শামীমসহ আটজনকে রিমান্ডে চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। অস্ত্র ও মুদ্রা পাচার মামলায় শামীমসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে, মাদকের মামলাটিতে শুধু শামীমই আসামি। গ্রেফতার দেহরক্ষীরা হলেন আমিনুল, কামাল, শহিদুল, মুরাদ, দেলোয়ার, জাহেদ ও সায়েম। তাদের অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেফতারের কথা জানিয়েছিল র‌্যাব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ