ঢাকা, মঙ্গলবার 24 September 2019, ৯ আশ্বিন ১৪২৬, ২৪ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বেড়েই চলছে দুর্ঘটনা

স্টাফ রিপোর্টার: সড়ক দুর্ঘটনা কমেনি। বরং বেড়েই চলছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। অকালে প্রাণ হারানো মানুষের পরিবার অসহায় হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
জানা গেছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে একবছর আগে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছিল সড়ক পরিবহন আইন। সড়কে দুর্ঘটনার মিছিল কমিয়ে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্য ছিল সরকারের। তবে চালকদের অপরাধ জামিনযোগ্য হওয়া এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতায় শিথিলতার দাবি জানিয়ে আইনটির বিরোধিতা করেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তাদের বিরোধিতার মুখে সংসদে পাস হওয়ার একবছরেও কার্যকর করা যায়নি সেই সড়ক পরিবহন আইন।
এদিকে, আইন কার্যকর না করেই এ বছরের শুরুর দিকে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিক নেতা শাজাহান খানের নেতৃত্বে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি সম্প্রতি ১১১টি সুপারিশও তুলে দিয়েছে সেতুমন্ত্রীর হাতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন পাস না করে এ ধরনের উদ্যোগ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে। এ খাতে অরাজকতা বন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া দীর্ঘদিন থেকেই ঝুলে ছিল। গত বছরের জুলাইয়ের শেষের দিকে বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের রেষারেষিতে দুই কলেজ শিক্ষার্থী প্রাণ হারালে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের মুখে ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটির খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বিল’ সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে ১৯ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে পাস হয়। রাষ্ট্রপতির সইয়ের পর ৮ অক্টোবর আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। তবে আইনটির ১(২) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির গেজেটের পর আইনটি কার্যকর করতে সরকারের পক্ষ থেকেও গেজেট প্রকাশ করতে হবে। সেই গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় এখনো কার্যকর হয়নি আইনটি।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ৬ ধারার (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বয়স হতে হবে ন্যূনতম ১৮ বছর, পেশাদারদের ক্ষেত্রে ২০ বছর। একই ধারার (গ) উপধারায় বলা হয়েছে, চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস। অন্যদিকে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য ৯৮ ও ১০৫ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। ১০৫ ধারায় বেপরোয়া ও অবহেলা জনিত গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে এবং সেই দুর্ঘটনায় কেউ আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদ- বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ৯৮ ধারায় সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদ-ের বিধান রয়েছে। আর গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণেদিতভাবে হত্যা করলে বা ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ক্ষেত্রে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদ-ের বিধান রাখা হয়েছে সড়ক পরিবহন আইনে।
আইনটির প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর পরই এর বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবি নিয়ে আন্দলনে নামেন পরিবহন শ্রমিকেরা। ৮ দফা দাবিতে ২৮ অক্টোবর থেকে সারাদেশে ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘটও পালন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।
শ্রমিকদের দাবি, সড়ক পরিবহন আইনে সব ধারা জামিনযোগ্য করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রমিকের অর্থদ- ৫ লাখ টাকার বিধান বাতিল করতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে শিক্ষাগত যোগ্যতা অস্টম শ্রেণির বদলে করতে হবে পঞ্চম শ্রেণি। আর উদ্দেশ্যপ্রণেদিত বা ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে মৃত্যুদ-ের বিধানেও শৈথিল্য দাবি করেন তারা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেছেন, পৃথিবীর কোথাও এমন আইনে চালকদের শাস্তি অজামিনযোগ্য নেই। সে জায়গায় শিথিল করতেই আইনটি সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
এনায়েত আরও বলেন, বাংলাদেশের পরিবহন খাত এখনও অতটা উন্নত হয়নি যে শিক্ষিত ও ভালো মানের চালক-শ্রমিক পাওয়া সম্ভব। সেসব দিক চিন্তা করেই দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়েছে।
শ্রমিক নেতা ওসমান গনি এ প্রসঙ্গে বলেন, সড়ক পরিবহন আইনে শ্রমিকদের অধিকার কিংবা সুরক্ষার বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু শ্রমিকদের ঘামে প্রতিষ্ঠিত পরিবহন খাত, সেই শ্রমিকদেরই নানাভাবে বিপদে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন।
২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়ার একবছর পেরিয়ে গেলেও আইন বাস্তবায়নের বিধিমালা তৈরি করতে পারেনি সড়ক মহাসড়ক বিভাগ। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর ফেব্রুয়ারিতে আইনটি পুনঃবিশ্লেষণের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে প্রধান করে আইন ও রেলমন্ত্রীকে সঙ্গে রেখে একটি কমিটি গঠন করা হয়। বলা হয়, ওই কমিটি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনটি পুনঃপর্যালোচনা করে আইনটি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, আইনটি পুনরায় বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। কিভাবে আইনটি শিথিল করা যায়, সে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে শিগগিরই বৈঠক আহ্বান করা হবে। সরকার চায় আইনটি দ্রুতই কার্যকর হোক।
এদিকে, সংসদে পাস হওয়ার পরও আইন বাস্তবায়ন না করেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে শাজাহান খানের নেতৃত্বে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত মাসে ১১১টি সুপারিশ তুলে দেয় সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর হাতে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে একটি টাস্কফোর্স গঠনে কাজ করেছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুপারিশ কখনো বাস্তবায়ন করা হয় না। এমনকি সড়ক-মহাসড়ক বিভাগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হয়নি।
মহাসড়কে সিএনজি নিষিদ্ধ করার উদাহরণ টেনে এই সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, ২২ মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ৫ ঘণ্টার বেশি কোনো চালক গাড়ি চালবেন না বলে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে নির্দেশনা দেয়া থাকলেও তা কতগুলো বাস মালিক বা চালক মেনে চলেছেন? পর পর তিনবার সরকার ক্ষমতায়। এখন পর্যালোচনা করার সময় এসেছে, সড়ক এই বিশৃঙ্খলা বন্ধ না হওয়ার কারণ কী? সুপারিশ, সিদ্ধান্ত কিংবা আইন নয়, সড়ক পরিবহনে কৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার প্রধানের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন ড. শামছুল।
অন্যদিকে সেইফ রোডস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অ্যালায়েন্সের (শ্রোতা) বিশেষজ্ঞ সদরুল হাসান মজুমদার বলছেন, আইনটি প্রণয়নের আগে তারা যেসব সুপারিশ রেখেছিলেন, তার অনেকাংশই রাখা হয়নি। সড়কে দিন দিন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়লেও এসব ঘটনার তদন্ত ঠিকভাবে হয় না। অন্যদিকে পরিবহন খাতে নৈরাজ্যও দিন দিন বাড়ছেই।
সদরুল বলেন, এই খাতকে রাজনীতি থেকে বের করে নিয়ে আসতে না পারলে মালিক-শ্রমিকদের কাছে সবাইকে জিম্মি থাকতে হবে। আইন বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে তা বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়।
আইন কার্যকর না করে ভিন্ন উদ্যোগ সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ আরও দীর্ঘায়িত করে তুলবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে লেখক, সাংবাদিক ও শাজাহান খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, পরিবহন খাতেও যেন শৃঙ্খলা ফিরে আসে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্টদের স্বার্থও রক্ষা হয় এমন সিদ্ধান্তে আসতে হবে দু’পক্ষকেই।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার জায়গা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। একইসঙ্গে পরিবহন খাতও টিকে থাকবে এবং সাধারণ মানুষও নিরাপদে চলাচলা করতে পারবে- এমনই চায় সরকার। সেজন্য যা করা দরকার, তাই করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ