ঢাকা, মঙ্গলবার 24 September 2019, ৯ আশ্বিন ১৪২৬, ২৪ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

স্বপ্নের মৃত্যুকে হাসিমুখে আলিঙ্গন

শবনম নাহার শুভ্রা : এক.
একাদশ শ্রেণীর রাহাত লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী। এসএসসিতে এপ্লাস না পেলেও যে রেজাল্ট করেছে রাহাত, তাতেই রাহাতের বাবা মা সন্তুষ্ট। রাহাত এইচএসসিতে এপ্লাস যাতে মিস না হয় সেজন্য একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার শুরু থেকেই বেশ সচেতন। রাহাতের বাবা মাও ছেলের ভাল ক্যারিয়ার গড়তে অনেক বেশি তৎপর। রাহাত পরিবারে ছোট বেলা থেকেই ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া। রোজা রাখা। বড়দের সম্মান করা। সবই রাহাত পারিবারিকভাবেই শিক্ষা পেয়েছে। রাহাত প্লে থেকে এসএসসি সময় পর্যন্ত বয়েজ বিদ্যালয়েই লেখাপড়া করেছে। এইচএসসিতেও ঢাকার একটি ভাল কলেজে বয়েজ শাখায় ভর্তি হয়েছে।
রাহাতের বাবা আইয়ুব সাহেব বেসরকারি একটি কলেজের ইংরেজী’র শিক্ষক। তার সংসারে ১টি ছেলে ও ২টি মেয়ে। রাহাত তাদের মধ্যে বড়। রাহাতের মা শামসাদ নাসরিন একজন গৃহিনী। পরিবার নিয়ে আইয়ুব সাহেব রামপুরা বনশ্রী এলাকায় দীর্ঘদিন যাবত বসবাস করছে। রাহাতের বাবা আইয়ুব সাহেব নিজের স্বপ্নটি ছেলেকে দিয়ে বাস্তবায়ন করার জন্য ছেলেকে প্রায়শই মোটিভেশন করে থাকে। রাহাতের বাবা’র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছিল কিন্তু সংসারের অস্বচ্ছলতা ও সুপরামর্শ কিংবা দায়িত্বশীল অভিভাবকের অভাবে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু তাতে আইয়ুব সাহেবের ক্যারিয়ার থেমে থাকেনি। মফস্বল শহরের কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে রাজধানীর একটি প্রাইভেট কলেজের ইংরেজীতে শিক্ষকতা করছেন। রাজধানীতে আসার পড় থেকে কলেজ শেষে অবশিষ্ট সময়টুকু বাসায় ব্যাচে প্রাইভেট পড়িয়ে যা কামিয়েছে তা দিয়ে এই শহরে মাথা গুজার ঠাঁইটুকু করেছেন আইয়ুব সাহেব।
রাহাতের বাবা আইয়ুব সাহেব সন্তানদের লেখাপড়া ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়া ছাড়া অন্য কোন স্বপ্নই দেখেন না। আইয়ুব-শামসাদ দম্পতি ছেলে মেয়েদের আদর ভালবাসার কোন কমতি রাখেনি। বিশেষ করে রাহাতকে নিয়ে চিন্তাটা একটু বেশি। আইয়ুব সাহেব রাহাতকে প্রায়ই বলে থাকেন দু-চারটা বছর একটু কষ্ট করো বাকী জীবনটা অনেক সুখে শান্তিতে কাটাতে পারবে। অর্থাৎ এইচএসসিতে তে ভাল রেজাল্ট করে ভাল একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে জীবনটা অনেক সুন্দর করা সম্ভব। ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী অনেক বন্ধু পাবে। যাদের সংস্পর্শে এসে নিজেও মেধাকে শানিত করতে পারবে। যখনই একটু সময় পান তখনই রাহাতকে তারা বাবা প্রেরণাদায়ক কথা বলে উজ্জীবিত করে থাকে। রাহাতও তার বাবার কথায় উৎফুল্ল হয়। নিজেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। বাবার স্বপ্নটাকে সত্যি করতে হবে, তাই রাহাত লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী।
রাহাত নিয়মিত কলেজে যায়। মনোযোগ সহকারে পাঠদানে অংশগ্রহন করছে। টিফিনের সময় বন্ধুদের সাথে কলেজ মসজিদে যোহর নামাজ আদায় করছে। বাসা থেকে টিফিন বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খাচ্ছে। রাহাতের ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন ভাল বন্ধুও হয়েছে। এদের মধ্যে রিফাত, আরিফ, রাজু ও রুকন অন্যতম। রাহাতের বাসার কাছাকাছি রিফাত, আরিফ, রাজু ও রুকনদের বাসা। কয়েকদিন ক্লাশ করার পর থেকে ওদের সম্পর্কটাও বেশ আন্তরিকতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একসাথে কলেজে আসা যাওয়া। নামাজ পড়া, টিফিন ভাগাভাগি করে খাওয়া। বিকেলে আছর নামায পড়ে মাঝেমাঝে হাতিরঝিলে ঘুরতে যাওয়া। এভাবেই রাহাতের কলেজ সময় কেটে যাচ্ছে। মাগরিব নামাজের পূর্বেই বাসার পাশের মাসজিদে বায়তুল আমান মসজিদে নামায পড়ে বাসায় চলে যায়। রাত ১১টা পর্যন্ত কলেজের পড়া শেষ করে ঘুমুতে যায় রাহাত। এর মধ্যে এশা নামাজ ও রাতের খাবার পর্ব শেষ করে নেয়। প্রতিদিন রুটিন মাফিক নিজের প্রত্যেকটা কাজ সম্পন্ন করার দীর্ঘদিনের অভ্যাস আজও রাহাত ঠিকঠাকমত চালিয়ে যাচ্ছে।
রাহাত ও তার বন্ধুদের ইংরেজী ছাড়াও হিসাব বিজ্ঞান, ফিন্যান্স ও আইসিটি বিষয় নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। রাহাতের বাবা ইংরেজীর শিক্ষক হওয়ার সুবাধে ছোট বেলা থেকেই রাহাত ইংরেজীতে বেশ পটু। দু-চার মিনিট ইংরেজীতে অনর্গল কথাও বলতে পারে। রাহাতের ইংরেজী পারফরমেন্স দেখে কলেজের শিক্ষকরাও বিস্মিত হয়। ভাল ইংরেজী বলতে ও বুঝতে পাড়ায় রাহাত শিক্ষকদের নজরে আসে। শিক্ষকরাও রাহাতকে বেশ আদর করে। ইংরেজীর মতো অন্যান্য বিষয়গুলোতে ভাল করতে পারলে রাহাতের বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হবেই হবে। রাহাতের ভাল ফলাফল করার আকাঙ্খা ও বাবার স্বপ্নপূরণের বিষয়টি একান্তে বাবা মায়ের সাথে শেয়ার করে। রাহাতের কথায় বাবা-মা খুব গর্বিত হয়। রাহাতের বাবা রাহাতকে ভাল একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
আইয়ুব-শামসাদ দম্পত্তি ছেলেকে কোচিং সেন্টারে ভর্তি করার জন্য বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টারের খোঁজ খবর নেয়। সকল কোচিং সেন্টারগুলোতেই ছেলে-মেয়েদের একসাথে ক্লাশ নেওয়ার বিষয়টি রাহাতের বাবা মা খুব ভালভাবে নেয়নি। রাহাতের পরিবার ইসলামিক কৃষ্টি কালচারে বিশ্বাসী; তাই ছেলেকে কোচিংয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও বেশ চিন্তা ভাবনা করছে। বাসার আশে পাশে বা কাছাকাছি ছেলে অথবা মেয়েদের আলাদা পড়ানোর মতো কোন কোচিং সেন্টার তাদের চোখে পড়েনি। আবার একমাত্র ছেলেকে দূরে কোথাও পাঠাতেও তাদের মন সায় দেয়নি। কোন উপায় উপায়ন্তর না পেয়ে আইয়ুব-শামসাদ দম্পত্তি বাসা ও কলেজের কাছেই একটি ভালোমানের কোচিং সেন্টারে ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেয়। রাহাতের বন্ধুদের মধ্যে রিফাত কয়েকদিন হলো একই কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছে।
দুই.
রাহাত কোচিংয়ে প্রথম দিন। সকাল ৮টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত কোচিং। এ সেন্টারে শুধুমাত্র ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো হয়। এখানে অনেকগুলো ব্যাচ রয়েছে। ব্যাচগুলোর নামও ভিন্ন ভিন্ন। রাহাত দূরন্ত ব্যাচে। ওর ব্যাচে প্রায় ১৬ জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। রিফাত ছাড়া বাকীদের সাথে রাহাতের পরিচয় নেই। আজই প্রথম অন্যদের সাথে দেখা। এ ব্যাচে ৮ জন ছাত্র ও ৮ জন ছাত্রী রয়েছে। ক্লাশ রুমে ৮টি বেঞ্চ। ডান দিকে ছেলেরা ও বাম দিকে মেয়েরা বসে। মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। এ ফাঁকা জায়গা দিয়ে ক্লাশের শিক্ষক হাঁটাহাঁটি করে সকলকে নজরে রাখার চেষ্টা করে।
প্রথম ক্লাশেই ইংরেজী শিক্ষক এসেছেন। রাহাতদের ইংরেজী শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি কোচিংয়ে ক্লাশ নিয়ে যা পায় তা দিয়ে বেশ ভালভাবেই মাস পার হয়ে যায়। প্রতি ক্লাশের জন্য ১৫০ টাকা করে পেয়ে থাকেন। এভাবে প্রতিদিনে প্রায় ৫-৭টি ক্লাশ নেয়। আজকের ওরিয়েন্টেশন ক্লাশে রাহাতদের ইংরেজী শিক্ষক প্রথমে সকলের সাথে পরিচিত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে মজার মজার কিছু কথা বলে শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ফ্রি হওয়ার চেষ্টা করেন। তারপর সকলকে কিছু বেসিক ইংরেজী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এর মধ্যে বি ভার্ব ও ডু ভার্ব নিয়ে আলোচনা করে। ইংরেজী বুঝার পাশাপাশি যেন সকলে ইংরেজীতে বেশ পটু হতে পারে রাহাতদের ঢাবি পড়ুয়া শিক্ষক সেদিকেও তাদের আকৃষ্ট করে।
রাহাত ও তার বন্ধুরা প্রথম দিনে ইংরেজী ছাড়াও অন্যান্য ক্লাশগুলো বেশ উপভোগ করেছে।ক্লাশ শেষে দূরন্ত ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীরা একে অপরের মোবাইল নম্বর ও সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক আইডি আদান প্রদান করেছে। সম্মিলিতভাবে একটি ফেসবুক গ্রুপ খোলারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাচের সকলের ফেসবুক আইডি থাকলেও। ব্যতিক্রম রাহাত। রাহাতের কোন ফেসবুক আইডি নাই। এমনকি এখনও পর্যন্ত রাহাতের বাবা-মা তাকে কোন মোবাইলও কিনেদেয়নি। রাহাত তাই ওর বাবা-মায়ের মোবাইল নম্বরটি বন্ধুদের দিয়েছে। রাহাতের এ অবস্থা দেখে অন্যরাতো রাহাতকে যা ইচ্ছে তাই বলছে। এর মধ্যে রাহাতদের ব্যাচের এক ছাত্রী সুপ্তি বলে উঠেছে বেকডেটেড, আনকালচার, গেও কোথাকার! বর্তমান যুগে কেউ কি মোবাইল ফোন ও ফেসবুক ছাড়া থাকে। আশ্চর্য!
সুপ্তির কথাগুলো রাহাতের কানে বেজে উঠলো। রাহাতও প্রতিউত্তরে টানা তিন মিনিট অনর্গল ইংরেজীতে সুপ্তিকে ইচ্ছেমতো ধবলধোলাই করলো। কথাগুলো ঠিক যেন সুপ্তির কানের উপর দিয়ে গেলো। রাহাত এতোটা উত্তেজিত ছিল যে, রাহাতের চোখমুখ লাল হয়ে যায়। রাহাত এই প্রথমবারের মতো কারও সাথে এতোটা উত্তেজিত হয়েছে। রাহাত রাগে ক্ষোভে, ক্লাশ থেকে বের হয়ে যায়। রাহাত কোচিং থেকে বের হয়ে হাঁটতে থাকে। রিফাতও রাহাতের পিছনে হাঁটতে থাকে। এই রাহাত ..... এই রাহাত বলে রিফাত রাহাতকে ডাকতে থাকে। রাহাত কিছুদূরে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ায়। রিফাতও রাহাতের পাশে এসে দাঁড়ায়।
রিফাত- তুই এতো উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?
রাহাত- দেখলি না আমাকে কিভাবে হেয় করলো। তুই তো কিছু বললি না... তখন।
রিফাত- ঠিকই তো বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কেউ কি মোবাইল ফোন ছাড়া, ফেসবুক ছাড়া আছে। দেখা তো আমাকে কোন একটা ছেলে মেয়ে কে। সুপ্তি যা বলেছে একদম ঠিক বলেছে। বাপরে বাপ, তোর এত্তো রাগ। আগে তো কখনো দেখিনি। আমার মনে হয় সুপ্তিকে এভাবে তোর রিয়্যাক্ট করা ঠিক হয়নি।
রাহাত- হুম। ঠিকই বলেছিস। বাজে কথাগুলো শুনে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি নি।
রিফাত- হাজার হলেও সুপ্তি আমাদের ব্যাচমেট। তাছাড়া আজকেই আমাদের প্রথম দেখা। না না, তোর এভাবে রিয়্যাক্ট করে তুই যে ভাল ইংরেজী পারিস এটা তুই না জানালেও পারতি।
রাহাত-আ”চ্ছা বাদ দে। কলেজের সময় হয়ে যাচ্চে। কলেজের দিকে চল।
রিফাত- আচ্ছা চল।
রাহাত ও রিফাত হাঁটতে হাঁটতে কলেজ ক্যাম্পাসে চলে এসেছে। কলেজের বকুলতলায় রাহাত ও রিফাত বসে আছে। রাহাত নিরবতা ভেঙ্গে রিফাতকে বললো দোস্ত আমার ভুল হয়ে গেছে। তুই ঠিকই বলেছিস আমার এতোটা উত্তেজিত আচরণ করা ঠিক হয়নি।
রিফাত বললো আচ্ছা চল ক্লাশে যাই। পড়ে এ নিয়ে কথা বলবোনি।
রাহাতের মনটা বেশ খারাপ। প্রথম দিনেই এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটে গেল। রাহাত কোন ভাবেই নিজেকে সান্তনা দিতে পারছে না। ক্লাশগুলোও ভাল লাগছে না। এলোমেলো চিন্তা ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রাহাত সিদ্ধান্ত নিল আগামীকাল কোচিংয়ে গিয়ে সুপ্তিকে স্যরি বলবে। রাহাত কলেজ শেষ করে বাসায় ফিরলো। রাহাতের মনটা আজ বেশ মনমরা হয় আছে।
রাহাতের চেহারার দিকে তাকিয়ে রাহাতের মা শামসাদ বললেন- কি হয়েছে তোর।
রাহাত- কিছু না।
রাহাতের মা বললেন- তাহলে তোর মনখারাপ কেন?
রাহাতওর মাকে কিচ্ছু না বলে। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে। শরীর থেকে ইউনিফরম ছেড়ে। বাথরুমে ঢুকে পড়েছে। রাহাত আজ অনেক সময় নিয়ে গোসল করলো। এতোটা সময় নিয়ে রাহাত কখনও গোসল করেছে কিনা মনে করতে পারছে না। রাহাতের মা ছেলের অস্বাভাবিক আচারণ দেখে কিছুটা চিন্তিত। কিন্তু তেমন কিছু বললেন না। রাহাত গোসল শেষ করে বের হতেই আজ মাগরিবের আযান পড়ে গেছে। রাহাত তাড়াতাড়ি মসজিদে নামাযের উদ্দেশ্যে বের হলো। রাহাতের মা ছেলেকে আর কিছু বললো না। নামায শেষ করে রাহাত বাসায় ফিরে পড়ার টেবিলে পড়তে বসলো। আজকের মতো রাহাতের রুটিন মাফিক চলা কখনো মিসিং হয়েছে কিনা রাহাত মনে করতে পারছে না। রাহাত বই নিয়ে বসলেও পড়ায় তেমন মন ছিল না।
দীর্ঘক্ষণ টেবিলে বসে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে রাহাতের মা চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে রাহাতের মাথায় হাত দিয়ে বললেন-কি হয়েছে বাবা তোর? আজকের মতো তোকে শেষ কবে দেখেছি আমি মনে করতে পারছি না। রাহাত চুপচাপ চেয়ার থেকে উঠে মায়ের বুকে মাথা রেখে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। রাহাতের মাও ওর কান্ড দেখে বেশি খানিকটা আবেগপ্রবহন হয়ে উঠে। রাহাত সারাদিন যা হয়েছে সব মা কে খুলে বলে।
শামসাদ নাসরিন ছেলের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেন এবং রাহাতকে সান্তনা দেন। রাহাতকে বন্ধুদের সাথে উত্তেজিত হয়ে ভবিষ্যতে কথা না বলার পরামর্শও দেন। রাহাত মায়ের কথাও শুনে নিজের মধ্যে স্বস্তি ফিরে পান।
তিন.
রাহাতের মা ছেলের বিষয়টি নিয়ে আইয়ুব সাহেব অর্থাৎ রাহাতের বাবার সাথে কথা বলেন। রাহাতকে একটি মোবাইল ফোন কিনে দেয়ার পরামর্শ দেন। রাহাতের বাবা শামসাদ নাসরিনকে অনেক ভালবাসেন। রাহাতের বাবা-মা দুজনেই ধর্মীয় বিশ্বাস নিজেদের মধ্যে পোষণ করেন এবং তারা ব্যক্তিগত জীবনে প্র্যাকটিশিয়ান মুসলিম হিসেবে গর্ববোধ করেন। রাহাতের মা আইয়ুব সাহেব কে বুঝান- রাহাত সারাদিন বাহিরে কোচিং, কলেজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ওর কাছে মোবাইল না থাকলে তো আমিও সারাদিন চিন্তায় থাকি। ছেলেটার কোন খোঁজ খবর নিতে পারি না। তুমি রাহাতকে একটা মোবাইল কিনে দাও। রাহাতের বাবা অনেক চিন্তা ভাবনা করে বললো- মোবাইল কিনে দিতে আমার আপত্তি নেই। তবে ভয় হয় মোবাইল পেয়ে যদি আমাদের ছেলেটা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে।
শামসাদ নাসরিন-রাহাতের বাবাকে অভয় দেয়, দেখো আমাদের ছেলে ওরকম কিছু করবে বলে আমার মনে হয় না।
আইয়ুব সাহেব বললেন-আমার ইচ্ছে ছিল ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলেই একটা মোবাইল কিনে দিব। রাহাতের বাবা আইয়ুব শামসাদ নাসরিনকে সম্প্রতি বিবিসি’র একটি খবরের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করালো। তুমি খবরটি ভালভাবে পড়ে আরেকটু চিন্তা ভাবনা করে দেখো। শামসাদ নাসরিন স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল ভালো হয়েছে শিরোনামের গবেষনা প্রতিবেদনটি পড়লেন। স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল ভালো হয়েছে গবেষকরা বলছেন, এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনার জন্যে বাড়তি সময় পেয়েছেন।ইংল্যান্ডের চারটির শহরের স্কুলে জরিপ চালিয়ে লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এই সমীক্ষাটি প্রকাশ করেছে। ফোন নিষিদ্ধ করার আগে ও পরে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে এই মন্তব্য করা হয়েছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ