ঢাকা, মঙ্গলবার 24 September 2019, ৯ আশ্বিন ১৪২৬, ২৪ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

যৌতুকের অভিশাপমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ

সেলিনা শৈরে : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ঢাকায় ২০১৬ সালে ২৭ জন, ২০১৫ সালে ২৫ জন, ২০১৪ সালে ২২ জন, ২০১৩ সালে ৩০ জন, ২০১২ সালে ২৫ জন, ২০১১ সালে ২৬ জন এবং ২০১০ সালে ১৫ জন নারীকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে যৌতুকের কারণে ঢাকায় যে হারে নারীরা হত্যার শিকার হচ্ছেন, সে অনুপাতে সাজার হার খুব কম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া যৌতুকের জন্য হত্যা মামলার মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে।
যৌতুক এক সামাজিক ব্যাধি। যৌতুকের দাবি পূরণ করতে না পারায় ভেঙ্গে গেছে হাজারো বিয়ে, ঘর-সংসার। চিরতরে হারিয়ে গেছে অসংখ্য নিষ্পাপ প্রাণ। শুধু অসহায় মেয়েরাই বিপন্ন অবস্থার শিকার হয় তা নয়; কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা-মাতারাও এই নির্মম অপসংস্কারের কবলে নিপতিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অত্যাচার চলছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। হাজারও মেয়ে পঙ্গুত্ব জীবন কাটাচ্ছে অসংখ্য মা-বোন। কেটে ফেলা হয়েছে কারো কান, উপড়ে ফেলা হয়েছে কারো চোখ, আগুনে ঝলসে দেয়া হয়েছে কারো শরীর, ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে কারো হাত-পা, এসিড মেরে ঝলসে দেয়া হয়েছে কারো মুখ। এ ঘাতক ও ঘৃণিত ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা শুধু স্বামীর কাছ থেকে নয়, শশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেবর-ভাসুর সবাই একত্রে মেয়েকে পণ্যের জন্য অকথ্য নির্যাতন করে থাকে।
নির্যাতনের মাত্রা এমনই হয়যে, এ দুর্ভোগে কোন মেয়েকে হয়ত বা শেষ অবধি পৃথিবী থেকেই বিদায় নিতে হয়। বেঁচে থাকলেও ক্ষত-বিক্ষত শরীর আর মন নিয়ে জীবনভর চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। প্রিণ্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ায় এসবের খবর আমরা নিত্যদিনই পাচ্ছি। তবুও যৌতুক বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে। এ সমাজে যৌতুক প্রদানও হচ্ছে, গ্রহনও হচ্ছে। ইসলামী শরিয়াহসহ সরকার মহল যৌতুক আদান-প্রদান এবং মধ্যস্থতা করায় ঘৃণ্যতা পোষণ করে বিভিন্ন মত ও পথ দেখিয়ে সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন- পবিত্র কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না এবং জেনে শুনে লোকদের ধন-সম্পদের কিয়দংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে উৎকোচ দিও না’। (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৮) পবিত্র কোরআনে যৌতুক আদান-প্রদানে নিষেধপূর্বক আরো ইরশাদ হয়েছে- আর বিয়ের সময় থেকে আজীবন স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর উপর।
বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেনমোহর তথা উপঢৌকন দেয়ার দায়িত্বও স্বামীর। যেমন- ‘পুরুষরা স্ত্রীলোকদের অভিভাবক, কেননা আল্লাহ তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং এ কারণেও যে, তারা নিজেদের ধন-সম্পদ থেকে স্ত্রীলোকদের জন্য খরচ করে (যা পুরুষদের উপর অবশ্য কর্তব্য)’। (সূরা আন-নিসা ৩৪)
এক শ্রেণীর পুরুষ নামের কাপুরুষ তা না করে নিজ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভোগের জন্য চাপ দিয়ে থাকে অবলা-সরলা, অসহায়, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত স্ত্রী জাতিকে। যা ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত ভিক্ষাবৃত্তিতে পরিণত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন-যদি কোন ব্যক্তি ফেরত না দেয়ার নিয়াতে অর্থপ্রাপ্তির লোভে কোন নারীকে বিয়ে করে, তবে ঐ ব্যক্তি একজন যিনাকারী। আর যে ব্যক্তি ফেরত না দেয়ার নিয়াতে কোন ঋণ গ্রহণ করে, তবে ঐ ব্যক্তি একজন চোর। (মিশকাতুল মাসাবিহ : আলহাজ্ব মাওলানা ফজলুল করীম এমএ, বিএল সংকলিত)
বর্তমান বাংলাদেশে যৌতুক একটি সামাজিক মহামারী। সাম্প্রতিককালে এ প্রথা জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ন্যায়-নীতি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম। এ ধর্মে অন্যায় নেই, প্রবণতা নেই, উগ্রতা নেই। নেই জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন। আত্মসাৎ, প্রতারণা ও অনধিকার চর্চা এ ধর্মে নেই। নেই যৌতুকের মতো অমানবিক প্রথা ও অন্যায় দাবি-দাওয়ার কোনো ভিত্তি। প্রিয় নবী (সা.) তাঁর মেয়ে ফাতেমা (রা.)-এর বিয়েতে মেয়ের সংসারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী দিয়েছিলেন (ইবনে মাজাহ, নাসায়ি, মুসতাদরাক)। তবে কন্যাপক্ষকে দিতে বাধ্য করা, চাপ সৃষ্টি করা বা পরিস্থিতি তৈরি করা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অবৈধ। মহানবী (সা.) বলেন, কোনো মুসলমানের মাল-সম্পদ তার পূর্ণ সন্তুষ্টি ব্যতীত বৈধ হবে না (বায়হাকি সুনান, দারাকুতনি)। মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কর না’ (নিসা : ২৯)।
যৌতুক প্রথার শিকড় সমাজের গভীরে প্রোথিত। এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার জন্য, একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের জন্য, যৌতুকের অভিশাপ থেকে সমাজ, দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার জন্য সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। যৌতুকবিষয়ক প্রচলিত আইন ও এর প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।  যৌতুকের বিরুদ্ধে আমাদের লেখা, বক্তৃতা ও আচার-আচরণে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। যৌতুকের কুফল, ভয়াবহ গ্লানি এবং অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সর্বস্তরের নারী-পুরুষকে অবহিত করতে হবে।  পৌঁছে দিতে হবে সবার কাছে নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় ইসলামের অবদান।
আসুন নিজেকে, সমাজকে ও রাষ্ট্রকে এ বিপর্যয় হতে রক্ষা করার জন্য দেশজুড়ে আ্ওয়াজ তুলি- যৌতুক দিবো না, যৌতুক নিবোও না। যৌতুককে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। এই হোক আমাদের শপথ। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ