ঢাকা, মঙ্গলবার 8 October 2019, ২৩ আশ্বিন ১৪২৬, ৮ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কতিপয় পদক্ষেপ

ড. মো. নূরুল আমিন : খ্যাতনামা ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক, নিবেদিতপ্রাণ ইসলামী দা’য়ী ও লেখক বুদ্ধিজীবী অগ্রজ প্রতীম শাহ আবদুল হান্নান সাম্প্রতিককালে আমাদের মধ্যে অনেকটা হারিয়ে যাওয়া কল্যাণ রাষ্ট্রের কনসেপ্ট বা ধারণাটিকে পরিষ্কারভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানও সম্প্রতি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।
হারিয়ে যাওয়া এ জন্য বলছি যে, সেক্যুলার রাজনীতির তথাকথিত ঢামাঢোলে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা এখন আমাদের মাথায় আসে না বলেই মনে হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ইসলামী রাষ্ট্রের সূচনা হয়েছিল। রাসূল (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্র কল্যাণ রাষ্ট্রই ছিল এবং পরবর্তীকালে ইসলামী খেলাফতের আমলে পরিচালিত রাষ্ট্রও কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারাবাহিক প্রতিফলন ছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে মুসলিম শাসনের অবসানের সাথে সাথে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের অবসান হলেও এর ধারণা কিন্তু দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। ভিন্ন অবয়বে কল্যাণ রাষ্ট্রের কনসেপ্ট এসেছে এবং তা কার্যকর হয়েছে। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলো যতই ঔপনিবেশিক শোষণের হাতিয়ার হোক না কেন, নিজ দেশে তারা welfare state বা কল্যাণ রাষ্ট্রের অনেকগুলো চাহিদা পূরণ করতে চেষ্টা করেছে। গ্রেট বৃটেন, নরওয়ে, সুইডেন এমনকি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডাও কল্যাণ রাষ্ট্রের অনেকগুলো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অর্থাৎ ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের ব্যাপারে অনেকের যে নাকসিটকানি তার এখন সুযোগ কম, চোখের সামনেই তারা এখন এর রূপরেখার অংশ বিশেষ দেখতে পাচ্ছেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ওয়েলফেয়ার স্টেট বা কল্যাণ রাষ্ট্র বলতে যা বুঝায় তা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র ব্যক্তির মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো পূরণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি। এখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা মুখ্য। ব্যক্তি যাতে অবাধে তার পেশা পরিচালনা করতে পারে, নিজে পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলার জন্য উপার্জন ও ব্যয় করার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে রাষ্ট্র তাকে সে নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা প্রদান করে। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এক্ষেত্রে লেসি ফেয়ার পলিসি অবলম্বন করে, তারা ব্যক্তির আয়-উপার্জন ও ব্যয়ের উপর কোনও রকম বিধি নিষেধ আরোপ করে না।
এছাড়াও রাষ্ট্রের কল্যাণ নীতি অনুযায়ী সেখানে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের জন্য ভাতা নির্ধারিত আছে, বড় হলে নির্দিষ্ট গ-ি পর্যন্ত তাদের শিক্ষাও ফ্রি। এরপর কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেকার ভাতা দেয়া হয়। বৃদ্ধ অবস্থায় তারা পেনশন বা বয়স্ক ভাতা পায়। এই ভাতা থেকে তাদের অন্ন, বস্ত্র চলে। সরকারের তরফ থেকে তারা চিকিৎসা সুযোগ যেমন পান তেমনি বাসস্থানের জন্য হোম লোনও পান। দৈব দুর্ঘটনার জন্য তাদের বীমার ব্যবস্থাও আছে। তারা নাগরিক অধিকার ভোগ করে এবং আদালতের সুরক্ষাসহ রাষ্ট্রের তরফ থেকে যাবতীয় সুযোগ সুবিধা পায়।
উপার্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের লেসি ফেয়ার বা অবাধ স্বাধীনতার অংশটি বাদ দিলে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের অনেক বৈশিষ্ট্যই তাদের সাথে মিলে যায়। ইসলামে হারাম হালালের বিধান একটি অবশ্য পালনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে দরিদ্রের সম্পদে ধনীদের বড় হবার সুযোগ নেই। এখানে ধনীরা যেমন দরিদ্রদের শোষণ করতে পারে না, তেমনি দরিদ্র্যদের নাম করে State Capitalism বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠারও সুযোগ নেই। ইসলামে সুদ, মদ, জুয়া হারাম। হারাম পণ্যের উৎপাদন এবং ব্যবসাও হারাম। সম্পদের পরিশোধন এবং তাতে দরিদ্রের অংশ নিশ্চিত করার জন্য যাকাত-ওশরের বিধান রাখা হয়েছে। মওজুতদারী মুনাফাখোরী এখানে হারাম। ইসলাম দান সদকাকে উৎসাহিত করেছে এবং ওয়াকফ্ ব্যবস্থার প্রবর্তন করে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করেছে।
শাহ হান্নান কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে কতিপয় কাজের সুপারিশ করেছেন। তার সুপারিশগুলো ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সেগুলো নি¤œরূপ:
এক. সুবিচার পূর্ণ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা, যেমন: ইসলামের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কোনো হারাম বা ক্ষতিকর জিনিসের উৎপাদন বা ব্যবসা করা যাবে না। বাজারমূল্য ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে এবং কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকতে হবে। সুদবিহীন অর্থনীতি এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ব্যয়নীতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করতে হবে। বিলাসিতা ও অপচয়ের পরিবর্তে যাতে প্রকৃত চাহিদা প্রাধান্য পায়, দারিদ্র্য দূর হয় এবং দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
তেমনিভাবে কর নীতিও ব্যাপকভাবে পরিবর্তন প্রয়োজন। কর যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই ধার্য করতে হবে, তার বেশি নয়। দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য যাকাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য দূর করার জন্য যাকাত ছাড়াও সরকারের রাজস্ব খাত থেকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। ইসলামী অর্থনীতি পুঁজিবাদ থেকে অনেক উত্তম; পুঁজিবাদে দরিদ্রের স্থান নেই। পক্ষান্তরে সমাজতন্ত্রে উৎপাদন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল এবং তাতে সমস্যার সমাধান হয় না। সকল স্তরে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করে প্রতিটি মানুষের কাছে যাতে বাজেটারি বরাদ্দের সুফল পৌঁছে তা নিশ্চিত করা দরকার।
কল্যাণ রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে মানুষের অভাব মোচন ও দারিদ্র্য দূর করা। বাংলাদেশে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং বিধবাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ভাতা দেয়া হয়। এসব ভাতা এমন হতে হবে যাতে নতুন করে হাত পাততে না হয়। সরকার হান্ড্রেড পার্সেন্ট আর্থিক সুবিধাভোগী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদেরও অবসরের ১৫ বছর পূর্তি সাপেক্ষে পূর্ণাঙ্গ অবসর ভাতার আওতায় এনেছেন। এগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এভাবে যারা শিক্ষিত বেকার, কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য বেকার ভাতার ব্যবস্থা করা হলে কল্যাণ রাষ্ট্রের আরেকটি চাহিদা পূরণ হতে পারে। একইভাবে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অবশিষ্ট বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, দুঃস্থ, পঙ্গু, ছিন্নমূল এবং ভিক্ষুকদের পর্যায়ক্রমে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে আসা যায়। আমাদের বার্ষিক বাজেটের আকার ইতিমধ্যে ছয় লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। কল্যাণ খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অনুৎপাদনশীল মেগা প্রকল্প খাতে ব্যয় বরাদ্দ হ্রাস করে সহজেই এর আঞ্জাম দেয়া যেতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় শাসকদের ব্যর্থতা থেকে আমরা কতিপয় শিক্ষা অনুসন্ধান করতে পারি যা বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন আমরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই?
ইতিহাসের প্রথম শিক্ষা হচ্ছে জবাবদিহিতার অভাব। জনগণের কাছে যদি শাসকদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকে তাহলে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অথবা মানুষের কল্যাণে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অথবা মানুষের কল্যাণের যে স্পৃহা শাসকরা তা হারিয়ে ফেলেন। আবার রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিলে ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নেরও সঙ্কট দেখা দেয়। ফলে মানুষ বাক স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে, সরকারের সমালোচনা করতে ভয় পায় এবং এতে সরকার বেপরোয়া হয়ে উঠে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অবিচার, অপচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এমনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে যে, সমাজ ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়। সরকার তার কর্তৃত্ব হারায় এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, জনবিচ্ছিন্ন কোনো সরকারের পক্ষে কল্যাণকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভবপর হয় না। এতে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠে। সরকার যদি অস্থিতিশীল হয় তা হলে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা সহজ হয় না। এজন্য আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। জনগণকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সরকার গঠন করবেন। সরকার তার সকল কাজকর্মের জন্য জনগণ ও পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহি করবেন। বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পরিপূর্ণভাবে ভোগ করবেন। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দল নয়, সর্বত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ