ঢাকা, মঙ্গলবার 8 October 2019, ২৩ আশ্বিন ১৪২৬, ৮ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বিলুপ্তির পথে নালিতাবাড়ীর লাঙ্গল জোয়াল ও হালের বলদ-

আল-হেলাল : নালিতাবাড়ী শেরপুর। সব সাধনের বড় সাধক আমার দেশের চাষা, দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা’ এমনটাই লিখিছিলেন রাজিয়া খাতুন চৌধুরানী তার চাষা কবিতায় কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেরপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলা নালিতাবাড়ীতে এ ধরণের কবিতাগুলোর সাথে এর বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়অ যায় না।

আবহমান কাল থেকে নালিতাবাড়ী খাদ্যে উদ্বুদ্ধ এলাকা হলেও সনাতন পদ্ধতিতে কাঠের লাঙ্গল ও হালের বলদ দ্বারা কৃষি করা হতো। কৃষিতে একর প্রতি উৎপাদন ছিলো কম অন্যান্য কারণও ছিলো যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে পাহাড়ী ঢল, উন্নত সার ও বীজের অভাব সেচ ব্যবস্থার অভাব, ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা, কীট পতঙ্গের উৎপাত ইত্যাদি।

আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় নালিতাবাড়ীর মানুষ দিন দিন যন্ত্র নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির সাথে সাথে জীবন যাত্রার ত্রুটি বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। পাহাড়ি অঞ্চল খ্যাত নালিতাবাড়ীতে ৯০ ভাগ লোকই এক সময় কৃষি নির্ভরশীল ছিল। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ, আমাদের জীবনে কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা কৃষি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর প্রায় সকল উপকরণ উৎপাদন ও সরবরাহ করে থাকে। কৃষিকাজ করার জন্য যেসব ধারণা পদ্ধতি যন্ত্র বা জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়। সেগুলোই হচ্ছে কৃষি প্রযুক্তি। কতগুলো প্রযুক্তি আছে প্রাচীন কাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে, আবার কতগুলো প্রযুক্তি আছে যা দশ বছর আগে ছিলো। এখন তার স্থান দখল করে নিচ্ছে নতুন প্রযুক্তিগুলো। প্রাচীনকালের লাঙ্গল, জোয়াল কৃষি যন্ত্র হলেও উপজেলায় এর ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। জমি চাষের কাজে নালিতাবাড়ী ও এর আশপাশের কৃষকেরা এক সময় কাঠের তৈরি লাঙ্গল, জোয়াল, মই ও হালের বলদ ব্যবহার করতো। ফসলি জমিতে চাষাবাদের জন্য এসব কৃষি উপকরণ হাজার হাজার বছর ধরে ব্যবহার করে এসেছে কৃষকরা।

কিন্তু কালের বিবর্তনে নালিতাবাড়ীতে আজ এসব ঐহিত্যবাহী জিনিস এর ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে। পরিবেশ বান্ধব লাঙ্গল যোয়ালের স্থান দখল করে নিয়েছে পরিবেশ ও শব্দ দুষণকারী আধুনিক প্রযুক্তির তৈরী যান্ত্রিক পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর। আগে লাঙ্গল যোয়াল ছাড়া চাষাবাদের কথা চিন্তাই করতে পারতো না সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ীর কৃষকরা। কিন্তু আধুনিক যুগে যুগের সাথে তাল মেলাতে চাসাবাদের জন্য ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারের মতো যান্ত্রিক উপকরণ আবিষ্কৃত হয়েছে। এতে কৃষক যেমনি উপকৃত হয়েছে তেমনি ক্ষতিগ্রস্থও হয়েছে। যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দুষণ শব্দ দুষণ ও বেকারত্বের হার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কৃষি শ্রমিকের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে যন্ত্র চালিত কৃষি উপকরণগুলো। আর এসব আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে চাষাবাদ আগের তুলনায় সময় শ্রম এবং অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে কৃষক আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে চাষাবাদ করে জমিতে ফসল ফলাচ্ছে। এতে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী লাঙ্গল, জোয়াল মই ও হালের বলদ। বর্তমানে নালিতাবাড়ী পাহাড়ী অঞ্চলের প্রায় সব কৃষকই জমি চাষের জন্য পাওয়ার টিলারের তৈরী ট্রাক্টর ব্যবহার করেন। লাঙ্গল মইসহ কৃষি সরঞ্জাম তৈরি করা যাদের পেশা তারা এখন বেশির ভাগ সময় বেকার বসে থাকছেন। এ পেশায় যারা জড়িত তাদের অনেকেই বাপদাদার এ আদি পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আর যারা এখনো কষ্ট করে ধরে আছেন তারাও ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছেন।

এভাবে হয়তো একদিন লাঙ্গল তৈরির পেশায় থাকা ব্যক্তিরা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এই কাজকে পেশা হিসেবে নিতে আর আগ্রহ প্রকাশ করবে না। নতুন পেশা খুঁজে নেবেন তারা। 

তখন হাজার বছরের পুরোনো লাঙ্গল-যোয়ালের স্থান হবে জাতীয় যাদুঘরে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা গল্প হয়ে থাকবে। থাকবে বই পুস্তকে। বাস্তবে চোখে দেখার সযোগও পাবেনা তারা। মানুষের সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে চির বিশ্রামে থাকবে এই লাঙ্গল-যোয়াল। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী পাশ্ববর্তী নকলা, ঝিনাইগাতী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে কমবেশি সব গ্রামেই দেখা যেতো লাঙ্গল, যোয়ল ও হালের বদল, কিন্ত এখন আর চোছে পড়ে না। উপজেলার কোন্নগর গ্রামের কৃষক মোছলেম উদ্দিন দৈনিক সংগ্রামকে জানান তার বাব-দাদাদের স্মৃতি বিজড়িত লাঙ্গল জোয়াল মই এখন আর তেমন একটা কাজে আসেনা। তিনি আরো বলেন এখন শুধুমাত্র বীজতলা তৈরি করার জন্য লাঙ্গল জোয়াল বলদ ব্যবহার করে থাকি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ