ঢাকা, মঙ্গলবার 8 October 2019, ২৩ আশ্বিন ১৪২৬, ৮ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

দাম্পত্য সংকট

ছোট্ট এই জীবনে একচিলতে সুখের আশায় ঘর বাঁধে মানুষ। স্বপ্ন দেখে একজন মনের মতো। মানুষের। যাকে নিয়ে তার জীবন অর্থময় হয়ে ওঠে। ঘর একদিন ঠিকই হয়। যুগল জীবনে। আনন্দের বান ডাকার আগে কখনও বা সেখানে। বাসা বাঁধে ঘুনপোকা। সুখের দেয়ালে অবিশ্বাসের আঁচড় পড়ে। স্বপ্নের মানুষটি হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্নের অমানিশা। সংকট নেমে আসে দাম্পত্যজীবনে। একজনমে সেই সংকট যেন আর কাটে না। কুরে কুরে খায় জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো। কিন্তু কেন? সমাজবিদ, মনস্তত্ববিদরাই হয়তো নিরূপণ করতে পারেন তার প্রকৃত কারণ। খোলাচোখে কিছু কিছু সমস্যা ধরা পড়ে, যা পরিহার করে চললে এড়ানো। যায় স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রণা। এড়ানো যায় দাম্পত্য সংকট। সে সব কার্যকারণ নিয়েই এই প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। দাম্পত্য সংকটের কারণ। দাম্পত্য সংকটের কারণ অনেক। যে কোনো একটি কারণে দাম্পত্য জীবনে ঝড় উঠতে পারে। সেই ঝড়ের মাত্রা কখনো হয় তীব্র, কখনো বা তীব্রতর। ঘর ভাঙে, ঘটে সেপারেশন, তালাক কিংবা খুন-খারাবির মতো ঘটনা। দাম্পত্য সংকটের কারণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম খান বলেছেন, দাম্পত্য সংকটের কারণ হচ্ছে-স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হওয়া, সন্তানদের স্নেহের ক্ষেত্রে তারতম্য, উচ্চাভিলাষ, শিক্ষার ব্যবধান, পরকীয়া প্রেম, বিয়ের আগে প্রেম, সন্দেহ ও শারীরিক দুর্বলতা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আইন ও সালিস। কেন্দ্রের আইনজীবী ইলাচন্দ বলেছেন-দাম্পত্য সংকটের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- বহুবিবাহ, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, স্বাবলম্বী না হওয়া, তালাক ও অবৈধ সম্পর্ক। যে সব কারণে সুখের জীবনে ঝড় নেমে আসে, ভেঙে যায় স্বপ্ন, নীড়-তার কিছু কারণ তুলে ধরা হলো।
বহু বিবাহ যে সব কারণে দাম্পত্য সংকট সৃষ্টি হয় তার মধ্যে বহু বিবাহ একটি। মুসলিম শরীয়া আইনে বহু বিবাহের অনুমতি রয়েছে। বিশেষ বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে একজন মুসলমান চারটি পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহণ করতে পারেন। তবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে সিদ্ধ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়-অধিকাংশ লোক দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির তোয়াক্কা করেন না। ফলে সৃষ্টি হয় দাম্পত্য সংকট। বাংলাদেশের আইনে বহু বিবাহ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তথাপি আইনের অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রথম বিয়ের পর অতিরিক্ত বিয়েগুলো বৈধ হিসেবে ধরা হয়। বহু বিবাহের কারণে অনেক মেয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে পারিবারিক সংকট ও সামাজিক সমস্যা। বহু বিবাহ কি ধরনের সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করছে সে বিষয়ে দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। মনসুর আহমেদ চাকরি করেন একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে। সংসারে স্ত্রীসহ দু’টি কন্যা রয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করায় বেতনাদি ভালো পেতেন। ভাড়া থাকতেন পল্লবীতে। বাড়ি ভাড়া দিতেন ৮ হাজার টাকা। নিজস্ব গাড়িও ছিলো। বড় মেয়ের বয়স ১০ বছর ও ছোট মেয়ের ৭। সব মিলিয়ে সুখের সংসার। হঠাৎ মনসুর আহমদকে বিদেশের একটি অফিসে বদলি করা হয়। তিনি সেখানকার কার্যালয়ে যোগদান করলেন। কথা ছিলো মাস দুয়েক পর এসে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে যাবেন। কিন্তু মাসখানেক পর স্ত্রীকে টেলিফোনে জানালেন তাদের বিদেশে যাওয়া হবে না। কারণ অফিসের জটিলতা। স্ত্রীকে কোনো প্রকার চিন্তা করতে নিষেধ করলেন। প্রতিমাসে সংসার খরচের টাকা নিয়মিত পাঠাতেন। এভাবে কেটে গেল বছরখানেক। তারপর ধীরে-ধীরে যোগাযোগ কমতে থাকে। টাকা-পয়সাও দিতে লাগলেন অনিয়মিতভাবে। এভাবে টাকা পাওয়ার কারণে মিসেস মনসুর ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। পাওনাদাররা টাকার জন্য তাগাদা দিতে থাকে। স্বামীকে টেলিফোন করে তিনি টাকা পাঠাতে বললেন। স্বামী একপর্যায়ে রেগে বললেন-আমার কাছে কি টাকার মেশিন আছে যে চাইলেই তৈরি করে দেবো। এক কথা দু’কথায় টেলিফোনে ঝগড়া হতো। মনসুর আহমদ তার পর থেকে স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। টাকাও পাঠাতেন না স্ত্রী-সন্তানদের জন্য। মিসেস মনসুর জানেন না কি তার অপরাধ। কি কারণে তার স্বামীর এমন আচরণ। তিনি তার সেখানকার প্রবাসী এক আত্মীয়কে চিঠি লিখলেন। জানালেন বিস্তারিত। তার স্বামীর খোঁজ নিয়ে প্রকৃত ঘটনা জানাতে অনুরোধ করলেন। ২০/২৫ দিন পর তার আত্মীয়ের চিঠি। এলো। জানালেন, মিস্টার মনসুর আরেকটি বিয়ে করেছেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে যথারীতি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বড় মেয়ে আস্তে আস্তে বদলে যেতে থাকে। বেশ কিছু  বন্ধু জুটে যায়। তাদের সঙ্গে সারা দিন কাটাতো হৈ-হুল্লোড় করে। অভাব ও হতাশায় সে একদিন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নেশার টাকা যোগাতে গিয়ে একপর্যায়ে নেমে পড়ে দেহ ব্যবসায়। বড় বোনের দেখাদেখি ছোট বোনটিও একদিন পা বাড়ায় একই পথে।
সংসার করছেন। এ খবর শুনে মিসেস মনসুর কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এদিকে তিনি ঋণে জর্জরিত। ঋণ শোধ করার জন্য ব্যবহৃত গাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। কি করবেন ভেবে ঠাহর করতে পারলেন না। ঘরের আসবাবপত্র একে একে বিক্রি করে কম ভাড়ার বাড়িতে এলেন। জিনিসপত্র বিক্রি করা টাকাও ফুরিয়ে আসতে থাকে। বাবার অবস্থাও ভালো নয় যে সেখানে গিয়ে থাকবেন। মিসেস মনসুর লেখাপড়াও বেশি একটা জানেন না। মাত্র আই এ পাস। এই লেখাপড়ায় ভালো কোনো চাকরিও পাওয়া যাবে না। এদিকে দু’মেয়েই স্কুলে পড়ছে। তাদের পড়ার খরচ চালাতে হবে। পাশাপাশি সংসারের খরচ। দু’চোখে তিনি অন্ধকার দেখলেন। কোনো উপায় না পেয়ে একজনের পরামর্শে তিনি গার্মেন্টসে চাকরি নিলেন। বেতন মাত্র ১ হাজার ৫শ’ টাকা। ওভার টাইমসহ মাসে আসে ২২/২৩শ’ টাকা। এই টাকায় অতিকষ্টে চলতে লাগলেন। মেয়ে দু’টি পড়তো হলিক্রস স্কুলে। আর্থিক কারণে তাদের স্কুল পরিবর্তন করলেন। ভর্তি করলেন মিরপুর শহীদ স্মৃতি স্কুলে। গার্মেন্টসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর মেয়ে দু’টির তিনি ঠিকমতো খোঁজ-খবর নিতে পারতেন না। সংসারে অভাব-অনটন মেয়ে দু’টির জীবনে। মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তার ওপর ভালো স্কুল। থেকে খারাপ স্কুলে ভর্তি তাদের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ কমতে থাকে। এভাবে দিন যায়। বড় মেয়েটি একদিন এসএসসি পাস করে। ভর্তি হয় মিরপুর আইডিয়াল কলেজে। ছোট মেয়েটি তখন ক্লাস এইটে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বড় মেয়ে আস্তে আস্তে বদলে যেতে থাকে। বেশ কিছু ছেলে বন্ধু জুটে যায়। তাদের সঙ্গে সারা দিন কাটাতো। হৈ-হুল্লোড় করে। অভাব ও হতাশায় সে একদিন, নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নেশার টাকা যোগাতে গিয়ে একপর্যায়ে নেমে পড়ে দেহ ব্যবসায়। বড় বোনের দেখাদেখি ছোট বোনটিও একদিন পা বাড়ায়। একই পথে। এভাবেই একদিন ভেঙে যায় সেই। সুখের সংসার। পাঁচ বছর প্রেম করে মুক্তা বিয়ে করে রেজাউলকে। রেজাউল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করে ঢাকার এক কনস্ট্রাকশন ফার্মে। মুক্তার বাবা-মা কেউ নেই। নানী তাকে মানুষ করেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মা মারা যান। ঘটনাক্রমে মুক্তা বেঁচে যায়। নানীর কাছে বড় হতে থাকে মুক্তা। বাবা-মা মরা মেয়েকে মামারা খুব আদর করেন। মুক্তার সব দাবীই মেনে নেন মামারা। এ কারণে মুক্তার পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিতে কোনো আপত্তি করেননি। বিয়ের পর মুক্তা মামা বাড়ি থেকে যায়। কথা ছিলো কিছুদিন পর মুক্তাকে ঢাকায় নিয়ে আসবে। কিন্তু অল্প বেতনের অজুহাত দেখিয়ে মামা বাড়িতেই রেখে দেয়। এভাবে কেটে যায় দুই বছর। রেজাউল সময় পেলেই মামা বাড়িতে দেখতে আসতো মুক্তাকে। কিছু দিন পর থেকে যোগাযোগ কমিয়ে। দেয়। একপর্যায়ে মুক্তার কাছে আসাও বন্ধ করে দেয়। মুক্তা একের পর এক রেজাউলকে চিঠি লিখতে থাকে। কিন্তু রেজাউল কোনো উত্তর দেয়।
একপর্যায়ে মুক্তা অস্থির হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা যাবে। নানীকে নিয়ে সে ঢাকা রওনা হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রেজাউলের দেখা পায়। মুক্তাকে দেখে রেজাউল তেলে বেগুনে জ্বলে ওেঠ। জিজ্ঞেস করে, মুক্তা ঢাকায় এসেছো কেন? ইতোমধ্যে মুক্তা জেনে ফেলেছে রেজাউল ঢাকায় আরেকটি বিয়ে করেছে। ক্ষিপ্ত হয়ে বলে করে তুমি আর কত মেয়ের জীবন নষ্ট করতে চাও? কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে দু’জনের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে কনস্ট্রাকশন ফার্মে। মুক্তার বাবাও যায়। রেজাউল মানুষ করেছেন এনিয়ে   ঝগড়া বাঁধে। ঘটনাক্রমে  একপর্যায়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মুক্তা বেঁচে বাবা- মা মরা মেয়ে মুক্তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে ঘর মুক্তার সব দাবীই মেনে নিয়ে ঘর থেকে বের কওে দেয়। পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে  দেয়। মুক্তা আবার ফিরে আসে মামা বাড়ি। মামা-মামী তাকে বিষয়টি ভুলে যেতে বলেন। সবার পরামর্শে মুক্তা ডিভোর্স দেয় রেজাউলকে। ডিভোর্সের পর কেটে যায় বছরখানেক। এই সময়ে মুক্তা ঘর থেকে বের হতো না। কথা বলতো না কারো সঙ্গে। মামারা মুক্তার জন্য পাত্র খুঁজতে থাকে। মুক্তা বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। মুক্তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে পুনরায় এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করা হয়। বিয়ের দিনক্ষণ, ঠিক হয়। হঠাৎ মুক্তা এক রাতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। চাকরি করে ঢাকায়। বাবা  ও মা কেউ নেই।   নানীর কাছে বড় হতে থাকে ভয়ানক সামাজিক মামারা। খুব বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মামারা। এ কারণে মুক্তা এখনো যৌতুক নিতে কোনো আপত্তি করেননি। যৌতুক প্রথার প্রচলন ব্যাপক। যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হয় অসংখ্য নারী। পরিণতি কখনো কখনো গড়ায় মৃত্যুতে। অথচ যৌতুক আদান-প্রদান আইনত সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। তথাপি এই প্রথা চালু রয়েছে। ১৯৮০ সালের ৩৫ নম্বর যৌতুক নিরোধ আইনের ১(২) ধারায় বাংলাদেশের যে কোনো ধর্মের, গোত্রের কিংবা সম্প্রদায়ের নাগরিকদের বিবাহের পণস্বরূপ দেয় যে কোনো প্রকারের যৌতুক আদান-প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী যে ব্যক্তি যৌতুক প্রদান করে কিংবা গ্রহণ করে অথবা আদান-প্রদানে সহায়তা করে তাকে পাঁচ বছরের কারাদ- কিংবা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। আইন চালু থাকলেও যৌতুক প্রথা বন্ধ হয়নি। যৌতুকের ছোবলে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য অসহায় গৃহবধূ। আইএ পরীক্ষার আগে বাবা-মা বিয়ে দেন আরিফাকে। সুন্দরী স্মার্ট ও প্রাণবন্ত মেয়ে আরিফা। বাবা ব্যাংকার। একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক। স্বামী মুজিবর ছিলেন। আরিফার বাবার অধস্তন কর্মকর্তা। সুদর্শন, চালচলন, স্বভাব-চরিত্র ভালো। তার ব্যবহারে মুগ্ধ। আরিফার বাবা। ছেলেটির সঙ্গে আরিফার বিয়ে দেয়ার কথা ভাবতে থাকেন বাবা আব্দুল মালেক। আবদুল মালেক মাঝে মধ্যেই মুজিবরকে কাছে ডাকতেন। স্নেহবশত বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করতেন। একদিন কৌশলে মুজিবরকে তিনি বাড়ি নিয়ে যান। পরিচয় করিয়ে দেন আরিফার সঙ্গে। প্রথম দর্শনেই আরিফাকে ভালো লেগে যায়। মুজিবরের। তার পর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে মুজিবর আরিফাদের বাসায় আসতে থাকে। এক সময় তোক মারফৎ বিয়ের প্রস্তাব দেন আরিফার বাবার কাছে। ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে। হয়। বিয়ের পর মুজিবর ও আরিফা বাসা নেয় মোহাম্মদপুর বিজলী মহল্লায়। কেটে যায়। বছরখানেক। একপর্যায়ে মুজিবর আরিফাকে যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। আরিফা জানায় বাবাকে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না। শুরু হয় আরিফার ওপর নির্যাতন। নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে আরিফা বাবা আবদুল মালেকের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা এনে মুজিবরকে দেয়। মাস ছয়েক পর শুরু হয় আবার নির্যাতন। একদিন মুজিবর হঠাৎ আরিফাকে বলে টঙ্গীতে জায়গা ঠিক করেছি। দাম ৬ লাখ। তোমার বাবাকে বলে ৩ লাখ টাকা এনে দাও। আরিফা টাকা আনতে অপারগতা প্রকাশ করে। স্বামীকে জানায়, বাবার কাছে কোনো টাকা নেই। আমার পক্ষে টাকা চাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া মাস ছয়েক আগেই তো ৫০ হাজার টাকা এনে দিলাম। মুজিবরের সাফ কথা, টাকা আনতে না পারলে বাপের বাড়ি চলে যাও। এক কথায় দু’কথায় দু’জনের মধ্যে বাকবিত-া শুরু হয়। মুজিবর। মারাত্মক রেগে যায়। আরিফাকে বেধড়ক পেটাতে থাকে। আরিফার নাক-মুখ ও দু’কান দিয়ে রক্ত বেরুতে থাকে। আরিফা প্রহার সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে বাঁচাও-বাঁচাও, বলে কান্না করতে থাকে। চারপাশ থেকে ছুটে আসে আশপাশের লোকজন। আরিফা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। প্রতিবেশিরা আরিফাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যায়। ৮ ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরে আসে আরিফার। কয়েক দিন চিকিৎসার পর বাবার বাড়িতে চলে আসে আরিফা। স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা করে। মামলার শুনানিকালে আরিফা ডিভোর্স ও যৌতুকলোভী স্বামীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। আদালত মুজিবরকে ৩ বছরের কারাদ- দেয়। আরিফা স্বামীকে ডিভোর্স দেয়ার পর নতুন করে লেখাপড়া শুরু করে। লেখাপড়া শেষ করে সে এখন সরকারি চাকরি। করছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সারা জীবন একাই থাকবে। বিয়ে-সাদী করবে না। মাঝে মধ্যে। বিয়ের ভালো প্রস্তাব আসে। বাবা-মা আরিফাকে বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আরিফা তার সিদ্ধান্তে অটল।
বাল্যবিবাহের কারণেও দাম্পত্য সংকট নেমে আসে। গ্রামাঞ্চলেই বাল্যবিবাহের প্রচলন বেশি। বালবিবাহ নিরোধ আইনে বাল্যবিবাহ হলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে ও ২১ বছরের কম বয়সের য়েলের মধ্যে বিয়ে হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো ব্যক্তি যদি নাবালকের বিয়ে সম্পন্ন করে। কিংবা বিয়ে পরিচালনা করে অথবা বিয়ে। অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেয় তবে ওই ব্যক্তির এক মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- বা এক হাজার টাকা। পর্যন্ত জরিমানা বা দুটোই হতে পারে। পিতামাতা বা অভিভাবক বিয়ে সম্পন্ন করার নির্দেশ। দিলে তাদের জন্যও এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। তাছাড়া ২১ বছরের বেশি বয়সের কোনো য়েলে ১৮ বছরের কম কাউকে বিয়ে করলে সে একই শাস্তিতে দণ্ডিত হবে। এই আইন এখনো বলবৎ থাকা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যায়নি। বাল্যবিবাহ দাম্পত্য জীবনে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করে। আকলিমার ১০ বছর বয়সে বিয়ে হয়। স্বামীর বয়স ছিল ২২ বছর। তখনো আকলিমার রজস্বলা হননি। বিয়ের দুই বছর পর আকলিমা মা হয়। দশ বছরের মাথায় আকলিমার সন্তানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩টি। স্বামী রিকশা চালায়। যা আয় হয় কোনোমতে সংসার চলে। সংসারের খরচ ও বাচ্চাদের খাবার জোগাতে তার স্বামী হিমশিম খায়। অভাবের কারণে দু’বেলা পেট পুরে ভাত জোটে না। বিয়ের ১০ বছরের মাথায় আকলিমার শরীর একেবারে ভেঙে যায়। ২০ বছরের আকলিমাকে দেখলে মনে হয় বয়স ৪০ বছর। রূপ-লাবণ্য হারিয়ে ফেলেছে। আকলিমা স্বামীর সঙ্গে থাকতো আগারগাঁও তারের বেড়া বস্তিতে। আকলিমা বস্তির যে ঘরে ভাড়া থাকতো, তার পাশে ভাড়া থাকতো সেলিনা নামে এক মেয়ে। সেলিনা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতো। সেলিনার বিয়ে হয়েছিলো। বিয়ের দু’বছরের মাথায় স্বামী তালাক দেয়। তারপর থেকে সে গার্মেন্টসে চাকরি করে। সেলিনা দেখতে বেশ সুন্দরী। বয়স বাইশ- তেইশ বছর। আকলিমার স্বামী এক সময় সেলিনাকে ভালোবাসতে শুরু করে। একদিন ভালোবাসার কথা জানায়। সেলিনাকে। প্রথম দিকে সেলিনা আপত্তি জানায়। কিন্তু একের পর এক ভালোবাসার প্রস্তাবে সেলিনা একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে। সেলিনা শর্ত দেয়। আকলিমাকে তালাক দিতে হবে। এই শর্তে রাজি হয় আকলিমার স্বামী। একদিন আকলিমার স্বামী ও সেলিনা উধাও হয়ে যায়। আকলিমা দু’চোখে অন্ধকার দেখে। কয়েক দিন পর লোকজনের কাছে শুনতে পায় তার স্বামী সেলিনাকে বিয়ে করেছে। তারা ঘর ভাড়া নিয়েছে মোল্লারটেক বস্তিতে। আকলিমা স্বামীকে খুঁজে বের করে। সংসারে ফিরে আসতে অনুরোধ জানায়। হাতে পায়ে ধরে। কিন্তু স্বামী তার সাথে সংসার করতে অস্বীকৃতি জানায়। আকলিমা তার অপরাধের কথা জানতে চাইলে তার স্বামী জানায় তোরে অহন আর ভালো লাগে না। এই কথা বলে লোকজনের সামনে আকলিমাকে তালাক দেয়। আকলিমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবে তা ভেবে পায় না। উপায়ন্তর না দেখে। বাসা বাড়িতে কাজ নেয়। এভাবেই তার জীবন আকলিমা তার অপরাধের কথা জানতে চাইলে তার স্বামী জানায় - তোরে অহন আর ভালো লাগে না। এই কথা বলে লোকজনের সামনে। আকলিমাকে তালাক দেয়। আকলিমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবে তা। ভেবে পায় না। উপায়ন্তর না দেখে বাসা বাড়িতে কাজ নেয়। এভাবেই তার জীবন চলতে থাকে। চলতে থাকে। পাঁচ বছর বয়সে হালিমার বাবা মারা যান। আর কোনো ভাই-বোন নেই। বাবা মারা যাবার পর তাকে নিয়ে মা চলে আসেন নানা বাড়ি। বছরখানেক পর মায়ের বিয়ে হয়ে যায় অন্যখানে। হালিমা নানা বাড়িতে বড় হতে থাকে। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার নানা মারা যান। সংসারের দায়িত্ব পড়ে মামাদের ওপর। গ্রামের তরুণ যুবকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে হালিমা। এক সময় যুবকদের উত্ত্যক্ত করার মাত্রা বেড়ে যায়। বিষয়টি মামাদের জানায়। মামারা কিছু দিনের মধ্যে হালিমার বিয়ে ঠিক করে। পাত্রের ঢাকায় দু’টি বাড়ি আছে। ভালো ব্যবসা আছে। বয়স চল্লিশের ওপর। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার কারণে পাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে করতে চায়। পাত্রের অঢেল টাকা থাকায় হালিমার মামারাও রাজি হয়ে যান। দিনক্ষণ দেখে হালিমার বিয়ে হয়ে যায়। অজপাড়াগাঁওয়ের মেয়ে হালিমা। বিয়ের পর হালিমা স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় এসে স্বামীর সঙ্গে সংসারজীবন শুরু করে। বিয়ের পর কেটে যায় ১০ বছর। হালিমা তখন ভরা যৌবনা এক রমণী। কিন্তু বিশেষ করে তার স্বামী বৃদ্ধ বয়সের দ্বারপ্রান্তে। হালিমা প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হতে চাইতো। কিন্তু বয়সের কারণে তার স্বামী প্রতিদিন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতো না। রাতে হালিমার ঘুম হতো না। কেমন যেন অস্থির, লাগতো। কিন্তু কাউকে তার সমস্যার কথা বলতে পারতো না। এমনি একটি মুহূর্তে হালিমার স্বামীর এক ভাগিনা সুমন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে আসে। সুমন ছিলো একজন সরকারি চাকুরে। অবিবাহিত, শিক্ষিত ও সুদর্শন। ঢাকায় এসে সুমন মামার সঙ্গে দেখা করতে আসে। মামা সুমনকে তার বাসায় থাকতে বলে। মেসে থাকতে অসুবিধা বলে সুমন মামার কথায় রাজি হয়ে যায়। মামা বাড়িতে থাকার কিছুদিনের মধ্যে মামীর সাথে তৈরী হয় অবৈধ সম্পর্ক। এই সম্পর্ক এক সময় শরীর সর্বস্ব হয়ে ওঠে। মামার অগোচরে তাদের সম্পর্ক চলতে থাকে। এভাবে কেটে যায় বছরখানেক। হালিমা এক সময় সুমনকে জানায়, এভাবে আমি আর পারবো না। সুমনকে সে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু সুমন বিয়ে করতে অস্বীকার করে। সে হালিমাকে বলে বিয়ে করার দরকার কি, এভাবেই চলুক না। কিন্তু হালিমা নাছোড়বান্দা। সুমনকে হালিমা হুমকি দেয়-তাকে বিয়ে না করলে সে আত্মহত্যা করবে। সে চিরকুটে লিখে যাবে আমার মৃত্যুর জন্য সুমন দায়ী। একথা শুনে সুমন চিন্তায় পড়ে যায়। হালিমাকে নানাভাবে বোঝাতে থাকে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। একদিন হালিমা সুমনকে বিষের বোতল দেখিয়ে বলে, তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করো তবে আজই আমি আত্মহত্যা করবো। ইতোমধ্যে সুমন নিজেও দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। হালিমা সুযোগ খুঁজতে থাকে। একদিন সুযোগ বুঝে হালিমা সুমনের হাত ধরে পাড়ি জমায়। হালিমার স্বামী বাসায় এসে কোথাও খুঁজে না পেয়ে বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে খুঁজতে থাকে। সপ্তাহখানেক পর তাকে একজন টেলিফোন করে হালিমা ও সুমনের বিয়ের খবর দেয়। এ খবর পেয়ে হালিমার স্বামী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় তাকে ভর্তি করা হয় হৃদরোগ হাসপাতালে। হাসপাতালে ভর্তি করার ৩ দিন পর সে মারা যায়। স্বাবলম্বী না হওয়া। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হবার কারণেও দাম্পত্য সংকট সৃষ্টি হয়। এ দেশের বেশিরভাগ গৃহবধূ স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের ছোটখাটো জিনিস থেকে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুই তারা স্বামীর কাছ থেকে পেয়ে থাকে। এজন্য সংসারে তাদের কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। স্বামীর ভালো-মন্দ সব কথাই মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। সংসারে স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীর সামান্য অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ থাকলে স্বামী একক কর্তৃত্ব করতে কিছুটা হলেও চিন্তা করতো। কিন্তু বেশিরভাগ নারী। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংসারে তাদের মতামত থাকে না। তাদের মতামতের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করা হয় না। অনেক স্বামী স্ত্রীকে প্রায়ই খোটা দিয়ে কথা বলেন। একদিন, দুদিন করতে করতে স্ত্রীও এক পর্যায়ে মুখ খুলতে শুরু করেন। এককথা, দু’কথায় প্রথমে মান-অভিমান, তারপর ঝগড়াঝাটির সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে সৃষ্টি হয় দাম্পত্য সংকট। আবার কখনো কখনো স্বামীর সাময়িক বেকারত্বের সুযোগে কর্মজীবী স্ত্রী তার স্বামীর ওপর কর্তৃত্ব ফলান উঠতে-বসতে। তিরস্কার করেন। এতে স্বামীর ব্যক্তিত্বে লাগে। এভাবেও অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য সংকটের সৃষ্টি হয়। এমন ঘটনাও দেখা যায়, স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি উপার্জন করেন। এ ক্ষেত্রে যে সমস্যা হয় তা হচ্ছে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব। স্ত্রী মনে করেন, তিনি বেশি আয় করেন সংসার চলবে তার একক কর্তৃত্বে। আবার স্বামীও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে বিচ্ছেদের পর যদি তারা আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান এতে কোনো বাধা নেই। দেশের আইনে এতে হিলা বিয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে হিলা বিয়ে রহিত করা হয়েছে। তথাপি গ্রামে-গঞ্জে এখনো হিলা বিয়ের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
১৯৯৯ সালের ঘটনা। কেরানীগঞ্জ থানার বাইখর গ্রামের নারেশা ও তার স্বামী নবী আউয়াল সমাজপতিদের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। একদিন নবী আউয়াল ঝগড়ার সময় স্ত্রী নারেশাকে তালাক দেবে বলে উচ্চারণ করে। আশপাশের কিছু লোক শুনে ফেলে এ কথা। কিছুক্ষণের মধ্যে সারা গ্রাম রটে যায় নবী আউয়াল স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে। সমাজপতিরা ঘোষণা দেয় তাদের হিলা বিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তারা রাজি হয় না। রাজি না হওয়ায় নারেশা ও তার ভাইয়ের পরিবারকে একঘরে করে রাখা। হয়। সমাজের সবাইকে তাদের সঙ্গে না মিশতে নিষেধ করা হয়। যে কথা বলবে তাকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এভাবে পাঁচমাস কেটে যায়। (চলবে)
-আখতার হামিদ খান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ