ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 October 2019, ২৫ আশ্বিন ১৪২৬, ১০ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

অব্যাহত দরপতনে পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : অব্যাহত দরপতন আর লেনদেন খরায় দেশের শেয়ারবাজার। এতে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে বেড়েই চলেছে পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ। আস্থার সংকটে শুধু দেশী নয়, বিদেশীদেরও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহ নেই। এতে বাজারে বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে কমছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশী বিনিয়োগ ২৬৬ কোটি টাকার বেশি কমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শেয়ারবাজারের মূল সমস্যা বিনিয়োগ ও আস্থা সংকট। এই সংকটের কারণে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসছে না।
আগের কার্যদিবসের ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবারও প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সবকটি মূল্য সূচকের পতন হয়েছে। এর মাধ্যমে চলতি সপ্তাহে লেনদেন হওয়া তিন কার্যদিবসেই দরপতন হলো। এমন টানা দরপতন হলেও শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে সম্প্রতি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তারল্য বাড়াতে রেপোর মাধ্যমে অর্থ সরবরাহের সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু শেয়ারবাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এমনকি চীনের দুই শেয়ারবাজার সাংহাই এবং শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ার কেনার পরও বাজারে ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারের মূল সমস্যা আস্থা সংকট। এই সংকট কাটিয়ে বাজারে স্থিতিশীলতা আনার জন্য আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নিতে হবে। ২০১০ সালের পর বাজার অব্যাহতভাবে নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এরপর ওইভাবে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। বিপরীতে বোম্বে এবং সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের অবস্থা খুব ভালো।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের মূল সমস্যা বিনিয়োগ আস্থা সংকট। এই সংকটের কারণে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসছে না। তিনি বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ বাজারের গভীরতা বাড়ায়। কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে বিদেশীরা বিনিয়োগ করে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, আইন-কানুন এবং কারসাজির করলে তার বিচার কত দ্রুত হয় সেটি বিদেশীরা বিবেচনা করে। 
ডিএসইর তথ্য অনুসারে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে বিদেশীরা শেয়ারবাজারে ৭৮৩ কোটি টাকা লেনদেন করেছে। এর মধ্যে ৩০৯ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে। বিপরীতে ৪৭৪ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে। এ হিসাবে তারা ১৬৪ কোটি টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছে। পরের মাস আগস্টে ৪৫৬ কোটি টাকা লেনদেন করেছে। এর মধ্যে ১৭৬ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে তারা। বিপরীতে বিক্রি করেছে ২৭৯ কোটি টাকার শেয়ার। এ হিসাবে কেনার চেয়ে বিক্রি ১০২ কোটি টাকা বেশি। সব মিলিয়ে দুই মাসে ২৬৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে। এছাড়া জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টের লেনদেনের হারও কমে এসেছে।
বিনিয়োগকারীরা বলেন, শেয়ারবাজারে প্রতিনিয়ত দরপতন হচ্ছে। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে লেনদেন খরা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাতে হচ্ছে। আর আমাদের নীরবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তারা বলেন, সবাই ২০১০ সালের মহাধসের কথা বলেন। কিন্তু গত কয়েক মাসের দরপতন ২০১০ থেকে কোনো অংশে কম না। চলমান নীরব পতনে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। এসব বিনিয়োগকারীদের রক্ষা করার যেন কোনো উপায় নেই।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল বুধবার ডিএসইতে দরপতন হয়েছে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেয়া ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার বিপরীতে দরপতন হয়েছে ২৪১টির। আর ৪৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমায় ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ৩২ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৮৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ্ ৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১২৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক ১৪ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৭২৪ পয়েন্টে উঠে অবস্থান করছে।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা আস্থা সংকটের মধ্যে রয়েছে। দিন যত যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তারল্য সংকট। যে কারণে বাজারে এমন ধারাবাহিক দরপতন হচ্ছে। এদিকে দরপতনের সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে লেনদেন খরা। তবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় বুধবার লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। দিনভর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৩২০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩০১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
লেনদেন খরার বাজারে টাকার অঙ্কে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে ন্যাশনাল টিউবসের শেয়ার। কোম্পানিটির ২৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। ২০ কোটি ৪০ লাখ টাকার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সামিট পাওয়ার। এছাড়া লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, মুন্নু জুট স্টাফলার্স, সিলকো ফার্মাসিটিক্যাল, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ওয়াটা কেমিক্যাল, স্টাইল ক্রাফট এবং গ্রামীণফোন।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্য সূচক সিএএসপিআই ৭৯ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৮০৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। লেনদেনে অংশ নেয়া ২৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৯টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৫৫টির। আর ৩৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ