ঢাকা, শুক্রবার 11 October 2019, ২৬ আশ্বিন ১৪২৬, ১১ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বুয়েট ভিসি’র নাটকীয় সফর

মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়- বুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর সাইফুল ইসলামকে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। এর কারণও তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। সারাদেশে যখন ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ এবং হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে তেমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে গত বুধবার ভিসি সাইফুল ইসলাম গিয়েছিলেন কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির রায়ডাঙ্গায়। ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল নিহত ফাহাদের কবর জিয়ারত করা। ভিসি মহোদয় তাই বলে একা যাননি। গিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক এবং পুলিশের এসপিসহ বিরাট এক বহর নিয়ে। তার সঙ্গে ছিলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ক্ষমতাসীন দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী।

ওদিকে কুষ্টিয়া থেকে ভিসি সাইফুল ইসলাম রায়ডাঙ্গার উদ্দেশে রওনা দেয়ার আগেই জেলা ছাত্রলীগের সভাাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে কয়েকশ’ নেতা-কর্মী গিয়ে কবরস্থান এবং ফাহাদের বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিসি মহোদয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী এবং পুলিশের প্রহরায় ভিসি নিহত ফাহাদের কবর জিয়ারতও করেছেন। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল তিনি ফাহাদের বাড়ির উদ্দেশে পা বাড়ানোর পর। সেখানে ফাহাদের দাদা ও পিতা তো ছিলেনই, তাদের সঙ্গে ছিলেন রায়ডাঙ্গাসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের শত শত অধিবাসীও। তারাই ভিসি মহোদয়ের পথরোধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সামনে এগিয়ে এসেছিল ফাহাদের ছোট ভাই ও ঢাকা কলেজের ছাত্র আবরার ফায়াজ। ভাই হারানোর গভীর বেদনায় ক্ষুব্ধ ফায়াজ ভিসির কাছে জানতে চেয়েছে, হত্যাকান্ডের খবর পাওয়ার পর সারাদিন যিনি ফাহাদের লাশ দেখতে যাননি এবং যিনি এমনকি বুয়েটের মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজে পর্যন্ত অংশ নেয়ার সময় পাননি, সে তিনিই কেন কবর জিয়ারতের নামে কুষ্টিয়ার কুমারখালির গ্রামে ছুটে এসেছেন? 

উল্লেখ্য, বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নিহত ফাহাদের মা নাকি আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ভিসি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান না। জানা গেছে, মূলত সে কারণেই ফাহাদের ছোট ভাই ভিসির পথরোধ করেছিল। অন্যদিকে ভিসির ইঙ্গিতে কি না সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও পুলিশ সদস্যরা ছোট ভাই ফায়াজকে ধাক্কাধাক্কি করেছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে পুলিশের একজন এডিশনাল এসপি ফায়াজের বুকে নিজের হাতের কনুই দিয়ে আঘাত করেছে বলে ফায়াজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। এই ধাক্কাধাক্কি এবং ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের ফলে মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ভিসির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে, তাকে ওই গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে। স্লোগানের মূলকথায় তারা বলেছে, যিনি বুয়েটের ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা ফাহাদের লাশ দেখতে যাননি এবং তার জানাজার নামাজে পর্যন্ত অংশ নেননি, তিনি আসলে নাটকীয়তা করার এবং আলগা মায়া দেখানোর হীন উদ্দেশ্যে কুমারখালির গ্রামে এসেছেন।

আমরাও বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি না। কারণ, একজন মেধাবী ছাত্রকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করার খবর পাওয়ার পরও ভিসি সাইফুল ইসলাম তার লাশ দেখতে যাননি, জানাজার নামাজে অংশ নেননি এবং এক মুহূর্তের জন্যও গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতি জানাননি। সে একই ভিসি আবার রাজধানী থেকে বহুদূরে অবস্থিত কুমারখালির গ্রামে ‘ছুটে’ গেছেন ফাহাদের কবর জিয়ারত করার অজুহাত দেখিয়ে! শুধু তা-ই নয়, গেছেনও মন্ত্রী-এমপি এবং আওয়ামী লীগের বড়সড় একজন নেতার মতো। তার সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও এসপিসহ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বহরকেও দেখা গেছে। তাদেরও আগে কবরস্থানে গিয়ে প্রহরার জন্য দাঁড়িয়েছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তারা এমনকি ফাহাদের বাড়িও ঘিরে ফেলেছিল। 

এভাবে সব মিলিয়েই ভিসি মহোদয় বুঝিয়ে ছেড়েছেন, কবর জিয়ারত অজুহাত মাত্র ছিল। তিনি আসলেও নাটকীয়তার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলেন। এর যথোচিত জবাবও তাকে দেয়া হয়েছে। দিয়েছে ওই এলাকার বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা, যাদের অতি প্রিয় একজন মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ভিসি সাইফুল ইসলামের অধীনে থাকা ক্যাম্পাস বুয়েটের একটি হলের ভেতরে। বড়কথা, এত বড় একটি হত্যাকান্ডের পরও একই ভিসি মহোদয়কে সামান্য তৎপর পর্যন্ত হতে দেখা যায়নি।

আমরা মনে করি, অনাকাক্সিক্ষত হলেও ভিসি সাইফুল ইসলামের এই লজ্জাকর পরিণতি থেকে বিশেষ করে তাদের শিক্ষা নেয়া দরকার, যারা এখনো ফাহাদ হত্যাকান্ডকে ভিন্নখাতে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে এবং যারা ছাত্রলীগের খুনিদের বাঁচানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ফাহাদের সকল খুনিকে চিহ্নিত ও গ্রেফতার করে আইনসম্মত বিচারের মাধ্যমে অবশ্যই কঠোর শাস্তি দিতে হবে। বুয়েটসহ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হত্যা-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মদ ও জুয়াসহ সকল বেআইনি ও অনৈতিক কর্মকান্ডের অবসান ও মূলোচ্ছেদ করার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ