ঢাকা, রোববার 13 October 2019, ২৮ আশ্বিন ১৪২৬, ১৩ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বাড়ছে বারো মাসের যন্ত্রণা ‘কিউলেক্স’ মশা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : সংকট পিছু ছাড়ছে না রাজধানীবাসীর। একটি সংকট শেষ হবার আগে আরেকটি সংকটে পতিত হতে হচ্ছে ঢাকাবাসীকে। সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশা নিয়ে আতংকে থাকার পর এবার নতুন আতংকের নাম কিউলেক্স মশা। আশংকার কথা হচ্ছে, ডেঙ্গু মশার প্রবণতা কমলেও বাড়ছে রাজধানীর ‘বারো মাসের যন্ত্রণা’ কিউলেক্স মশা। ডেঙ্গুর পাশাপাশি এখন কিউলেক্স মশা মোকাবেলায় দুই সিটি করপোরেশনের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের।
অ্যানোফিলিস, এডিস ও কিউলেক্স এ তিন ধরনের মশা আমাদের দেশে বেশি দেখা যায়। এদের দেখে চেনা সহজ। অ্যানোফিলিস মশা তার লেজের দিকটি উঁচু করে বসে। এডিস ও কিউলেক্স মশা লেজের দিকটি উঁচু না করে বসার স্থানের সঙ্গে তাদের শরীরকে মোটামুটি সমান্তরাল করে রাখে। এডিস মশার পায়ে বাঘের মতো ডোরাকাটা থাকে। এডিস মশা দিনের বেলাতেও কামড়ায়। প্রতিবছর অনেক মানুষ মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। চলতি বছরে ডেঙ্গু মশায় কামড়ে মারা যান অনেকেই। এখনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে হাজারো মানুষ।
অ্যানোফিলিস মশা পুকুরের বা খেতখামারের পরিষ্কার বদ্ধ পানিতে ডিম পাড়ে। এডিস মশা ডিম পাড়ে গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, ছাদের ওপরে বা বারান্দায় থাকা ফুলের টব, পরিত্যক্ত নারকেলের মালা, ডাবের খোসা ইত্যাদিতে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পরিষ্কার পানিতে। আর কিউলেক্স মশা ডিম পাড়ে বদ্ধ নোংরা পানিতে (যেমন, বদ্ধ ড্রেনের নোংরা পানি)। মশার ডিম থেকে পরিণত মশা হতে এক থেকে দুই সপ্তাহ লাগে। পরিণত মশা মোটামুটি এক সপ্তাহ থেকে এক মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে। কামড় দিয়ে অসুস্থ মানুষের রক্ত চুষে নেওয়ার সময় রক্তে থাকা জীবাণুগুলোও মশার পেটে প্রবেশ করে। তারপর কয়েক দিনের মধ্যেই জীবাণুগুলো সংখ্যায় বেড়ে মশার লালাগ্রন্থিতে প্রবেশ করে। তখন এই মশা অন্য কোনো সুস্থ মানুষকে কামড় দিলে মশার লালায় থাকা জীবাণুগুলো সুস্থ মানুষের রক্তে প্রবেশ করে। মশা নানান রোগের বাহক। কিউলেক্স মশা ছড়ায় ‘ফাইলেরিয়া’ বা ‘গোদরোগ’।
প্রতিরোধের উপায় জানাতে গিয়ে কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ এর কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ডা. মো. শহীদুল্লাহ বলেন, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রথমত মশা মারার ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিধন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যবস্থা নিতে হবে যেন মশার ডিম পাড়ার স্থানগুলোতে মশা ডিম না পাড়তে পারে। যেমন, বদ্ধ পানিতে প্রবাহ আনতে হবে যেন অ্যানোফিলিস ও কিউলেক্স মশা ডিম না পাড়তে পারে। ড্রেন, পুকুর বা অন্য জলাশয়ের নোংরা পানি পরিষ্কার করতে হবে। বাসাবাড়ির ছাদে ও আশপাশে থাকা ফুলের টব, ডাবের খোসা, কোমল পানীয়র ক্যান, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদিতে চার–পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে যেন পানি জমে থাকতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাহলে এডিস মশার ডিম পাড়ার জায়গা থাকবে না। এই পরিচ্ছন্নতা কেবল সরকার বা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে সম্ভব নয়, পাড়ায় পাড়ায় এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া ঘরে স্প্রে, মশার কয়েল ও দরজা জানালায় নেট ব্যবহার করেও মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। ছোট শিশুদের ফুল হাতা জামা বা প্যান্ট পরাতে হবে সন্ধ্যার পর।
ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী এডিস মশার মৌসুম শেষের দিকে। কমছে এডিসের উপদ্রব ও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। তবে বাড়ছে রাজধানীর ‘বারো মাসের যন্ত্রণা’ কিউলেক্স মশা। সরকারি হিসাবে গত ২৬ সেপ্টেম্বরের পর ডেঙ্গুতে কেউ মারা যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান মতে, এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ৮১-তে দাঁড়ায়। তবে ডেঙ্গু সন্দেহে মৃত্যুর রিপোর্ট প্রাপ্তির সংখ্যা ২৩৬। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এখনো প্রায় দেড় হাজার।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ পর্যন্ত সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এমন রোগীর সংখ্যা সর্বমোট ৯০৬৪৫ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪৭৭১৯ জন ও ঢাকার বাইরে ৪২৮২৬ জন। সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন সর্বমোট ৮৮৯৮৭ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪৭০৮২ জন ও ঢাকার বাইরের হাসপাতাল থেকে ৪১৯০৫ জন ছাড়পত্র পান। প্রথম দিকে শুধু ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলেও পরে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তির খবর আসতে থাকে। বর্তমানে ঢাকার বাইরেই আক্রান্ত হয়ে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেশি। যদিও মোট সংখ্যার হিসাবে ঢাকা এখনো এগিয়ে আছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে শুরু থেকেই অমিল ছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক ডা: আয়েশা আক্তারের দেয়া পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু সন্দেহে ২৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রেরিত হয়েছে। তার মধ্যে আইইডিসিআর ১৩৬টি মৃত্যু পর্যালোচনা সমাপ্ত করে ৮১টি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে।
স্বচ্ছ পানিতে জন্ম নেয়া এডিসের কামড়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে কিউলেক্সে মৃত্যুর ভয় নেই বলে জানান চিকিৎসকেরা। তবে যন্ত্রণা ও ছোটখাটো রোগের আশঙ্কা রয়েছে। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণেই কিউলেক্স মশায় ঢাকাতে ছোটখাটো রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে এডিস মশার মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে চলতি বছর এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বৃৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি দেশের প্রায় সব জেলায় একই সময়ে এই মশার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত দুই মাসেরও বেশি সময় গলদগর্ম হওয়ার পর এখন আগের মতোই প্রায়ই নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চলছে বলে দাবি সিটি করপোরেশনের। বাড়ি বাড়ি ডেঙ্গু শনাক্তের কার্যক্রমও এখন বন্ধ রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, উত্তরে আমরা ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকাগুলোর সব বাড়িতে ডেঙ্গুর লার্ভা শনাক্তের জন্য অভিযান পরিচালনা করেছি। এ সময় ৮০ লাখ টাকার মতো জরিমানাও করা হয়েছে। অনেক বাড়িতে দ্বিতীয় দফায়ও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এখন বাড়িতে লার্ভার অনুসন্ধানকাজ বন্ধ আছে।
এডিস নিয়ে উদ্বেগ কমলেও আবারো কিউলেক্সের মৌসুম আসন্ন। যদিও সারা বছরই এই মশার উপদ্রব থাকে। জলাশয়, ড্রেন, ডোবানালায় কিউলেক্স মশার জন্ম হয়। এ জন্য পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ড্রেন, ডোবানালা পরিষ্কার রাখার এবং লার্ভা ধ্বংস ও উড়ন্ত মশা মারার জন্য ওষুধ ছিটিয়ে থাকে সিটি করপোরেশন। রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায়ই সারা বছর মশার উপদ্রব থাকে। অনেক এলাকায় অফিস, বাসাবাড়িতে দিনের বেলায় মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী। ঘুমানোর সময় মশারি টাঙানোর পাশাপাশি দিন-রাতে কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার, ধূপ জ্বালিয়ে মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায় নগরবাসীকে।
এ ব্যাপারে উত্তর সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: হামিদুল হক বলেন, ডেঙ্গুর মৌসুম প্রায় শেষ। কিউলেক্স সারা বছরই থাকে। তবে শীতকালে কিউলেক্স মশা বেশি বৃদ্ধি পায়। এই মশা নিধনে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এডিসের কামড়ে প্রাণহানির আশঙ্কার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক লক্ষ্য করা যায়; কিন্তু কিউলেক্স তেমন জীবাণুবাহী কোনো মশা নয়। এই মশা কামড়ে মানুষকে ডিস্টার্ব করে এ পর্যন্তই। তবে নগরবাসীকে মশার যন্ত্রণা থেকে রক্ষার জন্য সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতা, এডাল্টিসাইডিং ও লার্ভিসাইডিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই সিটি করপোরেশনকে মশক নিধনের জন্য যে অতিরিক্ত জনবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া হয়েছে তারা এক বছর এখানে থাকবেন। ফলে মশক নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম আগের চেয়েও আরো জোরালো ও অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর দাবি করে এলেও রাজধানীর অনেক এলাকার স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, মশা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পরই কোনো কোনো এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাতে দেখা যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ