ঢাকা, রোববার 13 October 2019, ২৮ আশ্বিন ১৪২৬, ১৩ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

কুরআন নাযিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী অবস্থা

এমদাদুল হক চৌধুরী : কুরআন নাযিলের পুর্বে পুরো বিশ্ব ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। অন্ধকার এতটাই ঘনিভূত ছিল যে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলেও আলোর নিভু নিভু শিখাও দেখা যাচ্ছিল না। কুরআন নাযিলের পুর্বে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে সভ্যতা-সংস্কৃতি, নীতি-নৈতিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান। বিশ্ববাসী তখন একটি ঐশি গাইড লাইনের জন্য তীব্রভাবে অনুভব করছিল। তখন আল্লাহ তা’আলা মেহেরবানী করে প্রেরণ করলেন একজন রসূল সাথে দিলেন মানবজাতির পথ নির্দেশিকা গাইড লাইন। কুরআন নাযিলের পূর্বে বিশ্ববাসীর অবস্থা কেমন ছিল, সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা যাক।
কুরআন নাজিলের পূর্বে আরব বিশ্বের অবস্থা : কুরআন নাজিলের পূর্বে আরব বিশ্বে মূর্তি পূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। প্রায় সব মানুষই আল্লাহর অস্তিত্ব ও পরকালকে বিশ্বাস করতো না। মানুষ অগ্নি, বিভিন্ন দেব-দেবী ও নক্ষত্রের পূজা করতো। এই নক্ষত্র পূজারীর মধ্যে চাঁদের পূজারীর সংখ্যাই ছিল বেশি। চাঁদকে তারা সর্বাধিক জনপ্রিয় উপাস্য মনে করতো। এমনকি আল্লাহর ঘর কা’বা গৃহে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল।
আরবে তখন কাহিন বা গণৎকারদের সংখ্যাও ছিল প্রচুর। তারা অদৃশ্য জগতের সংবাদ জানত বলে দাবী করতো এবং তারা মানুষের ভবিষ্যত বলে দিতে পারতো। অতি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে কথায় কথায় যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু হতো। এই যুদ্ধ শুরু হলে তা শত শত বছর ধরে চলতো। বংশপরম্পরায় এ যুদ্ধ তারা চালিয়ে যেতো।
আরব জাহিলিয়াতের একটা রেওয়াজ ছিল যে, তারা প্রতিপক্ষকে বন্দী করেই ক্ষান্ত হতো না, তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে তারা হত্যা করতো। যাকে মুক্তি দিতে চাইতো, প্রথমে তার মাথার চুল মুন্ডন করে দিতো এবং দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানাতো। অসি চালনা, তীরন্দাজী ও বল্লম নিক্ষেপকারীদের সমাজে খুবই সম্মান ছিল। যুদ্ধপ্রিয় আরব বিশ্ব যুদ্ধ-বিগ্রহে অত্যন্ত উৎসাহ বোধ করতো।
জাহিলিয়াত যুগে মহিলাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না। পিতার সম্পত্তিতে তাদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। আরব সমাজের ঐ ব্যক্তিকে অপদার্থ ও অভদ্র বলে বিবেচনা করা হতো যার সাথে কোনো নারীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আরবের কোনো কোনো কবিলা তো প্রেমলীলার জন্য বিখ্যাত ছিলো। উদাহরণস্বরূপ আযরা গোত্রের কথা বলা যেতে পারে। তাদের প্রেমলীলা এতটাই মশহুর ছিল যে, আরবে এটি প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয় যে, অমুকের প্রেমলীলা বনী উযরাকেও মাত করে দিয়েছে। এক বেদুঈনকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সে জবাবে বলেছিলো, আমি এমন এক গোত্রের লোক যারা প্রেম করলে অনিবার্যভাবে সে প্রেমের জন্যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। জনৈক কিশোরী তা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করলো, কা’বার প্রভুর কসম, তুমি অবশ্যই আযরা গোত্রের লোক হবে।
নানা ধরণের কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিল আরব বিশ্ব। তারা জ্বিন, পরী, দৈত্য-দানবে বিশ্বাস করতো। পরীরা পুরুষের সাথে এবং জ্বিন নারীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতো বলে বিশ্বাস করতো। কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তারা তার কবরে তার উষ্ট্রীকে চোখ বন্ধ করে বেঁধে রাখতো এবং উষ্ট্রীটির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই তাকে বেঁধে রাখতো। অথবা ঐ উষ্ট্রীর মাথা পিছনের দিকে টেনে তার বুকের সাথে বেঁধে দিত এবং এভাবেই উষ্ট্রীর মৃত্যু হতো। তাদের ধারণা ছিল যে, পরকালে যখন ঐ ব্যক্তি কবর থেকে উঠবে, তখন সে এ উষ্ট্রীটিতে আরোহণ করেই উঠবে। তাদের আরো ধারণা ছিল, যখন কোনো জনপদে মহামারি দেখা দেয়, তখন সে জনপদের কোনো এক ব্যক্তি জনপথের প্রবেশ পথে দাড়িয়ে গাধার ন্যায় চিৎকার করলে অন্য জনপদগুলো ঐ মহামারি থেকে রক্ষা পাবে। আরবরা রক্তের বদলা নিতো বংশ পরম্পরায়। কারণ তারা বিশ্বাস করতো, নিহত ব্যক্তির মৃত্যুর বদলা না নিলে তার মাথার খুলি থেকে একটি পাখি বের হয়ে অস্থিরভাবে চীৎকার করে বলতো, আমাকে পানি পান করাও, আমাকে পানি পান করাও। যতক্ষণ পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির রক্তের প্রতিশোধ না নেয়া হতো ততক্ষণ পর্যন্ত এ পাখির চীৎকার থামতো না। কল্পিত এ পাখির নাম দিয়েছিল তারা ‘হামা’। এমনি নানা ধরণের কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল আরব বিশ্বসহ বিশ্ব সম্প্রদায়।
বনু তামীম ও কুরায়েশদের মধ্যে কন্যা সন্তান হত্যার মাত্রা ছিল সর্বাধিক। এ কাজে তারা গর্ববোধ করতো। কন্যা সন্তান হত্যাকে তারা সম্মানের প্রতীক বলে বিশ্বাস করতো। ইতিহাস থেকে জানা যায়, কোনো কোনো পরিবারের পাষ-তা এতদূর পর্যন্ত গিয়েছিল যে, কন্যা সন্তানের বয়স পাঁচ-ছয় বছর হলে, যখন সে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতো শুরু করতো, তখন তাকে সুন্দর বেশভূষায় সজ্জিত করে পিতা তাকে লোকালয়ের বাইরে নিয়ে যেয়ে গর্ত খুড়ে ধাক্কা দিয়ে গর্তের মধ্যে ফেলে কন্যা সন্তানকে মাটি চাপা দিয়ে জীবন্ত হত্যা করতো। এ নিষ্ঠুর ও নির্দয় কাজ করতে তার হৃদয়ে এতটুকু দয়ার উদ্রেক হতো না। বরং সে নির্বিকার চিত্তে বাড়ি ফিরে আসতো। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত দেইয়া ক্বালবী (রা.)-এর কন্যা সন্তান হত্যার হৃদয়বিদারক ঘটনা আমরা কমবেশি প্রায় সবাই জানি। কন্যা সন্তান হত্যার এ অমানুষিক বর্বরতা থেকে কোনো আরব কবীলাই মুক্ত ছিল না। কোনো কবীলায় এটা বেশি হতো, আবার কোনো কবীলায় এটা কম হতো।
সমসাময়িক বিশ্বের অবস্থা : কুরআন নাযিলের পূর্বে সমসাময়িক বিশ্ববাসীর নৈতিক মান কোনো পর্যায়ে ছিল সেটাই জেনে নেয়া যাক সংক্ষিপ্তভাবে।
ইরান : প্রাচীন সভ্যতার আরেক লীলাভূমি ছিল ইরান। প্রাচীনকাল থেকে এখানে ‘মাহ আবাদী’ ধর্ম প্রচলিত ছিল। ‘মাহ আবাদী’ ধর্মের নতুন সংস্কার ‘জরথ্রুস্ট্র’ বা ‘অগ্নি উপাসনা’। এটাই ছিল তৎকালীন ইরানি জনগণের রাজধর্ম। মঙ্গল ও অমঙ্গলের দেবতারূপে তারা ইযদান ও আহরমন নামে দুই দেবতার পূজা করতো। রাষ্ট্রের সকল জনগণ জোরে সোরে আগুনের পূজা করতো। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের পূজাও ছিল ব্যাপকভাবে। চুরি-রাহাজানি, ডাকাতি তো ছিল নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার। ব্যাভিচার এমন চরমে পৌঁছেছিল যে,  উজিরে আজম প্রকাশ্য রাজদরবারে ইরান সম্রাটকে তার রাজ মহিষীর সাথে সঙ্গম করার প্রস্তাব দেয়, অথচ ইরান অধিপতি এ নির্লজ্জ প্রস্তাবের কোনো বিরুদ্ধাচারণের প্রয়োজনীয়তাবোধ করলেন না। পারস্পরিক অনৈক্য, হিংস্রতা, হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতারণা চরম আকার ধারণ করে। সবলরা দুর্বলদেরকে পশুর চেয়েও অধম জ্ঞান করে। যে ইরান ছিল এক সময় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার লীলাভূমি, ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। সে সময় সাধারণ জনগণ যে শুধু অগ্নি ও নক্ষত্র পূজা করতো তাই নয়, বরং তারা সম্রাট ও তার মন্ত্রীবর্গ, সিপাহসালার এবং আমীর-ওমরাদেরও পূজা করতো।
রোম ও গ্রীক সাম্রাজ্য : প্রাক ইসলামী যুগে পৃথিবীর সর্বাধিক শক্তিধর রাষ্ট্র ছিল রোমান সাম্রাজ্য। চিকিৎসা বিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, তর্ক শাস্ত্র ইউনানী চিকিৎসা থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সকল শাখায় রোমানদের মোকাবেলা করার মত কোনো সভ্যতা তখনও জন্ম নেয়নি। এটা সেই সাম্রাজ্য, যে সাম্রাজ্যে জন্মেছিল সক্রেটিসের মত বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক, প্লেটো ও এরিস্টটলের মত সর্ববিদ্যায় পন্ডিত। আলেকজান্ডারের মত দ্বিগীজয়ী বীর।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে সভ্যাতার এ লীলাভূমির দেশেও সাধারণ মানুষের মর্যাদা ছিল চতুষ্পদ জন্তুর নিচে। মানুষকে এখানে বিক্রি করা হতো গরু, ছাগল, উট, ঘোড়া প্রভৃতি জন্তুর ন্যায় হাটে-বাজারে।
অধঃপতিত খৃস্টান ও ইহুদী ধর্মের অবস্থা : হযরত ঈসা আ.) ও তাঁর পরবর্তী প্রায় দু’শ পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত রাহীব বা সন্ন্যাসীদের কোনো নামগন্ধ ছিল না। মোটামুটি প্রায় সাড়ে চার’শ বছর পর সিরিয়া, গ্রীস ও রোমে রাহীব বা সন্ন্যাসীদের আধিক্য দেখা দিতে শুরু করলো। কেননা, তখন রাহীব বা সন্ন্যাসীরা ব্যাপক ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী ছিল। এই ক্ষমতা ও মর্যাদা লাভের জন্য খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশ ব্যাপকহারে এই সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করতে থাকে। এরফলে রাহীব পুরুষ ও রাহীম রমণীদের বাসস্থান হয় গীর্জাসমূহে। ধীরে ধীরে এ গীর্জসমূহ লজ্জাজনক কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে থাকে। নারীদের প্রাপ্ত অধিকার হারাতে থাকে ও পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ওঠে যায়। পরিবার ব্যবস্থা শিথিল হতে থাকে। চুরি, প্রতারণা ও ব্যাভিচার এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে যে, এগুলোকে কেউ আর তেমন দূষণীয় মনে করে না। সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী ও ধর্মীয় নেতারা সম্রাট, আমীর-ওমরা ও জনসাধারণের মুক্তির গ্যারান্টি বা সার্টিফিকেট দিতে থাকে। জনসাধারণও তাদের সেবক বা গোলামে পরিণত হয়।
আল্লাহর নব-রসূলদের হত্যাকারী ও তাদের রক্তে রঞ্জিত এই ইহুদীদের অবস্থা আরো মারাত্মক। তারা পুরো সমাজ কাঠামোকে ধ্বংস করার জন্য এক গোত্রকে আরেক গোত্রের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিতো। অস্ত্র বিক্রি ও সুদে টাকা খাটানো ছিল তাদের মূল পেশা। বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা ছিল তাদের মজ্জাগত স্বভাব। হেন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করতো না। তাদের মিথ্যাচার, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আল্লাহর রসূল (স.)ও এতটাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে, তাদের হত্যার নির্দেশ পর্যন্ত দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মিসর, ভারতবর্ষ ও চীনের অবস্থাও এর চেয়ে উন্নত ছিল না। অজ্ঞতা ও অন্ধকার বিশ্বব্যাপী এমনিভাবে ছেয়ে গিয়েছিলো যে, কোথাও নিভু নিভু আলোর রেখাও দেখা যাচ্ছিল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব আর্তনাদ কন্ঠে একজন ‘হাদী’র আবেদন জানাচ্ছিল বারবার। বিশ্ব তখন একজন পথপ্রদর্শকের প্রয়োজনীয়তা অনুভাব করছিল তীব্রভাবে।
ঠিক এমনি সময় মানবজাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে এ পৃথিবীতে আগমন ঘটে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের।
সমাজের এ বিভীষিকাময় অবস্থা দেখে কিশোর মুহম্মদের অন্তর কেঁদে উঠলো। সমাজের এ চরম দুরবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনিও চিন্তা-ফিকির করতে লাগলেন। অবশেষে বনু হাশিম, বনু আবদুল মুত্তালিব, বনু আসাদ, বহু জুহরা ও বনু তামীমের সম্ভ্রান্ত লোকদের নিয়ে গঠন করলেন ‘হিলফুল ফুযুল’। যার শ্লোগান ছিল “আমরা সর্বদাই জালিমদেরকে প্রতিরোধ করবো এবং মজলুমদের সাহায্য করবো।”
এ সংগঠনের প্রতিটি সদস্যই নিম্নোক্ত মর্মে অঙ্গীকার করে-
১. আমরা দেশের অরাজকতা ও অশান্তি দূর করবো
২. আমরা পথিকদের জানমালের হিফাযত করবো
৩. আমরা নিঃস্ব দরিদ্রদেরকে সাহায্য করবো।
সবলদেরকে দুর্বলদের প্রতি অত্যাচার অবিচার করা থেকে বিরত রাখবো।
এ সংগঠন দ্বারা জনগন উপকৃত হলেও, পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। কারণ তা ছিল মানব রচিত।
মজলুম মানবতাকে মুক্তি দিতে চল্লিশ বছর বয়সে মুহম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর উপর অবতীর্ণ হল আল্লাহর ওহী ‘আল কুরআন’। আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘পথ প্রদর্শক’ তথা ‘রসূল’ হিসেবে নির্বাচিত হলেন। এবার আমরা দেখি কুরআনের আলোয় সমাজ তথা বিশ্ব পরিস্থিতি কিভাবে পাল্টিয়ে গেল। প্রথমে আলোচনা করি কুরআনের সম্মোহনী ক্ষমতার উপর।
কুরআনের সম্মোহনী ক্ষমতা : কুরআন আরববাসীদের সম্মোহনী ক্ষমতায় বিমোহিত করেছিলো। তাদের মন ও চিন্তার জগতে যে বিশাল পর্দা পড়েছিল, তাও কুরআনের সম্মোহনী ক্ষমতার প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলো। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যারাই ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার বেশিরভাগই কুরআনের গভীর প্রভাবে এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলো যে, জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো।
কুরআন হযরত ওমর রা.-এর কঠিন হৃদয়কেও গলিয়ে দিলো : হযরত ওমর রা. ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে আতা ও মুজাহিদ থেকে জানা যায়, ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ বিন আবু নাজীহ সংকলনে বলেছেন, উমর রা. বলেন :
“আমি সেদিনও ইসলাম থেকে দূরে অবস্থান করছিলাম, শরাব পানে মত্ত থাকতাম। আমাদের এক মিলনায়তন ছিল, যেখানে কুরাইশরা এসে জমায়েত হতো। সেদিন আমি তাদের সন্ধানে গেলাম কিন্তু কাউকে সেখানে পেলাম না। চিন্তা করলাম অমুক শরাব বিক্রেতার নিকট যাব, হয়তো সেখানে তাদেরকে পেয়েও যেতে পারি। কিন্তু, সেখানেও তাদের কাউকে আমি পেলাম না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, মসজিদে হারামে গিয়ে তাওয়াফ করিগে। সেখানে গেলাম। দেখলাম, মুহম্মদ (স.) নামাযে মশগুল। তিনি শামের (সিরিয়া) দিকে মুখ করে নামাযে দাঁড়িয়েছেন। কা’বা তাঁর ও শামের মাঝে অবস্থিত। তিনি রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমেনীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন। তাঁকে দেখে ভাবলাম, আজ রাতে আমি চুপি চুপি শুনবো, তিনি কী পড়েন্ আবার মনে হলো, যদি শোনার জন্য কাছে চলে যাই তবে তো আমি ধরা পড়ে যাব। তাই হাতিমের দিক থেকে এসে খানায় কা’বার গেলাফের নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার ও তাঁর মাঝে একমাত্র কা’বার গেলাফ ছাড়া অন্য কোনো আড়াল ছিল না। যখন আমি নবী করীম (স.) এর তিলাওয়াত শুনলাম তখন আমার মধ্যে এক ধরনের ভাবান্তর সৃষ্টি হলো। আমি কাঁদতে লাগলাম। আর পরিণতিতে আমার ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য হলো।
সিরাতে ইবনে হিশামে বর্ণিত আছে, হযরত ওমর রা. মুহাম্মদ (স.)কে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। পথিমধ্যে নঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে দেখা। সে জিজ্ঞেস করলো, ওমর! কোথায় যাচ্ছ? ওমর তাঁর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলো। নঈম বললো, আগে নিজের বোন আর ভগ্নিপতিকে সামলাও। তারা মুসলমান হয়ে গেছে। এ কথা শুনে হযরত ওমর রা. হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে চলে গেলেন বোনের বাড়িতে। সেখানে তারা কুরআন পড়ছে। হযরত ওমর রা. এ দৃশ্য দেখে  রাগে অগ্নিশর্মা আঘাতে আঘাতে বোনকে রক্তাক্ত করলেন। কিছুক্ষণ বাক-বিত-ার পর ওমর রা. বললেন, দেখি তোমরা কি পড়ছিলে। যখন ওমর রা. সূরা ত্ব-হার কিছু অংশ শুনলেন, তখন কুরআনের ভাষার গভীরতা ও সম্মোহনী ক্ষমতায় এতটাই প্রভাবিত হলেন যে, তিনি তৎক্ষণাৎ ছুটে গেলেন মুহাম্মদ (স.)-এর কাছে, এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।
এখানেও লক্ষণীয় বিষয়, হযরত ওমর (রা.) কিন্তু মুহাম্মদ (স.)-এর বিশাল ব্যক্তিত্ব, সত্যবাদীতা বা আমানতদারীতায় বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হননি, বরং তিনি মুহাম্মদ (স.)কে হত্যা করার জন্য নগ্ন তরবারী হাতে নিয়ে ছুটে গেছেন। শুধুমাত্র কুরআনই তাঁকে ইসলামের ছায়াতলে আসতে বাধ্য করেছে।
“কুরআন ভাষার দিক থেকে কোনো কবির রচনা নয়, ভাবের দিক থেকে কোনো যাদুমন্ত্র নয়” : মক্কার অন্যতম ধনী ও কুরাইশ সর্দার ওতবা গেলেন মুহাম্মদ (স.) কাছে, বিপ্লবী দাওয়াত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য। তখন রসূল (স.) কা’বা গৃহে একাকী বসা ছিলেন। ওৎবা অত্যন্ত নরম সূরে বলল, বাবা, তুমি আমাদের পর কেউ নও, নতুন ধর্ম প্রচার করে কেন খামাখা আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছো। যদি চাও আরবের নেতৃত্ব, আমরা তোমাকে নেতা হিসেবে বরণ করে নেব, যদি ধন-সম্পদ, তাও তোমার পদতলে হাজির করবো, যদি চাও সুন্দরী রমণী, তাহলে আরবের সেরা সুন্দরী এনে দিতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করবো না। তবুও, তুমি ঐ অভিনব ধর্ম থেকে ফিরে আস।
ওতবার এ লম্বা বক্তব্য শুনে রসূল (স.) সূরা হা-মীম আস্ সাজদা থেকে কিছু আয়াত পাঠ করে শুনালেন। ওতবাও তা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতে লাগলেন। কুরআনের সুললিত কণ্ঠ ও ছন্দ ওতবাকে এতটাই অভিভূত করলো যে, কুরাইশদের মাঝে ফিরে গিয়ে বললেন, “আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদের কাছে যা শুনলাম তা আগে কখনো শুনিনি। আল্লাহর শপথ, ভাষার দিক থেকে তা কোনো কবির রচনা নয়, ভাবের দিক থেকে তা কোনো যাদু মন্ত্র নয়।” হে কুরাইশ সম্প্রদায়, আমার কথা শোন, মুহাম্মদ যা করতে চায়, তা তাকে করতে দাও। খামোখা আর গ-গোল করো না।”
কুরআন ওয়ালীদ বিন মুগীরার চিন্তাশক্তিকেও ছিন্ন ভিন্ন করে দিলো : আরবের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি, অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সম্মানীত ব্যক্তি ওয়ালীদ বিন মুগীরা কুরআনুল করীমের কিছু অংশ শুনে তার চিন্তা-চেতনায় এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিলো যে, কুরাইশরা বলাবলি করতে শুরু করলো, মুগীরা মুসলমান হয়ে গেছে। আবু জেহেলকে মুগীরার কাছে পাঠানো হলো। যেন সে কুরআনের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের ঘোষণা দেয়। মুগীরা বলল, “আমি কুরআন সম্পর্কে কী বলবো? আল্লাহর কসম! আমি কবিতা ও কাব্যে তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখি কিন্তু মুহাম্মদের কাছে যে কুরআন আমি শুনেছি তার সাথে এগুলোর কোনো মিল নেই। আল্লাহর শপথ! তার কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর এবং তা প্রাঞ্জল। যা তার সামনে আসে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। ওটি বিজয়ী হওয়ার জন্য এসেছে পরাজিত হতে আসেনি।”
একথা শুনে আবু জাহেল বললো : ‘যতোক্ষণ তুমি কুরআনকে অবজ্ঞা না করবে ততোক্ষণ তোমার কওম তোমার ওপর নারাজ থাকবে।’ ওয়ালীদ বললো : ‘আমাকে একটু চিন্তা করার অবকাশ দাও।’ তারপর সে ঘোষণা দিলো ঃ “এতো সুস্পষ্ট যাদু, তোমরা দেখো না, যে এর সংস্পর্শে যায় তাকেই তার পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।” (সীরাতে ইবনে হিশাম)
কুরআন সম্রাট নাজ্জাসীকেও ভীষণভাবে কাঁদিয়েছিলো : যখন কুরাইশরা রসূল (স.) ও তাঁর অনুসারীদের উপর নির্যাতনের চরম মাত্রা অতিক্রম করছিলো, তখন রসূল (স.) তাঁর সাথীদের হাবশায় (বর্তমানে ইথিওপিয়া) হিজরতের পরামর্শ দেন। পরামর্শ মোতাবেক ৮৩ জন পুরুষ ও ১১ জন মহিলা হাবশায় হিজরত করেন। এতে মক্কার কাফিররা খুবই বিচলিত হয়ে পড়ে। তারা রসূল (স.)-এর সাথীদের ফিরিয়ে আনার জন্য বহু মূল্যবান উপঢৌকনসহ মক্কার দুই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে রবীআকে দূতরূপে আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর দরবারে প্রেরণ করেন।
হযরত উম্মে সালমা (রা.) বর্ণনা করেন, “জাফর ইবনে আবু তালিব যখন কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন, তখন কুরআন সম্রাটের হৃদয়ে এমনই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিলো যে, বাদশা নাজ্জাশী অঝোরে কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতে তার দাড়ি ভিজে যায়। পবিত্র ইঞ্জিল খুলে বসা উপস্থিত ধর্মীয় পুরোহিতরাও কাঁদতে থাকে এবং পুরোহিতদের অশ্রুতে ইঞ্জিলের পাতা ভিজে যায়।
অতপর জাফর তিলাওয়াত শেষ করলে সম্রাট কুরআনের সত্যতার সাক্ষ্য দেন। তিনি বলে উঠেন : ‘ঈসার কাছে যে উৎস থেকে বাণী এসেছিলো, এ বাণীও ঠিক একই উৎস থেকে উৎসারিত।’
বর্বর ও যাযাবর আরবদের পরিবর্তনের নেপথ্যে : শুধুমাত্র এ কুরআনের কারণেই অসভ্য, বর্বর ও যাযাবর আরবরা সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়েছিলো। তারা ছিল বিশ্ববাসীর জন্য সকল আদর্শের নমুনা। এ কুরআনের কারণেই ২২ লক্ষ বর্গমাইলের শাসক হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) চিন্তিত ছিলেন, যদি ফোরাতের কুলে একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায় তাহলে এই ওমর আখিরাতের আদালতে তার মালিকের কাছে কি জবাব দিবে। অর্ধ বিশ্বের শাসক ওমর উত্তপ্ত বালুকাময় মরুভূমিতে ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়িয়ে রশি ধরে টেনে চলেছেন, জেরুজালেমের পথে। জুম’আর খুতবায় একজন সাধারণ মুসল্লি প্রশ্ন করলো ‘হে ওমর খুৎবার আগে জানতে আপনার পরিধেয় বস্ত্র এতো লম্বা হলো কি করে?’ শাসককে মুখের উপর জবাব তলব করার এমন দৃষ্টান্ত কি পূর্বে বা পরে ঘটেছিলো? শুধু কি ওমর, হযরত আলী রা. তখন মুসলিম বিশ্বের খলিফা। তাঁর বর্ম হারিয়ে গেছে। চুরি করেছে এক ইহুদী। হযরত আলী (রা.) বর্মটি নিজের বলে দাবী করলে, বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। কাজী হযরত আলী (রা.) দাবীর পক্ষে সাক্ষী হিসেবে পেশ করেন নিজ পুত্র হযরত হাসান (রা.) ও ভৃত্যকে। কিন্তু কাজী এ সাক্ষ্য গ্রহণ না করে ইহুদীর পক্ষে রায় দিলেন। শুধু কুরআনের কারণেই এ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। যতদিন কুরআন বিজয়ী ছিল ততদিন ইনসাফ ও মানবতা প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইতিহাস থেকে আমরা এও জানি মধ্যযুগের সুলতান নাসিরউদ্দিন টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতো। বাদশা আলমগীরও টুপি সেলাই ও কুরআনুল করীম নকল করে তা বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। শুধু কুরআনের কারণেই মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারতবর্ষ জয় করেন। তারিখ জয় করেন ইউরোপ। কুতায়বা জয় করেন এশিয়া মাইনর। এমনি ভাবে কুরআন দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সর্বত্র। জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা-প্রশাখা নেই যেখানে মুসলমানদের অবদান নেই। কুরআন বিশ্বকে উপহার দিয়েছে চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক বু আলী সিনা বা ইবনে সিনা, আবু বকর মুহাম্মদ আল রাজী কুরআন উপহার দিয়েছে, এ্যালজেবরা শাস্ত্রের জনক জাবের ইবনুল হাইয়ান, কুরআন উপহার দিয়েছে, ইতিহাস  শাস্ত্রের জনক ইবনে খালদুন, ইবনে জরীর, তাবারী প্রমুখ।
কুরআনের কারণেই হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.) হযরত ওসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত উমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.), খলিফা হারুন অর রশিদ, খলিফা আল মামুন, গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, ভারতবর্ষে সুলতান নাসিরউদ্দিন, বাদশা আলমগীর-এর মত আরো অনেক বিশ্ববিখ্যাত শাসক ও ন্যায় বিচারক বিশ্ববাসীকে উপহার দিতে পেরেছে।
আব্বাসীয় যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের তো ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন বাগদাদে তৈরি করেন ‘বায়তুল হিকমাহ’। সব ধর্মের জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিদের মিলনভূমি ছিল এই বায়তুল হিকমাহ। এই জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহামূল্যবান গ্রন্থসমূহ আরবী ভাষায় অনুবাদ করে। ঐতিহাসিক হিট্টী বলেন, ‘অনুবাদ গ্রন্থের ওজনের সমান স্বর্ণমূদ্রা তাঁদেরকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া হতো।’ সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটল, ইউক্লিড, ইতিহাসের জনক হিরোডোটাসের ন্যায় বিশ্ববিখ্যাত পন্ডিতবর্গকে মুসলমানরাই বিশ্ববাসীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, তাঁদের গ্রন্থসমূহ অনুবাদ করার মধ্য দিয়ে। সময়টা ছিল আব্বাসীয় খলিফাদের শাসনামলে, খলিফা আল মামুনের শাসনামল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কুরআন মানুষকে নিরঙ্কুশ আনুগত্য করায় : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  ১৯২০ সালে মদ নিবারক আইন পাশ করা হয়। জাতিকে মদের অপকারিতা বোঝার জন্য ‘এ্যান্টি সেলুন লীগ’ নামক একটি সংস্থা কয়েক বছর ধরে পত্র-পত্রিকা, বক্তৃতা, বিবৃতি, প্রচারপত্র, নকশা-চিত্র, ছায়াছবি ইত্যাদি মাধ্যমে বন্যার পানির মত অর্থ ব্যয় করেছে। পরিসংখ্যানে জানা যায় প্রায় ১৯২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কোটি পাউ- ব্যয় করা হয়।  ১৯২০ সাল থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত যে সংখ্যাতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়, তা থেকে আরো জানা যায় এই আইন কার্যকর করতে প্রায় দু’শ ব্যক্তি নিহত হয়, ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার ৩৩৫ জনকে কারারুদ্ধ করা হয়। ১ কোটি ৬০ লক্ষ পাউন্ড জরিমানা ধার্য করা হয়। ৪০ কোটি ৪০ লক্ষ পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই আইন পাশ হওয়ার পর সমাজে মদ্যপান ও দুষ্কৃতিকারীর পরিমাণ বিপুল হারে বেড়ে যায়। কারণ এই আইন পাশ হওয়ার ফলে গোপনে অসংখ্য মদের কারখানা তৈরি হয়। এই সমস্ত গোপন কারখানা স্থাপনের ফলে কিশোর ও যুবকরাও নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অপরদিকে-
কুরআনে মদ নিষিদ্ধের আয়াত নাযিল হওয়ার ফলে মক্কাবাসীদের কি অবস্থা হয়েছিলো
“হে ইমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, পাশাখেলা ইত্যাদি হচ্ছে শয়তানের উদ্ভাবিত নোংরা কাজ; সুতরাং ওগুলো তোমরা বর্জন করো। আশা করা যায়, এই বর্জনের ফলে তোমরা কল্যাণ লাভে সমর্থ হবে। শয়তান তো মদ ও জুয়ার সাহায্যে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বৈরিতা জাগিয়ে তুলতে এবং তোমাদেরকে খোদার স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়। এটা জানার পরও কি তোমরা ওগুলো থেকে বিরত থাকবে না? আল্লাহর আনুগত্য করো, রসূলের কথা শোনো এবং বিরত থাকো। কিন্তু যদি তোমরা অবাধ্যতা করো, তবে জেনে রাখো, আমার রসূলের কাজ হচ্ছে শুধু নির্দেশকে স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। (সূরা মায়েদা, ৯০-৯১)
এই নির্দেশ আসার সাথে সাথে সুরা রসিক ও মদ্য প্রেমিকগণ যারা মদের নামে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলোÑতারা এর প্রতি এতোটাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লো যে, মদ্য নিবারণ আয়াত শোনার সাথে সাথে সূরা পাত্রগুলোকে ভেঙে ফেলা হলো। মদীনার অলিগলিতে মদের বন্যা প্রবাহ বয়ে গেলো। এক মজলিশে বসে দশ/এগার জন সাহাবী সূরা পান করে নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন। এরই মধ্যে রসূল (স.)-এর ঘোষণাকারীর এই ঘোষণা শোনার সাথে সাথেই আল্লাহর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শন করে মদ গ্রহণ চিরতরের জন্য বন্ধ করে দিল এবং মদের পাত্রগুলো ভেঙে চুরমার করে দিলো। এক ব্যক্তি কোথাও বসে মদ পানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সে মুখে পেয়ালা তুলে ধরেছে এমন সময় কেউ এসে মদ নিবারক আয়াতটি পড়ে শোনাল। অমনি মুখ থেকে পেয়ালা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো।
কুরআন শুধু এতটুকু বলে দিয়েছে, ‘আল্লাহ, তোমাদের জন্য মদকে হারাম ঘোষণা করে দিয়েছে।” আর সাথে সাথেই গোটা জাতি, (যে জাতি মদের প্রেমে আমেরিকানদের চাইতেও বেশি অগ্রগামী ছিল) মদের প্রতি চরমভাবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লো। জাতিকে মদের অপকারীতা বোঝার জন্য কোনো প্রপাগান্ডা চালানো হয়নি, জেল, জরিমানার স্বীকার হতে হয়নি, কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হয়নি, মদের কারখানা বন্ধ করার জন্য কোনো আইন জারি করতে হয়নি,  করতে হয়নি কেটি কোটি অর্থ ব্যয়। এখানেই কুরআনের মাহত্য। এ জন্যই কুরআন বিশ্ব মানবতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। এ নিয়ামতকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় এ অশান্ত বিশ্বের বুকে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে পারে।
কুরআন তাঁর নিজের মর্যাদা, গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা এভাবে দিয়েছেন : “...যদি এ কুরআনকে পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করে দিতাম, তাহলে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে ধসে দীর্ণ-বিদীর্ণ হয়ে পড়তো। এ দৃষ্টান্তগুলো লোকদের সামনে এ জন্য উপস্থাপন করছি যে, তাহারা (নিজেদের সম্পর্কে) চিন্তা-ভাবনা করতে পারে”। সুরা হাশর, আয়াত-২১
কুরআন তার সুললিত ভাষা-ছন্দ, কাব্যিক রূপ, সাহিত্যমান ও এর গভীরতা, মানুষের চিন্তা-চেতনায় দারুণ প্রভাব বিস্তারের উপর চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন : “আর যা আমি আমার বান্দার উপর অবতীর্ণ করেছি সে ব্যাপারে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে অনুরূপ একটি সূরা তৈরি করে আন এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সহযোগীদের ডেকে আন যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।” সূরা বাকারা, আয়াত # ২৩
লেখক : ইতিহাস চিন্তক ও গ্রন্থকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ