ঢাকা, মঙ্গলবার 15 October 2019, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

১৪ বছরে দেশে আসলো প্রায় ৪০ হাজার লাশ

ইবরাহীম খলিল : ২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল এই ১৪ বছরে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া প্রায় ৪০ হাজার মানুষ লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন। ২০১৮ সাল ছিল সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর বছর। আর এবছর আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ৬১১ জনের লাশ এসেছে বাংলাদেশে। সব মিলিয়ে আগস্ট মাস পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৭৪৯ জনের লাশ আসার খবর পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সাল ছিল সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর বছর। ২০১৭ সালে ৩ হাজার ৩৮৭ অভিবাসী কর্মীর লাশ এসেছিল। ২০১৬ সালে এসেছিল ৩ হাজার ৪৮১ জনের লাশ। ২০১৫ সালে ২ হাজার ৮৩১ জন। আর ২০০৫ সালে সেখানে এসেছিল ১ হাজার ২৪৮ কর্মীর লাশ। এদিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আসা লাশ গ্রহণে স্বজনেরা প্রতিনিয়ত হয়রানি ও ভোগান্তি পোহাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো লাশ উড়োজাহাজ থেকে নামানোর পর রানওয়েতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকছে। এসব ব্যাপারে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দেয়ার পরও সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি পাত্তা দিচ্ছেন না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, প্রতিদিন ১০ জনের বেশি মানুষের লাশ দেশে আসছে। এখানে জায়গার অভাব এবং প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব রয়েছে। এজন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকদিন যাবত জায়গা দেওয়ার জন্য বলে আসছি। আমরা এখানে অসহায়।
ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ারের তথ্য অনুযায়ী বলেন, ২০১৮ সালে বৈধ কর্মীদের ৩ হাজার ৬৭৬টি লাশ এসেছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে কর্মরত ১১৭ কর্মীর লাশ এসেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৫৩ জনের লাশ এসেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এছাড়া ৩৭৪টি লাশ এসেছে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ৬৬টি লাশ এসেছে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিদেশে মারা যাওয়া কর্মীর বেশিরভাগেরই বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
এরমধ্যে বেশির ভাগ লাশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। সৌদি আরবের পর বেশি লাশ এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। গত বছর দেশটি থেকে ৭৮৪ জনের লাশ এসেছে।
অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও অধিকার কর্মীরা বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে ব্রেন স্ট্রোক ও হৃদরোগে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। তবে এতো অল্প বয়সে স্ট্রোকে এবং হৃদরোগে মৃত্যুর অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মানসিক চাপ। অনেকেই ঋণ করে বিদেশে যান, সেই টাকা তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। দিনে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। কিন্তু দেখা যায়, যে টাকা খরচ করে গেছেন তার তুলনায় আয় খুবই কম। এই ঋণ পরিশোধের একটা চাপ সব সময় তাদের থাকে। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ, অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা, নিম্নমানের খাবার, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাও এই ধরনের মৃত্যু ত্বরান্বিত করছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ হতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানী শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। সময়ের সাথে তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের ১৬০ টি দেশে প্রায় ১ কোটির বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী জীবিকার প্রয়োজনে কর্মরত আছে।
জানা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন প্রবাসীর লাশ আসছে। ২০১৮ সালে মোট ৩ হাজার ৭৯৩ জনের লাশ এসেছে, যা গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গত ১৪ বছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ৩৫ হাজার ৫২৬ জনের এবং  শাহ আমানাত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে লাশ এসেছে ৩ হাজার ৬৭৯ জনের এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ৫৪৪ জন প্রবাসীর লাশ আসে। এ ছাড়া বিদেশে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর দাফন হয়েছে। সেই সংখ্যা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জানা নেই। প্রবাসীদের এমন অকাল মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো কোনো অনুসন্ধান হয়নি। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো মৃত্যুর এই সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গত চার বছরে যত প্রবাসীর লাশ এসেছে, তাঁদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু আকস্মিক।
প্রবাসী বাংলাদেশি, মৃতদের স্বজন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্ট্রোক ও হৃদরোহে আক্রান্ত হন। যে বিপুল টাকা খরচ করে বিদেশে যান, সেই টাকা তুলতে অমানুষিক পরিশ্রম, দিনে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপে ভোগেন তাঁরা।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশী কর্মীর লাশ তার পরিবারের মতামত সাপেক্ষে দেশে আনা হয়। যদি কোনো মৃত ব্যক্তির পরিবার লাশ সংশ্লিøষ্ট দেশে দাফনের ইচ্ছা প্রকাশ করে, সে ক্ষেত্রে সে দেশে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। মৃতের লাশ দেশে প্রেরণে নিয়োগকর্তা খরচ বহন করতে অপারগতা প্রকাশ করলে এবং মৃতের পরিবার লাশ দেশে আনতে খরচ বহনে অক্ষম হলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের অর্থায়নে সেই লাশ দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়। মৃত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে দাফনের জন্য বিমানবন্দরে বোর্ড ৩৫ হাজার টাকা করে এবং পরে ৩ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেয়।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কন্সট্রাকশন, ফ্যাক্টরি ও বাগানে নিয়োজিত কর্মীদের মধ্যেই মৃত্যুর হার বেশি। কেননা এসব কাজে যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে সঠিকভাবে ট্রেনিং, প্রি-ব্রিফিং ও মেডিক্যাল-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত না করাই এ মৃত্যুর হার বাড়ছে। এমনিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় দেশেও তারা অপুষ্টিতে ভুগে। বিদেশে গিয়ে নতুন পরিবেশে হাড়ভাঙা খাটুনি তারা সহ্য করতে পারেন না। তারপর কাক্সিক্ষত বেতন না পাওয়ায় সেখানেই তারা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন। এ শ্রেণীর কর্মীদের বেশির ভাগই বিদেশে যাওয়ার জন্য ধারদেনা করে বা জমি বন্ধক রেখে যান। সেখানে গিয়ে কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী বেতন ও সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে তারা মানসিক চাপে পড়েন। দেশে ঋণের বোঝা আর বিদেশে স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে তারা দিন দিন নিস্তেজ ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। চাপ সইতে না পেরে তারা অসুখে মারা যান। আবার অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নয় বছরে শাহজালাল বিমানবন্দরে আসা ২২ হাজার ৫৬১ লাশের মধ্যে ৬১ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব থেকে এসেছে ২৯ শতাংশ (৬ হাজার ৫৮০ লাশ)। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লাশ এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। এর সংখ্যা ৩ হাজার ৯৩৮। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২ হাজার ৭৩৪ জনের, কুয়েত থেকে ১ হাজার ৩২২, ওমান থেকে ১ হাজার ৩১৮, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮৪৫, কাতার থেকে ৬০০, বাহরাইন থেকে ৫৯৯, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৫৯৭, সিঙ্গাপুর থেকে ৪৬৫, ইতালি থেকে ৪৯৫, যুক্তরাজ্য থেকে ২৮৭ এবং লিবিয়া থেকে ১৬৪ জনের লাশ এসেছে। বাকি লাশগুলো এসেছে অন্যান্য দেশ থেকে।
অভিবাসনবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রামরুর চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, একাকী প্রবাস জীবন, সব সময় দুশ্চিন্তা, কাজের ও থাকার নিম্ন পরিবেশ এসব কারণে মধ্যবয়সেই একজন প্রবাসীর জীবন থেমে যায়। সময় এসেছে এসব মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখার। পাশাপাশি বিদেশের কর্মপরিবেশ উন্নত করার জন্য দ্বি-পক্ষীয় এবং বহু-পক্ষীয় আলোচনার প্রয়োজন।
তার মতে, বিদেশগামীদের জন্য অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে একই সাথে দূতাবাসের সহযোগিতায় কাজের পরিবেশ নিশ্চিত ও ব্রিফিং জোরদার করতে হবে। তাহলেই বিদেশে মত্যু কমে আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ