ঢাকা, শনিবার 26 October 2019, ১১ কার্তিক ১৪২৬, ২৬ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন ও ব্রিটিশ-বিরোধী মতপথ : নজরুলের প্রতিক্রিয়া

 

আখতার হামিদ খান: উনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় রাজনৈতিক ধারা, দার্শনিক চিন্তা এবং মননশীলতার ক্ষেত্রে গান্ধী এক গুরুত্বপূর্ণ অভিধা। ভারতীয় রাজনীতির উথাল পাথাল তরঙ্গে দোলা তুলেছিল যে ‘ঔপনিবেশিক ক্ষমতা গান্ধী তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ভারতের নানাপ্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন; কখনো ব্রিটিশের শোষণ-ত্রাসনের প্রতিবাদে, আবার কখনোবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিবাদে। বিভূতিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, উদার অহিংস-প্রাণ গান্ধীজী’র রাজনৈতিক ও দার্শনিক কর্মসূচী দ্বারা অনেক চিন্তকই অহিংস দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। গান্ধীর সমসাময়িক বিদ্রোহী কবি নজরুল এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এ প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না। গান্ধীজীর প্রতি এ দু’জন মনীষীর নির্মোহ শ্রদ্ধা ও ভক্তি ছিল। আবার আদর্শিক প্রশ্নে গান্ধীজীর সঙ্গে তাঁদের দুজনেরই বিরোধ ছিল স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে গান্ধী কয়েকবার গিয়েছিলেন। তাঁরা দুজনই বিভিন্ন সময় আদর্শিক প্রশ্নে তর্কেও জড়িয়েছেন। কিন্তু কবি নজরুলের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। তিনি গান্ধীর সঙ্গে যেসব প্রশ্নে বিরোধে জড়িয়েছেন গান্ধী তা নিয়ে কখনোই কোনো মন্তব্য করেননি।

নজরুলের সাহিত্যজীবনে গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন ও ভাবধারার প্রভাবকে দু’টি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে : প্রথমতঃ ১৯২১ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত নজরুলের উপর গান্ধীর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয়তঃ নজরুলের প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকা-ে (১৯২৩ ও ১৯২৪) অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে এ পর্বটির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে। এ পর্যায়ে আছে গান্ধী-বিরোধিতা। গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এবং অহিংস নীতির অন্তর্নিহিত দেউলিয়া ভাবটি নজরুল তাঁর বিভিন্ন কবিতায় ও নিবন্ধে ব্যঙ্গ-রসাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছেন। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা এ দু’টি দিকের উপরই আলোকপাত করবো।

নজরুলের সঙ্গে গান্ধীর সাক্ষাত হয় প্রথমে হুগলিতে, তারপর ফরিদপুরে (১৯২৫ এর মে মাসে)। পরিচয়ের সূত্র ছাড়াও নজরুল গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এবং অহিংসার প্রতি জীবনের প্রথম দিকে আকৃষ্ট ছিলেন। একজন নেতা হিসাবে গান্ধী ৩০ কোটি জনগণের স্বাধীনতার প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশময় ঘুরে বেড়িয়েছেন, জেগে উঠবার আহ্বান জনিয়েছেন। বস্তুত সত্যপ্রতিষ্ঠার অভীপ্সা, রাষ্ট্রকে, জাতিকে সৌহার্দ্য ও শান্তির পথে ফিরিয়ে আনবার অভিপ্রায়কেই সামনে তুলে ধরেছেন। ১৯২০-২১ পর্যন্ত। গান্ধীর স্বদেশী তৎপরতার প্রতি নজরুলের নির্মোহ সমর্থন ছিল। নজরুল লক্ষ করেছেন গান্ধীর কাছে শান্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের ধরন ভিন্নতর, যা বিপ্লবীদের পথ হিসাবে অনাদৃত। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গান্ধীর প্রতি নজরুলের আচ্ছন্নতার ভাব স্পষ্ট হয়ে যায়। মুজফফর আহমদ তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা গ্রন্থে নজরুলের গান্ধীপ্রীতির কথা উল্লেখ করেন। মুজফফর উল্লেখ করেন ১৯১৯-১৯২০ সালের দিকে গান্ধী। যখন জাতীয় নেতা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সর্বভারতে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি সক্রিয়, তখন আমরা নজরুলের উপর গান্ধীর প্রভাব লক্ষ্য করি। ১৯২১ সালে সারা ভারত জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় কবি লিখেছেন:

এ কোন পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মা’র আঙ্গিনায়। 

ত্রিশ কোটি ভাই মরণ-হরণ গান গেয়ে তাঁর সঙ্গে যায়।। 

অধীন দেশের বাঁধন-বেদন কে এলো রে করতে ছেদন?

শিকল-দেবীর বেদীর বুকে মুক্তি-শঙ্খ কে বাজায়।। 

এই ‘পাগল পথিক’ই গান্ধী। কে এলোরে করতে ছেদন? এ প্রশ্নের মধ্যে যে ভিখারীর কথা কবি বলতে চেয়েছেন তিনিও গান্ধীই। একই অনুরণন আমরা শুনতে পাই:

ইরাফিলের শিঙ্গা বাজে আজকে ঈশান-বিষাণ সাথে,

প্রলয়-রাগে নয় রে এবার ভৈরবীতে দেশ জাগাতে। 

পথের বাধা স্নেহের মায়ায় 

পায় দলে আয় পায় দলে আয়! 

রোদন কিসের? আজ যে বোধন!

বাজিয়ে বিষাণ উড়িয়ে নিশান আয় রে আয়।। 

মুজফফর আহমদ এই কবিতার সূত্র ধরে বলছেন : “আমি যতটা মনে করতে পারছি, গান্ধীজীকে লক্ষ্য করে এটাই ছিল নজরুলের লেখা প্রথম গান। খানিকটা গান্ধীবাদও এই গানের ভিতর আছে। যেমন, “মুক্তি সে ত নিজের প্রাণে, নাই ভিখারীর প্রার্থনায়।” কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনের সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাশও ‘স্বরাজের সংজ্ঞায় বলতেন: “স্বরাজ? সে তো প্রাণে প্রাণে অনুভব করার ব্যাপার।”৬ কবিও তাঁর কবিতায় যেভাবে মুক্তি সে ত নিজের প্রাণের কথা বলছেন তাতে ঐ গান্ধীবাদী ‘স্বরাজের প্রতিধ্বনিই শােনা যায়। গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন’ কিংবা স্বরাজের প্রতি কবির যে অকুণ্ঠ সমর্থন, উপরোক্ত গানটিতে আমরা তারই আভাস পাই।

গান্ধীর প্রতি নজরুলের ভক্তি মাখানো যে সমর্থন রয়েছে তা স্পষ্ট হয়েছে তাঁর ‘উপেক্ষিত শক্তি উদ্বোধন’ এবং ঘূত্মার্গ’ প্রবন্ধে। ‘উপেক্ষিত শক্তি উদ্বোধন’ প্রবন্ধে। কবি গান্ধী সম্পর্কে সপ্রশংস মন্তব্য করেছেন। জাতির মধ্যে প্রাণ-সঞ্চার করার জন্য, জনশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য, তাদের প্রাণের ভেতর লুক্কায়িত মুক্তির উন্মেষ ঘটানোর জন্য নজরুল গোটা জাতিকে আহ্বান করেছেন। এই আহ্বানের সত্যাসত্য প্রমাণের তাগিদে নজরুল লিখছেন : “... একথা হয়ত তোমার বিশ্বাস হইবে না, কিন্তু এই সে দিনকার সত্যাগ্রহ, হরতালের কথা মনে কর দেখি, একবার মহাত্মা গান্ধীর কথা ভাবিয়া দেখ দেখি। তিনি আজ ভারতে কি অসাধ্য সাধন করিতে পারিয়াছেন।”

এই অসাধ্য সাধনের বড় ক্ষেত্রটি হল জাতপাতহীন রাজনীতির চর্চা। আমরা কবিকে বলতে শুনি, নাহি দেশকাল পাত্রের ভেদ অভেদ ধর্ম জাতি’ ... এই ভেদাভেদহীন জাতপাতের কথা ভাবতেন বলেই তিনি বলতে পেরেছেন : কোনো ধর্মই মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করতে শেখায় না। ধর্ম মানুষকে মানুষ হিসাবে ভাবতে শেখায়। ছুঁৎত্সর্গ প্রবন্ধে তিনি জোরালোভাবে বললেন, “যত ছোঁয়াছুয়ির নীচ ব্যবহার ভ- বক-ধার্মিক আর বিড়াল-তপস্বী দলের মধ্যেই। ইহাদের এই মিথ্যা মুখোশ খুলিয়া ফেলিয়া ইহাদের অন্তরের বীভৎস নগ্নতা সমাজের চোখের সম্মুখে খুলিয়া ধরিতে হইবে।” র্গের বিরুদ্ধে গান্ধী লড়াই করেছেন। গান্ধী বুঝতেন মানুষ হয়ে মানুষকে কুকুর-বিড়ালের মতো ঘৃণা করা মনুষ্যত্বের অবমাননা। মানবাত্মাকে ঘৃণা করা পরমাত্মাকে ঘৃণা করারই সামিল। মানুষ-মনুষ্যত্বের এই অভয় বাণী “মহাত্মা গান্ধীজী ধরিয়াছেন এ মহা সত্যকে, তাই আজ বিক্ষুব্ধ জনসঙ্গ তাহাকে ঘিরিয়া এমন আনন্দের নাচ নাচিতেছে। তোমরা রাজনীতিক যুক্তি তর্কের চটক দেখাইয়া লেখাপড়া শেখা ভ-দের মুগ্ধ করিতে পার, কিন্তু অমন ডাকটি আর ডাকিতে পারিবে না। এরকম সপ্রশংস বয়ানে গান্ধীর প্রতি নজরুলের সুপ্রসন্ন দৃষ্টিকোণকে ইঙ্গিত করে। নজরুল তাঁর প্রথম জীবনে গান্ধীকে মহামানবের আসনে বসিয়ে দেখেছেন। গান্ধীর মধ্যে তিনি লক্ষ করেছেন হতভাগাদের প্রতি সহমর্মিতা, অবিচল আস্থা ও প্রেম। এই মহামানবের মানবপ্রেমী মনোভাবের প্রতিফলনই হল সকল ছুঁৎসর্গের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা। গান্ধীজীর প্রতি নজরুলের এই আবেগ প্রকাশিত হয়েছে : “তিনি যদি এমনি করিয়া প্রাণ খুলিয়া ইহাদের সহিত না মিশিতেন, ইহাদের সুখ দুঃখের এমন করিয়া ভাগী না হইতেন, ইহাদিগকে নিতান্ত আপন করিয়া না তুলিতেন, তাহা হইলে আজ তাহাকে কে মানিত? কে তাহার কথায় কর্ণপাত করিত? কে তাহার একটি ইঙ্গিতে এমন করিয়া বুক বাড়াইয়া মরিতে পারিত?” কবির সঙ্কোচহীন এই বক্তব্য গান্ধীর প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থনকে প্রকাশ করে। কবির বিভিন্ন কবিতায়, প্রবন্ধে গান্ধীর ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবনত মনোভাবেরই অভিব্যক্তি।। সেই শ্রদ্ধার পূর্ণতা লক্ষ্য করি কবির দুরন্ত কল্লোলে : ‘জাগো যৌবনের জয়টিকা নিয়ে।

১৯২৪ সালে গান্ধী হুগলিতে এসেছিলেন। সেই সময়ই গান্ধীর সঙ্গে নজরুলের প্রথম সাক্ষাত-পরিচয় ঘটে। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে কবি গান্ধীর অহিংস নীতি’ এবং ‘স্বরাজ’ সম্পর্কে গান ও কবিতা লেখেন। সদ্যবিবাহিত নজরুল তখন সংসারের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু আত্মসচেতন কবি সেদিন স্বরাজের কবিকে অভিবাদন জানিয়েছিলেন বাংলায়। মহাত্মা’ অভিবাদনে। নজরুলের এই উক্তি হুগলি জেলার সর্বস্তরের জনসাধারণকে গান্ধীকে গ্রহণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া জাগায়। সেই সময় কবি চরকার গান’ মহাত্মাকে শুনিয়েছিলেন। কবির এই কাব্যিক ধীশক্তি গান্ধীকে মুগ্ধ করে। তখন ‘চরকার গান’ প্রায় সকলের কণ্ঠে কণ্ঠে। গান্ধীবাদের প্রতি কবির ভাবনার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় এ কবিতায়। ‘চরকার গান কবিতার পেছনের খাদি-আন্দোলনের পুরোধা পশ্চিম বঙ্গের গরিফার রায় পরিবারের কন্যা শ্রমিকনেত্রী সন্তোষকুমারী দেবীর প্রভাব উল্লেখ করার মতো। সন্তোষকুমারী দেবীর তত্ত্বাবধানে গরিফায় চরকা ও তাঁতের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই নেত্রীর অনুরোধে নজরুল গরিফায় গিয়েছিলেন, চরকা ও তাঁতের সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে কবি উদ্বেলিত হয়েছিলেন। তাঁর সেই উদ্বেলতারই ফসল ‘চরকার গান’। উল্লেখ্য যে গানটি কবি স্বকণ্ঠে গান্ধীকে শুনিয়েছিলেন।১২ চরকার গান কবিতায় গান্ধীর ‘স্বরাজ’ ধারণাটি বিভিন্ন মাত্রায় ও বিন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে। কখনো বলেছেন, ঐ স্বরাজ-রথের আগমনী শুনি চাকার শব্দে তোর। আবার কখনোবা উল্লেখ করেছেন, ঐ খুলল স্বরাজ-সিংহদুয়ার, আর বিলম্ব নাই। গান্ধী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসাবে চরকা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এই চরকা। একদিকে যেমন স্বদেশীর অফুরন্ত বস্ত্র যোগানদাতা, আবার এই চরকাই জোর জুলুমের বিরুদ্ধে দশম গ্রহ, বিষ্ণু-চক্র ভীম কঠোর’। চরকা যেন এক অফুরন্ত গতির আধার। চরকার স্পর্শে স্বর্গ মেলে, অন্ন পণ্য-সুধা মেটায়, সবকিছু যেন এই চরকার বদৌলতে। চরকার স্তুতি বন্দনায় কবি বলেন,

তুই সাত রাজারই ধন, 

দেশ-মা’র পরশ-রতন, 

তোর স্পর্শে মেলে স্বর্গ অর্থ কাম্য মোক্ষ মন।

তুই মায়ের আশিস, মাথার মানিক, চোখ ছেপে’ বয় অশ্রু-লোর ।।

গান্ধীর দেশপ্রেমিক প্রতিশ্রুতিতে বিদ্যমান ‘স্বরাজ’ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ সেই আকর্ষণ তৈরীর মূলে কাজ করেছিল। স্বরাজের এই অভিব্যক্তি দ্ব্যর্থহীনতায় প্রকাশিত হয়েছে চরকার গান কবিতায়:

তোর ঘোরার শব্দে ভাই। 

সদাই শুনতে যেন পাই। 

ঐ খুল স্বরাজ-সিংহদুয়ার, আর বিলম্ব নাই।

ঘুরে আসল ভারত-ভাগ্য-রবি, কাটল দুখের রাত্রি ঘোর ।।

এখানে স্পষ্টতই স্বরাজের প্রতি কবির উদগ্রীব-বাসনা প্রকাশিত হয়েছে। আবার গান্ধীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভিব্যক্তিটিও আমরা লক্ষ করি: 

হিন্দু-মুসলিম দুই সোদর, 

তাদের মিলন-সূত্র-ডোর রে 

রলি চক্রে তোর, 

তুই ঘোর ঘোর ঘোর।

আবার তোর মহিমায় বুঝল দু’ভাই মধুর কেমন মায়ের ক্রোড়।” 

এখানে এসে গান্ধীর হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বাসনা প্রকাশিত হয়েছে। স্বরাজের প্রতি নজরুলের আকর্ষণ মূলত স্বদেশের পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হবার ব্যগ্রবাসনা। আর হিন্দু-মুসলিমকে তিনি ভারত মায়ের দুই সহোদর হিসাবেই দেখেছেন। এরকম বিবেচনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকেই সামনে তুলে আনে।

১৯২৪ সালের শেষের দিকে নজরুল বামপন্থার সঙ্গে পরিচিত হন। বামপন্থার রাজনৈতিক আদর্শ কবিকে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে রুশ বিপ্লবের অভিঘাত নজরুলের ভাবনায়। প্রতিফলিত হয়। ফলে রাজনৈতিক প্রপঞ্চ’, সামাজিক বিন্যাস এবং সংগ্রাম সম্পর্কে তাঁর মধ্যে নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটে। এই প্রতিফলনের কারণেই নজরুল সামাজিক বিন্যাসকে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে উদ্বুদ্ধ হন। সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার অংশ হিসাবে শোষণ জিইয়ে রাখে এরকম কোনো আদর্শ বা তত্ত্বকে তাই নজরুল মেনে নেন নি। সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী মতাদর্শ হিসাবে সমাজবাদ’ নজরুলের আদর্শিক ভাবনায় যে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে তা-ই তাঁকে গান্ধী পুনর্মূল্যায়নে উৎসাহিত করেছে। যে সত্যটি নজরুলের উপলব্ধিকে শাণিত করতে সাহায্য করেছে তা হচ্ছে ভারতবর্ষের পরাধীনতা। তখন নজরুল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক চরিত্রের গতিপ্রকৃতি এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদ নিয়ে গভীরভাবে ভাবছিলেন। এই ভাবনাই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে যা ‘স্থিতধী-প্রকৃতির অহিংস কিংবা অসহযোগ তত্ত্বের প্রতি তাঁকে বিমুখ করে তোলে। নজরুল বিশ্বাস করতে শুরু করেন চরকা’ বা ‘দেশজ খদ্দর কাপড় একটা জাতির মুক্তির একমাত্র পথ হতে পারে না। দেশ যেখানে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়েপড়া, ঔপনিবেশিক শক্তি যেখানে অদম্য শক্তিতে তৎপর, সেখানে চরকা কিংবা অসহযোগ আন্দোলন মুক্তির পথ নয়। এই সময় নজরুলের মনে স্বরাজ’ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। এই বোধই ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাসে ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’ গড়ে তুলতে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। পার্টির উদ্যেগে নজরুল সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার মূল নির্যাসই হল ঔপনিবেশিক শক্তির বহুমুখী তৎপরতার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকে শাণিত করা। এ পর্যয়ে নজরুল বিশ্বাস করতেন। অহিংসা কিংবা অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণবাদী তৎপরতা থেকে মুক্ত হওয়া আদৌ সম্ভব নয়। এজন্য নজরুল গান্ধীর মত ও পথকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। নজরুল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, গান্ধীর নির্মোহ ‘শান্তির ললিত বাণী’ যেভাবে ভারতবাসীকে আঁকড়ে ধরেছে তাতে চূড়ান্ত বিজয়ই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়বে। ১৯২৪-এর আগেও নজরুল গান্ধীর মতপথ নিয়ে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। এই দ্বিধা ব্যক্ত হয়েছে ১৯২২ সালে ধূমকেতু অর্ধ-সাপ্তাহিকে। গান্ধী চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, নজরুল তাতে তুষ্ট হন নি। নজরুল চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা’। আর এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র যুদ্ধের। যার কাছে দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা কাম্য, তিনি কখনোই গান্ধী-প্রস্তাবিত তথাকথিত শান্তিবাদে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না, এটাই স্বাভাবিক। লক্ষণীয়, সারা ভারত জুড়ে তখন ব্রিটিশের শােষণবাদী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম চলছে। ব্রিটিশ শাসকশ্রেণীর কারসাজিতে বঙ্গভঙ্গ’ বিরোধী আন্দোলন জটিল রাজনৈতিক কর্মসূচীতে রূপান্তরিত হয়েছে। ভারতের নানান প্রান্তে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিতে ফাটল স্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। এরকম রাজনৈতিক অপতৎপরতার বিরুদ্ধে যেখানে গড়ে উঠছে ‘অনুশীলন’ ও ‘যুগান্তর’ সমিতি তার অভিঘাত নজরুলের মধ্যে সক্রিয় প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক।

সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাসমূহের এসব বিষয়াদি ছাড়াও নজরুলের উপর তাঁর শিক্ষক শ্রী নিবারণচন্দ্র ঘটকও প্রভাব ফেলেছিলেন। নজরুল জীবনীলেখক মুজফফর আহমদও এই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। মুজফফর আহমদ লিখছেন-পল্টন থেকে ফিরে নজরুল নিজেও শিক্ষক নিবারাণচন্দ্র ঘটকের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকের সংগ্রামী সান্নিধ্যে নজরুল এসেছিলেন ১৯১৭ সালে। শিয়ারশােল রাজ হাই স্কুলের শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটক তখন পশ্চিমবঙ্গীয় বিপ্লববাদী সংগঠন যুগান্তরের সক্রিয় সদস্য। নজরুলের ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা শিক্ষককে আকৃষ্ট করেছিল। শিক্ষকের প্রতিও তাঁর আকর্ষণ ছিল। এই উভমাত্রিক আকর্ষণই নজরুলের মনে নতুই ভারতবর্ষের প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। আর তাই নজরুল স্বাধীনতার চূড়ান্ত অর্জনের প্রশ্নে সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত অন্য কোনো বিকল্প নিয়ে। ভাবতে চাননি।

সশস্ত্র সংগ্রামের ধারণাই তাঁকে সেনাবাহিনীতে যোগদানে উৎসাহিত করে। পরাধীন ভারতের মুক্তিপ্রত্যাশী নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগদানের মূল কারণই হল সশস্ত্র প্রশিক্ষণ অর্জন করা। যা তাঁকে ভবিষ্যত ভারতের পূর্ণস্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে সাহায্য করে।১৮ আরো উল্লেখ করা যায়, ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে নজরুলের যে আত্মপ্রতিশ্রুতি, কাব্যে ও বিপ্লবে ধূমকেতুর মতো আর্বিভাব, তাতে যুগান্তর সমিতির দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ তাঁকে উদ্বেলিত করেছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যুগান্তর সমিতি, ধূমকেতু পত্রিকা এবং নজরুল’ এই ত্রয়ী অবিচ্ছিন্ন সুতোয় গাঁথা মালা। এসবকিছুই কবিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ভারতমাতার স্বাধীনতা সংগ্রামের সুবাতাস চৌদিকে ছড়িয়ে দিতে। কবির মনোজগতে সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্দীপনার স্ফুরণকে উৎসাহিত করেছিল ‘দামাল। ছেলে কামাল’, ‘দাবানল ¯্রােত আনোয়ার’, আর রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের জয়যাত্রা’। এই তিন ধারাই নজরুলকে ভারতের স্বাধীনতা এবং গণমুক্তির ভাবনাকে পুনর্বিন্যস্ত করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই ভাবনার পরিপ্রেক্ষিত ধরেই ১৯২৪ উত্তরকালে ভিন্ন ভাবমূর্তির নজরুলকে আমরা পাই। ১৯২৪-এর পূর্বে নজরুল চরকাকেই মনে করতেন সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দ্রোহ। কিংবা বিদেশী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। গণমুক্তি ও স্বরাজের ভূমিকা হল প্রতীকী বন্ধুর মতো। চরকাকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উৎস হিসাবেও দেখেছেন। কিন্তু ১৯২৪এ এসে নজরুল যেভাবে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন এর পূর্বাভাস তিনি ধূমকেতুর ১৯২২-এর এক সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। নজরুল সেখানে বলছেন: স্বরাজনৈয়, আমাদের প্রয়োজন পূর্ণ স্বাধীনতা’। নজরুল তীক্ষ উপলব্ধির সহযোগেই বলছেন : স্বরাজ পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে সক্ষম নয়। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন পূর্ণ স্বাধীনতা। স্বরাজের মধ্য দিয়ে গান্ধী আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মঅধিকার চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তপূর্ণ স্বাধীনতার জন্য কোনো প্রকল্প হাতে নেননি। ১৯২৪এ গান্ধী যখন হুগলিতে আসেন তখনও তার প্রতি নজরুল যে, সৌহার্দ্য, সৌজন্য ও বদান্যতা দেখিয়েছেন তা অনেককিছুর ঊর্ধ্বে। যদিও নজরুল এই দুই সময়ের ব্যবধানে অনেক পাল্টে গিয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন ‘অসহযোগ’, ‘অহিংসা এবং স্বরাজ’ তত্ত্ব ও মতকে। ১৯২৪-এ হুগলিতে গান্ধীর প্রতি যে সম্মান দেখিয়েছেন সেটা একান্তই তার ব্যক্তিত্বে অন্তর্নিহিত উদার শ্রদ্ধা-ভক্তির কারণে। আর গান্ধীর মতপথের প্রতি বিরূপ হলেও গান্ধীর সততা ও মহত্ত্বের প্রতি নজরুলের অবিচল আস্থা ছিল। গান্ধী যখন সারা ভারত জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন প্রচার করে বেড়াচ্ছিলেন, ব্রিটিশ সরকার তখন তাঁকে বন্দী করে। নজরুল লক্ষ্য করেছেন এই বন্দীদশায় গান্ধীর হাজার হাজার ভক্ত, অনুরাগী আন্দোলনের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েছেন। নজরুল মনে করেন গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শূন্যতার কারণেই ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে জনগণের এই অভক্তি জন্মেছে। একারণেই তিনি তীব্র ভাষায় গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সমালোচনা করেন। ধূমকেতু’র এক সংখ্যায় তিনি বলেন : গোটা দেশের রাজনৈতিক স্পিরিট আরো শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে বঙ্গভারতের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ঘোচানো অতীব প্রয়োজন। আর এই দেউলিয়াত্ব ঘোচানোর জন্য প্রয়োজন বঙ্গভারতের নিজস্ব ধারায় সশস্ত্র বিপ্লব’কে অনুসরণ করা। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে নজরুল ঔপনিবেশিক শক্তিকে রুখে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন। একই যুদ্ধ তিনি গান্ধীবাদের বিরুদ্ধেও ঘোষণা করেছেন। গান্ধীর বিরুদ্ধে কেন তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন? উত্তর খুবই সহজ। বিপ্লববাদী নজরুল মনে করেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন কিংবা স্বরাজ’ স্বল্প আয়েসের স্বাধীনতা দিলেও ঔপনিবেশিকতার বেষ্টনী থেকে জাতিকে মুক্ত করবে না। এই বেষ্টনী থেকে ভারতবাসীকে অবমুক্ত করার জন্য প্রয়োজন পূর্ণস্বাধীনতা। কিন্তু গান্ধী সেই কাক্সিক্ষত অগ্রযাত্রাকে ‘মায়ার জালে ফেঁসে দিয়েছেন। এই বাস্তবতার নিরিখেই ধূমকেতু’র প্রথম সংখ্যায় নজরুল ‘সারথীর পথের খবর’ শিরোনামে উপসম্পাদকীয়তে লেখেন : আমাদের প্রয়োজন ‘অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র এবং সদর্থক-সত্তার বিকাশ ঘটানো। গান্ধীর ‘আত্ম-সংরক্ষণ’ ও ‘আত্মদৃচতার ধারণা এই ব্যক্তিত্বের বিকাশের অন্তরায়। 

নজরুল আক্ষেপ করে বলেন, গান্ধীর দর্শন বা স্বরাজ যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কথা বলে তাতে স্বাধীনতার ধারণা অনুপস্থিত। কিন্তু সাধারণ জনগণ গান্ধীর দর্শনের এই ফাঁকটুকু বুঝতে ব্যর্থ। অহিংস নীতি বিস্তারের মাধ্যমে গান্ধী যে স্থূল জনপ্রিয়তায় জনগণকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছেন নজরুল সেটারও নিন্দা করেন। ভারতীয় সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে সমন্বয় করে গান্ধী যে বীরপূজা’ এবং ‘দেবপূজা’র প্রচার গোটা ভারত জুড়ে বিস্তৃত করেছেন সেটি ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা’ অর্জনের প্রতিবন্ধক স্বরূপ। গান্ধীর বিভ্রান্ত মত ও পথের প্রতি জনগণের যে মোহ রয়েছে তার কারণে তাদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসা কষ্টকর হয়ে উঠছে। এজন্য নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকেই নজরুল মনে করলেন গান্ধীর অভ্রান্ত-কর্তৃত্ব খ-ন করা উচিত।  [অসমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ