ঢাকা, শনিবার 26 October 2019, ১১ কার্তিক ১৪২৬, ২৬ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতের স্বপ্ন 

আহমদ মনসুর: রাষ্ট্র পরিচালকদের পাকিস্তান সৃষ্টির আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং পাকিস্তানী সমর নায়কদের অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তই বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ১৯৭১ সালে বাংলা দেশের সেই সঙ্কট কালে ভারতীয় নেতারা আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই।   এই হাত বাড়িয়ে দেয়ার কি কি কারণ ছিল তা জানা প্রয়োজন। বিজ্ঞানের একটি সূত্র আছে  Laws of causality. সেই সূত্র মতে Everything which has a begining has a cause.ভারত যে আমাদের প্রতি হাত বাড়িয়েছিল তার নিশ্চয়ই কারণ ছিল। একদিকে ছিল মানবতার চিত্র অপরদিকে ছিল স্বার্থ চিন্তা। তারা যে ছবি অঙ্কন করেছিল আমরা সে ছবির এক পিঠ দেখে বিমোহিত হয়ে তাদের প্রতি অন্ধভাবে ঝুঁকে পড়ি। কিন্তু এর অপর পিঠের ছবিটি যে কত ভয়ঙ্কর ছিল তা একবারও আমরা ভাবি না। ভারত অত্যন্ত সচেতন ভাবে ধীর পদক্ষেপে নিজেদের স্বার্থের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে আমাদের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাদের সেই সতর্ক দৃষ্টির কথা আমরা অল্প দিনেই ভুলতে বসেছি। 

১৯৭১ সালের ২৬  মার্চ ভারতের পররাষ্ট্্র মন্ত্রী শরণ সিং পুর্ব পাকিস্তানের ঘটনাক্রমে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রাজ্য সভায় এক বক্তৃতায় বলেছিলেন , ‘ এই মুহূর্তের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা তীব্র ভাবে সচেতন। এর সমাধান ক্ষেত্রে কোনো ভ্রান্ত পদক্ষেপ, কোনো ভুল বক্তব্য যেন কোন প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায় সে সম্পর্কে আমরা তীব্র ভাবে সচেতন।’   ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে Bangladesh  and India’s national security: the options of India শিরোনামে লিখিত একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন এবং লেখেন যে‘ মুক্ত বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কোনো বামপন্থী সরকার যেন  সেখানে অধিষ্ঠিত হতে না পারে তেমনি সামরিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে। ’ (By such  pre- emptorymilitary moves, India could ensure her security by preventing a radically left- oriented leadership from being installed in power in Bangladesh.)   

শুধু কি তাই, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ যেন  সার্বভৌম বাংলাদেশে পরিণত না হয় সে দিকেও  ভারতের নীতি নির্ধারকদের সচেতন দৃষ্টি ছিল।  (প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ - বাংলাদেশের জনগণের অর্জন মুক্তি যুদ্ধে বিজয়।) 

১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রামে ভারত তাদের নীল নকশা বাস্তবায়নের প্রয়োজনেই মুক্তি পাগল মুসলিম বাংগালীদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল। কেন ভারত পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি নিয়োগ করেছিল তার রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন ‘সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ার ’ পত্রিকার সম্পাদক বাবু সমর সেন। তিনি তার ‘বাবু বৃত্তান্ত’ শীর্ষক বইয়ে ফিল্ড মার্শাল মানেক শ -এর ১৯৭৭ সালে বোম্বাই রোটারী ক্লাবে প্রদত্ত এক বক্তৃতার উদ্ধৃতি তুলে ধরে লিখেছেন:-বিগত ১৯৭১ সালের মার্চের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম মুহূেের্তই দিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে ( তখনকার প্রধান সেনাপাতি জেনারেল মানেক শ) ডেকে তখনই তার বিশাল ভারতীয় বাহিনীকে পাঠিয়ে ঢাকা সহ সমগ্র বাংলাদেশ দখল করতেই না কি বলেছিলেন । অগনন শরণার্থী তখনও ভারতে যায়নি বলে তাদের ভিড়ে  রুদ্ধশ^াস হয়ে ভারতের তখনই মুক্তি লাভের জন্য যুদ্ধ যাত্রার প্রয়োজন ছিল না। তাই জেনারেল মানেক শ না কি নানা যুক্তি তর্ক তুলে তখনই বাংলাদেশে সামরিক অভিযান পাঠান থেকে ইন্দিরা শাসিত দেশটিকে বিরত রেখে ছিলেন।  

ভারতের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় বাহিনী কখনো বাংলাদেশ ত্যাগ করবে না। এ তথ্য ফাঁস করেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি জৈল সিং। ১৯৮৭ সালের ২ মে এক সংবাদ পত্রে প্রকাশিত জৈল সিংএর মন্তব্য ছিল “ বালাদেশ থেকে ১৯৭২ সালে দ্রুত ভারতীয় সৈন্য প্রত্যহারের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। এতে ভারতের স্বার্থ হানি হয়েছে। আমরা তাড়াতাড়ি সৈন্য প্রত্যাহার করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারিনি।   

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত কী ভাবে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিল তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন অন্যতম পরিচালক সুব্রানিয়াম (K. Subrahamayam)- এর বক্তব্য থেকে। ৩০ মার্চ ১৯৭১ ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্লড অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত এক সিম্পেজিয়ামে Indian Institute for Defence studies and Analysis এর পরিচালক সুব্রানিয়াম (K. Subrahamayam) বলেছিলেন, ভারতকে এই সত্য অনুধাবন করতে হবে যে  পাকিস্তানকে খ-বিখ- করাই আমাদের স্বার্থের অনুকুল। এবং এমন সুযোগ এর পর আর কখনো আসবে না। (What India must realize is the fact  that break-up of Pakistan is in our interest, and opportunity the like of which will never come again.) দ্য লিবারেশন ওয়ার ’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি আরও বলেছেন, ‘ভারতের জন্য এটা এমন এক ঘটনা যা শতাব্দীতে ঘটেনি। ’

পাকিস্তান ভেঙ্গে দেয়াই ছিল গোড়া থেকেই ভারতের উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে যখন বিরাট সুযোগটি এল তখনই তারা তা লুফে নিল। প্রমাণ স্বরূপ  জনাব বেলাল  মোহাম্মদ  বিরচিত‘ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ শীর্ষক বই থেকে কিছু কথা তুলে ধরা হল। “ মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির লনে ড. ত্রিগুণা সেন আমার কাঁধে হাত রেখে  ছিলেন। লোকজনের জটলা থেকে সরে এসে ছিলাম। বলেছিলেন, ‘ ইয়ংম্যান, কাজ করে যাও। ১লা নভেম্বর ঢাকায় বিজয় উৎসব হবে।  জানো, ১৯৪৯ সালে আমরা বাংলাদেশ সেল গঠন করেছিলাম। তখন থেকে ঐ সেল-এর দায়িত্বে ।  এত দিন পরে দুই নদীর ¯্রােত মিশেছে এক মোহনায়। ’

 সংগে সংগে আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলাম মুখোমুখি। বলেছিলাম, স্যার আমি পাকিস্তান রেডিওতে স্ক্রীপ রাইটারের কাজ করতাম।‘সিগনিফিক্যান্ট’ নামে একটি কনফিডেন্সিয়াল  তথ্য পত্রিকা আমাকে দেয়া হতো  কাউন্টার প্রোগ্রামের ডাটা হিসেবে ব্যবহারের জন্য। বলা হতো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারত চাইছে , কী করে পাকিস্তান ভেঙ্গে যায়।   আপনারা ১৯৪৯ সালে ‘ বাংলাদেশ সেল’ করেছেন । তা হ’লে তো ঐ ডাটাটি মিথ্যা নয়।” ড. ত্রিগুণা সেন অপ্রস্তুত ছিলেন। আমাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “ছিঃ , এ সব কথা বলতে নেই খোকা। ’ 

ভারতের মনোভাবের ব্যাপারে ভারতের সমর বিশারদ রবি শিখির উক্তি আলোচনা করা যেতে পারে।  তিনি ‘দি ওয়ার দ্যাট নেভার ওয়াজ’ বইতে লিখেছেন, ‘প্রথম সুযোগেই ভারতের কর্তব্য হবে পাকিস্তানকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া।  এর পর একে একে ঐ সমস্ত  এলাকাকেই ভারতের প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে  যারা ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পূর্বে অবিভক্ত ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ 

এ সামান্য আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ  যেন সার্বভৌম বাংলাদেশে পরিণত না হয়  সে দিকে ভারতের নীতি নির্ধারকদের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। ১৯৭১সালের ১০ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনী গঠনের জন্য যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ; কিন্তু ভারতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর চেয়ারম্যান শ্যাম মানেক শ এবং নীতি নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান ডি পি ধর। অন্য কথায় স্বাধীন বাংলাদেশ ভারতীয় প্রশাসনিক কাঠামোয় ছিল একটি বিভাগ তুল্য।       

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশকে ভারতের অনুদাস করাই ছিল ভারতের প্রধান লক্ষ্য। এ কারণেই ভারত শুরুতেই মুক্তি যুদ্ধের অবিস্মরণীয় বিজয়কে ভারতীয় বাহিনীর একক বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বাংলার মুক্তি যোদ্ধাদেরকে উপেক্ষা করে ভারতীয় বাহিনীর হাতে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করে। এ ব্যাপারে এন্টনী মাসকারানাস ১৯৮৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী ‘বিচিত্রা’কে যে সাক্ষাৎকারটি দেন তার সামান্য অংশ তুলে ধরা যেতে পারে। 

বিচিত্রা-  আপনি লিখেছেন পাকিস্তানী সৈন্যরা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আমরা জানি তারা যৌথ বাহিনীর কাছে আত্ম সমর্পণ করে। এ বিষয় আপনার মন্তব্য কী? 

এন্টেনী- ননসেন্স, জেনারেল অরোরার আনুগত্য হল ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি । কি করে তিনি অন্য কারো প্রতি আনুগত্য দেখাতে পারেন।

 এ ভাবে বিশ্লেষণ করলে দিবাকরের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সাহায্যের হাত বিস্তারে মানবীয় দিক যতটা না ছিল তার চেয়ে অধিক ছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে তাদের রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। শেষে সেক্সপিয়ারের একটি কথা মনে পড়ে, তিনি বলেছেন, ‘ Sometimes I have to be cruel just to be kind ।’ কিন্তু ভারতের অবস্থা ঠিক উল্টা , He had to be Kind just to be cruel.

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ