ঢাকা, রোববার 27 October 2019, ১২ কার্তিক ১৪২৬, ২৭ সফর ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

হ্যাকিং ও হ্যাকার নিয়ে চলছে যেন ‘আলো ছায়ার খেলা’

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ভোলার বোরহানুদ্দিনে এক হিন্দু ছেলের ফেসবুক আইডি থেকে আল্লাহ ও রাসুল (স.)কে অবমাননার পোস্ট দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘আলো ছায়ার খেলা’ চলছে বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। তারা বলছেন, ঘটনার দিন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, একজন মুসলমানের পক্ষে কিভাবে একটি হিন্দু ছেলের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করা হলো। তার মানে সেদিনই বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে যে, যারা ফেসবুক আইডি হ্যাক করেছে তারা ধরা পড়েছে বা তাদের সনাক্ত করা হয়েছে এবং সে মুসলমান। অথচ এরপর প্রশাসন ও সরকারের মন্ত্রীরা এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলছেন। কেউ বলছেন, এখনো সনাক্ত হয়নি। কেউ বলছেন, আরো কিছু দিন সময় দরকার। আবার কেউ বলছেন, আইডি হ্যাককারীতে ধরতে ফেসবুক যে ধরনের সহযোগিতা আমাদের করার কথা সেভাবে করেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনা কেন ঘটল? যার ফেসবুকে ইসলামের অবমাননামূলক স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছিল, সেই বিপ্লব ফেসবুকে নিজে লিখেছে, না অন্য কেউ হ্যাক করে লিখেছে তা তদন্তের আগেই আমরা অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেয়াটা যুক্তিসঙ্গত নয়। তারা বলছেন, যেই ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো কটূক্তির কারণে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ৪ জন মুসলমান মারা গেল, দেড়শতাধিক সাধারণ মানুষ আহত হলো সেই আইডি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটা ‘ধোয়াশা’ তৈরী করে রাখা হচ্ছে। অথচ যারা প্রতিবাদ জানাতে গেল, হাতহত হলো তাদের নামে মামলা দিয়ে গ্রেফতার এমনকি তদন্ত রিপোর্টও দেয়া হলো। অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে অতীতের ন্যায় আসল অপরাধীদের আড়ালের ষড়যন্ত্র চলছে। 

সূত্র মতে, ধর্ম অবমাননাকারীদের বিচারের দাবিতে প্রতিবাদীদের বিচার চললেও মূল আসামীদের বিষয়ে কিছুই হচ্ছে না। এরই মধ্যে ভোলার বোরহানউদ্দিনে সংঘর্ষের ঘটনায় জেলা প্রশাসন থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। কমিটির প্রধান ভোলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মাহমুদুর রহমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মুসুদ আলম সিদ্দিকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। এদিকে, সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত চারজনের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে। শনিবার দুপুরে ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল নিহতদের বাবা-মায়ের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেন। এর আগে মুকুল বোরহানউদ্দিনে নিজ বাসভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, এ সংঘর্ষের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত চলছে। পুরো ঘটনাটিকে নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে এবং যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মুকুল দোষীদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে সাংবাদ মাধ্যমের সহায়তাও কামনা করেন।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে, বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক যুবকের ফেসবুক আইডি থেকে আল্লাহ ও মহানবীকে কটূক্তি করে বিভিন্ন জনের কাছে মেসেজ পাঠানো হয়। এসবের স্ক্রিনশট ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেলে এলাকায় নিন্দা ও বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে বিপ্লব ১৯ অক্টোবর থানায় এসে দাবি করেন যে তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি সাধারণ ডায়েরিও করেন।

ভোলায় হিন্দু তরুণ বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অন্য কেউ মহানবী সা:-এর নামে কটূক্তির পোস্ট দিয়েছেÑ মর্মে যে কথা বলা হচ্ছে তাকে পরিকল্পিত কথা মনে করছেন হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও ঢাকা মহানগর সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। তার মতে, যদি সত্যিই তার আইডি হ্যাক হতো তাহলে সাথে সাথেই তিনি থানাকে জানাতেন। যখন বিষয়টা জানাজানি হয়েছে ও মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে তখন তিনি আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে থানায় জিডি করেছেন। চক্রান্তের অংশ হিসেবেই সেই পোস্ট দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে মনে করছি, তিনি নিজেই এই চক্রান্ত করেছে, নিজেই পোস্ট দিয়েছে।

সূত্র মতে, যারা এই হত্যা নিয়ে কথা বলবে তাদের বিষয়েও হুশিয়ারি দেয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। ভোলার ঘটনা নিয়ে কেউ রঙ ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু, কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়। তারা শান্তিপ্রিয় ও পরমতসহিঞ্চু। একটি মহল দেশের এই শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। একজনের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক পোস্ট দিয়ে অশান্তি-হানাহানি সৃষ্টিই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া কেউ শান্তি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এগুলো নিয়ে রঙ ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার।

অন্যদিকে ভোলার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ভোলায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে দিলে সরকারের কি পতন হয়ে যেত। কিসের এত ভয়। কাদের প্রতি ভয়। ঘটনার শুরু শুক্রবার। ঘটনার পরে পুলিশের ব্যাখ্যায় মনে হয় তারা পুরো বিষয়টি আগে থেকেই জানতো। তাহলে এত সময় পেয়েও সামাল দিতে পারলো না কেন। এর কারণ সরকার ও পুলিশের কাছে জনতার কোনো মূল্য নেই। আমরা মনে করি ভোলার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত। যে কারণে ভোলাকে রক্তে রঞ্জিত করা হয়েছে। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন মোশাররফ হোসেন। তিনি আরও বলেন, আমরা সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- জনগণকে যারা অবজ্ঞা করে তাদের পরিণতি শুভ হয় না। গণমানুষের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না। যথেষ্ট হয়েছে। ভোলার গণহত্যার বিচার করতে হবে। 

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আল্লাহ ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক হিন্দু ব্যক্তির বিচারের দাবিতে গত রোববার ঈদগাহ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে তৌহিদী জনতা। সেই সমাবেশে একপর্যায়ে পুলিশ গুলি ছুড়লে চারজন নিহত হন। পুলিশের দাবি, উত্তেজিত লোকজন পুলিশের ওপর হামলা করলে তারা গুলি করতে বাধ্য হয়। অভিযোগ উঠেছে, শুক্রবার বিকেলে বিপ্লব চন্দ্র শুভর নিজের ছবিসংবলিত ফেসবুক আইডি থেকে আল্লাহ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে গালাগাল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে কয়েকজন ফেসবুক বন্ধুর কাছে মেসেজ পাঠানো হয়। যাদের মেসেজ পাঠানো হয়, তারা এর স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে দিলে লোকজন প্রতিবাদ জানানো শুরু করে। বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। এ নিয়ে বিভিন্ন মসজিদ থেকে কয়েক দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়। শুক্রবার সন্ধ্যার পর বিপ্লব চন্দ্র বোরহানউদ্দিন থানায় তার আইডি হ্যাক হয়েছে মর্মে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে আসেন। এ সময় পুলিশ বিষয়টি তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিপ্লব চন্দ্রকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তার কথা ধরে পটুয়াখালী থেকে আরেকজনকে পরেরদিন শনিবার আটক করে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই হ্যাকের ঘটনা জানবে যিনি ফেসবুক পরিচালনা করবে বা যারা হ্যাক করেছে তারাই। তাহলে পটুয়াখালী থেকে কিভাবে একজন মানুষ এই হ্যাকের খবর জানলো। তাকে কিসের ভিত্তিতে আটক করা হলো। প্রশ্ন উঠেছে, সে কিভাবে ২০ হাজার না দিলে এটি ছড়িয়ে দেয়ার কথা বললো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব কিছুর মধ্যেই যেন একটা ধোয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এখন আবার বলা হচ্ছে, পটুয়াখালী থেকে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে এর সাথে সম্পৃক্ত নয়। আরো কেউ এর সাথে জড়িত। 

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হচ্ছে, এই হ্যাকের খবর কখন জানাজানি হলো। আর কখন ফেসবুক আইডির মালিক হিন্দু ব্যক্তিটি থানায় অভিযোগ দিতে এলো। তৌহিদি জনতার বিক্ষোভের আগে সে কি জানতো না তার আইডি হ্যাক হয়েছে? সে কেন আগে জানালো না? তাহলে কি শর্ষের মধ্যেই ভূত- এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনার দিন সরকারের কারো কারো দেয়া বক্তব্য ও সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্যের মধ্যে বিশাল ফারাক লক্ষ করা যাচ্ছে। ঘটনার দিন সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ফেসবুকে নানা অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। বলা হয়, ভোলার বোরহানউদ্দিনে এক হিন্দু ছেলের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে তার নাম দিয়ে কতগুলো মিথ্যাচার করা হয়েছে। যার ফেসবুক হ্যাক করেছে তাকে আবার ফোন করে বিশ হাজার টাকাও চেয়েছে। বিশ হাজার টাকা না দিলে তার ফেসবুক আইডিতে এমন কথা লিখবে যে, সেটা তার জন্য ক্ষতির কারণ হবে। এমন হুমকির পর পরই ওই হিন্দু ছেলেটা পুলিশ স্টেশনে গিয়ে জিডি করে। এরপরও পুলিশ কিন্তু তাকে আটক করে রাখে। পরে যে ফোন করে হুমকি দিয়ে টাকা চেয়েছিল তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আরও বলা হয়, হিন্দু ছেলেটার আইডি হ্যাকিং করে তার কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে তার নাম করে যে কথাগুলো লিখেছে, সে তো একজন মুসলমানের ছেলে। একজন মুসলমান হয়ে কীভাবে নবী করিম (সা.) নিয়ে এই ধরনের বাজে কথা লিখে? এবং আরেকজনকে জড়াবার চেষ্টা করতে পারে। আবার সেই কথা ধরে সেখানকার একজন পীর বেশকিছু লোককে জড়ো করে। যখন পুলিশ তাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে, তখন তারা পুলিশের ওপর চড়াও হয়েছে। পুলিশের ওপর চড়াও হলে তারা নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য একটা ঘরে আশ্রয় নেয়। সেখানেও তারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। এ সময় পুলিশের এক এসআইয়ের গায়ে গুলি লাগে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে এসপি, ডিসি সকলেই পৌঁছে যায়। এক পর্যায়ে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছুঁড়লে বেশ অনেক জন আহত হয়। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। শেখ হাসিনা বলেন, কেউ যদি সত্যিকার ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে। যদি তাদের নবী করিম (সা.) প্রতি এতটুকু সম্মান থাকে, তাহলে আরেকজনের ক্ষতি করার জন্য এই ধরনের জঘন্য কথা কিভাবে লেখে? এটাও আমার একটা প্রশ্ন।” 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের একজন দায়িত্বশীল যখন কোনো বিষয়ে কথা বলেন তখন তিনি দায়িত্ব নিয়েই কথা বলেন। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দু ছেলেটার আইডি হ্যাকিং করে তার কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে তার নাম করে যে কথাগুলো লিখেছে, সে তো একজন মুসলমানের ছেলে। একজন মুসলমান হয়ে কীভাবে নবী করিম (সা.) নিয়ে এই ধরনের বাজে কথা লিখে’? তাহলে বুঝা যাচ্ছে, সেদিনই অপরাধীদের সনাক্ত করা হয়েছে। তাদের ধরা হয়েছে কিন্তু গত কয়েকদিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ নেতাসহ প্রশাসনের লোকজন বলছে, এখনো ফরাধীদের সনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। আরো কিছু দিন সশয় লাগবে। মানুষের মনে জিজ্ঞাসা, তাহলে ঘটনার দিনে সরকারের দেয়া বক্তব্য কি আইওয়াশ ছিল?

আইটি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপ্লব চন্দ্র শুভর নিজের ছবিসংবলিত ফেসবুক আইডি থেকে আল্লাহ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে গালাগাল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য যারা করেছে তাদের বিষয়ে ফেসবুক কর্তপক্ষ সঠিক তথ্য দিতে পারবে। তারা এই তথ্য দিতে বাধ্য। জানা গেছে, ফেসবুক কর্ক্ষৃপক্ষ সরকার ও প্রশাসনকে সার্বিক ক্লু দিয়েছে। সরকার সংশ্লিষ্টরা এরই মধ্যে নিশ্চিৎ হয়েছে যে, কারা এর সাথে জড়িত এবং বলাও হয়েছে যে, হ্যাকার চিহ্নিত হয়েছে। তাহলে এখনো কেন যারা জড়িত তাদের সনাক্ত করা হচ্ছেনা। তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছেনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলে বলেছেন, সরকারের নানা ধরণের বক্তব্যে ফেসবুক আইডির আসল মালিকের বিষয়ে ধোয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোলার হত্যাকান্ডের ঘটনার তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অতীতের মতো এই ঘটনাটিও হারিয়ে যেতে বসেছে। ইতিপূর্বে ফেসবুকে যারাই ধর্ম অবমাননা করেছিল তাদের কারোরই তেমন বিচার হয়নি জানা গেছে। অতীতেও একই কায়দায় এই ধরণের কর্মকান্ড ঘটানো হয়েছিল।  ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এবং ২০১৭ সালে রংপুরে একই কায়দায়, একই অভিযোগে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ করে ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করা হয়। এসবের সাথে কারা জড়িত তা নিয়ে মিডিয়ায় লেখালেখি হলেও কার্যত কোনো বিচার হয়নি। প্রত্যেকটি ঘটনায় পুলিশ একাধিক মামলা করেছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে কিন্তু কোনো মামলারই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়নি। বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজা দেয়া সম্ভব হলে এ ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রবণতা হ্রাস পেতে পারে বলে অনেকের ধারণা। এবারের ঘটনাও সেদিকে যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। কারণ একটি ঘটনার পর অন্য ঘটনা ঘটলে মানুষ অতীতকে ভুলে যায়। তারা বলছেন, ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে বিচার না হলেও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মানহানিসহ হাস্যকর বিষয়ের বিচার চলছে। 

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও সমাজচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা শুধু নয় বরং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভোলার ঘটনার কারণ যাই হোক না কেন আধিপত্যবাদী শক্তি এ ধরনের ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলাদেশকেও কাশ্মিরের পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে অনেকে শঙ্কিত। এক প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ মজহার বলেন, এটা অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, বারবার কোনো না কোনো হিন্দু ছেলের আইডি হ্যাক হয় এবং ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। প্যাটার্ন তো একই রকম। এটাও অবিশ্বাস্য মনে হয় যে এই ধরনের হ্যাকিং সরকার প্রতিরোধ বা বন্ধ করতে সক্ষম নয়। আসলে কেন পারে না? ফরহাদ মজহার বলেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারছে কারণ ক্ষমতাসীন সরকার মনে করে দেশের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতী শক্তিকে প্রশ্রয় না দিয়ে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। হিন্দুত্ববাদী শক্তির সমর্থন নিয়েই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।এক প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ মজহার বলেন, এ দেশের ইসলাম প্রিয় জনতাকে অনেক সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে। না বোঝে অন্যের পাতা ফাঁদে পা দেয়া যাবে না, যা আমরা প্রায়ই করি। ইসলামী রাজনীতির সাথে যুক্তদের বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা বাদ দিয়ে নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কোন ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অসৎ উদ্দেশ্যে কেউ যেন গুজব ছড়াতে না পারে সেই ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, ভোলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী একটি ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আপনাদের প্রথম কাজ হবে এই মিথ্যা ও ভুল তথ্যের বিভ্রান্তি যেন তৈরি না হয় সেটা নিশ্চিত করা। ফেসবুকের প্রভাব আমরা রামুতে দেখেছি, নাসিরনগরেও দেখেছি। অতি সম্প্রতি ভোলাতেও দেখেছি। সেজন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য নিয়ে সচেতনভাবে কমিউনিটি পুলিশকে কাজ করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, আমরা জঙ্গি ও সন্ত্রাস মুক্ত করেছি, মাদকও মুক্ত করতে পারবো। মাদকের সঙ্গে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ