ঢাকা, শুক্রবার 15 November 2019, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

২২ বছরেও এমপিওভুক্ত হলো না চুয়াডাঙ্গার সৃজনী মডেল হাইস্কুল

 

#৬ শতাধিক শিক্ষার্থী 

#এবার জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১৫৪জন

#অবসরে যাওয়ার কাছাকাছি অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী

#পরিবারে কান্নার রোল

এফ,এ আলমগীর,চুয়াডাঙ্গা: সব শর্ত পূরণ করেও এমপিওভুক্ত হতে পারেনি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেরার সবচেয়ে পুরনো ও ভালো মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৃজনী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ। এতে এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ। শিক্ষক-কর্মচারীরা হয়ে পড়েছেন হতাশ। এখন তারা কী করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। ২২ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর বয়সও প্রায় শেষের দিকে। শূন্য হাতেই হয়তো অবসরে যেতে হবে তাদের। তবে এমপিওভুক্তির পুনর্বিবেচনার জন্য মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করবেন তারা। এতেও প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করা না হলে আদালতের শরণাপন্ন হবেন বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। 

জানা গেছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৯৭ সালে আলমডাঙ্গা উপজেলার গ্রামীণ এলাকায় সৃজনী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা অঞ্চলকে এগিয়ে নিতেই এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে। ১ জানুয়ারি ২০০৫ থেকে নিম্নমাধ্যমিক এবং ১ জানুয়ারি ২০১০ থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায় বিদ্যালয়টি।

বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৬ শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে। বিদ্যালয়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো ও খেলার মাঠ। সম্প্রতি শিক্ষাপ্রকৌশল অধিদফতর এ বিদ্যালয়ে ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চারতলা ভিতবিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবনও নির্মাণ করেছে।

২০১০ সালেও একবার বিদ্যালয়টি এমপিও বঞ্চিত হয়। শিক্ষক-কর্মচারীরা আশা করেছিলেন যেহেতু এমপিও নীতিমালার সব শর্ত পূরণ আছে এবার হয়তো বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হবে। কিন্তু ২৩ অক্টোবর ২ হাজার ৭৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হলেও ওই তালিকায় নেই সৃজনী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের নাম।

উপজেলার সব ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত বিদ্যালয়টিতে কাম্য শিক্ষার্থীর চেয়েও কয়েকগুন বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কয়েকগুন বেশি। এছাড়া পাসের হারও ৭০ ভাগের ওপরে। তাহলে কেন বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলো না এ প্রশ্ন এলাকাবাসীর?

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘শিক্ষায় অনগ্রসর ও নারী শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা এলাকার সৃজনী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ শিক্ষার ক্ষেত্রে ২২ বছর ধরে ভূমিকা পালন করে আসছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এলাকার লোকজন খুবই ক্ষুব্ধ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু সরকারের প্রধান। তাই যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির তালিকায় ঠাঁই পাবে বলে আমার বিশ্বাস।’

প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আহাদ আলী বলেন ‘আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত আকারে আবেদন জানাব যাতে বিদ্যালয়টিকে পূর্বে ঘোষিত এমপিওভুক্তির আওতায় আনা হয়। তা না হলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’

সহকারী প্রধান শিক্ষক আতিকুল হক বুলবুল জানান, ‘আলমডাঙ্গা উপজেলার একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের সৃজনী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ। আমাদের বিদ্যালয় থেকে এবার জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১৫৪ ছাত্র-ছাত্রী। প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে। তাহলে এমপিও কমিটি কী ধরনের যাচাই বাছাই করল যে, আমাদের চেয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলো আর আমরা নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করেও এমপিও পেলাম না? বিদ্যালয়টিকে এমপিওভুক্ত করার ব্যাপারে আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন জানাই।’

 

বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী বিচিত্র কুমার বিশ্বাসের বয়স ষাটের কোটায়। তার আর মাত্র ৪ বছর চাকরি আছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হব না। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস ২২ বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরি করছি। শেষমেশ আমাকে খালি হাতেই অবসরে যেতে হবে।’

বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান মঞ্জুশ্রী অধিকারী ও সহকারী শিক্ষক শেফালী রানী সরকার জানান, ‘আমাদের আর বেশিদিন চাকরি নেই। কিন্তু ভেবেছিলাম শেষ বয়সে হয়তো বেতন-ভাতার সরকারি অংশটা কিছুদিন খেয়ে পরে যেতে পারব কিন্তু তা হলো না। আমাদের পরিবারজুড়ে চলছে কান্নাকাটি। আমরা এখন কী করব কিছু ভেবে পাচ্ছি না।’

সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান জানান, ‘আমাদের ওপর অবিচার করা হয়েছে। আমরা নীতিমালার সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির জন্য বিধিসম্মতভাবে অনলাইনে আবেদন করি। কিন্তু এখন দেখছি শুভঙ্করের ফাঁকি। এলাকার দুর্বল অনেক প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হলেও আমাদের যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেয়া হয়েছে। নিম্নমাধ্যমিক বা মাধ্যমিক কোনো স্তরকেই এমপিওভুক্ত করা হলো না। জানি না এটা মন্ত্রণালয়ের ভুল নাকি ইচ্ছাকৃত।’

ডিএস/এএইচ

 

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ