ঢাকা, শুক্রবার 1 November 2019, ১৭ কার্তিক ১৪২৬, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

গ্যাস সিলিন্ডার বাড়ছে মৃত্যুসংখ্যা

মুহাম্মদ নূরে আলম: সারা দেশে সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে ঝোক বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর ঝুকিঁও। রান্নার কাজে এলপিজির ব্যবহার শুরু হয় ২০০৫ সালে। দেশে এখন ২ কোটির বেশি এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহৃরিত হচ্ছে। সারাদেশে প্রতি সপ্তাহেই গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণে আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এই বিষয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় আহত ও নিহতের সংখ্যাও জানা যাচ্ছে না। তবে গত ১০ বছরে গ্যাস সিলিন্ডার-সংক্রান্ত ৯ শতাধিক ঘটনায় দেড় হাজার লোক হতাহত হয়েছেন। গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার বাজারে ছাড়ার আগে এর মান পরীক্ষা করা হয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দেওয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে। অনেক ক্ষেত্রে সিলিন্ডারগুলো নিয়মিত পরীক্ষাও করা হয় না। তবে এ রিটেস্ট সুবিধাও দেশে পর্যাপ্ত নয়। সারাদেশে মাত্র ১৫টি রিটেস্ট সেন্টার রয়েছে। সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানো হলে রিটেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকিও কমবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এইসব তথ্য জানা যায়। 

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, অসচেতনতা, মানহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার এবং উপযুক্ত তদারকির অভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে। তবুও সিলিন্ডারের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার ও পরিবহন থামছে না। বিশেষ করে খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডার বিপণন ও বিতরণে নিয়ম মানা হচ্ছে না। এতে সিলিন্ডারের স্থায়িত্ব কমছে। ঘটছে দুর্ঘটনা। চাহিদা অনুযায়ী বার্ষিক ১৫ লাখ টনের বেশি এলপিজি সরবরাহ করা দরকার। তবে আমদানি ও বিক্রি হচ্ছে বার্ষিক প্রায় ১০ লাখ টন। এর মধ্যে ২০ হাজার টন এলপিজি সরকারিভাবে বিক্রি হয়। আর বাজারে বসুন্ধরা, ওমেরা, বেক্সিমকো, পেট্রোম্যাক্স, টোটাল, বিএম এলপি গ্যাস, এনার্জিপ্যাকের জি গ্যাস, ইউনিগ্যাস, ইউরোগ্যাস, ইউনিভার্সাল, ইন্ট্রাকো, যমুনা, সেনা এলপিজি নামে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস বিক্রি করছে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে প্রায় ৯০ লাখ এলপিজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সিলিন্ডার রয়েছে। যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) সিলিন্ডার আছে প্রায় ৪ লাখ। রিটেস্টের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত বাতিল হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার এলপিজি ও ২০০ থেকে ৩০০ সিএনজি সিলিন্ডার। তবে এ রিটেস্ট সুবিধাও দেশে পর্যাপ্ত নয়। সারাদেশে মাত্র ১৫টি রিটেস্ট সেন্টার রয়েছে। সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানো হলে রিটেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকিও কমবে।

সূত্রে জানা যায়, দেশে সিলিন্ডার গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজি আমদানির লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। গত ৯ বছর ধরে আবাসিকে পাইপলাইনে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পাইপলাইনে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধের পর কয়েক বছরে গ্যাস সিলিন্ডার বা বোতলজাত গ্যাসের ব্যবহার দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাসাবাড়ি ছাড়াও হোটেল, রেস্তোরাঁ, অটোমোবাইল, ক্ষুদ্রশিল্পের জ্বালানি হিসেবে এলপি গ্যাস ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, গ্যাস বিস্ফোরণে ২০১৮ সালে ১৭৮, ২০১৭ সালে ৭৯, ২০১৬ সালে ১৩১ এবং ২০১৫ সালে ৮০টি দুর্ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় গ্যাসসংক্রান্ত যত দুর্ঘটনা ঘটেছে বেশিরভাগই অসচেতনতার অভাবে হয়েছে। আর একেকটি দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় অমূল্য প্রাণ। গ্যাস ব্যবহারে একটু সচেতন হলেই প্রাণহানীর মতো দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া এবং অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ ব্যবহারের ফলে এগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে এইসব গ্যাস সিলিন্ডার। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ব্যবসায়ী নিজেরাই সিলিন্ডার ভরে গ্যাস বিক্রি করছে। এটাকে বলা হচ্ছে ক্রস ফিলিং। এটা অনিরাপদ। কারণ এলপিজি কোম্পানিগুলোতে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা হয়। সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বাল্ক্ব ও সেফটি ক্যাপ বসানো হয়। আর ক্রস ফিলিংয়ে হাতের সাহায্যে বাল্ক্ব বসানো হয়। তাই সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। 

সূত্রে জানা যায়, এলএনজি আমদানির পর পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ দেয়ার পক্ষে বিশেষ কমিটিও তাদের মতামত দেয়। চলতি মাসে একনেক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাসাবাড়িতে নতুন করে সংযোগ বন্ধ রাখার পক্ষে তার অভিমত ব্যক্ত করেন। এছাড়া গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ায় এখন বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ স্থায়ীভাবেই বন্ধ হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রাকৃতিক গ্যাস শুধু বিদ্যুৎ ও শিল্পে ব্যবহার করা হবে।

এদিকে, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দ্রুত বাড়ছে এলপিজির ব্যবহার। গত ৯ বছরে দেশে এলপিজির ব্যবহার ৭ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে যাবে। ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে দেশে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ৪৪ হাজার ৯৭৪ টন। ৯ বছরের ব্যবধানে এ চাহিদা ৭ লাখ ১৩ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে। ২০৪১ সালে এলপিজির চাহিদা ৮০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলছে জ্বালানি বিভাগ।

রাজধানীর মগবাজার, রামপুরা, মুগদা-মান্ডাসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায় মহল্লার দোকানের কর্মীরা সাইকেলের দু'পাশে সিলিন্ডার বহনের জন্য বিশেষ কাঠামো তৈরি করেছে। দু'পাশে দুটি সিলিন্ডার রাখার পর তাদের ওপর শুইয়ে আরেকটি সিলিন্ডার বহন করা হচ্ছে। জানতে চাইলে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার একজন সিলিন্ডার ব্যবসায়ী বলেন, আশপাশের গ্রাহকদের কাছে সাইকেলের মাধ্যমে সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হয়। এমন করে পৌঁছানো তো নিরাপদ কি-না- এমন প্রশ্নে ওই ব্যবসায়ী বলেন, দু-একটি সিলিন্ডার তো পিকআপে করে দিয়ে আসা সম্ভব নয়। যদিও গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা ১৯৯১-এর চতুর্থ পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার কোনো দ্বিচক্রযানে (মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল) পরিবহন করা যাবে না। কোনো যানে সিলিন্ডার পরিবহনের ক্ষেত্রে সিলিন্ডারের কোনো অংশ ওই যানের বাইরে থাকা চলবে না।

ওমেরা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, তারা ডিলার পর্যন্ত সিলিন্ডার পৌঁছাতে নিরাপত্তার সব নিয়ম মেনে চলেন। মূলত অনিয়মটা হয় ডিলার পর্যায়ে। তারা সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও পরিবহনে নিয়মগুলো মানতে চান না। ছোট ছোট স্থানে এলোমেলোভাবে সিলিন্ডার রাখেন। খরচ বাঁচাতে সাইকেলে করে পরিবহন করেন। যদিও বারবার তাদের বলে দেওয়া হয়, সিলিন্ডার কখনও হেলে বা শুইয়ে পরিবহন করা যাবে না, দুর্ঘটনা ঘটবে। এজন্য ডিলারদের নিয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনও করা হয়।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরিচালক মো. সামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বহনে ও সংরক্ষণে বিশেষ সতর্কতা জরুরি। সাইকেলের মতো বাহনে সিলিন্ডার বহন ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে গ্রাহক ও ডিলার সবাইকে সচেতন হতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাদের সীমিত জনবলে মাঠ পর্যায়ে বিশদ তদারকি সম্ভব হয় না।

সিলিন্ডার ব্যবহার আসলে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ জানতে চাইলে যমুনা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলায়েত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, বাজারে তাদের ৫০ লাখ সিলিন্ডার আছে। প্রতিটির মেয়াদ ২৫ থেকে ৩০ বছর। এই মেয়াদকালে তিনবার সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে ১০ বছর, এরপর ১৫ বছর, এরপর পাঁচ বছর পর। এ ছাড়া প্রতিবার গ্যাস ভরার সময় তারা হাইড্রো টেস্ট করেন। কোনো সমস্যা দেখলে সেই সিলিন্ডার বাতিল ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনা ঘটে ব্যবহারে অসচেতনতা ও অসাধু ডিলারদের অসৎ ব্যবসার কারণে। তার মতে, গ্রাহকরা সচেতন নন।

দুর্ঘটনা এড়ানোর পরামর্শ হিসেবে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, সিলিন্ডারের গ্যাস লিক থেকেই কিন্তু মূল সমস্যা। তাই সিলিন্ডার লিক হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। এটা করার জন্য পানিতে সাবানের গুঁড়া মিশিয়ে ফেনা তৈরি করুন। এবার ফেনা হোস পাইপ, রেগুলেটর, ভাল্ব ইত্যাদিতে লাগান। যদি দেখেন সাবান পানির ফোঁটা বড় হচ্ছে, তাহলে বুঝবেন লিক হচ্ছে গ্যাস। দ্রুত ব্যবস্থা নিন। বাসাবাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাসের দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু বিষয় সবসময় জানা থাকা জরুরি। ডেমন সিলিন্ডারের গ্যাস খুব বাজে গন্ধযুক্ত। লিক হলে উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাই এমন উৎকট গন্ধ পেলে আগুন তো জ্বালাবেন না, উল্টো বাসার বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিন। প্রয়োজনে মেইন সুইচ বন্ধ করুন। দেশলাই, মোমবাতি বা আগুনের অন্য কিছু জ্বালানো যাবে না কোনোভাবেই। ঘরের দরজা–জানালা খুলে বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থা করুন। সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করুন। সেফটি ক্যাপ লাগান।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, সিলিন্ডারের সমস্যার কারণ থেকেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে সিলিন্ডার বিক্রিকারী কোম্পানিগুলো বলছে, অসচেতনতা ও অসতর্কতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকারিভাবে সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। গ্রাহকদের সচেতন করার বিষয়েও নেই কোনো কিছু। এমনকি কোম্পানিগুলো যে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারে ভরে বিক্রি করছে তারও যাচাই-বাছাই করার সুযোগ কম। এলপি গ্যাস ব্যবহারের নীতিমালা না থাকার কারণেই এই সমস্যার কোনো সমাধানও হচ্ছে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ম তামিম বলেন, এলপি গ্যাস সিলিন্ডারজাত ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর আরেকটু সতর্ক ও সচেতন হওয়া দরকার। আর সরকারের উচিত মনিটরিং বাড়ানো। সিলিন্ডারের মান ভালো হলে এবং সিলিন্ডারের মুখের ভাল্ভ ঠিকঠাক থাকলে দুর্ঘটনার তেমন আশঙ্কা এলপি গ্যাসে থাকে না। দুর্ঘটনাগুলো প্রধানত হয় ভাল্ভের সমস্যা থেকে গ্যাস লিক হয়ে।

এলপি গ্যাসের কয়েকজন ডিলার বলেন, সিলিন্ডারগুলোর পরিবহন এবং ট্রাকে ওঠানো-নামানোর পদ্ধতি মোটেই আধুনিক নয়। এ ধরনের দাহ্য পদার্থের পরিবহন ও নাড়াচাড়া হচ্ছে চাল-ডাল-পেঁয়াজের বস্তার মতো। আর অধিকাংশ ডিলার যে পরিবেশে এবং যে অবস্থায় সিলিন্ডারগুলো রাখেন, তা-ও নিরাপদ কিংবা যথাযথ নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ