ঢাকা, মঙ্গলবার 5 November 2019, ২১ কার্তিক ১৪২৬, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থার অবনতি সংকটের ইঙ্গিত

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: ব্যাংক খাতকে যদি একটি দেশের অর্থনীতির হৃৎপি- ধরা হয়, তাহলে সেখানে রক্তক্ষরণ ঘটছে অনেক দিন ধরে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ক্যানসারের মতো, একবার দেখা দিলে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা অর্থনীতিতে। দিন যত যাচ্ছে সংকটের মাত্রা তত বাড়ছে। ভেঙে পড়ছে একের পর এক ব্যাংকের আর্থিক ভিত। ফলে আস্তে আস্তে তলানীতে গিয়ে ঠেকছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা। আবার দফায় দফায় পুন:তফসিল করায় আড়ালেই থাকছে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র। ফলে ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থার অবনতি সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
সরকারি ব্যাংকের সমস্যা ছড়িয়ে পড়ছে বেসরকারি ব্যাংকেও। নিয়ম না মেনে ঋণ বিতরণ, বেনামি ঋণ, সুশাসনের অভাব এসবই ব্যাংক খাতের সামগ্রিক চিত্র। এর মধ্যেও অবশ্য ভালো চলছে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংক, বাকিরা নানা সংকটে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ ব্যাংক খাতের নেতৃত্ব নিয়েও। অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংকও নয়, ব্যাংক খাতের ওপর এখন একক নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি ব্যাংকমালিকদের সংগঠনের।
গত ১০ বছরে ব্যাংক খাত থেকে জালিয়াতি হয়েছে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। গত ১০ বছরে জনতা ব্যাংক থেকে অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপ মিলে ১১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে, বেসিক ব্যাংক থেকে চলে গেছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে আত্মসাৎ হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা, বিসমিল্লাহ গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে আরও ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা।
এদিকে ঋণখেলাপি হয়ে গেলে ব্যাংকগুলো তা দফায় দফায় পুনঃ তফসিল করছে। যখন নিয়মের মধ্যে পুনঃ তফসিল করতে পারছে না, তখন বিশেষ অনুমোদন দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে অনেক সময় ঋণ আদায় না হলেও তা খেলাপির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে না। ফলে আড়ালেই থাকছে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই ২০১২ সালে ৫ হাজার ৫০০ কোটি, ২০১৩ সালে ১৮ হাজার ২০ কোটি ও ২০১৪ সালে ১২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিলের অনুমোদন দেয়। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ১৪০ কোটি, ২০১৬ সালে ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা ও ২০১৭ সালে ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৮ সালেও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়। এভাবে ঋণ পুনঃ তফসিলের পরও প্রতিনিয়ত বাড়ছে খেলাপি ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ সামগ্রিক ব্যাংক খাত নিয়ে বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সবার মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আর যারা দোষী, তাদের দ্রুত দৃশ্যমান বিচারের আওতায় আনতে হবে। দোষীরা সবার চেনা। এসব উদ্যোগই পারে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, খেলাপি ঋণ পরিশোধের নিয়মাবলি একেবারেই মানা হচ্ছে না। সাধারণত দুবারের বেশি ঋণ পুনঃ তফসিল হয় না। পুনঃ তফসিল করলে ঋণের ১০ শতাংশ অবশ্যই নগদে আদায় করতে হবে। কিস্তি থেকে কেটে রাখলে তা হবে না, নগদে আদায় করতে হবে। যদি কেউ পুনঃ তফসিলের শর্ত ভঙ্গ করে তবে তা বাতিল হয়ে যাবে। ব্যাংকগুলোকে এসব নিয়ম মানতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাধ্য করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে নিমজ্জিম আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে নতুন করে লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে আরও দুটি ব্যাংক। এছাড়া ১২টি ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগের মুনাফা গত বছরেও কমেছিল। অর্থাৎ বেশির ভাগ ব্যাংকের মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমেই যাচ্ছে। মুনাফার পাশাপাশি ব্যাংক কোম্পানিগুলোর ক্যাশ ফ্লো বা পরিচালন নগদ প্রবাহ এবং সম্পদের নেতিবাচক প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। তালিকাভুক্ত ছয়টি ব্যাংকের ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। সম্পদের মূল্য কমেছে চারটির এবং একটির সম্পদের মূল্য ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) পর্যন্ত ২৯টি ব্যাংক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা আইসিবি ইসলামী ব্যাংক লোকসান থেকে বের হতে পারেনি। চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২০ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৩ পয়সা। ব্যাংকটির সঙ্গে এবার নতুন করে লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এর মধ্যে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি ৩০ পয়সা মুনাফা করেছিল ব্যাংকটি। শেয়ারপ্রতি ১২ পয়সা লোকসান করা এক্সিম ব্যাংক গত বছর শেয়ারপ্রতি ২ পয়সা লোকসান করেছিল। তবে ২০১৭ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ব্যাংক দুটি মুনাফা করেছিল।
এদিকে মুনাফায় থাকলেও ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথ ইস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে।
এর মধ্যে সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংকের মুনাফা গত বছরও কমেছিল। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক কোম্পানিগুলোর আর্থিক চিত্র অশনিসংকেত দিচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। এগুলো ব্যাংক খাতের সংকটের চিত্রই ইঙ্গিত করছে। নানা রকম দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়া এবং সার্বিকভাবে ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমে যাওয়া ও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর সংকটের পেছনের অন্যতম কারণ।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতের চিত্র অবশ্যই সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে বেশির ভাগ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। এর পেছনের অন্যতম কারণ হিসেবে রয়েছে- ঋণ বিতরণ থেকে আয় কমে যাওয়া, বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়া। এর সঙ্গে ব্যাংকগুলো ব্যয় কমাতে পারছে না, অথচ পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলো একধরনের সমস্যার মধ্যে আছে। মানুষের সঞ্চয় কমে গেছে। অনেকে ব্যাংকমুখী হচ্ছেন না। আবার লোনও দিতে পারছেন না। পুঁজিবাজারের অবস্থাও ভালো নয়। এটিও ব্যাংকের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংকগুলো যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা শুরু হয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক দিয়ে। পর্যায়ক্রমে তা সংক্রামক ব্যাধির মতো সার্বিক ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা দুঃখজনক ব্যাপার।
এদিকে ছয়টি ব্যাংকের ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ব্যাংকের ক্যাশ ফ্লো গত বছরও ঋণাত্মক ছিল। চলতি বছর দুটি ব্যাংকের ক্যাশ ফ্লো নতুন করে ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। অবশ্য চলতি বছর ঋণাত্মক ক্যাশ ফ্লো থেকে নয়টি ব্যাংক বেরিয়ে এসেছে। ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ নগদ টাকার সংকট দেখা দেয়া। চলতি বছর ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক অবস্থায় থাকা বা নগদ অর্থ সংকটে পড়া ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- সিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক।
এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে রূপালী ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি ক্যাশ ফ্লো দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৬৭ টাকা ৮ পয়সা। বড় ধরনের নগদ অর্থ সংকটে থাকা ব্যাংকটির সম্পদের মূল্য কমে গেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৯ টাকা ৯০ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪১ টাকা ৫৭ পয়সা।
আগের বছরের তুলনায় সম্পদের মূল্য কমে যাওয়া ব্যাংকের তালিকায় আরও রয়েছে- যমুনা ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও এবি ব্যাংক। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের সম্পদের মূল্য আগের মতোই ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, পুঁজিবাজার বর্তমানে যে দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এজন্য প্রধানত দায়ী ব্যাংক খাত। ব্যাংক খাতের সংকটের কারণে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। এ খাতের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে পুঁজিবাজার আপনা-আপনিই ঘুরে দাঁড়াবে।
এমতাবস্থায় ব্যাংক খাত কীভাবে চলবে, তা এখন ঠিক করে দিচ্ছে ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। তাদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমিয়েছে সরকার। এক পরিবার থেকে চারজন পরিচালক ও একটানা তিন মেয়াদে থাকার বিধান রেখে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়েছে। ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কমিয়েছে নগদ জমার হার (সিআরআর)। সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে জমা রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো ফল দিচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ নিয়ে বলেন, ব্যাংক চলে আমানতকারীদের টাকায়। এতে মালিকদের অংশগ্রহণ মাত্র ১০ শতাংশ। ৯০ শতাংশ আমানতকারীকে সুরক্ষা দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অথচ ১০ শতাংশের মালিকেরাই এখন সব করছে। এসব বন্ধ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুরোপুরি স্বাধীন করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ