ঢাকা, মঙ্গলবার 5 November 2019, ২১ কার্তিক ১৪২৬, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

সাদেক হোসেন খোকা আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার: অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহী ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময় সোমবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে (নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৩ টায়) তিনি ইন্তিকাল করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন এক ফেসবুক পোস্টে তার পিতার ইন্তিকালের খবর জানিয়েছেন। এর আগে গতকাল দুপুরে বিএনপির চেয়ারপার্সনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য জানান। সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমীর মকবুল আহমাদ। এ ছাড়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনীতিক, পেশাজীবি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। নেতৃবৃন্দ মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।  উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর নিউ ইয়র্কের স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে ভর্তি হওয়ার পর ২৭ অক্টোবর সাদেক হোসেন খোকার শ্বাসনালী থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়। এরপরেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
জীবিত অবস্থায় দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। এখন তার লাশ দেশে আনার চেষ্টা করছে তার পরিবার। এ বিষয়ে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।  সাদেক হোসেন খোকার পরিবারের বরাত দিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেসউইং কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান এসব তথ্য জানান। শায়রুল বলেন, স্ত্রী ইসমত হোসেন ও ছেলে ইশরাক হোসেন চেষ্টা চালাচ্ছেন সাদেক হোসেন খোকার লাশ দেশে নিয়ে আনার। যেহেতু তাদের পাসপোর্ট নেই, সেহেতু নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশে ফেরার একমাত্র উপায় ট্রাভেল পারমিট। আর এই পারমিট দেওয়ার এখতিয়ার নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের দূতাবাস, তথা বাংলাদেশ সরকারের। সে কারণে সাদেক হোসেন খোকার পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের রাজনীতি থেকে সাদেক হোসেন খোকা বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি সাদেক হোসেন খোকার ক্রীড়া সংগঠন হিসেবেও ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক পরিচিত রয়েছে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ঢাকার সূত্রাপুর-কোতয়ালী আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাদেক হোসেন খোকা অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত শেষ মেয়র এবং খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ সালের ১৪ মে সাদেক হোসেন খোকা চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। সেখানে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে দেশে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা হয় এবং কয়েকটিতে আদালত সাজাও দেন। তবে পাসপোর্ট জটিলতায় ইচ্ছে থাকলেও এতদিন দেশে ফিরতে পারেন নি সাদেক হোসেন খোকা। ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ মে সপরিবারে নিউইয়র্ক যান খোকা। এরপর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিউইয়র্কেই থেকেছেন তিনি।
ভিজিট ভিসার নিয়ম অনুযায়ী, ছয় মাস পর পর যাওয়া-আসা করে আমেরিকার ভিসা বৈধ রাখতে হয়। ২০১৭ সালে খোকা ও তার স্ত্রী ইসমত হোসেনের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তারা নিউইয়র্ক কনস্যুলেটে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করলেও সেখান থেকে এতদিন কোনো সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছে সাদেক হোসেন খোকার পরিবার।
এদিকে গত ৩ নভেম্বর সাদেক হোসেন খোকা দেশে ফেরার বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, সাদেক হোসেন খোকা এবং তার স্ত্রীর নামে মামলা আছে, গ্রেফতারি পরোয়ানাও থাকতে পারে (আমি নিশ্চিত নই)। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে যা জেনেছি, তাদের আগমনের পর বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হবে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নং সেক্টর থেকে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সাদেক হোসেন খোকা।
সাদেক হোসেন খোকার লাশ দেশে আনতে সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দফতরে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। সাদেক হোসেন খোকা সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ভাল নেতৃত্বের অধিকারীও ছিলেন। রাজনীতির মাঠে আমাদের অনেক স্মৃতি আছে। দল আলাদা হলেও ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। আমি তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাচ্ছি। তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাদেক হোসেন খোকার লাশ দেশে আনতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে। মৃত্যুর আগেই তিনি দেশে আসার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এজন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে এরইমধ্যে তাকে আনার জন্য বলা হয়েছে।
লাশ দেশে আসার বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে আমাদের কিছু করার নেই। এই বিষয়টি এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় দেখবে। সাদেক হোসেন খোকার পরিবার যদি নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট এ যোগাযোগ করে তাহলে ট্রাভেল পাশ দেবে। সেই পাশ দিয়ে তারা লাশু দেশে আনতে পারবেন।
জন্ম ১৯৫২ সালের ১২ মে মুন্সিগঞ্জে সৈয়দপুরে। বাবা-মায়ের সাথে শিশুকাল থেকেই বসবাস পুরানো ঢাকার গোপীবাগে। বাবা এম এ করীম প্রকৌশলী ছিলেন। শিশুকাল থেকেই বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সাদেক হোসেন খোকার জীবন। একাত্তরের স্বাধীনতার উত্তাল সংগ্রামের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে মা-বাবাকে না জানিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যান বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে।  একাত্তরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনো বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। দুর্র্দষ গেলিরা ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। ডিএফপি ছাড়া রাজারবাগের কাছে মোমিনবাগে পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়, ঢাকা হলের পেছনে এয়ারফোর্সের রিক্রুটিং সেন্টারও খোকার নেতৃত্বে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় সফলভাবে।সাদেক হোসেন খোকা তার ছোট পরিবারের রেখে গেছেন স্ত্রী ইসমত হোসেন, একমাত্র মেয়ে সারিকা সাদেক এবং দুই ছেলে ইসরাক হোসেন ও ইসফাক হোসেনকে।
শিশুকাল ও কৈশোরের শিক্ষাজীবন কেটেছে পুরনো ঢাকায়। গোপীবাগ রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল, কলতাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়দেবপুর রানী বিলাস মনি উচ্চ বালক বিদ্যালয়, পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ হয়ে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনো বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্র্রি লাভ করেন তিনি। ছাত্র জীবনে রাজনীতির শুরুটা বাম রাজনীতি দিয়ে। ইউনাইটেড পিপলস লীগ(ইউপিপি-কাজী জাফর) এবং পরে ন্যাপ ভাসানীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে যখন দলের হাল ধরে খালেদা জিয়া সেই সময়ে ১৯৮৪ সালে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতির যাত্রা শুরু করে তিনি। তৃনমূল পর্যায় থেকে নেতৃত্ব পেয়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যান পদে দায়িত্বে ছিলেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। ঢাকা সিটি মেয়র হিসেবেই সাদেক হোসেন খোকা দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বরণ্যে শিল্পী-সাহিত্যিকদের নামে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করেন।
বিএনপির ঢাকা মহানগরের সভাপতির পাশাপাশি সাদেক হোসেন খোকা দলের নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। সর্বশেষে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রভাগে ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। আপাদমস্তক রাজনীতি ছিলেন তিনি। যখনই কোথাও মানুষের বিপদ হয়েছে, যখনই কোনো নেতা-কর্মী সংকটে পড়েছে সেটা সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক বা ক্রীড়াঙ্গনে হোক ছুটে গেছেন সাদেক হোসেন খোকা।
লন্ডনে অবস্থারত ঢাকার প্রথম মেয়র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাকালীন সদস্য ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত বলেন, সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে আমি ভীষণভাবে মর্মাহত হয়েছি। তিনি একজন তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক নেতা যিনি দলমত নির্বিশেষে মানুষের পাশে থাকতেন সবসময়, নেতা-কর্মীদের দেখভাল করতেন। ‘হি ওয়াজ ম্যান অব দি পিপলস।’ তিনি জানান, ওয়ার্ড কমিশনার দিয়ে তার প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি শুরু হয়েছিলো সময়টা জিয়াউর রহমান সাহেবের আমলে।
সাদেক হোসেন খোকা প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে গোপীবাগের একটি মিষ্টি দোকানের প্রবীন কর্মী দেবন্দ্র নাথ বলেন, খোকা ভাইয়ের মতো নেতা আর আসবে না। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময়ের যখন ম্যাডামের নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট হয় তখন ঢাকা মহানগর সংগ্রাম পরিষদের নেতার দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৯০ সালে ভারতের বাবরী মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার চেষ্টা হয়েছিলো তা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেছিলেন খোকা ভাই। তিনি পুরান ঢাকার শাখারী বাজারে এসে বলেছিলেন, সাবধান-খবরদার এখানে কেউ কিছু করলে হাত ভেঙে ফেলব। শুধু তাই নয়, স্বামীবাগের হিন্দু সম্প্রদায়ের দুইটি মন্দির ‘লোকনাথ মন্দির’ ও ‘ইসকন’ এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের দখলী জমি পুনরুদ্ধার করে দিয়েছিলেন তিনি। জনবান্ধব নেতৃত্বের কারণে সাদেক হোসেন খোকা পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর-কোতয়ালী আসনে সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে আলোচনায় আসেন। শুধু তাই নয়, ১৯৯৬ সালে ঢাকার যে ৮ টি আসনের মধ্যে ৭টিতে বিএনপির প্রার্থীরা পরাজিত হলেও সাদেক হোসেন খোকাই কেবল বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। বিএনপির পাশাপাশি দলটির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতিও ছিলেন খোকা।
মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের দায়িত্ব নেন সাদেক হোসেন খোকা। তিন বছরে ঘরোয়া ফুটবলের তৃতীয় ডিভিশন থেকে প্রথম ডিভিশনে উঠে ব্রাদার্স ইউনিয়ন। এ ছাড়া ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাব, ফরাশগঞ্জ ক্লাব এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের গর্বনিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ