ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 November 2019, ৩০ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

'গরুর দুধে সোনা' তত্ত্ব দিয়ে বেকায়দায় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি প্রধান

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: কেউ বলছেন "এক ভরি গরুর গয়না বানাব", কেউ একজন দুধ বিক্রেতার ছবি দিয়ে মশকরা করে লিখেছেন 'এটি আসলে এক স্বর্ণকারের ছবি - দুধের ড্রাম নিয়ে তিনি সোনার দোকানে চলেছেন।'

অনেকে বলেছেন 'বাংলায় আবার একটি নোবেল আসতে চলেছে।'

কেউ আবার গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়ার ছবি পোস্ট করে ক্যাপশন দিয়েছেন 'যাতে আরও একটু বেশি সোনা দেয়, সেই চেষ্টা।'

মঙ্গলবার সকাল থেকে সোনা আর গরুর দুধ নিয়ে এধরণের পোস্টে ফেসবুক ছেয়ে গেছে।

কারণটা ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি ও লোকসভার সদস্য দিলীপ ঘোষের একটি মন্তব্য।

সোমবার তিনি বর্ধমান জেলায় একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, "ভারতীয় গরুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার দুধের মধ্যে সোনার ভাগ থাকে। সেজন্য ওই দুধের রঙ একটু হলদে হয়।"

মি. ঘোষ ব্যাখ্যাও করেছেন যে কীভাবে, 'গরুর দুধে সোনা মেশে।'

"আমাদের দেশের গরুর যে কুঁজ থাকে, সেখানে স্বর্ণনাড়ি থাকে। সেখানে সূর্যের আলো পড়লে সেখান থেকে সোনা তৈরি হয়, তাই দুধের রঙ একটু হলদে - সোনালী হয়," ব্যাখ্যা দিয়েছেন মি. ঘোষ।

এই বৈশিষ্ট্য শুধু দেশি গরুরই থাকে, বিদেশি গরুর থাকে না। কারণ, মি. ঘোষের কথায়, "বিদেশি গরুর কুঁজ থাকে না। মোষের মতো সমান হয় তাদের পিঠ।"

দিলীপ ঘোষ, সভাপতি, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি

তার বক্তব্যের ভিডিওটি গণমাধ্যমে আর সামাজিক মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে।

মঙ্গলবার তিনি বিবিসিকে বলেন, "আমাদের পুজোতে দেশি গরুর দুধ-ঘি-দই লাগে। বিদেশি গরুর দুধ কাজে লাগে না পুজোয়। আর বিদেশি গরু হাম্বা করে আওয়াজও করে না। তাই ওগুলো গরুই নয়।"

"আমি একটু মজা করেই বলেছিলাম, আমাদের দেশি গরু হচ্ছে গোমাতা আর যেহেতু ওগুলো বিদেশি, তাই ওদের আন্টি বলা যেতে পারে।"

এই মন্তব্যের পরেই মঙ্গলবার সকাল থেকে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় মশকরা।

পশ্চিমবঙ্গের একটি বিখ্যাত গয়নার দোকানের নাম উল্লেখ করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন ওই দোকানের মালিক নাকি রাজ্য জুড়ে একশো খাটাল কিনতে চলেছেন।

বেশ কিছু মিম তৈরি হতেও সময় নেন নি নেটিজেনরা।

একটি মিমে পাতন পদ্ধতিতে কীভাবে 'দেশি গো মাতার দুগ্ধ' থেকে সোনা নিষ্কাশন করা যেতে পারে, একজন রীতিমতো রসায়নবিদ্যার বইয়ের ডায়াগ্রামের মতো করে দেখিয়েছেন।

একটি প্যারোডি করা হয়েছে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত 'অবনী বাড়ি আছো'র অনুকরণে।

দেশি গরু আর বিদেশি গরুর তুলনা করেও তৈরি হয়েছে মীম। যেখানে দেশি গরুর একটি ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে 'গোমাতা' আর জার্সি গরুর ছবি দিয়ে নীচে লেখা হয়েছে 'আন্টি'।

আর দুধ বিক্রেতাদের বানানো হয়েছে স্বর্ণকার।

গরুর দুধ একটু হলদেটে রংয়ের কেন হয়? জানতে চেয়েছিলাম গুজরাতের জুনাগড় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান ড. বি এ গোলাকিয়ার কাছে।

ড. গোলাকিয়া এবং তার গবেষকদের দল কয়েক বছর আগে দাবী করেছিলেন যে গোমূত্রের মধ্যে সোনা খুঁজে পেয়েছেন তারা।

কিন্তু গরুর দুধে সোনা থাকে কী না, সেটা জানা নেই ড. গোলাকিয়ার।

"আমরা গোমূত্রে সোনার উপস্থিতি পেয়েছি, কিন্তু গরুর দুধে সোনা আছে কী না, সেটার কোনও তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে নেই। গরুর দুধে হলদেটে ভাব থাকে 'ক্যারটিনয়েড'-এর কারণে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ড. গোলাকিয়া।

ক্যারট বা গাজরের থেকে এই জৈব যৌগটির নাম ক্যারটিনয়েড। সেটির রং হাল্কা হলুদ বা কমলা। এই যৌগ থাকে সবুজ গাছপালায়। গরু যখন ঘাস-পাতা খায়, তার সঙ্গেই ক্যারটিনও তার শরীরে প্রবেশ করে এবং চর্বিতে জমা হয়। সেই ক্যারটিনই তার দুধের সঙ্গে মিশে যায়।

তাই গরুর দুধে হাল্কা হলুদ ভাব দেখা যায় বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত।

গরু নিয়ে বিজেপির নানা নেতা এর আগেও নতুন-নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন।

'
দেশি গো মাতার দুগ্ধ' থেকে কীভাবে সোনা নিষ্কাশন করা যেতে পারে, তা নিয়ে ফেসবুকে রসিক ডায়াগ্রাম।

দু'হাজার সতের সালে রাজস্থানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী বাসুদেব দেবনানি মন্তব্য করেছিলেন যে গরুই একমাত্র প্রাণী, যারা নিশ্বাসের সময়ে যেমন অক্সিজেন নেয় আবার প্রশ্বাস ছাড়ার সময়েও অক্সিজেন ত্যাগ করে।

একই কথা এবছর আবারও বলেছেন বিজেপির নেতা ও উত্তরাখণ্ড রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী টি. এস. রাওয়াত। তার আরও দাবী ছিল যে গরুকে ম্যাসাজ করলে শ্বাসকষ্টের সমস্যা কমে যায় আর গরুর কাছাকাছি থাকলে যক্ষ্মারোগ নির্মূল হয়।

মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে নির্বাচিত বিজেপির সংসদ সদস্য সাধ্বী প্রজ্ঞা দাবী করেছিলেন যে তার স্তন ক্যান্সার সেরে গেছে প্রতিদিন নিয়ম করে গোমূত্র পান করার ফলে। তবে তার সেই দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন এক ক্যান্সার সার্জেন - যিনি নিজেই সাধ্বী প্রজ্ঞার দুবার ক্যান্সার অপারেশন করেছিলেন।

গরুর দুধের প্রতিষেধক ক্ষমতা নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বিবিসিকে জানিয়েছেন , "দেশি গরুর দুধে যে প্রতিষেধক ক্ষমতা থাকে, উপকারিতা থাকে, সেটা বিদেশি গরুর দুধে নেই। গরুর দুধ খেয়েই একটা মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।"

উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন যে অনেক সাধু-সন্তরা শুধু গরুর দুধ আর গঙ্গার জল খেয়েই সুস্থভাবে বেঁচে থাকেন।

-বিবিসি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ