ঢাকা, বৃহস্পতিবার 7 November 2019, ২৩ কার্তিক ১৪২৬, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

ডিএসসিসির বোর্ড সভা ডাকলেই অসুস্থ হন ২১ কাউন্সিলর!

# বেশির ভাগ কাউন্সিলর আইনই জানেন না?
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : বোর্ড সভা অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনী বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ওই সভা যখনই আহ্বান করা হবে তাতে হাজির হওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন আইনে বলা হয়েছে, মেয়র অথবা কাউন্সিলর তার স্বীয় পদ হতে অপসারণযোগ্য হবেন, ‘যদি তিনি যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতিরেকে সিটি করপোরেশনের পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন। এই আইনী বাধ্যবাধকতাও মানেননি ২১ কাউন্সিলর। তারা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কাউন্সিলর। এসব কাউন্সিলর তিনটি থেকে আটটি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন ‘যুক্তিসঙ্গত’ কারণ ছাড়াই। এসব কাউন্সিলরদের বোর্ড সভায় অনুপস্থিতিতির কারণ জানতে ‘কারণ দর্শানো’ নোটিশ দিয়েছে ডিএসসিসি। ‘অসুস্থততাকে’ তারা বোর্ড সভায় অনুপস্থিতিতির কারণ হিসাবে জবাব দিয়েছেন লিখিতভাবে।
অক্টোবর মাসের ১৮ তারিখ থেকে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর আলোচনায় আসেন ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। তিনি অনুমতি ছাড়াই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন দীর্ঘদিন ধরে। ডিএসসিসির বোর্ড সভাতেও হাজির হননা অনেকদিন। নানা কারণ ও অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে ডিএসসিসির বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ এনে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। মমিনুল হক সাঈদকে বরখাস্ত করার পরই টনক নড়ে ডিএসসিসির। তারা খোঁজ নিয়ে দেখতে পান মমিনুল হক সাঈদের মতোই এমন আরও ২১ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর নিয়মিত বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। যাদের গত ২৭ অক্টোবর কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়। সাত কার্যদিবসের মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয় ওই নোটিশে। গতকাল বুধবার ছিল নোটিশের জবাব দেয়ার শেষ দিন। জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত ২১ জনের মধ্যে ১৯ জন কাউন্সিলর নোটিশের জবাব দিয়েছেন। এদের মধ্যে একজন বাদে বাকিরা উল্লেখ করেছেন অসুস্থ্যতাজনিত কারণে সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। বাকি দুইজনের মধ্যে একজন জবাবে লিখেছেন, তিনি বোর্ড সভায় হাজির হওয়ার নোটিশ পাননি এবং জানতেন না। তিনি সময় চেয়েছেন। আরেকজন সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়ার কারণে জবাব দিতে পারেননি।
করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২১ জন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনের সভায় অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে, যারা অনুমতি ছাড়া একনাগাড়ে তিনটি থেকে ৮টি পর্যন্ত বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ৯জন ১০টি সভার বেশি অনুপস্থিত ছিলেন। কয়েকজন ১৯টি সভার মধ্যে মাত্র ৪ থেকে ৬টি সভায় উপস্থিত ছিলেন। এদের অনেকের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো, মদ, জুয়া, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ করপোরেশনের দায়িত্ব পালনেও অনীহার অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ সরকারের অনুমোদন না নিয়ে একাধিকবার বিদেশেও গেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশন থেকে মন্ত্রণালয়ে কোনও অভিযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে মন্ত্রণালয় থেকেও কোনও ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
জানা গেছে, ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদ করপোরেশনের অনুষ্ঠিত ১৯টি সভার মধ্যে মাত্র ছয়টি বোর্ড সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, সপ্তম থেকে দশম, ১২তম থেকে ১৭তম পর্যন্ত মোট ১৩টি সভায় উপস্থিত ছিলেন না।
২০১৫ সালের ২৮ মার্চ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের পর ডিএসসিসিতে মোট ২০টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় ২১ জন কাউন্সিলর একনাগারে তিনটি সভায় অনুপস্থিত থেকেছেন। কেউ কেউ ১৪-১৫টি সভায় অনুপস্থিত রয়েছেন। তাদের কয়েকজন দুই-একবার অনুমতি নিলেও বাকিরা অনুপস্থিত ছিলেন পূর্বানুমতিও ছাড়াই।
অনুপস্থিত থাকা কাউন্সিলরদের মধ্যে ৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মকবুল হোসেন মহসিন ৮ বার করপোরেশনের সভায় উপস্থিত হননি। এরমধ্যে ১৫ তম সভা থেকে ১৭তম সভা পর্যন্ত টানা ৩ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন।
৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোলাম হোসেন ৬ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৬ থেকে ১৮ তম সভা পর্যন্ত টানা ৩ টি সভায় অনুপস্থিত  ছিলেন। ৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আশ্রাফুজ্জামান ১০ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ৮ থেকে ১০ম সভা পর্যন্ত টানা ৩ বার ও ১৪ থেকে ১৮তম সভা পর্যন্ত ৫ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুল বাসিত খান ৫ টি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ৮ম থেকে ১০ম সভায় টানা অনুপস্থিত ছিলেন। ১২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদার ১২ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১২তম সভা থেকে ১৯ তম সভা পর্যন্ত টানা ৭ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন।
১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোস্তবা জামান পপি ১১ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ২য় থেকে ৪র্থ টানা ৩ টি সভা, ১২ থেকে ১৬তম টানা ৫ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ১৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ সেলিম ৯ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৮ থেকে ২০তম সভায় টানা অনুপস্থিত ছিলেন। ১৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জসীম উদ্দিন আহমেদ ৮ টি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ৮ম থেকে ১০ম , এবং ১৬ থেকে ১৮ তম সভায় টানা অনুপস্থিত ছিলেন। ২২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারিকুল ইসলাম সজিব ১১টি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ৭ম থেকে ১৩তম সভা পর্যন্ত তিনি টানা ৭ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ২৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার পারভেজ বাদল ৮টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৫তম থেকে ১৯তম বোর্ডসভা পর্যন্ত টানা ৫ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. হাসান ১৪ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ৬ষ্ঠ থেকে ১১তম পর্যন্ত টানা ৬ টি সভা ও ১৩ তম থেকে ১৯তম সভা পর্যন্ত টানা ৮ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম রাসেল ৮টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৩তম থেকে ১৭তম পর্যন্ত টানা ৪ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. বিল্লাল শাহ ১১ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ২য় থেকে ৫ম টানা ৪ টি, ১১ থেকে ১৩তম টানা ৩ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন ৬টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৪তম থেকে ১৬তম পর্যন্ত টানা ৩ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ৩৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু ১৫ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ২য় থেকে ৬ষ্ঠ টানা ৫ টি এবং ১০ম থেকে ১৭তম সভা পর্যন্ত টানা ৮ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি বেআইনী কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। ৪০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মকবুল ইসলাম খান টিপু ৬ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৩ থেকে ১৫ তম পর্যন্ত টানা ৩ টি সভায় অনুপস্থিথ ছিলেন। ৪১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সারোয়ার হোসেন আলো ৬ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৮ থেকে ২০তম সভায় টানা অনুপস্থিত ছিলেন। ৪৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফ হোসেনও ৮ টি সভায় অনুপস্থিত  ছিলেন। এরমধ্যে ৫ম থেকে ৮ম পর্যন্ত টানা ৪ টি সভায় অনুপস্থিত  ছিলেন। ৫০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজী দেলোয়ার হোসেন খান ৭ টি সভায় অনুপস্থিথ ছিলেন। ৫২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাছিম মিয়া ৫টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১৫ থেকে ১৭তম টানা ৩ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন।
এর বাইরে ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একএম মমিনুল হক সাঈদ ১৩ টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে ১ম থেকে ৩য় মোট ৩টি, ৭ম থেকে ১০ম মোট ৪ বার এবং ১২ থেকে ১৭তম পর্যন্ত ৬ বার করপোরেশনের সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। সংরক্ষিত আসনে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাশিদা পারভীন মণি ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ সভা ও ১২তম থেকে ১৪তম সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোসাম্মৎ শিউলী হোসেন ৫ম থেকে ৮ম সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক সাঈদ ছাড়া এখনও আর কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।
ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেয়র ও কাউন্সিলরগণ শপথগ্রহণ করে স্ব স্ব দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম বোর্ড সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ১৭ মে। এরপর ওই বছরের ৩০ জুলাই ২য় সভা, ২৩ সেপ্টেম্বর ৩য় সভা, ২৭ ডিসেম্বর ৪র্থ সভাসহ মোট ৪টি সভা অনুষ্ঠিত হয় ওই বছর। এরপরের বছর ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় ৩টি সভা যথাক্রমে ১০ ফেব্রুয়ারি, ২৮ জুলাই ও পহেলা সেপ্টেম্বর। ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় ৪টি বোর্ড সভা যথাক্রমে, ৪ জানুয়ারি, ১৬ জুলাই, ২৪ জুলাই ও ৯ নবেম্বর। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া ৫টি বোর্ড সভা যথাক্রমে ২৪ জানুয়ারি, ১২ মার্চ, ৩ এপ্রিল, ২৫ জুলাই ও ১১ অক্টোবর। চলতি বছরের সর্বশেষ সভাটি ২০ তম অনুষ্ঠিত হয় ২০ অক্টোবর। এর আগে ১৭ তম সভাটি হয় ৯ জানুয়ারি, ১৮ তম সভা ২০ জুন ও ১৯ তম সভা পহেলা সেপ্টেম্বর। সূত্রমতে, সবচে কম বোর্ড সভা হয়েছে ২০১৬ সালে। তুলনামূলক বেশি বোর্ড সভা হয়েছে ২০১৮ সালে ৫টি। তবে কোনো বোর্ড সভাই নিয়মিত হয়নি। সবচে কম সময় ৮ দিনের ব্যবধান থেকে ৬ মাসের ব্যবধানেও বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ডিএসসিসির। ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল তারা কাউন্সিলরদের কাছ থেকে প্রদত্ত নোটিশের লিখিত জবাব পেয়েছেন। তাদের জবাব যাচাই বাছাই করার জন্য সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির সদস্যরা কাউন্সিলরদের জবাব মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বীয় মন্ত্রনালয়ে পাঠাবেন। মন্ত্রণালয় পরবর্তী ব্যবস্থা হিসেবে তদন্ত করে আইনী পদক্ষেপ নেবে।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তিনটির অধিক বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকার কারণে ২৮ অক্টোবর ডিএনসিসির ১৪ কাউন্সিলরকে শোকজ নোটিশ দেয়া হয়। সচিব স্বাক্ষরিত এ নোটিশে সাত কার্যদিবসের মধ্য অনুপস্থিতির জবাব দিতে বলা হয়েছে। আজ জবাব দেয়ার শেষ দিন।
সম্প্রতি কাউন্সিলরদের নানা অনিয়মের বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় তড়িঘড়ি করে এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। উত্তর সিটির নোটিশ পাওয়া কাউন্সিলররা হলেন, সংরক্ষিত আসনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মেহেরুন্নেছা হক, ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর খালেদা বাহার বিউটি, ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলেয়া সারোয়ার ডেইজি, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইলোরা পারভীন। ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক, ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুর রউফ, ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. রজ্জব হোসেন, ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. নাছির, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মজিবুর রহমান, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামীম হোসেন, ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. নুরুল ইসলাম রতন, ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৈমুর রেজা ও ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোতালেব মিয়া।
সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এ কাউন্সিলরদের অপসারণ নিয়ে যে ছয়টি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে তার প্রথমটি হচ্ছে যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিরেকে সিটি করপোরেশনের পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকা। এরই প্রেক্ষিতে এর আগে ক্যাসিনো কান্ডে নাম আসায় পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকার কারণ দেখিয়ে ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলো ডিএসসিসি। পরে ওই চিঠির প্রেক্ষিতে সাঈদকে অপসারণ করে মন্ত্রণালয়। এছাড়া ক্যাসিনোকান্ডে জড়িত থাকায় উত্তর সিটির কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ও তারেকুজ্জামান রতনকে গ্রেপ্তার করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নানা অপকর্মে জড়িত থাকায় অভিযান শুরুর পর গা ঢাকা দিয়েছেন অন্তত এক ডজন কাউন্সিলর। সিটি করপোরেশন সূত্রে জানাগেছে, উত্তরের কাউন্সিলরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টানা ১২টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম। ১১ সভায় অনুপস্থিত ছিলেন ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব আলী, ৮ সভায় অনুপস্থিত ছিলেন ৩নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম। আর দক্ষিণে সর্বোচ্চ ৮টি সভায় অনুপস্থিত ছিলেন ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদার, ৭ সভায় অনুপস্থিত ছিলেন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হাসান ও ৫ সভায় অনুপস্থিত ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম।
সূত্র বলছে, দুই সিটির বেশিরভাগ কাউন্সিলর সরকার দলীয় তকমা থাকায় তারা অনেকটা বেপরোয়া। দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা নানা অপকর্মে লিপ্ত। ক্যাসিনো বাণিজ্য থেকে শুরু করে, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, খুন-খারাবি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অবৈধ কাজে জড়িত। কিছু কিছু কাউন্সিলর অবৈধ পন্থায় হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। দেশে বিদেশে গড়ে তুলেছেন বিত্ত-বৈভব। অনেকেই বিদেশে সেকেন্ড হোম, অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা চলাফেরা করেন সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নিয়ে। সম্প্রতি ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে দুই সিটির অনেক কাউন্সিলরদের নাম উঠে এসেছে। এরপর থেকে অনেকেই গাঁ-ঢাকা দিয়েছেন। পালিয়ে গেছেন বিদেশে।
কাউন্সিলরদের অনুপস্থিত নিয়ে দক্ষিণ সিটির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সম্প্রতি গনমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে আসে নাই। এখন নজরে আসছে তাই নোটিশ দিয়েছি। নোটিশপ্রাপ্ত কাউন্সিলরদের বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকা ছাড়া অন্য কোনো অভিযোগ আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, অন্য কোনো কারণ থাকলে সেটাতো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপার। যদি কোনো অভিযোগ থাকে তবে তারা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবে। এই ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের সুযোগ সীমিত। অনুপস্থিতির জন্য একজন কাউন্সিলরকে অপসারন করা হয়েছে, নোটিশপ্রাপ্তদেরকে এমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা এ বিষয়ে তিনি বলেন, এটি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তারা তদন্ত করবে। সবকিছু মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করছে।

বেশির ভাগ কাউন্সিলর আইনই জানেন না
পর পর তিনটির বেশি সভায় অনুপস্থিত থাকায় শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৩৫ কাউন্সিলরকে। নোটিশ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে কাউন্সিলরদের মধ্যে। নোটিশে উল্লেখ করা অনুপস্থিত থাকা সভার সংখ্যা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। আবার পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলে সিটি করপোরেশন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানাতে পারে-এমন বিধানের কথা জানাও নেই বেশির ভাগ কাউন্সিলরের। নোটিশ পাওয়া কাউন্সিলর এবং সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশনকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করে হজে যাওয়ার কারণে বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর করপোরেশন সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়ে হজে যাওয়া কাউন্সিলরদেরও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। করপোরেশন সভায় অনুপস্থিতির সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে কাউন্সিলরদের মধ্যে। নির্বাচিত হওয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষ থেকে আইন সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি কাউন্সিলরদের। এ ছাড়া কয়টি সভায় অনুপস্থিত থাকলে সিটি করপোরেশন আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে, সে ব্যাপারেও অজ্ঞ ডিএসসিসির অনেক কাউন্সিলর। আইন বা নিয়মনীতি সম্পর্কে কাউন্সিলরদের ধারণা দিতে সরকার বা ডিএসসিসির পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়নি কোনো প্রশিক্ষণ। আবার যে আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশন চলে সে বিষয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে জানারও চেষ্টা করেননি অনেক কাউন্সিলর। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ২০১৬ সালে সব কাউন্সিলরকে পর্যায়ক্রমে কুমিল্লায় বার্ডে নিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তৎ্কালীন মেয়র আনিসুল হকের সময় কাউন্সিলরদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডের ১৮ জন কাউন্সিলরকেও বার্ডে নিয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
ডিএসসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুল বাসিত সরকার বলেন, ‘সরকারের যথাযথ নিয়ম মেনে হজে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু করপোরেশন সভায় অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে। কত সভায় অনুপস্থিত থাকলে সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা নিতে পারবে সে ব্যাপারে আমরা কিছু জানতাম না।’
ডিএনসিসির সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর ইলোরা পারভীন বলেন, ‘মেয়রের কাছে আবেদন করে আমি হজে যাই। কিন্তু আমাকে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে। আবার পাশের ওয়ার্ডে মশক নিয়ন্ত্রণকাজে জড়িত থাকায় অন্য একটিতে অংশ নিতে পারিনি। আইন সম্পর্কে জানলে আমি যেকোনো মূল্যে সভায় যোগদান করতাম।’
কাউন্সিলরদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ডিএসসিসির সচিব মোস্তফা কামাল মজুমদার। তিনি বলেন, সংস্থায় কাউন্সিলররা যেসব কাজ করছেন সে সংক্রান্ত সব আইন তাঁদের জানা উচিত। বিভিন্ন সময়ে সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯ নিয়ে কথা হয়েছে। তবে ধারা ধরে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।
ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কারণ দর্শানোর নোটিশে অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। কোনো কাউন্সিলর যদি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেন তবে করপোরেশন অবশ্যই তা বিবেচনায় নেবে। কাউন্সিলরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচিত হয়ে করপোরেশনে আসার পর কাউন্সিলরদের প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত। তা না হলে জনপ্রতিনিধিদের কর্মক্ষমতার সঠিক ব্যবহার হয় না। কিন্তু সরকার ও সিটি করপোরেশন কোনো পক্ষই তা নিয়ে খুব একটা ভাবে না।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা জানান, জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বার্ড থেকে সব কয়টি সিটি করপোরেশনে চিঠি দেওয়া হয়েছে কিছুদিন আগে। প্রশিক্ষণের খরচ সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে বহন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কুমিল্লা, গাজীপুর ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্যকোনো সংস্থা টাকা খরচ করে জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণে পাঠাতে রাজি হয়নি। সরকারের দিক থেকেও নেওয়া হয় না কোনো উদ্যোগ। তবে জনপ্রতিনিধিদের বিভিন্ন আইন-কানুন ও কর্মকৌশল শিখিয়ে দিলে কাজে গতি আসে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ