ঢাকা, শুক্রবার 8 November 2019, ২৪ কার্তিক ১৪২৬, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

কথাশিল্পী শাহেদ আলী

মুহম্মদ মতিউর রহমান : বিশিষ্ট কথাশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলী (জন্ম ২৬ মে ১৯২৫-মৃত্যু ৬ নভেম্বর ২০০১) সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানার মাহমুদপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা- মৌলবী ইসমাইল আলী, মাতা- আয়েশা খাতুন। ১৯৪৭ সালে বিএ এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করে ১৯৫১ সালে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ, পরে রংপুর কারমাইকেল কলেজ, চট্রগ্রাম সিটি কলেজ ও ঢাকার মিরপুর বাংলা কলেজে অধ্যাপনা করেন। এছাড়া, তিনি ইসলামিক একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ১৯৬২-১৯৮২ পর্যন্ত অনুবাদ ও সংকলন বিভাগে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

কথাশিল্পী শাহেদ আলীর লেখা প্রথম গল্প ‘অশ্রু’ ১৯৪০ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ১৯৪৪-১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি ‘মাসিক প্রভাতি’ পত্রিকার সম্পাদক, ১৯৪৮-১৯৫০ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র ‘সৈনিক’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি ‘দৈনিক বুনিয়াদ’ এর সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া, তিনি বহু মূল্যবান পত্রিকা, সংকলন ও সম্পাদনার সাথে জড়িত ছিলেন। তন্মধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা (গবেষণা), মাসিক সবুজপাতা (শিশুতোষ) ১৯৬৩ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এবং ত্রৈমাসিক গবেষণা পত্র ‘আল্লামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। 

শাহেদ আলী ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এর কাউন্সিলর ও ‘ফেলো’ নির্বাচিত হন। তিনি রাইটার্স গিল্ডের নির্বাহী কমিটির সদস্য, তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে আজীবন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বহু সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিনিধি হিসাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট ভাষা-সৈনিক। কথাশিল্পী হিসাবে সমধিক পরিচিত শাহেদ আলী একজন উঁচু মানের মননশীল লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক, অধ্যাপক, বক্তা, সংগঠক, সমাজসেবক, রাজনীতিক ও সংস্কৃতিসেবী হিসাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি একাধারে উপন্যাস, ছোটগল্প, মননশীল রচনা, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, ভ্রমণ কাহিনী ইত্যাদির জন্য সকলের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থঃ 

ছোটগল্পঃ ১. জিবরাইলের ডানা-১৯৫৩, ২. একই সমতলে, ১৯৬৩, ৩. শা’নযর, ১৯৮৫, ৪. অতীত রাতের কাহিনী, ১৯৮৬, ৫. অমর কাহিনী, ১৯৮৭, ৬. নতুন জমিনদার, ১৯৯২, ৭. শাহেদ আলীর শ্রেষ্ঠগল্প, ১৯৯৬। 

উপন্যাসঃ  ১. হৃদয় নদী, ১৯৬৫, ২. কাদা মাটির সাতকাহন, ৩. আতœসমর্পণ (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, অপ্রকাশিত)।

শিশু সাহিত্যঃ ১. রুহীর প্রথম পাঠ, ১৯৮০, ২. ছোটদের ইমাম আবু হানিফা (২য় সংস্করণ ১৯৮০), ৩. সোনার গাঁয়ের সোনার মানুষ ১৯৭১, ১৯৯২ (২য় সংস্করণ)।

গবেষণাঃ ১. বাংলা সাহিত্যে চট্রগ্রামের অবদান ১৯৬৫(২য় সংস্করণ), ২. তরুণ মুসলিম ভূমিকা, ৩. একমাত্র পথ, ৪. তরুণের সমস্যা, ৫. তওহীদ, ৬. মুক্তির পথ, ৭. বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস, ৮. ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা, ৯. জীবন নিরবচ্ছিন্ন, ১০. জীবনদৃষ্টি, ১১. সাম্প্রদায়িকতা। 

ইতিহাসঃ ১. ফিলিস্তিনে রুশ ভূমিকা, ২. সা¤্রাজ্যবাদ ও রাশিয়া, ৩. বিপর্যয়ের হেতু।

অনুবাদঃ ১. মক্কার পথ (মূলঃ মুহাম্মদ আসাদ) ১৯৯৩ (৩য় সংস্করণ), ২. ইসলামে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার মূলনীতি (মূলঃ মুহাম্মদ আসাদ) ১৯৬৬, ৩. আধুনিক বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষ (মূলঃ কে বি এইচ কোনান্ট), ৪. ইতিবৃত্ত (মূলঃ হিরোডোটাস) ১৯৯৪, ৫. হিস্টরি অব পলিটিক্যাল থিওরী (মূলঃ জি এইচ সেবাইন,আংশিক), ৬. উন্ডামেন্টালস অব ইকনমিকস (মূলঃ জি এইচ সেবাইন,আংশিক), ৭. আত তাওহীদ (মূলঃ ইসমাইল আর রাযী ফারুকী) অমুদ্রিত, ৮. ডেইলী লাইফ অব এনসাইন্ট রোম (মূলঃ জেরোমি কাসোপিনো), ৯. হরোডোটাস, ১০. এ যুগের বিজ্ঞান ও মানুষ (১৯৬০)। 

ইংরেজি গ্রন্থঃ ১. ঊপড়হড়সরপ ঙৎফবৎ ঙভ ওংষধস ১৯৭৮, ২. ওংষধস রহ ইধহমষধফবংয ঞড়ফধু ১৯৮১.

নাটিকাঃ ১. বিচার।

অপ্রকাশিত রচনাবলিঃ একটি কবিতা সংকলনসহ (কিশোর বয়সে রচিত) বিভিন্ন ধরনের রচনাবলি।  

সম্পাদনাঃ ১. আমাদের সাহিত্যে ও ভাবনায় কায়েদে আজম, ২. দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ-জাতীয় সম্বর্ধনা স্মারক, ৩. ইসলামী সংস্কৃতির রূপরেখা, ৪. মাসিক প্রভাতী ১৯৪৪-১৯৪৬, ৫. সাপ্তাহিক সৈনিক ১৯৪৮-১৯৫০, ৬. দৈনিক বুনিয়াদ, ১৯৫৫, ৭. ইসলামিক একাডেমী পত্রিকা পরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা ১৯৬২-১৯৮০, ৮. মাসিক সবুজ পাতা ১৯৬৩-১৯৮২।

অন্যান্য সম্পাদনাঃ ১. সহকারী সম্পাদক, দৈনিক মিল্লাত ১৯৫৬, ২. প্রথম সম্পাদক- বাংলা বিশ্বকোষ, ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনস ১৯৫৯-৬০, ৩. সদস্য-সম্পাদনা বোর্ড,বাংলা একাডেমী পত্রিকা ১৯৬৩-৬৪, ৪. সদস্য-সম্পাদনা বোর্ড,ইসলামি বিশ্বকোষ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলা প্রকাশিত), ৫. অনুবাদক ও সম্পাদক, আল কোরআনুল কারীম (ইসলামিক একাডেমী প্রকাশিত) ১৩৭৪-৭৮, ৬. সদস্য-সম্পাদনা কমিটি,আল্লামা ইকবাল সংসদ পত্রিকা।

এছাড়া, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘অশ্রু’, ‘রিসার্চ স্কলার’, ‘এই আকাশের হাওয়া’, ‘ছিন্নপত্র’, ‘পরিচয়’, ‘হাসিকান্না’, ‘সোনার চেয়েও দামী’, ‘পিটিশন’, ‘তুচ্ছ’ প্রভৃতি গল্প এখনো পর্যন্ত কোন গ্রন্থভুক্ত হয়নি। তাঁর রচিত কিছু গল্প বিদেশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর কন্যা দিলরুবা জেড আরা ইংরাজিতে অনুদিত ‘ঝবষবপঃবফ ঝযড়ৎঃ ঝঃড়ৎরবং ড়ভ ঝযধযবফ অষর’-২০০৬ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। 

শাহেদ আলী ইতিহাস-সচেতন, ঐতিহ্যনিষ্ঠ, বাস্তবধর্মী, সমাজমনষ্ক লেখক। তাঁর লেখায় মাটি ও মানুষের কথা, মানুষের জীবন-সংগ্রামের বিচিত্র কাহিনী, ইতিহাস-ঐতিহ্য ইত্যাদির প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর লেখায় সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশার নিরন্তর দোলাচলে প্রত্যয়ের দৃঢ়তায় অবিমিশ্র জীবনের দ্বন্দ্বমুখর চিত্র ফুটে উঠেছে । বিশ্বাসে ও আচরণে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলিম। তাঁর সাহিত্যেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। বিশ্বাসের সাথে বাস্তবতার সংমিশ্রণে যে জীবনধর্মী সাহিত্যের সৃষ্টি হতে পারে, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত শাহেদ আলীর সাহিত্য। মননশীল রচনা তো বটেই, তাঁর কথাসাহিত্যেও বিশ্বাসের সাথে বাস্তবতার ও জীবনধর্মিতার এক আশ্চর্য শিল্পসুন্দর সুসমন্বয় সুসংঘটিত হয়েছে। এক্ষেত্রে তাঁকে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মুসলিম কথাশিল্পী মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রতেœর যোগ্য উত্তরাধিকারী বলা যায়। শাহেদ আলীর কথাসাহিত্যে বাংলাদেশের নৈসর্গিক মনোরম দৃশ্যপট, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-আকাক্সক্ষা, প্রেম-প্রণয়, স্বপ্ন-প্রত্যাশাপূর্ণ জীবন-চিত্র, বর্ণাঢ্য ঐতিহ্য, সামিাজিক মূল্যবোধের সাথে আধুনিক জীবন-জিজ্ঞাসার দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ বৈচিত্র্য মনোরম বৈভবে অভিনব রূপ লাভ করেছে। 

চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমিতে শাহেদ আলীর সাহিত্য-চর্চার সূত্রপাত। তিনি নিজেও এ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। পরাধীনতার বন্ধন-মুক্তি, স্বাধীনতার স্বপ্ন-কল্পনা, স্বকীয় আদর্শ-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক মুহূর্তে শাহেদ আলীর মানস-বিকাশ ঘটে। এ বিশেষ রাজনৈতিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর নতুন দেশ গড়ার আবেগচঞ্চল উদ্দীপনাপূর্ণ মুহূর্তে শাহেদ আলী জাতীয় আদর্শ-ঐতিহ্যের দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন। তিনি ভাষা-আন্দোলনের পথিকৃৎ আদর্শবাদী সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিশে’ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি মুসলিম জীবন-চিত্র, গ্রামীণ সমাজের সাধারণ মানুষ ও তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ, স্বপ্ন-সম্ভাবনা নিয়ে জীবনধর্মী সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে গ্রামীণ ভাষার ব্যবহারেও দক্ষতা প্রদর্শন করেন। তাঁর সাহিত্যে মোটামুটি তিনটি দিক সুস্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, জীবনদৃষ্টি। ইসলামের আলোকে লালিত বিশ্বাস ও জীবনদৃষ্টির সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সাহিত্যে। তবে তা কখনো প্রচারণার রূপ লাভ করেনি, যথার্থ শিল্পসম্মতভাবে জীবনরসে জারিত হয়ে তা সাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তিনি ছিলেন জীবনশিল্পী। বাস্তব জীবনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি সাহিত্য রচনা করেন। শিল্পের আশ্লেষে নির্মিত জীবন বাস্তবতার ঘনিষ্ঠ রূপায়ণ তাঁর সাহিত্যকে করেছে রসবিধুর ও পাঠকপ্রিয়। তৃতীয়ত, আজন্ম লালিত গ্রাম্য পরিবেশ ও গ্রামীণ জীবনের সাধারণ জীবনচিত্র তাঁর সাহিত্যে অন্তরঙ্গ ও অকৃত্রিমভাবে রূপায়িত হয়েছে। গ্রামীণ জীবনের সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র রূপায়ণে তিনি তাদের পরিবেশ, জীবন-বৈচিত্র্য, জীবনের সুখ-দুঃখ-ভালবাসা-আনন্দ-বেদনার রূপ এবং সে সঙ্গে তাদের ভাষা, স্বপ্ন-কল্পনা সবই বিশ্বস্ততার সাথে চিত্রায়িত করেছেন। তাই শাহেদ আলী মাটি, মানুষ ও স্বপ্ন-কল্পনার সুরভিকোমল পদ্মরাগের মত চিত্ত-মনোহর এক রসজ্ঞ শিল্পী।       

শাহেদ আলীর সুবিখ্যাত গল্প ‘জিবরাইলের ডানা’ তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায় এবং ছোটগল্পকার হিসাবে তিনি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। ‘জিবরাইলের ডানা’ গল্পটি প্রকাশের পরই দেশে-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অভৎড়-অংরধহ ইড়ড়শ ঈষঁন সংকলিত টহফবৎ ঃযব এৎববহ ঈধহড়ঢ়ু গ্রন্থে ‘জিবরাইলের ডানা’ ইংরাজি অনুবাদ ছাপা হয়। মস্কো থেকে প্রকাশিত ‘জানোতোয়ে ওবোলো’ (সোনালী মেঘ) নামক সংকলনে  রুশ ভাষায় অনূদিত হয়ে ‘জিবরাইলের ডানা’ গল্পটি ছাপা হয়। এছাড়া, গল্পটি বিদেশী আরো কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়। একসময় ভারতের বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়, মৃনাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, জ্যোতির্ময় রায়, নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায়সহ অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা এর চলচ্চিত্র রূপ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, অবশ্য যে কোন কারণেই  হোক, শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে রূপ লাভ করেনি। দেশে-বিদেশে উচ্চ প্রশংসিত ‘জিবরাইলের ডানা’কে শাহেদ আলীর মাস্টার পীচ বললে অত্যুক্তি হবে না। সমগ্র বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যেও এটাকে একটি অনবদ্য রচনা বলে আখ্যায়িত করা চলে। শাহেদ আলীর অনন্য ছোটগল্প ও উপন্যাসও কথাশিল্পী হিসাবে তাঁর শক্তিমত্তা ও বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে।

কথাশিল্পী হিসাবে শাহেদ আলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তিনি গ্রামীণ জীবন, পরিবেশ ও সমাজের সাধারণ মানুষের চরিত্র চিত্রায়ণ করেছেন। সাধারণ মানুষের জীবনে বিচিত্র অনুষঙ্গ, ভাব, চেতনা ও ঐতিহ্যের বর্ণালী ছন্দ তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। সমাজ সচেতনতা ছাড়া কেউ সত্যিকার জীবনধর্মী সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে না। শাহেদ আলী যথার্থ জীবনধর্মী লেখক, তাঁর লেখায় জীবন ও সমাজের বাস্তব চিত্র বাক্সময় রূপ লাভ করেছে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। আমার দুবাই প্রবাস-জীবনে (১৯৭৭-৯৭) আমি সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশী ছেলেমেয়েদের বাংলা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। স্কুলের উদ্যেগে প্রতি বছর বাংলা সাহিত্য সম্মেলনেরও আয়োজন করি। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে তাঁদেরকে সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করি। ১৯৯২ সালে সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক শাহেদ আলী। সেখানে স্থানীয় বিভিন্ন ইংরাজি পত্রিকায় তিনি সাক্ষাতকার প্রদান করেন। এসব সাক্ষাতকারে তিনি তাঁর লেখক জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। ঐ সময় দুবাইতে একটি  দৈনিক পত্রিকায় প্রদত্ত তাঁর সাক্ষাতকারের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলোঃMy message is social. It is an attempt to awaken the social conscience of my people. Yes. there is a great deal of symbolism but it is rooted in my experience and environment.’’ (Quoted from the Gulf Weekly’’, Dubai, 19-25, March, 1992.) 

একজন যথার্থ শিল্পীর নিকট তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর উর্ধ্বে উঠে বা এর প্রভাবকে অস্বীকার করে কেউ প্রকৃত জীবন-শিল্পী হতে পারে না। জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ সম্পর্কে উক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেনঃ ‘‘My Writings are about my experience, about my environment. There is a great deal about my rural life but my themes are also urban. Often, I respond to my own feelings about the anomalies in urban life, about the erosion in social values in moral standards. The sum total of my massage is to illustrate and convey the sufferings, the pain and the tragedies which people are forced to bear and struggle against. I don’t believe that a writer can or should try to create anything outside the context of his own experience. To be authentic, you must be a product of your own environment. I contradict the theory that true poets and writers are bonded to humanity at large, not to a particular place or time. A Writer is born in a particular country, at a particular time and in a particular place.’’’( ঐ)।

এখানে শাহেদ আলী তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের ছাপ যে তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে, সেকথা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। অন্য আর একটি পত্রিকায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেনঃ ‘‘I have devoted to the study of life in the lower rungs of society. I give utterance to their sufferings...A Writer has to have commitment for his place, his community and his time. The greatest of writers have written about their own life.ÕÕ (‘Khaleej Times’, Dubai, 29 February, 1992).

শাহেদ আলী নিজ সমাজ ও পরিবেশের নিকট দায়বদ্ধ। এ সমাজের দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশায় তিনি ব্যথিত হন এবং তার সকরুণ চিত্র তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। সমাজের নিকট দায়বদ্ধতার কারণেই সমাজের আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধকে অকৃত্রিম আবেগে লালন করেন ও তার স্খলনে বেদনাবোধ করেন, এটা তাঁর জীবন-বাস্তবতার এক সংবেদনশীল দিক। এ সামাজিক স্খলন-পতন-অবক্ষয় তাঁর সাহিত্যের সর্বত্র ফুটে উঠেছে। তিনি একজন প্রতিবাদী লেখক। তরুণ বয়সেই তাঁর মধ্যে এ প্রতিবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। স্কুলে অধ্যায়নকালে তিনি ‘প্রভাতী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। শাহেদ আলীর নিজের ভাষায়ঃ ‘‘I was editor of a revolutionary paper called  Probhat, way back in the early 40s. I was still a student and we were all involved passionately with the Pakistan movement. No, this was more than a political stance. I like to think to myself as a writer who expresses the aspirations of his people.ÕÕ (Gulf Weekly, Dubai, 19-25 March, 1992).

এ ব্রত শাহেদ আলী যথাযথভাবেই পালন করেছেন। তবে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন তাঁর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তিনি জনগণের সাথে একাত্ম ছিলেন, এ স্বপ্ন তাঁর নিজের জীবনের লালিত স্বপ্ন। তাই এর রূপায়ণে ও বাণী-রূপ দানে স্বতস্ফূর্তভাবে তাঁর মন-প্রাণ-আবেগ ঢেলে দিয়েছিলেন। তাই তাঁর সাহিত্য হয়েছে বাস্তবধর্মী ও আবেদনশীল। এরূপ সত্যিকার মানবিক আবেদনই কোন সাহিত্যকে স্থান-কালের উর্ধ্বে চিরকালীন মহৎ সাহিত্যের স্তরে উন্নীত করে। স্থান-কাল-অঞ্চলকে অস্বীকার করে নয়, বরং তা ধারণ করেই সাহিত্য অমরত্ব লাভ করে। তাঁর সৃজনশীল সংবেদনশীল মন যখন যা প্রত্যক্ষ করেছে, আপন সংরাগে পূর্ণ করে তার রূপায়ণ ঘটিয়েছে সাহিত্যে। শাহেদ আলীর সাহিত্যে তাই গণ-মানুষের জীবন, চিন্তা-চেতনা, দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দ, স্বপ্ন-কামনার প্রকাশ ঘটেছে। বিশেষত এ দেশের সাধারণ মানুষের ধ্যন-ধারণা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধ তাঁর সাহিত্যে বাক্সময় রূপ লাভ করেছে। সেদিক দিয়ে তাঁর সাহিত্য আমাদের জাতীয় সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত এবং তিনি এক্ষেত্রে এক আধুনিক আলোকিত ধারার উজ্জ্বল পথিকৃৎ।

শাহেদ আলী তাঁর সাহিত্য-কর্ম, ভাষা আন্দোলন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য যেসব পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করেন- বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৪), তমঘায়ে ইমতিয়াজ (১৯৭০), রাষ্ট্রপতির ভাষা-আন্দোলন পদক (১৯৮১), নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৮৫), সিলেট লায়ন ক্লাব পদক (১৯৮৫), ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৮৬), রাগিব-রাবেয়া সাহিত্য-১৯৮৮, একুশে পদক (১৯৮৯), সিলেট যুব ফোরাম পদক (১৯৯০), বাংলা সাহিত্য পরিষদ পদক-১৯৯১,বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্টুডেন্ট এ্যাওয়ার্ড, ইংল্যান্ড (১৯৯১), বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল, দুবাই সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯২, চট্রগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রদত্ত ‘কবি ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৭) ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পদক-২০০০, সেলুসাস সাহিত্য পুরস্কার- ২০০০, জাসাস স্বর্ণ পদক, ২০০২ (মরণোত্তর), কিশোরকণ্ঠ পুরস্কার ২০০৩ প্রভৃতি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ