ঢাকা, শুক্রবার 8 November 2019, ২৪ কার্তিক ১৪২৬, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

একটি মোবাইল কল

শাহিদ উল ইসলাম : জলিলের মাথাটি ভার হয়ে আছে। এই ভার হওয়ার কারণ বাদশা। বাদশা মোহাম্মদ আলীর সেকেন্ড ইন কমান্ড আজ সকালে তাকে হুমকি দিয়ে গেছে এই বলে যে সন্ধ্যার মধ্যে পঞ্চাশ হাজার টাকা না দিলে তাকে দেখে নিবে। বাদশা যে তাকে ধমকে গেছে বিষয়টি ভাবতেই তার শরীরের শিরদাঁড়া বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেল একফোঁটা ঘাম। তবুও মনে মনে সাহস যোগাচ্ছে এই ভেবে যে, তার কাছেও একটা মাল আছে, বাদশা কিছু করার আগেই কাজটি সে সেরে ফেলবে। না সে আর কিছুই ভাবতে পারছে না, তার মাথাটি এবার ঝিমঝিম করে উঠলো। তার মনে পড়লো সেই সেদিনের কথা; যেদিন সবাই মিলে তাকে সাত নম্বর ও আট নম্বর রুটের মিনিবাস শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বানালো। সে ভেবেছিল এবার বুঝি তার দুঃখ ঘুচল, এবার সে বেশকিছু ফাউ টাকার মুখ সে দেখতে পাবে। টাকা যে তার কাছে আসে না তা কিন্তু নয়। আসে প্রচুর, যেভাবে আসে ঠিক সেভাবে যায়। পুলিশকে ভাগ দাও, কমিশনারের ভাগ দাও, অমুককে দাও, তমুককে দাও তা ছাড়া সমিতির নেতা কর্মী তো আছেই। প্রতিদিন তার হাতে পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকা তো আসেই পরিবহন সেক্টর থেকে। তারপরেও গার্মেন্টসের জুট আছে। কিন্তু টাকা কোথায়? টাকা তো তার হাতে থাকে না। তাই ভাবছে সে এ পেশাটি ছেড়ে দিয়ে ভালো হয়ে যাবে। আবারো সে ড্রাইভার এর কাজ করবে। তাতে যা আসে তা দিয়ে তার নিজের পকেট খরচ চলে যাবে। মিরপুর মাজার রোডের নিজ বাড়িতে থাকে। মাসে মাসে তাকে অন্যদের মত বাসাভাড়া গুনতে হয় না। যদিও বাড়িটি বিহারীদের পরিত্যক্ত বাড়ি, জলিলের বাবা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকার থেকে লিজ নিয়েছে, তবুও বাড়ি তো। বেশ কিছু টাকা ভাড়াও সে পায়, তা দিয়ে তার সংসার সুন্দরভাবেই চলে যাবে, জলিল এইসবই ভাবছিলো। তিন্নির পদশব্দে তার ভাবনায় ছেদ পড়লো। তিন্নি জলিলের স্ত্রী সকালের চা দিতে এসে দেখে জলিল আনমনে কি যেন ভাবছে, তাই সে বলে উঠলো কি ভাবছো তনুর বাবা? তনু জলিলের একমাত্র মেয়ে ক্লাশ ফোরে পড়ে। তিন্নির ডাকে জলিল যেন কিছুটা চমকে উঠলো তবুও মুখে বলল না। কিছু ভাবছি না। তিন্নি বলল অবশ্যই কিছু ভাবছো, তোমার চেহারাই বলে দিচ্ছে সে কথা। জলিল নীরব হয়ে আছে দেখে তিন্নি টি টেবিলে চা কাপ রেখে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়াল। জলিলের মনটি আজ সত্যি অন্যরকম। কেমন যেন উদাস উদাস। তার ভালো হতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করতে। ইচ্ছে করছে স্ত্রী তিন্নির কাছে মাফ চাইতে। সে সিদ্ধান্ত নিলো আজই তিন্নির কাছে মাফ চেয়ে নিবে। আজই তার প্রথম মনে হলো জোর করে তিন্নিকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করাটি তার ঠিক হয়নি। গত দশ বছর যাবত এ বিষয়টি তাকে পীড়া দিয়ে আসছে। এ কথা ঠিক তিন্নিকে সে পাগলের মত ভালোবাসে এবং তিন্নির প্রাপ্তি তার জীবনের সেরা প্রাপ্তি বলে জলিল মনে করে। জলিল চায়ের কাপে চুমুক দিলো। চায়ের স্বাদটি আজ কেমন যেন একটু অন্যরকম লাগছে, কেমন যেন তেঁতো তেঁতো। অন্যদিন হলে তিন্নিকে একটু ধমকে দিতো, রাগত স্বরে চিনি চেয়ে নিতো। কিন্তু আজ তার তা করতে ইচ্ছে করছে না। সে চাসহ কাপটি রেখে দিল টেবিলের উপর। তার মনে পড়ে গেল আরো পুরানো দিনের কথা। আজ হতে দশ বছর আগেকার কথা। তিন্নিকে যেদিন কিডন্যাপ করলো সে দিনের কথা। তিন্নির সে কি কান্না, কত কাকুতি মিনতি সব উপেক্ষা করে তিন্নিকে-----না সে আর ভাবতে পারছে না, ভাবতেও চায় না। সে সিদ্ধান্ত নিলো তিন্নির কাছে আজ সে মাফ চেয়ে নিবে। প্রয়োজনবোধে পা ধরবে। তিন্নি তনুকে নিয়ে স্কুলে রওনা হলো। যাবার কালে সে জলিলকে উদ্দেশ্য করে বলল, টেবিলে নাস্তা দেয়া আছে খেয়ে নিও। জলিল এবারও কেঁপে উঠলো তিন্নির কণ্ঠ শুনে এবং হা করে তাকিয়ে থাকলো তার দিকে। স্বামীকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিন্নি বলল, কি বলেছি শুনেছো নাকী? জলিল বলল না। তিন্নি আবারো বলল, টেবিলে নাস্তা দেয়া আছে খেয়ে নিও। জলিল মাথা ঝাকিয়ে বলল ঠিক আছে যাও। তার বলতে ইচ্ছে করছিলো, আজ স্কুলে যাবার দরকার নেই, আমার মন ভালো না, একটু আমার পাশে বসো। কিন্তু মনের কথা মনেই থেকে গেল। জলিল আর কিছু বলতে পারলো না,তার গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরুলো না। খালি ঘরে জলিল দোল চেয়ারে বসে দোল খেতে থাকলো, সে ভুলে গেল তার নাস্তার কথা। আজ কেন জানি ভেতর থেকে তার কান্না ডুকরে উঠতে চাইছে। রাজ্যের বেদনা ভর করেছে তার উপর। তিন্নির প্রতি সে যে অবিচার করেছে তা আজ এমনভাবে তাকে নাড়া দিচ্ছে যা আগে এতোটা মনে হয়নি। সে কঠোর প্রতিজ্ঞা করলো যেভাবে হোক তিন্নির কাছে মাফ সে চেয়ে নিবে। তিন্নি হয়তো কান্নাকাটি করবে কিন্তু মাফ দিবে কারণ দশ বছরের সংসার মায়াতো একটু হবেই, এসবই ভাবছিলো জলিল। হঠাৎ সদর দরজায় কেউ কড়া নাড়ল, জলিলের চিন্তায় ছেদ পড়লো। সে দোল চেয়ার থেকে দরজার দিকে এগুলো। সফিকুল এসেছে, সফিকুল জলিলের বাল্যবন্ধু। সাথে আছে মতি, জামাল ও কামাল এরা সবাই পরিবহন নেতা। জলিল এর কাছ থেকে এরাও একটা অংশ পেয়ে থাকে। তাদের সবাইকে ঘরে নিয়ে এলো জলিল। তার কাছে আসার কারণ জানতে চাইলে সফিকুল বলল, আজ আমরা টঙ্গীতে পীরবাবার দরবারে যাবো আমাদের সাথে তোকেও যেতে হবে। জলিল বাদশার কথাটি চেপে গিয়ে বলল, না আমি যেতে পারবো না, আমার মন ভালো নেই। মতি বলল বাবার দরবারে গেলে মন ভালো হয়ে যাবে। কামাল বলল বাবার দরবার হতে কেউ খালি হাতে ফেরে না। ওদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে জলিল বলল ঠিক আছে কখন যেতে হবে? সফিকুল বলল সন্ধ্যায় যেতে চাই। জলিল বলল যাবার আগে আমাকে একটি ফোন                                                                                                                                                                               কল দিছ বলেই তাদের বিদায় জানালো। ওরা বিদায় নিয়ে গেলে জলিল আবার একা হয়ে গেল। দোল চেয়ারে বসে সে আবারও ভাবনায় তলিয়ে গেল। তার খেয়াল গেল এবার পীর সাহেবের দিকে। তিন্নি পীর সাহেবকে পছন্দ করে না। জলিল পীর সাহেবের কাছে যাক এটা তিন্নির বারণ আছে। এই পছন্দ না করার মূল কারণ পীরসাবেব মুরিদের সেজদা নিয়ে থাকেন। জলিল অশিক্ষিত হলেও তিন্নি বেশ শিক্ষিত। সে মিরপুরের বাংলা কলেজ থেকে বি এ পাশ করা মেয়ে। আরো পড়ার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু জলিল এর কারণে তা হয়নি। তিন্নি তাকে জানিয়েছে আল্লাহর সাথে কারো শরিক চলে না। সেজদা একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য। কিন্তু তিনি এটা নেননি, তাই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা দিলে সে মুসলমান থেকে খারিজ হয়ে যায়। তিন্নির কথা জলিল মানে আবার মানেও না। কারণ তিন্নি কেবল শরিয়তের কথা বলে, মারেফত বুঝে না। এসবই ভাবছিলো জলিল, এমন সময় তিন্নি তনুকে নিয়ে ফিরে এলো বাসায়। এসেই দেখলো জলিল সেই চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে আর নাস্তা পড়ে আছে টেবিলে। তাই সে কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বলল, কি ব্যাপার কি হয়েছে তোমার? নাস্তাতো পড়েই আছে টেবিলে খাওনি কেন? জলিল কোন কথা বলছে না দেখে এবার সে জলিলের নিকটে এসে তার দিকে চোখ রাখতেই জলিল তিন্নির হাতটি ধরে বলল; একটু পাশে বস তোমার সাথে কথা আছে। তিন্নি তার হাতটি ঝটিকায় ছাড়িয়ে নিয়ে বলল আমার সময় নেই রান্না করতে হবে, পড়ে শুনবো বলেই রওনা দিলো রান্নাঘরের দিকে। জলিল তার চলে যাওয়ার পথে হা করে কেবল তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। সে আবার দোল চেয়ারে দোল খেতে থাকলো এবং কখন যে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল টের পেল না। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো তবু তার ঘুম ভাঙল না। তিন্নি কয়েকবার এসে দেখে গেছে কিন্তু স্বামীকে জাগায়নি এই ভেবে যে আরো একটু ঘুমাক কারণ গতকাল সারারাত্রি সে জেগে ছিলো। হঠাৎ সফিকুলের ফোন কলে জলিলের ঘুম ভেঙ্গে গেল, সে তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে রওনা দিলো বাবার দরবারে। যাবার কালে স্ত্রীকে বলে গেল আমার ফিরতে একটু দেরী হবে তোমরা খেয়ে নিও। তিন্নি বলল কিছু খেয়ে যাও। সে বলল না বাহিরে খাবো। তিন্নি বলল তুমি যেন কি বলতে চেয়েছিলে? জলিল বলল ফিরে এসে বলবো। পথিমধ্যে বাদশার সাথে দেখা। বাদশাও একই পীরের মুরিদ। জলিল বাদশাকে বলল চল দোস্ত বাবার কাছে যাই। বাদশা কিছু বলল না কেবল রাগান্বিত চোখে জলিলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তার পথে পা বাড়ালো। বাদশার এই দৃষ্টি জলিলের কাছে নতুন কিছু নয়। বাদশার ইচ্ছে যে কি তাও জলিল জানে। তার স্থলে বাদশা সাধারণ সম্পাদক হতে চায় এটা অনেকের কাছ থেকে জলিলও জেনেছে। যাই হোক বাদশার ইচ্ছে সে পূরণ করবে। অচিরেই মিটিং ডেকে সে এ পদ থেকে ইস্তফা দেবে। এইসব ভাবতে ভাবতে জলিল একটি মিনিবাসের সামনে এসে দাঁড়ালো। মিনিবাসে ত্রিশজন নেতা কর্মী তার জন্য অপেক্ষা করছে, সবাই বাবার মুরিদ। তারা কেউ কোকের সাথে মিশিয়ে মদ্য পান করছে কেউ গাঁজায় টান দিচ্ছে। গাঁজা নাকি সাধনার জিনিস, এটা পীরবাবাও টানে। বাসে উঠতেই সফিকুল তাকে কোক মিশ্রিত মদ অফার করলে জলিল তা আজ মানা করলো যদিও মদ তার প্রিয়। জলিল একজন সিনিয়র ড্রাইভার তাই মিনি বাসের ড্রাইভার জলিলকে বলল ওস্তাদ আজ গাড়ি আপনি চালান। জলিল ভাবল গাড়িটি তারই চালানো উচিত কারণ সবাই মদ খেয়ে মাতাল হয়ে আছে। যথা সময়ে পীরবাবার দরবারে তারা পৌঁছুলো। তাকে ভক্তি সেজদা সকলেই দিলো, কিন্তু ব্যাতিক্রম হলো জলিলের বেলায় এই প্রথম সে তার পীরকে সেজদা দিলো না, তার কেবলই মনে হলো তিন্নির কথা। পীরসাহেব সহ সকলেই অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো জলিলের দিকে। বিদায় বেলায় পীরসাহেব বললেন যাবার আগে ভক্তি যখন দিলি না তখন শুইয়ে যা!! পীরসাহেবের এ কথার অর্থ জলিল বুঝতে পারলো না। পীরসাহেবের সাথে সাক্ষাৎ শেষে জলিলরা যখন এসে পৌছুলো তখন রাত একটা বেজে কিছু বেশি। মিরপুর মাজার রোডের লালকুঠি এসে তাদের মিনিবাসটি থামা মাত্রই চারিদিক থেকে বোমার আক্রমণ হলো। জলিলের আর বুঝতে দেরী হলনা যে বাদশা ও তার লোকেরা তাকে আক্রমন করেছে। এমনিতে অন্ধকার তার উপর বোমার ধোঁয়ায় আরো অন্ধকার হয়ে উঠলো স্থানটি। চোখের পলকে জলিলের লোকেরা জলিলকে ফেলে পালিয়ে গেল। বাসের মধ্যে জলিল ছাড়া আর কেউ নেই। সে বুঝতে পারলো এখানে সে নিরাপদ নয়। তাই বাস থেকে নেমেই একটি তরকারির দোকানের চকির নিচে লুকালো। বাদশার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে ; শালা কই লুকালো খুঁজে বের কর। সফিকুল বলে উঠলো শালাকে ফোন দে। সাথে সাথে জলিলের ফোনটি বেজে উঠলো। মোবাইল কলে যেন নেমে এলো আজরাইল। জলিলকে টেনে হিঁচড়ে বের করা হলো। বাদশা নয় সফিকুল এর পিস্তল থেকে একটি বুলেট তার কপাল ভেদ করে বের হল পেছন দিক দিয়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ