ঢাকা, শুক্রবার 8 November 2019, ২৪ কার্তিক ১৪২৬, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

শিক্ষাঙ্গনে অচলাবস্থা

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সাধারণভাবে শিক্ষাঙ্গনেই মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা নিয়মিতভাবে ক্লাস ও পরীক্ষাসহ শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার দাবি জানানোর পাশাপাশি নিন্দিত ভাইস চ্যান্সেলর ফারজানা ইসলামকে অপসারণের দাবিতে সংহতি সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখারও ঘোষণা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন শিক্ষকদের  সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও শিক্ষার্থীদের দাবি ও কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের গুন্ডা-মাস্তানদের সরাসরি সহযোগিতা নিয়ে ভিসি ফারজানা ইসলাম গত মঙ্গলবার কিছুক্ষণের জন্য তার অফিসে বসেছেন এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সেখানে বসেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের আদেশ জারি করেছেন। তার এই আদেশের ফলে বিভিন্ন বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষার সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে ভিসি তার বাসভবনে ‘অবস্থান’ নিয়েছেন। সেখানে তাকে শতাধিক পুলিশ ছাড়াও ছাত্রলীগের গুন্ডা-মাস্তানরা পাহারা দিচ্ছে। তার পক্ষে বাইরে আসা সম্ভব হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, বোনাসের নামে ছাত্রলীগ নেতাদের ১৮৬ কোটি টাকা ঘুষ দেয়া এবং ভর্তি বাণিজ্য করার মতো বিভিন্ন অভিযোগে ভিসি ফারজানা ইসলামকে অপসারণ ও তার বিচারের দাবিতে দু’ মাসের বেশি সময় ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। অন্যদিকে ঘুষসহ প্রায় সব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে ভিসির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। মাঝখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ঘুষ গ্রহণের দায়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও তারা অন্য কোনো শাস্তি পায়নি। এমন অবস্থ্ার সুযোগ নিয়ে ভিসি ফারজানা ইসলাম শুধু তার পদেই টিকে যাননি, তার দাম্ভিকতা ও দৌরাত্ম্যও অনেক বেড়ে গেছে। ভিসি এমনকি একথা পর্যন্ত ঘোষণা করেছেন যে, ঘুষ নয়, ছাত্রলীগ নেতাদের শত কোটি টাকার অংকে তিনি ‘বোনাস’ দিয়েছিলেন! 

এত প্রকাশ্যে দাম্ভিকতা দেখানো সত্ত্বেও সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও দ্রুত ব্যাপক হয়েছে। অন্যদিকে ভিসি ফারজানা ইসলাম নেমেছেন ‘মাস্তানের’ ভূমিকায়। তার নির্দেশ ও ইন্ধনে প্রায় প্রতিদিনই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের গুন্ডা-মাস্তানরা হামলা চালিয়েছে। ছাত্রীসহ অনেককে রক্তাক্ত করেছে, অনেকের হাত ও হাতের আঙুল পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছে। গত সোমবার এরকম সর্বশেষ এক ঘটনায় ছাত্রলীগের গুন্ডা-মাস্তানরা ছাত্রীদের মাটিতে ফেলে তাদের পেটে লাথির পর লাথি মেরেছে। এ ব্যাপারেও ভিসি ফারজানা ইসলামের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। তিনি ঘোষণা করেছেন, আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীরা তাকে অবরুদ্ধ করেছিল বলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মিরা নাকি ‘গণঅভ্যুত্থান’ ঘটিয়ে তাকে উদ্ধার করেছে! এজন্য ছাত্রলীগের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন তিনি!

‘গণঅভ্যুত্থান’ ঘটিয়ে ছাত্রলীগ তাকে উদ্ধার করলেও সেই থেকে তার পক্ষে কিন্তু পুলিশ প্রহরা ছাড়া বাসার বাইরে আসা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ রিপোর্টে বরং জানা গেছে, শতাধিক পুলিশ এবং ছাত্রলীগের গুন্ডা-মাস্তানদের প্রহরায় তিনি তার বাসভবনে ‘অবস্থান’ করছেন! অন্যদিকে একই ভিসি ফারজানা ইসলামের কারণে অচল হয়ে পড়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। 

আমরা মনে করি, একজন মাত্র ব্যক্তির কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে পড়ার এবং শিক্ষা ও পরীক্ষাসহ সকল একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারের উচিত রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধে উঠে অনতিবলম্বে নিন্দিত ও বিতর্কিত ভিসি ফারজানা ইসলামকে অপসারণ করা। সরকারকে একই সঙ্গে ভিসির বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগের ব্যাপারেও তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু নয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার পরিবেশ বতমানে বাধাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু পাবনা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এজন্যই দেশের শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত তৎপর হতে হবে। আমাদের মতে সদিচ্ছা থাকলে সরকারের উচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং বিতর্কিত ভিসি ফারজানা ইসলামকে অপসারণ করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। বুয়েটসহ অন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারেও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার একই লক্ষ্যে তৎপর হওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ