ঢাকা, শুক্রবার 8 November 2019, ২৪ কার্তিক ১৪২৬, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বুয়েক ছাত্রলীগের ২৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট শিগগিরই

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : পিতা-মাতার পরম আদর ¯েœহমাখা কোল ছেড়ে যে আশা নিয়ে এসেছিলেন স্বপ্নের বিদ্যাপিঠে, সেখান থেকে ভবিষ্যৎ কারিগর হওয়ার প্রদীপ নিভিয়ে সেই চেনাজানা কোলে ফিরলেন নিশ্চল  বাক্সবন্দি হয়ে। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাটতো যাদের সাথে , তাদের দানবীয় হাতেই অপার সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটলো। এই মৃত্যু সাধারণ নয়, স্বাভাবিক নয়। না মানা এক মৃত্যু, দেশজয়ী মৃত্যু, মৃত্যুঞ্জয়ী মৃত্যু। এই মৃত্যুঞ্জয়ীর নাম ‘আবরার ফাহাদ’। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে আবরার ফাহাদ খুনের ঘটনার এক মাস পার হলো গতকাল বৃহস্পতিবার। কিন্তু তার ফেলে যাওয়া পরিবারের কান্না এখনো থামেনি। সকল স্মৃতিই তাড়া করে ফিরছে তাদের।

এদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ২৪ জন ছাত্রকে আসামী করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) চূড়ান্ত করেছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ হত্যার চার্জশিট আগামী সপ্তাহে আদালতে দাখিল করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক (দক্ষিণ) মো. ওয়াহিদুজ্জামান মামলার তদন্ত শেষ করেছেন। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এ মামলার তদন্ত শেষ করল ডিবি। মামলার আসামীদের প্রায় সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থক। ঘটনার পর তাদেরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। বুয়েটও আসামীদের বহিষ্কার করেছে।

পরিবারের কান্না এখনো থামেনি: গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ছেলে হারানোর কষ্টে মায়ের চোখে জল। বাবা বরকত উল্লাহ ও ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ শোকে কাতর। এ সময় বাড়ি থেকে  কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

আবরারের পরিবারের সদস্যরা জানান,তিন কক্ষের বাড়ির একটি কক্ষ ছিল আবরার ফাহাদের। ওই কক্ষে রাখা হয়েছে আবরারের বুয়েটে ব্যবহৃত বইপত্রসহ যাবতীয় জিনিসপত্র। পাশের কক্ষেই থাকেন মা রোকেয়া খাতুন। ছোট ভাই ফাইয়াজ বলল, ‘ভাই ছুটিতে বাড়ি আসার আগে দুটি শার্ট কিনেছিলেন। সেই জামা দুটি এখনো প্যাকেটবন্দী অবস্থায় আছে। এই জামা কোনো দিন আর গায়ে জড়ানো হবে না।’

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে ফাইয়াজ। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে বুয়েটে পড়ার ইচ্ছে ছিল এত দিন। তবে ভাইয়ের হত্যাকান্ডের পর সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে ফাইয়াজ। দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে তার।

ফাইয়াজ জানাল, আবরার শেরে বাংলা হলের নিচতলার ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। ওই কক্ষের সামনেই সামান্য খোলা জায়গায় স্ট্যাম্প পুতে ক্রিকেট খেলা হতো। ভাই জানালা দিয়ে খেলা দেখতে দেখতে খেলার বিষয়ে কথা বলত। সেই স্ট্যাম্প দিয়েই ভাইকে মেরে ফেলা হলো।

বাবা বরকত উল্লাহ জানালেন, গত বুধবার আবরারের মামা ও মামাতো ভাই বুয়েটে গিয়েছিলেন। সেখানে বুয়েটের উপাচার্যের কাছে মামলায় আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে আবেদন করা হয়। ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম ও আরেকজন আইনজীবী নিয়োগের জন্য আবেদন করা হয়েছে। বুয়েট কর্তৃপক্ষ মামলা চালানোর ব্যয় বহনের আশ্বাস দিয়েছে।

বরকত উল্লাহর দাবি, ১৯ জনকে আসামী করে মামলা করা হয়েছিল। এখনো এজাহারভুক্ত তিন আসামী পলাতক। তাদের যেন দ্রুত ধরা হয় এবং মামলাটি যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়, সে দাবি জানান তিনি।

মা রোকেয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন, ‘ব্যাটার সাথে প্রতিদিন কথা হতো। আজ একটা মাস হয়ে গেল। একটা বার জিজ্ঞেস করে না আম্মু কেমন আছো।’

 রোকেয়া খাতুন নিজে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে পড়েছেন। নিজে নব্বই দশকে বিভিন্ন আন্দোলন, মারামারি দেখেছেন। তবে বুয়েটে তেমন কিছু দেখেননি। সেই আস্থায় ছেলেকে বুয়েটে দিয়ে নিরাপদবোধ করেছিলেন। সেই ছেলেকে বুয়েটে পিটিয়ে হত্যা করা হবে, কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না তিনি।

২৪ আসামীর সবাই ছাত্রলীগের: আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ২৪ জন ছাত্রকে আসামী করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) চূড়ান্ত করেছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ হত্যার চার্জশিট আগামী সপ্তাহে আদালতে দাখিল করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক (দক্ষিণ) মো. ওয়াহিদুজ্জামান মামলার তদন্ত শেষ করেছেন। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এ মামলার তদন্ত শেষ করল ডিবি। মামলার আসামীদের প্রায় সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থক। ঘটনার পর তাদেরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। বুয়েটও আসামীদের বহিষ্কার করেছে। 

জানা গেছে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের চার্জশিট জমা দেয়ার আগে তদন্ত তদারকি কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর অনুমতি নিতে চান। আইজিপি গতকাল  সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরেছেন। তিনি চার্জশিট সম্পর্কে অবহিত হয়ে অনুমতি দিলে আগামী সপ্তাহের যে কোনো দিন আদালতে জমা দেয়া হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও ১৭তম ব্যাচের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যায় সাক্ষী ও আসামীদের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। এই মামলায় ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা সবাই কারাগারে আছেন। এ ছাড়া তিনজন পলাতক। 

চার্জশিটভুক্ত হচ্ছে যে ২৪ জন: মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, মো. অনীক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মো. মাজেদুর রহমান, মো. তানভীর আহম্মেদ, মো. মোজাহিদুর, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মো. জিসান, মো. আকাশ, মো. শামীম বিল্লাহ, মো. শাদাত, মো. তানিম, মো. মোর্শেদ, মো. মোয়াজ, মুনতাসির আল জেমি, ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না, অমিত সাহা, মো. মিজানুর রহমান ওরফে মিজান, শামসুল আরেফিন রাহাত ও এস এম মাহমুদ সেতু। আসামীদের মধ্যে রাসেল বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক, ফুয়াদ সহসভাপতি, অনীক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, রবিন সাংগঠনিক সম্পাদক, সকাল উপ-সমাজসেবা সম্পাদক, মনির সাহিত্য সম্পাদক, জিয়ন ক্রীড়া সম্পাদক, রাফিদ উপদপ্তর সম্পাদক, অমিত সাহা উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক এবং তানিম, মুজাহিদুর ও জেমি সদস্য।

জানা গেছে , আসামীদের জবানবন্দিতে হত্যার ভয়াবহতা উঠে এসেছে।

কার কী অপরাধ, কতটুকু অপরাধ- তা চার্জশিটে উল্লেখ করা হচ্ছে। চার্জশিটের সঙ্গে আলামত হিসেবে আবরারের রক্তমাখা জামা-কাপড়, মেসেঞ্জারে আসামীদের লিখিত যোগাযোগ, প্রযুক্তিগত অন্যান্য যোগাযোগ, শেরেবাংলা হলের সিসিটিভি ফুটেজসহ ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামতও জমা দেয়া হচ্ছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হচ্ছে: আবরার ফাহাদ শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এই সন্দেহেই তাকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ঘটনার আগে এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতরা পরিকল্পনা করেন আবরারকে শায়েস্তা করার। ঘটনার আগে তারা একটি মিটিংও করেন। এর আগে বুয়েট ছাত্রলীগের এক নেতা ফেসবুক গ্রুপে আবরারকে শায়েস্তা করার ঘোষণা দেন। এতে অনেকেই সায় দেন।

৬ অক্টোবর শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে এনে আবরারকে মারধর করা হয়। তাকে কিল-ঘুষি মেরে, স্কিপিং দড়ি দিয়ে ও ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে বেধড়ক পেটান হত্যাকারীরা। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে পেটানো হয়। পানি পানি বলে চিৎকার করলেও তাকে পানি খেতে দেয়া হয়নি। তিনি কয়েকবার বমিও করেন। কিন্তু তার চিকিৎসার ব্যবস্থা কেউ করেননি। একপর্যায়ে আবরার মারা যাওয়ার পর তাকে ধরাধরি করে দোতলার সিঁড়ির ওপর ফেলে রাখেন হত্যাকারীরা।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ৮ জন : আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডে  জড়িত আটজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন- ইফতি মোশাররফ হোসেন সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, অনীক সরকার, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, মনিরুজ্জামান মনির, এ এস এম নাজমুস শাদাত ও তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর।

অধরা তিনজন: আবরার হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত তিন আসামী মো. জিসান, মো. মোর্শেদ ও মো. তানিমকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি মামলার তদন্তকারী সংস্থা ডিবি। তবে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া ২১ জনের মধ্যে ১৬ জন এজাহারভুক্ত।

গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে ১৭তম ব্যাচের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন নিহতের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

পুলিশ জানায়, আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একাধিক ভিডিও ফুটেজও পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জড়িত এখন পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তাদেরকে বুয়েট এবং ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ