ঢাকা, শনিবার 9 November 2019, ২৫ কার্তিক ১৪২৬, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

দুর্নীতির কারণেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হবে

গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে স্বাধীনতা পরিষদ আয়োজিত বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: বর্তমান সরকারই তাদের পতন ডেকে নিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। তিনি বলেন, দুর্নীতিতে যে শিকড় সুরঙ্গ তারা তৈরি করেছে সেই সুরঙ্গ থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে পারবে না। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, দুর্নীতির কারণেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হবে। দুই-চারজন খালেদ-শামীম-সম্রাটকে ধরে বিচার করে পার পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের শাখা-প্রশাখায় দুর্নীতি বিস্তার করেছে। দুর্নীতির যে সুড়ঙ্গ সরকার তৈরি করেছে, তা থেকে তারা বের হতে পারবে না। ব্যর্থতার কারণেই এই সরকারের পতন ঘটবে।
গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে স্বাধীনতা ফোরামের উদ্যোগে অবিভক্ত ঢাকার নির্বাচিত মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল এ কথা বলেন তিনি। স্বাধীনতা ফোরামের সভাপতি আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, বিএনপি'র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শিমুল বিশ্বাস, নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুন রায় চৌধুরী, কৃষক দলের সদস্য এম জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকে।
ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। মানুষ সুস্থ রাজনীতির চর্চা করবে, সেই উদ্দেশ্যেই আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সব অর্জন নস্যাৎ হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাবো।
বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, গতকাল প্রধানমন্ত্রী অনেকের স্মৃতিচারণ করেছেন। জাসদের একজন নেতা মারা গেছেন তার জন্য কথা বলেছেন। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য সাদেক হোসেন খোকার নাম উল্লেখ করেন নাই। কেন করেন নাই? কারণ সাদেক হোসেন খোকা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সাদেক হোসেন খোকা প্রধানমন্ত্রীকে হারিয়েছিল? সেই কারণে কি তার কথাটা তার (প্রধানমন্ত্রী) মনে আসেনি?
মওদুদ আহমেদ বলেন, সাদেক হোসেন খোকা একজন সাহসী সৎ বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন দেশপ্রেমিক নেতা ছিলেন। তার অবদান এদেশের মানুষ কখনো ভুলবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তাকে যে সম্মান দেখানো উচিত ছিল সে সম্মান আমরা দেখাতে পারিনি।
তিনি বলেন, আমরা লজ্জা পেয়েছি যে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী এতজনের কথা বললেন কিন্তু সাদেক হোসেন খোকার কথা বললেন না। যাই হোক সাদেক হোসেন খোকা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যতদিন বেঁচে থাকবে আমরা তাঁকে স্মরণ করব।
বিএনপি নেতা বলেন, সামান্য দুই কোটি টাকার জন্য খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখা হয়েছে। অথচ শামীমের অফিসে ১৫০ কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে। তাহলে তার কত বছরের সাজা হওয়া উচিত? শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই বেগম জিয়াকে কারাগারে রাখা হয়েছে। আমরা ইনশাল্লাহ তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনবো। তিনি জামিনে নয়, বরং আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমেই মুক্ত হবেন।
বেগম খালেদা জিয়া চিরদিনই কারাগারে থাকবেন না মন্তব্য করে মওদুদ আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাকে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। তিনি চিরদিনই কারাগারে থাকবেন না, তার মুক্তি হবে। এই সরকারের পতন হবে। এই সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার।
বর্তমান দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আপনারা অনেকেই মনে করেন আমরা রাস্তায় নামতে পারছি না আন্দোলন করতে পারছি না। সেই জন্য বুঝি সরকারের পতন হবে না। কিন্তু আমি নিরাশ নই, হতাশ নই। সরকার মনে করছেন দুর্নীতি ও ক্যাসিনো কান্ডে জড়িতদের বিচার করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এটা তো একটা আইওয়াশ মাত্র। এই সরকারের দুর্নীতির সুরঙ্গ এত বড় হয়েছে যে তাদের পতন হতে বাধ্য।
বিশিষ্ট এই আইনজীবী বলেন, প্রধানমন্ত্রী যতবার ভারতে গেছেন, কোন বারই দেশের জন্য কিছু আনতে পারেন নাই। শুধু দিয়ে এসেছেন। তিনি প্রত্যেকবারই বলে যান আমি জাতীয় কোন স্বার্থ বিক্রি করে আসেনি। তিনি জাতীয় স্বার্থ বিক্রি করেন না কিন্তু দিয়ে আসেন। এই ফেনী নদীর পানি ভারতের কৃষকদের জন্য দিয়ে এসেছেন আমার দেশের কৃষকদের বঞ্চিত করে, এর চেয়ে বড় জাতীয় স্বার্থ আর কি হতে পারে?
তিনি আরও বলেন, নুসরাত হত্যার বিচার করে তারা বলছে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ আমরা জানি শত শত নারী নির্যাতন হচ্ছে, তার বিচার হচ্ছে না। গুম, খুন হচ্ছে তার বিচার হচ্ছে না। সাগর রুনিসহ অসংখ্য হত্যার বিচার এখনো হয়নি। শুধু একটা বিচার করে কখনো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। নিতু, মিতু, ত্বকি, সাগর-রুনি এদের বিচার কোথায়? আজ বাধ্য হয়ে দুই-একটা মামলার বিচার করছে তারা। এগুলো মানুষকে ধোকা দেওয়া। ২৬ লাখ বিএনপি নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। অনেককে হত্যা ও গুম করা হয়েছে। তাদের বিচার কে করবে? দেশে আইনের শাসন নেই, দলীয় শাসন রয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, আল্লাহর কাছে দোয়া করি এই বর্তমান সরকারের পতন হওয়ার আগে যেন আমার মৃত্যু না হয়। রব বলেন, স্বাধীনতা বলা হচ্ছে, স্বাধীনতা তো চুরি হয়ে গেছে। দেশে কোন রাজনীতি নাই, জনগণের স্বাধীনতা নাই। তিনি বলেন, অবৈধভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। তার একটি হাত একটি পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো শ্লোগান বন্ধ হয়ে গেছে। মশাল মিছিল বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষের কন্ঠরোধ করে স্বাধীনতা হরণ করে বেশিদিন যদি ক্ষমতায় থাকেন আমি কিন্তু বলতেছি না কি হবে। তবে মানুষ যদি রাস্তায় নেমে যায় আপনাদের কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, ছাত্রের গুন্ডামির প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে পানিতে ডুবানো হয়েছে। এটা কি? চার মাস থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করছে ছাত্র-ছাত্রীরা। প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকা অবস্থায় থেকেই তারা আন্দোলন করছে। একটা ভাইস-চ্যান্সেলর একটা মহিলার যদি লজ্জা না থাকে যদি আপনি ভুলও না করেন তারপরও দায়িত্বে থাকেন কিভাবে? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যদি দুর্নীতি খুঁজে না পাওয়া যায় তাহলে ব্যবস্থা নেবেন। আপনি ব্যবস্থা নিয়েন তার আগে ভিসিকে সরান, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তারপরে ব্যবস্থা নেন। আসামিকে ক্ষমতায় রেখে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয় না। কি আশ্চর্য ব্যাপার দেশের প্রধানমন্ত্রী কথা বলছে উল্টাপাল্টা।
তিনি বলেন, এমন কোন নির্যাতন নাই যা এই সরকারের আমলে জনগণের ওপরে আসে নাই। ধানের মূল্য পায় না। জনগণের কথা বলার অধিকার নাই। স্বাধীনতা নাই। গুম খুন হত্যা চলছেই। মানুষ এই স্বৈরাচারের পরিবর্তন চায়। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চায়। জনগণের সরকার চায়। তার জন্য ঐক্য দরকার। জনগণের ঐক্যবদ্ধ ছাড়া পৃথিবীতে কোন মহৎ উদ্যোগ সফল হয় না। দেশের মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ না হতো তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, মানুষ যখন রাস্তায় নামবে। কখন যে কি হবে তা বলা যায় না। কখন সে পায়ের তলার মাটি সরে যাবে বসার চেয়ার সরে যাবে তা বলা যায় না। তাই নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে নির্বাচন দিন তা নাহলে কি যে হবে চিন্তাও করতে পারবেন না।
এ সময় তিনি সকলকে মাঠে নামার আহবান জানিয়ে বলেন,আমি থাকবো আপনাদেরকে মাঠে নামতে হবে। স্বৈরাচারকে সহজে বিদায় করা যায় না। স্বৈরাচারের পতন একমাত্র ওষুধ হলো ঐক্য এবং মাঠের আন্দোলন এইখানে ঘরে বসে স্মরণ সভা করে স্বৈরাচারের পতন হয় না। আপনারা যুবসমাজ ছাত্রসমাজ শ্রমিক-কৃষক সবাই মাঠে নামেন আমি এই বয়সেও আপনাদের সাথে মাঠে নামবো। আমাদের এই লড়াই চলবে, এই লড়াই বাঁচার লড়াই। রক্ত কত চায় রক্ত ততই দিব তারপরেও দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবো। তিনি বলেন,আপনারা যদি আপনাদের মা-বোনকে নিয়ে ভালভাবে ঘরে থাকতে চান তাহলে এই সরকারের পতন করতে হবে। এ সরকারের পতন ছাড়া মা-বোন ও নিরাপদ নয়।
দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ছাড়া সরকারের পতন ঘটানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, দসরকারের পতন ঘটানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সরকারের পতন ঘটাতে হলে আমাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশে বলা হয় সংসদীয় সরকার, সংবিধানের সরকার চলছে। কিন্তু দেশে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক সরকার চলছে। এই স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের আন্দোলন করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের যদি দেশপ্রেম না থাকে তাহলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। দেশপ্রেম হয়তো আপনাকে শহীদ করবে কিন্তু দেশের জনগণকে অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্ত করবে।
সাদেক হোসেন খোকার ভয়ে সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগ করেছিল সরকার এই মন্তব্য করে নোমান বলেন, সাদেক হোসেন খোকার ভয়ে সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগে ভাগ করা হয়। কারণ, সরকারের ভয় ছিল, যদি সাদেক হোসেন খোকা নির্বাচন করে, তাহলে তো আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী বিজয়ী হতে পারবে না। তাই সিটি কর্পোরেশনকে দুই ভাগ করে ধ্বংস করে ফেলেছে। উন্নয়নের বেঘাত ঘটিয়েছে। এই সিটি কর্পোরেশনের সেবা জনগণ পাচ্ছে না। তবে আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে, সাদেক হোসেন খোকার যে স্বপ্ন ছিল, তা পূরণ করব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ