ঢাকা, শনিবার 9 November 2019, ২৫ কার্তিক ১৪২৬, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

এহসান সোসাইটির হাতিয়ে নেওয়া ১১ কোটি টাকা ফেরত পায়নি গ্রাহকরা

খুলনা অফিস : খুলনায় ‘এহসান সোসাইটি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক হাতিয়ে নেওয়া প্রায় ১১ কোটি টাকা তিন বছরেও ফেরত পায়নি গ্রাহকরা। ফলে এ প্রতিষ্ঠানে অর্থ সঞ্চয়কারী ১০ হাজারেরও বেশি গ্রাহক ক্ষুব্ধ ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই সঞ্চিত অর্থ ফেরত না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আর মাঠ পর্যায়ে অর্থ সংগ্রহকারী কর্মীরা একদিকে চাকরি হারিয়ে বেকার, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এদিকে, উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইতোপূর্বে দায়েরকৃত দু’টি মামলার রায় সম্প্রতি খুলনার আদালতে ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে সংস্থার পরিচালক মুফতী গোলাম রহমান, খুলনা জেলা সমন্বয়কারী মুফতী রশিদ আহমাদ এবং ম্যানেজার রবিউল ইসলামকে পৃথক ধারায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে মুফতী গোলাম রহমান ও রবিউল ইসলাম পলাতক এবং মুফতী রশিদ আহমাদ আপীলের শর্তে জামিনে রয়েছেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৩নং আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এহসান সোসাইটি ২০০৪ সাল থেকে খুলনা অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করে। নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড় সংলগ্ন ১৭২ নম্বর শেরেবাংলা রোডে অফিস নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ছিলেন নগরীর দারুল উলুম মাদরাসার বহিষ্কৃত শিক্ষক মুফতি গোলাম রহমান এবং খুলনা জেলার সমন্বয়কারী ছিলেন ডালমিল মোড়স্থ মক্কি মসজিদের ইমাম মুফতি রশিদ আহমাদ। সঙ্গে যোগ দেন গোলাম রহমানের ভাগ্নে খুলনা শাখার ম্যানেজার রবিউল ইসলাম। এরা নিজেদের পরিচিতি, ইমেজ ও ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে খুলনার সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে একাধিক সেমিনার ও মতবিনিময় সভা করেন। যাতে নগরীর বিভিন্ন মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মাদরাসার শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে ইসলামী অর্থনীতির দোহাই দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করতে প্রলোভন দেখানো হয়। অনেকটা সহজ-সরল ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মাদরাসার শিক্ষকরা তাদের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে গ্রাহক সংগ্রহে নেমে পড়েন। এভাবে তারা গ্রাহকদের বুঝিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ করে কোটি কোটি টাকা জমা করান।
সূত্রে জানা গেছে, এ এহসান সোসাইটির নামে ২০১৪ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র খুলনা মহানগরী ও দিঘলিয়া উপজেলা এলাকা থেকেই সংগ্রহ করা হয় ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা এলাকা থেকে মাসিক সঞ্চয় বাবদ ৩ কোটি টাকা, খালিশপুর এলাকা থেকে দেড় কোটি টাকা এবং দিঘলিয়া উপজেলা থেকে ৪০ লাখসহ মোট ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং রিয়েল এস্টেটের (জমির ব্যবসা) মাসিক মুনাফার নামে আরও সংগ্রহ করা হয় ৬ কোটি টাকা। এভাবে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আমানত হিসেবে দু’টি খাতে মোট ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, খুলনায় কাজ শুরুর পর প্রথম দিকে গ্রাহকদের কিছু কিছু লভ্যাংশ লোক দেখানো হিসেবে পরিশোধ করা হলেও ২০১৪ সাল থেকে এ টাকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতারণা বুঝতে পেরে গ্রাহকরা তাদের জমানো অর্থ ফেরত চাইলে মুফতি গোলাম রহমান ও রশিদ আহমাদ নানা টালবাহানা শুরু করেন। আশ্রয় নেন নানা ছলচাতুরিরও।
প্রতিষ্ঠানের মাঠকর্মী মুফতি মুনিরুজ্জামান অভিযোগ করেন, মুফতি গোলাম রহমানের কথায় বিশ্বাস করে তিনি প্রায় দেড় শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ১২ লক্ষাধিক টাকা সংগ্রহ করে জমা দেন। কিন্তু তারা এসব টাকা ফেরত না দেওয়ায় গ্রাহকরা তাকে চাপে রেখেছেন। এমনকি অনেক গ্রাহক তাকে ভয়ভীতিও প্রদর্শন করছেন। এতে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতা এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন। মাঠকর্মী মাওলানা মুশাহিদুল্লাহ বলেন, তিনি ৪২ জন গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা সংগ্রহ করেন।
মাঠকর্মী মাওলানা আবুজর বলেন, তিনিও প্রায় ১৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দেন। কিন্তু গোলাম রহমান ও রশিদ আহমাদ টাকা না দেওয়ায় তারা গ্রাহকদেরও টাকা পরিশোধ নিয়ে হতাশায় পড়েন। এ কারণে তিনি বাদী হয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মুফতী গোলাম রহমান, জেলা সমন্বয়কারী রশিদ আহমাদ এবং ম্যানেজার রবিউল ইসলামকে আসামি করে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর গ্রাহকদের পক্ষে খুলনার আদালতে দু’টি মামলা দায়ের করেন। এছাড়াও মাওলানা হেমায়েত হোসেন ও নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে আদালতে আরও দু’টি মামলা দায়ের করেন।
এদিকে, গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের দায়ে পৃথক দু’টি মামলায় এহসান সোসাইটির তিন কর্মকর্তাকে পৃথকভাবে জেল জরিমানার আদেশ দিয়েছেন আদালত। ৩ সেপ্টেম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৩নং আদালতের বিচারক মো. শাহিদুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে (সোনাডাঙ্গা সিআর-৩৬৫/১৬ নং মামলা) দ-বিধির ৪০৬ ধারায় মুফতী গোলাম রহমানকে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৪২০ ধারায় ৩ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, মুফতী রশিদ আহমাদকে ৪০৬ ধারায় ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৪২০ ধারায় ১ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং রবিউল ইসলামকে ৪০৬ ধারায় ১ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা, আনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৪২০ ধারায় ২ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়।
অপর মামলায় (সোনাডাঙ্গা সি আর ৩৬৬/১৬) মুফতী গোলাম রহমানকে দ-বিধির ৪০৬ ধারায় এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- এবং ৪২০ ধারায় অপরাধে ২ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা, অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদ-, মুফতী রশিদ আহমাদকে ৪০৬ ধারায় ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ১ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- এবং ৪২০ ধারায় ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ১ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম করাদ-, মো. রবিউল ইসলামকে ৪০৬ ধারায় ১ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা, আনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- এবং ৪২০ ধারায় ১ বছর ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়।
এর মধ্যে মুফতী গোলাম রহমান ও রবিউল ইসলাম পলাতক এবং মুফতী রশিদ আহমাদ আপীলের শর্তে আদালত থেকে এক মাসের জামিন লাভ করেন।
মামলা দু’টির বাদী মাঠকর্মী মাওলানা আবুজর বলেন, মামলার রায় হলেও আসামীরা বহাল তবিয়তে রয়েছে। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
জামিনে থাকা সাজাপ্রাপ্ত আসামি মুফতী রশিদ আহমাদ বলেন, তিনি জামিনে থেকে রায়ের বিরুদ্ধে জজকোর্টে আপীল করেছেন। আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারি আপীলের শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মুফতী গোলাম রহমান এহসান সোসাইটির কেন্দ্রীয় শরীয়াহ কাউন্সিলের সহ-সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্বে রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নগরীর বাগমারাস্থ মারকাযুল ফিকহিল ইসলামী মাদরাসার পরিচালক। জেলা সমন্বয়কারী মুফতী রশিদ আহমাদ নগরীর ডালমিল মোড়স্থ মক্কি মসজিদের ইমাম। গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দারুল উলুম মাদরাসা থেকে কর্তৃপক্ষ দু’জনকেই বহিষ্কার করে। কিন্তু মুফতী রশিদ আহমাদ মক্কি মসজিদে ইমামের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ