ঢাকা, শনিবার 9 November 2019, ২৫ কার্তিক ১৪২৬, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার ৭০৯ সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত

খুলনা অফিস : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলের’ প্রভাবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সুন্দরবনের দুবলার চরে হতে যাওয়া রাসমেলা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার বিকেল থেকে রাসমেলার দর্শনার্থীদের যাত্রা শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল। এদিন দুপুর নাগাদ মেলায় যাওয়ার অনুমতি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত আসার কথা ছিল। তবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শুক্রবার দুপুরেই রাসমেলা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে রাসমেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বসু শন্তু। একইসঙ্গে ‘বুলবুলের’ কারণে সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান ও পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুন জানান, দুবলার চরে রাসমেলার স্থানটি বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের আওতায়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃতি, আঘাত হানার সম্ভাব্য সময় এবং দুর্যোগের সার্বিক প্রভাব বিবেচনা করে রাসমেলা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাসমেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বসু শন্তু জানান, পূর্ণিমার দিন শুধু পূজা অনুষ্ঠিত হবে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অপরদিকে শুক্রবার সকালে বাগেরহাট জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা থেকে সুন্দরবন বিভাগকে সব ধরনের পাস-পারমিট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনও পাস-পারমিট দেওয়া হবে না বলে নিশ্চিত করা হয়।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল আজাদ জানিয়েছেন, ‘শুক্রবার বেলা ১২টা নাগাদ মংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত অব্যাহত রাখা হচ্ছে। বেলা ১২টা পর্যন্ত মংলা থেকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ৫৮৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাবে শুক্রবার সকাল ৯টার পর থেকে খুলনার আকাশে মেঘমালা দেখা যায়। শুক্রবার সন্ধ্যা বা শনিবার সকাল থেকে খুলনার মানুষ এর তীব্রতা উপলব্ধি করতে পারবেন। যা শনিবার সন্ধ্যার দিকে এ অঞ্চল দিয়ে বয়ে যেতে পারে।’
তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাগর উত্তাল রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুক্রবার সকালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা করে জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এদিকে মংলা বন্দরে তিনটি কন্ট্রোল রুম চালু করেছে কর্তৃপক্ষ।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, ‘ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ঘনীভূত হওয়ার ফলে দুবলার আয়োজক জেলেদের পরামর্শেই মেলা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর তাৎক্ষণিক সাপোর্ট হিসেবে ১৯০ মেট্রিক টন খাবার ও নগদ দুই লাখ টাকা মজুদ রয়েছে। আপদকালিন সহায়তা আরও বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে জরুরি চিঠি পাঠানো হবে।’
খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ  হেলাল হোসেন জানিয়েছেন, খুলনা জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান জানান, ‘ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অবস্থা প্রতিকূল হলে দুবলার চরে জেলেদের মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।’
খুলনার ৩৩৮ সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র প্রভাবে খুলনায় সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় খুলনা জেলাসহ নয় উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৩৩৮টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। এদিকে, ক্ষেতে আধাপাকা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজিজুল হক জোয়ার্দ্দার বলেন, বিকেল ৪টায় খুলনা সার্কিট হাউজে ‘বুলবুল’র প্রভাব মোকাবেলা ও সকল কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি জরুরি সভা করেছে জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি ৩৩৮টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। উপকূলীয় দাকোপ ও কয়রা উপজেলায় ২৪ হাজার ৬০ সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বাগেরহাটে ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত : বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে। এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মংলা সমুদ্র বন্দরে চার নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত জারি করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুক্রবার সকালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা করে জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এদিকে মংলা বন্দরে তিনটি কন্ট্রোল রুম চালু করেছে কর্তৃপক্ষ।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে এই সভায় পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায়, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কামরুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে জেলা প্রশাসক জানান, ‘ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলায় ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া জেলা সদরসহ প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০টি মেডিকেল টিম। রেড ক্রিসেন্ট, ফায়ার সার্ভিস ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কয়েক শত স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দীন জানান, ‘মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় সর্বত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে তিনটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। বন্দর জেটি ও আউটার অ্যাংকরেজে অবস্থানরত ১৪টি জাহাজ নিরাপদে রয়েছে। ঘর্ণিঝড়ের সংকেত ৫ নম্বরে উঠলেই বন্দরের পণ্যবোঝাই ও খালাসের বিষয়ে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
আবহাওয়া বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ৬৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি শনিবার দুপুর নাগাদ উপকূলে আঘাত হানতে পারে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর উত্তাল রয়েছে।

হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দীন জানান, বন্দরে এই মুহূর্তে মেশিনারি, ক্লিংকার, সার, জিপসাম, পাথর, সিরামিক ও কয়লা বোঝাই দেশি-বিদেশি মোট ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছে। এসব জাহাজে পণ্য খালাসে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান জানান, ‘ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অবস্থা প্রতিকূল হলে দুবলার চরে জেলেদের মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।’
সাতক্ষীরার ১৩৭ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকা শ্যামনগর, আশাশুনিতে শুক্রবার ভোর থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সেই সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া জেলার ১৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া জন্য এলাকায় মাংকিং করা হচ্ছে। একইসঙ্গে উপকূলীয় এলাকার জেলে-বাওয়ালীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টায় প্রস্তুতি মূলক সভা শেষে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. বদিউজ্জামান (সার্বিক) একথা জানিয়েছেন।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে মংলা সমুদ্র বন্দরের জন্য ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেওয়া হয়েছে। বেলা ১২টার সময় মংলা থেকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ৫৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাবে শুক্রবার ভোর থেকে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। শুক্রবার ভোর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১ মিলিমিটার এবং ১২টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টি শনিবার সন্ধ্যার দিকে এ অঞ্চল অতিক্রম করতে পারে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ