ঢাকা, শনিবার 9 November 2019, ২৫ কার্তিক ১৪২৬, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

চুনোপুঁটি ধরে এবং ক্যাসিনো গল্প সাজিয়ে জনগণের দৃষ্টিকে আড়াল করতে পারবেন না

৭ নবেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ে বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: ‘ক্যাসিনোর গল্প’ সাজিয়ে সরকার দুর্নীতি থেকে জনদৃষ্টি আড়াল করছে বলে অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল শুক্রবার বিকেলে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, এই সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সচেতনভাবে বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র করতে চায়। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে দিচ্ছে, তারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তারা মানুষকে সুশাসন থেকে বঞ্চিত করছে, নিজেদের দুর্নীতি এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেটাকে ঢাকার জন্য নিজেদের চুঁনোপুটিদের ধরতে হচ্ছে। একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই চুনোপুঁটি ধরে এবং ক্যাসিনো গল্প সাজিয়ে মূল দুর্নীতি থেকে আপনারা (সরকার) জনগণের দৃষ্টিকে আড়াল করতে পারবেন না।
গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চ মিলনায়তনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে এই আলোচনা সভা হয়। মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে এবং প্রচার সম্পাদক শহিদউদ্দিন চৌধুরী ও সহপ্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিমের পরিচালনায় আলোচনা সভায় পধান অতিথি ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। অন্যান্যের মধ্যে ভ্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বেগম সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, ঢাকা মহানগর উত্তরের বজলুল বাসিত আনজু, স্বেচ্ছাসেবক দলের শফিউল বারী বাবু, যুব দলের সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসেইন, মহিলা দলের হেলেন জেরিন খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় বিএনপির আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, বিলকিস জাহান শিরিন, শিরিন সুলতানা, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, রেহানা আখতার রানু, আবদুস সালাম আজাদ, সেলিমুজ্জামান সেলিম, মোরতাজুল করীম বাদরু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, কাজী আবুল বাশার, রফিকুল ইসলাম মাহতাব, আবুল কালাম আজাদমহ অঙ্গসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকার পতনে সকলকে রাস্তায় নামার তাগিদ দিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এরা একদম ফ্যাসিস্ট একটা সরকার, একনায়ক একটা সরকার। এর থেকে মুক্তি পেতে হবে-এর কোনো বিকল্প নেই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হলে, গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে হলে, আমাদের অধিকারগুলোকে ছিনিয়ে আনতে হলে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নামতে হবে, রাস্তায় নামতে হবে- এর কোনো বিকল্প নাই।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারকে এককভাবে পরাজিত করা যায় না। সকল শক্তিগুলো একজায়গায় আনতে হয়। আমরা সেই লক্ষ্যেই যাচ্ছি। আমরা মনে করি যে, সকল দেশপ্রেমিক শক্তি, গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা এই একনায়ক ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরিয়ে জনগনের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো। তার জন্য দরকার ইস্পাতকঠিন ঐক্য। সেই ঐক্য সৃষ্টি করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। ইনশাল্লাহ বিজয় আমাদের অবিসম্ভাবী।
৭ নভেম্বর নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, যারা সরকারে আছেন, যারা জনগনের ভোটে নির্বাচিত হন নাই, জোর করে ক্ষমতায় আছেন তারা বলেন, ৭ নভেম্বর আমরা মানি না। আমাদের মুরুব্বী (জ্যেষ্ঠ নেতা) বলেছেন, মানবেন কেনো? আপনারা তো এেেদ্শর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করেনা বলেই মানেন না। আজকে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে, যারা বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে আছে- এই ধরনের রাষ্ট্র দেখতে চায়- তারা অবশ্যই ৭ নভেম্বরকে পালন করবে, মানবে। কারণ ওই দিন আমরা নতুন করে আমাদের দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা তারা ষড়যন্ত্র থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। ৭ নভেম্বর সেই দিন দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা তারা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশপ্রেমিক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বের করে নিয়ে এসে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন বলেই বাংলাদেশ অকার্য্কর রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি, দিয়েছেন বলেই বাংলাদেশ এখনো লড়াই করছে।
প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করছেন তার হিসাব কোথায়, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছেন তার হিসাব কোথায়? শেয়ার মার্কেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছেন তার হিসাব কোথায়? তাদের হিসাব মাফ করার জন্যে আপনাদের কেউ মন্ত্রী, কেউ উপদেষ্টা, কেউ আপনাদের নিজেদের আপনজন। এই সরকার যারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সচেতনভাবে বাংলাদেশকে অকার্য্কর রাষ্ট্র করতে চায়। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে, তারা মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তারা মানুষকে সুশাসন থেকে বঞ্চিত করছে।
সরকারের নির্দেশে মিডিয়া চলে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে মানুষের অধিকার নেই, ভোটের অধিকার নেই, বেঁচে থাকবার অধিকার নেই, বাক স্বাধীনতা নেই, সংবাদপত্রের কোনো স্বাধীনতা নেই। আজকে পত্রিকাগুলো দেখবেন- গতকাল সারাদেশে সাদেক হোসেন খোকার বিভিন্ন জানাজার খবর ছাড়া কোনো খবর ছিলো না। আজকে  আমাতের প্রিন্টিং মিডিয়াগুলো দেখবেন, বেশিরভাগ প্রিন্টিং মিডিয়া এই খবরটাকে পেছনের পাতা অথবা ভেতরের পাতা নিয়ে গেছে। আমি জানি, জিজ্ঞাসা করলে বলবেন, আমাদের বলার কি আছে। আমাদেরকে তাই নির্দেশ দিয়েছে। এটাই চলছে এখন। কেউ নির্দেশে করছে, কেউ আবার সেলফ সেন্সরশীপে করছে। এটা ছাপলে নাকী আবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। কেউ কথা বলতে সাহস করে না, িেট্লভিশনে কেউ কথা বলতে পারে না, যারা কথা বলতেন তাদেরকে ডাকা হয় না, মুক্তভাবে লিখতে পারে না, রাস্তায় বেরুতে পারে না।
স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ৭ নভেম্বর যে অবস্থা দেশের হয়েছিলো আজকেও আমাদের ঠিক একই ভাবে আওয়ামী লীগের একদলীয় শাসন, গায়ের জোরের শাসনের কারণে বাংলাদেশে আজকে ঠিক একই অবস্থা বিরাজ করছে। আজকে বাংলাদেশ একটি স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট সরকারের রোল মডেল হয়েছে, দুর্নীতির রোল মডেল হয়েছে, অত্যাচার-অনাচার-চাঁদাবাজীর রোল মডেল হয়েছে, ক্যাসিনোর রোল মডেল হয়েছে।
সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, এই দেশে উপর থেকে সমাজের সর্বস্তরে পচন লেগেছে এই নির্বাচিত সরকার কায়েম করে ক্ষমতা চালানোর কারণে। তাই আমাদেরকে এদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। রক্ষা করতে হলে গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা ছাড়া গণতন্ত্র আসবে না, এই সরকারের পতন হবে না। আপনাদের সাথে আমিও বিশ্বাস করি, রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারকে হটাতে হবে, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে- আজকে ৭ নভেম্বরের চেতনায় আসুন আমরা সকলে শপথ গ্রহন করি।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, আজকে আমরা ব্যর্থ হযেছি বেগম খালেদা জিয়াকে আমরা মুক্ত করতে পারি নাই। আজকে একবছর ৯ মাস হয়ে গেছেন তিনি কারাগারে আছেন। তার শরীরের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ-আপনারা সবাই জানেন। আদালতের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তার জামিনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় নাই। হয়ত জামিন হবে না। আমি বলতে চাই, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি রাজপথের আন্দোলনে আসতে হবে। আপনারা কী আপনাদের বাড়িতে বসে মিটিং করে বেগম জিয়ার মুক্তি করতে পারবেন না। তাই আন্দোলনের সময় এসে গেছে এখন। আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আজকে যদি আন্দোলনের ডাক আসে রাজপথে আপনাদের নামতে হবে, আমরা যারা সিনিয়র আছি আমরা আপনাদের পাশেই থাকবো। আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকারের পরিবর্তন করতে হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি মানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে হাসিনার মুক্তি। এই দুটা পাশাপাশি। সেই কারণেই সিদ্ধান্ত নিন- সরকার পতনের আন্দোলন করবেন না দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করবে। যেই কারণেই আন্দোলন করেন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন মানেই সরকার পতনের আন্দোলন, আর সরকার পতনের আন্দোলন মানেই দেশনেত্রীর মুক্তি। সেই কারণে বলব, সেই ৭ নভেম্বর চেতনাকে ধারণ করেন, আজকে আবার সেই ৭ নভেম্বরের চেতনা গর্জে উঠুক সকলের মনে, সকলের অন্তরে। চেতনাবোধকে শানিত করেন আর ব্যবসা-বানিজ্য, সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করা যাবে না। আর যারা যেতে চান, তারা যাক। তাদের দিয়ে কোনো চিন্তার দরকার নাই।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, নেতারা ডাকলো কি ডাকলো না সেটা দেখার দরকার নেই। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধে যেতে নেমে যেতে হবে। প্রেসক্লাবে আর নয়, যা হবে রাস্তায় হবে। নেতাদের নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে কর্মীদের মাঠে নামার আহ্বান জানিয়ে গয়েশ্বর বলেন, নেতারা অনেক সময় নির্দেশ দিতে পারেন না। তাই বলে কর্মীদের বসে থাকলে চলবে না। ১৯৭১ সালেও নেতারা ঠিক মতো নির্দেশ দিতে পারেননি। তখন অখ্যাত একজন মেজর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল। তখন কেউ প্রশ্ন করেনি তুমি কে হে ঘোষণা দেওয়ার? সবাই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিল। সুতরাং আর প্রেসক্লাবে নয়, যা হবে রাস্তায় হবে। বিএনপির এ নেতা বলেন, আদালতের মাধ্যমে নেত্রীর মুক্তি হবে না, এটা আমরা বুঝে গেছি। সুতরাং খালেদা জিয়ার মুক্তি বিষয়ে আপনাদের যদি প্রাণের দাবি ও আকাঙ্খাবোধ তীব্র হয় তাহলে আপনারা প্রস্তুত হন।
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সরকার আমাদের নেত্রীকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটক করে রেখেছে। অবৈধভাবে বিচার করছে। এটাকে তো আমি বিচারই মনে করি না। আমাদের সিনিয়র আইনজীবীরা বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। তাকে মুক্ত করতে হলে, রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে করতে হবে। দুদু বলেন, ৭ নভেম্বর সম্পর্কে অনেক কিছু বলার আছে। ৭ নভেম্বর সম্পর্কে যদি আমরা ব্যাখ্যা করতে না পারি, বুঝতে না পারি তাহলে আজকে বিরোধী দলের যে করুণ অবস্থা, গণতন্ত্রের আন্দোলনের পরেও সফলতা আসছে না, সেটা শুধু ৭ নভেম্বরের আদর্শ গৌরবের ব্যাখ্যা না বোঝার কারণে। গণতন্ত্রের পক্ষে হচ্ছে ৭ নভেম্বর আর স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে হচ্ছে ৩ নভেম্বর। এই জিনিসগুলা যতদিন আমরা ধরতে না পারব ততদিন পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে।
তিনি বলেন, অনেকেই ৭ নভেম্বরের বিরোধিতা করেন। যারা দেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ করাকে জায়েজ মনে করে, তারা ৭ নভেম্বরকে খারাপ চোখে দেখতে পারে। যারা বিরোধী দলের ৪০ হাজার নেতাকর্মীকে রক্ষীবাহিনী দ্বারা হত্যা করেছিল, তারা ৭ নভেম্বরকে খারাপ চোখে দেখতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ