ঢাকা, শুক্রবার 15 November 2019, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

গণপরিবহনে যথেচ্ছ ভাড়া

সারা দেশে তো বটেই, বিশেষ করে রাজধানীতে গণপরিবহনে যাতায়াতের জন্য যথেচ্ছ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাস মালিকরা যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে টাকা আদায় করছেন। শুধু তা-ই নয়, একই দূরত্বের গন্তব্যের জন্য বিভিন্ন কোম্পানির বাস যার যার ইচ্ছামতো ভাড়া দিতে যাত্রীদের বাধ্য করছে। জিম্মি হয়ে পড়া যাত্রীরাও বেশি ভাড়া না দিয়ে পারছেন না। 

প্রকাশিত রিপোর্টে কিছু উদাহরণও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, মালিবাগ রেলগেট থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত আনুমানিক চার কিলোমিটার দূরত্বের জন্য একটি কোম্পানির বাস ২০ টাকা আদায় করে। একই দূরত্বের জন্য অন্য এক কোম্পানির বাস আদায় করে ৩৫ টাকা। এসব সাধারণ বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসগুলোও যাত্রীদের সঙ্গে সর্বাত্মক প্রতারণা করে চলেছে। যেমন, মতিঝিল থেকে রামপুরা হয়ে টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য একটি কোম্পানি যেখানে ১০০ টাকা আদায় করছে সেখানে বিআরটিসি বাসের ভাড়া ৬০ টাকা। এভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৪ টাকা ৭৬ পয়সা আদায় করছে। অথচ সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার পরিমাণ হলো ২ টাকা ৬৭ পয়সা। 

সিটিং সার্ভিসের নামে যেসব বাসে ঠাসাঠাসি করে যাত্রী ওঠানো হয় সে বাসগুলো আবার নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করলেই প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করে থাকে। যেমন, মগবাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত সব বাসের ভাড়া ৪০ টাকা হলেও কোনো যাত্রী যদি তেজগাঁওয়ের সাত রাস্তা অর্থাৎ মোট দূরত্বের অর্ধেক পার হন তাহলে তাকে সর্বনিম্ন ভাড়া হিসেবে ২০ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। অথচ এর ভাড়া হওয়া উচিত ৫ টাকা। উল্লেখ্য, বাসের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়ার পরিমাণ ৭ টাকা এবং প্রতি কিলোমিটারের জন্য ১ টাকা ৭০ পয়সা। আর মিনি বাসের ক্ষেত্রে এই ভাড়ার পরিমাণ যথাক্রমে ৫ টাকা এবং ১ টাকা ৬০ পয়সা। এর বেশি ভাড়া আদায় বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অন্যদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর বাস ও মিনিবাসের কোনোটিই সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার পরোয়া করছে না। বিভিন্ন কোম্পানির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের বিরুদ্ধে অনেক আগেই অভিযোগের পাহাড় তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, বিআরটিসির বাসগুলোও মাঝে-মধ্যেই বেআইনিভাবে বেশি, এমনকি দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করে থাকে। অর্থাৎ পরিবহনের ভাড়ার ক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতা চরমে পৌঁছে গেছে, প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যার অসহায় শিকারে পরিণত হয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু এতকিছুর পরও সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবিধানের কোনো পদক্ষে নেয়া হচ্ছে না বললেই চলে। 

একই কারণে পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটে চললেও রাজধানী ঢাকার প্রাত্যহিক যানজট এবং পাবলিক বাসসহ গণপরিবহনে যাতায়াতের বিড়ম্বনা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার সুযোগ রয়েছে কি না সেকথা ভেবে দেখা দরকার। কারণ, টিভি ও সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমের প্রায় নিয়মিত রিপোর্টে সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের বিবরণ তো থাকছেই, পাশাপাশি থাকছে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কথাও। এ ধরনের বিষয় নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনাও যথেষ্টই হয়েছে। এখনো হচ্ছে। কিন্তু সরকার তো বটেই, অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা বিভাগের পক্ষ থেকেও প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সমস্যার সমাধানে সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনা না আসার ফলেও মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগ দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবার দুর্ঘটনা এবং  প্রাণহানির সঙ্গে হাত-পা থেতলে ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলার মতো ভয়ংকর কর্মকান্ডও যুক্ত হয়েছে। 

এমন এক পরিস্থিতিতে দরকার যেখানে ছিল যাত্রী তথা সাধারণ মানুষের কষ্ট-ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয়া, সেখানে বেশ কিছুদিন ধরেই জানা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী এক আশংকাজনক খবর। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাস মালিকরা রাজধানীর বিভিন্ন রুটের কয়েকটি পর্যন্ত পয়েন্টে তাদের ‘মাস্তান বাহিনী’ তথা সশস্ত্র গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের নিয়োজিত রেখেছেন। ভাড়া আদায় নিয়ে বাস চালক এবং কন্ডাক্টর ও হেল্পারের সঙ্গে তর্ক বা ঝগড়ার মতো কোনো কারণ ঘটলে ‘মাস্তান বাহিনী’র গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা শুধু মুখের অশ্লীল কথাতেই থেমে যায় না, যাত্রীদের গায়ে পর্যন্ত হাত তোলে। মারপিট করে এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অনেক বেশি টাকাও জোর করে আদায় করে নেয়। 

প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গাজীপুর থেকে গুলিস্তান ও সায়েদাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ রুটের টঙ্গী, উত্তরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, মৌচাক, গুলিস্তান ও সায়েদাবাদের কয়েকটি পয়েণ্টে ‘মাস্তান বাহিনী’র সদস্যরা তৎপরতা চালাচ্ছে। ওদিকে মিরপুর-গুলিস্তান এবং মিরপুর-রামপুরা রুটে মিরপুর ছাড়াও আগারগাঁও, আসাদ গেট, ফার্মগেট, মহাখালি, বাংলামোটর, বাড্ডা ও রামপুরাসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে তৎপর রয়েছে ‘মাস্তান বাহিনী’র গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা। বাসে উঠেই কন্ডাক্টর বা হেল্পারের দেখিয়ে দেয়া যাত্রী বা যাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা।  

বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে যথেচ্ছভাবে বেশি টাকা আদায় এবং ‘মাস্তান বাহিনী’র সাহায্যে যাত্রীদের অসম্মানিত ও নাজেহাল করার খবর যে কোনো মূল্যায়নে অগ্রহণযোগ্য। আমরা মনে করি, বেআইনিভাবে বেশি টাকা আদায় করার পরিবর্তে মালিকদের উচিত সকল রুটে সরকার-নির্ধারিত হারে ভাড়া আদায় করা এবং যাত্রী হয়রানি থেকে বিরত থাকা। এ ব্যাপারে বিআরটিএর মাধ্যমে সরকারকেই বেশি তৎপর হতে হবে। সরকারের উচিত রাজধানীর গণপরিবহন খাতে অভিন্ন ভাড়ার হার প্রবর্তন ও প্রয়োগ করা এবং যাত্রীদের স্বার্থ ও মান-সম্মান রক্ষার ব্যাপারে বিশেষভাব মনোযোগ দেয়া। আমরা একই সঙ্গে বিভিন্ন রুটে তৎপর ‘মাস্তান বাহিনী’র এবং এসব বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও দাবি জানাই। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ