ঢাকা, রোববার 8 December 2019, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

এনআরসি’র নামে গরীব মানুষকে রাষ্ট্রহীন করার অভিসন্ধি হচ্ছে: কান্নন গোপীনাথন

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: ভারতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি হলে দেশের গরীব মানুষ ও মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন বলে মন্তব্য করেছেন সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করা আইএএস কর্মকর্তা কান্নন গোপীনাথন। গতকাল (শুক্রবার) পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কোলকাতায় ‘এনআরসি : বিপর্যয় ও প্রতিরোধ’ শীর্ষক আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখার সময় তিনি ওই মন্তব্য করেন।

এনআরসি সম্পর্কে কান্নন গোপীনাথন বলেন, ‘প্রথমত, ওই নাগরিকপঞ্জি গরীব-বিরোধী এবং দ্বিতীয়ত, মুসলিম-বিরোধী। তাঁর যুক্তি, ৫০ বছরের পুরোনো নথিপত্র না দেখাতে পারলে নাগরিকত্বই থাকবে না, এমন উদ্ভট যুক্তি মেনে নেওয়া যায় না।’

কোলকাতায় সিপিআইয়ের রাজ্য দফতরে ‘অল ইন্ডিয়া পিপল্‌স ফোরাম’-এর উদ্যোগে ‘এনআরসি : বিপর্যয় ও প্রতিরোধ’ শীর্ষক আলোচনাসভায় কান্নন গোপীনাথন আরও বলেন, ‘আপনারা ইঁদুরের মতো ছুটোছুটি করে ২২ রকম কাগজ জোগাড় করলে সরকার ২৩ নম্বর কাগজের কথা বলে আপনাদের বিপাকে ফেলতে পারে। তারচেয়ে কাগজ জোগাড় বা জমা দেওয়া বন্ধ রাখুন। দেখা যাক, কীভাবে এনআরসি হয়!’

সরকারি কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, পুরোনো কাগজপত্র রাখার ক্ষেত্রে সামান্য সম্পন্ন মানুষের যতটুকু আয়োজন থাকে, গরীব মানুষের তাও থাকে না।  এনআরসি’র নামে গরীব মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়ার অভিসন্ধি হচ্ছে বলে তাঁর মত।

কান্নন গোপীনাথন বলেন, ‘ভারতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে সংবিধান। স্বাধীনতার পরে বহু বিতর্কের পর সংবিধানে ওই বিষয়টি ঠাঁই পেয়েছে। হঠাৎ রাতারাতি একটি তালিকা তৈরি করে কিছু লোককে বেনাগরিক করে দেওয়া সংবিধানের পরিপন্থী কাজ। আসলে এই সব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশের গরিব এবং সংখ্যালঘু মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে। কারণ, গরীবদের কাছে ৫০/৬০ বছরের পুরনো নথি থাকা খুবই দুরূহ বিষয়। পাশাপাশি ভিন দেশ থেকে আসা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে বাকিদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে ‘কেবলমাত্র মুসলিমদের নাগরিকত্ব না দেওয়া’র মাধ্যমেও সংবিধানকে অমান্য করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে নাগরিকদেরই পাল্টা কৌশল করতে হবে।’

এনআরসির প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গে বিক্ষোভ

তিনি বলেন, ‘নানা ধরণের নথি জোগাড়ের দৌড়ে শামিল না হয়ে সবাই বয়কটের মনোভাব নিয়ে বাড়িতে বসে থাকুন। দেশের অধিকাংশ মানুষ যদি নথি জোগাড় না করে তাহলে সরকার তাদের তালিকার বাইরে রাখার সাহস দেখাতে পারবে না। তখন সরকারই বিপাকে পড়ে এইসব ‘আজগুবি পদক্ষেপ’ গ্রহণ শিকেয় তুলে রাখতে বাধ্য হবে।’

কোনও একটি দল যদি লোকসভার ৫৪৩টি আসনেও জিতে আসে, তাহলেও তাদের সব কাজ বা পদক্ষেপ গ্রহণ বিনা প্রতিবাদে মেনে নেওয়া প্রকৃত নাগরিকের ভূমিকা হতে পারে না বলেও কান্নন গোপীনাথন মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ যখন ঘর ছেড়ে ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে যায়, তখন কী তার পক্ষে ৫০ বছরের পুরোনো নথি নিয়ে যাওয়া সম্ভব? এনআরসি’তে পাখির চোখ করা হয়েছে মুসলিমদের। হিন্দু হলেও ছাড়া পাবেন না। এনআরসি'র শর্ত অনুযায়ী ঠিকঠাক নথি দেখাতে না পারলেই শরণার্থীর স্তরে নেমে আসতে হবে। নাগরিকের অস্তিত্ব নির্ভর করছে সরকারের দয়ার উপরে!’

কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের প্রতিবাদে গত ২১ আগস্ট পদত্যাগ করেছিলেন কেরালার সরকারি আমলা কান্নন গোপীনাথন। তিনি বলেন, 'আমি যতটা না সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে চাকরি ছেড়েছি, তার চেয়েও আমি বেশি ব্যথিত হয়েছিলাম ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের পরে মানুষের মধ্যে নীরবতা লক্ষ্য করে। ওই ধারা প্রত্যাহারের পরে কাশ্মীরের সঙ্গে দেশের সব যোগাযোগ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে। এককথায়, মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার অধিকারও হারাল।'

তাঁর মতে, ‘সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে নরেন্দ্র মোদী সরকার জম্মু-কাশ্মীরের লাখ লাখ মানুষের মৌলিক অধিকারে আঘাত হেনেছে।’ তিনি বলেন, ‘জীবন ও স্বাধীনতা একই সঙ্গে জড়িত। এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেখানে যদি বলা হয়, জীবন বাঁচাতে আপনাকে জেলে পুরে রাখা হয়েছে, তা কি গ্রহণীয়?’

এভাবে কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বাতিলকে কেন্দ্র করে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতার পরে এবার জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মাঠে নেমেছেন কান্নন গোপীনাথন।- পার্স টুডে

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ