ঢাকা, শুক্রবার 22 November 2019, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

ঢাকা লিট ফেস্টের নবম আসর

মুহাম্মদ নূরে আলম: ঢাকা লিট ফেস্টের নবম আসরেও এলিট বিশ্বের নামিদামি এলিট সাহিত্যিক রাজনীতিবিদ, ঐতিহাসিক, গবেষকদের আনাগোনা গত ৮ম বারের মতো এবারও দেশের প্রান্তিক সাহিত্যিক গবেষকগণ বঞ্চিত হয়েছেন। এই লিট ফেস্ট নিয়ে আলোচনার চেয়ে সমালোচনাই বেশি। ঢাকার অনেক তরুণ-লেখক-তাদের মধ্যে এরকম একটা সমালোচনা আছে -লিট ফেস্টিভ্যাল নামে যেটি ঢাকায় হচ্ছে সেটা আসলে এলিট লোকজনের সাহিত্যচর্চা। বাংলাদেশের যে ব্যাপক জনগোষ্ঠী তাদেরকে অতটা সম্পৃক্ত করতে পারেনি আয়োজকেরা। কেউ কেউ বলছেন, মুনাফা লোভী  স্পন্সরের পর স্পন্সর দিয়ে রঙ ঢং হতে পারে কিন্তু সাহিত্যচর্চা হতে পারে না। কারণ যাদের মানসিকতাই হলো অর্থ অর্জন করা তারা কিভাবে সাহিত্যসেবী হয়। নবমবারের মতো গত ৯ নভেম্বর থেকে তিনদিন ব্যাপী ঢাকায় শুরু হয় আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’।  

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ঢাকা লিট ফেস্টের নবম আসরে বিদেশি নারীদের একটি নাচের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। ঢাকা লিট ফেস্টে নাচানাচি নিয়ে সমালোচনা ! ভিডিও ভাইরাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের ‘বন্ধু তুই লোকাল বাস’ গানের সঙ্গে নাচছেন বিদেশীরা। সানওয়ার রাসেল নামের এক ব্যক্তি প্রথমে ভিডিওটি তার ওয়ালে পোস্ট করেন। এরপর মুহূর্তেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়। তাতে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দেন অনেকে। মোহাম্মদ মশিউর নামের একজন লিখেছেন, দুঃখজনক, বাংলা একাডেমির মতো জায়গায় এসব কী হচ্ছে! এই যদি হয় কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা তাহলে তারা কী ধরনের লেখেন! বোঝাই যাচ্ছে!

ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান লিখেছেন, ‘বিকৃত রুচির সমাহার...! এরাই আবার সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক...’। শাকিল হাসান চৌধুরী লিখেছেন, আরে! এটি কবিদের অনুষ্ঠান? আমিতো ভেবেছিলাম বিদেশি কোনো মুভির নাইট শো! ডালিয়া হোসাইন এক নারী লিখেছেন, এটা কী? ঢাকা লিট ফিস্ট? ছি ছি ছি। ভাগ্যিস যাই নাই। ফারহানা হোসাইন নামের একজন লিখেছেন, আশ্চর্য ব্যাপার। একদম দেশটারেই লোকাল বাস বানায় ফেলছে। চেতনায় আগুন লেগে গেছে দেখি! তবে এই নাচের পক্ষেও মতামত দিয়েছেন অনেকেই। তাদের ভাষ্য, অনুষ্ঠানের একটি টপিকের কারণেই এমন নাচানাচি হয়েছে। গত শনিবার ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে সাহিত্যের এই উৎসবের সমাপনী ঘোষণা করা হয়। 

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ১০ম আসরেও আমরা সবাই এই আয়োজনের সঙ্গে থাকবো। আমরা যত বেশি সাহিত্য উৎসব করবো তত বেশি ভালোবাসার সঙ্গে থাকা হবে। সাদাফ সায্ এসময় আয়োজনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ঢাকা লিট ফেস্ট আবারও প্রমাণ করলো সাহিত্যে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়। সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এই আয়োজনে একত্রিত হওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।

বাংলা একাডেমি চত্বরে ঢাকা লিট ফেস্টের নবম আয়োজন শুরু হয় গত ৭ নভেম্বর। দেশি-বিদেশি সাহিত্য অঙ্গনের রথী-মহারথীদের এই মিলনমেলা চলে তিন দিনব্যাপী। ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠান হয় গত বৃহস্পতিবার  ৭ নভেম্বর সকাল ১০টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন-সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বাবু, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বুকারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ লেখক মনিকা আলী, ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্,কাজী আনিস আহমেদ এবং আহসান আকবর, টাইটেল স্পন্সর বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল ও ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান।

এ সাহিত্য উৎসবে পাঁচটি মহাদেশের ১৮টি দেশ থেকে শতাধিক বিদেশি এবং দুই শতাধিক বাংলাদেশি সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক অংশ গ্রহণ করে ছিলেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বুকারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ লেখক মনিকা আলী ছাড়াও থাকবেন ভারতীয় রাজনীতিক শশী থারুর, কথাসাহিত্যিক উইলিয়াম ডালরিম্পল, ভারতের জনপ্রিয় বাংলাভাষী লেখক শংকরসহ আরও অনেকে। সঙ্গে থাকছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আসাদ চৌধুরী, রুবী রহমান, সেলিনা হোসেন প্রমুখ।

প্রথমদিন এই উৎসবে দেওয়া হয় বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাহিত্য সম্মাননা জেমকন সাহিত্য পুরস্কার। দ্বিতীয় দিনে প্রদর্শিত হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর নির্মিত ডকুফিল্ম ‘হাসিনা: অ্যা ডটার্স টেল’।

ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজিত হচ্ছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহযোগিতায়। এটির টাইটেল স্পন্সর ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন ও অনলাইন নিউজপেপার বাংলা ট্রিবিউন, প্লাটিনাম স্পন্সর সিটি ব্যাংক। অনুষ্ঠানের সার্বিক আয়োজনে রয়েছে যাত্রিক। সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছে বাংলা একাডেমি। এছাড়া গোল্ড স্পন্সর হিসেবে রয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। সিলভার স্পন্সর হিসেবে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক। এছাড়া আরও পার্টনার হিসেবে রয়েছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, নগদ, স্কলাস্টিকা, বিকাশ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইন্টার কন্টিনেন্টাল, ঢাকাস্থ নরওয়েজিয়ান দূতাবাস, গোথে ইনস্টিটিউট, ইএমকে সেন্টার। সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল এই উৎসব।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ২০১১ সালে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজকে তার নবম আসর। বাংলা সাহিত্যকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজন। আমাদের আশা, একদিন লিট ফেস্ট বাংলাকে নিয়ে যাবে বিশ্বের কাছে। এর আগে হে ফেস্টিভ্যাল ছিল বহির্বিশ্বের সাহিত্যকে বাংলাদেশে পরিচিত করার জন্য। যারা আয়োজক তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এরকম একটা শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। ঢাকা লিট ফেস্টের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করছে। আগামী বছর এই আয়োজনের শ্রী এবং মান আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কবি ও ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবর বলেন, তিন দিনের এই উৎসবে দেশি ও বিদেশি সাহিত্যকে তুলে ধরা হবে। ঢাকা লিট ফেস্ট ফিকশনের সঙ্গে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের সঙ্গে কবিতা, কবিতার সঙ্গে কলার মেলবন্ধন ঘটায়। বাক স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ এবং রাজনীতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও মুক্তচিন্তার গুরুত্ব নিয়ে আমাদের আয়োজন সাজানো হয়।

ঢাকা লিট ফেস্টে আসতে পারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ম্যানবুকারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত সাহিত্যিক মনিকা আলী। এসময় তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাহিত্যিক মনিকা আলী ছাড়াও উপমহাদেশের অন্যতম সাহিত্য ব্যক্তিত্ব শংকর, পুলিৎজার প্রাইজ বিজয়ী লেখক জেফরি গেটলম্যান, প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া, ডিএসসি পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক এইচএম নাকভি, ইতিহাসভিত্তিক লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল, ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর, কবি তিশানি দোশি, সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কবি ও সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ইমদাদুল হক মিলন, শাহীন আখতারসহ অনেকে অংশ নিচ্ছেন সাহিত্যের এই উৎসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ