ঢাকা, শুক্রবার 22 November 2019, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

টাকা পাচার বন্ধ করতে হবে

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড এক রিপোর্টে জানিয়েছে, বাংলাদেশে বছরে যতো টাকা কর আদায় হয় তার ৩৬ শতাংশের সমান টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। কর হিসেবে ২০১৫ সালে আদায় করা অর্থের পরিমাণকে বিবেচনায় নিয়ে এই হিসাব করেছে আঙ্কটাড। গত বুধবার আঙ্কটাডের পক্ষে রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগÑ সিপিডি জানিয়েছে, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে সিংহভাগ অর্থ পাচার করা হয়। ২০১৫ সালের পর গত চার বছরে অর্থ পাচারের পরিমাণ অনেক বেড়েছে এবং এখনো বেড়েই চলেছে। উল্লেখিত ওই বছরে ঠিক কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছিল সে সম্পর্কে আঙ্কটাড সুনির্দিষ্টভাবে না জানালেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে কর আদায় হয়েছিল এক লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। সে কারণে আঙ্কটাডের হিসাবের ভিত্তিতে সিপিডির অভিমত, ২০১৫ সালে পাচারের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। 

অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা হিসাবের এই পরিমাণকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। তারা বলেছেন, আঙ্কটাড বলার কারণে শুধু নয়, দেশি-বিদেশি অন্য অনেক সংস্থার রিপোর্টেও বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে ব্যবসায়ী নামধারী গোষ্ঠীর লোকজন আসলেও ক্রমাগত বেশি পরিমাণের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। তাদের পাচারের কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। 

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১৩ সালের এক বছরে ৭৬ হাজার তিনশ কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালের এক বছরে ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। জিএফআই নামের একটি বিদেশি সংস্থা জানিয়েছে, ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাচার হওয়া অর্থে দেশের দুই বছরের বাজেট তৈরি করা যেতো। এর সঙ্গে যদি ২০১৫ সালে পাচার হওয়া ৫০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকাকে বিবেচনায় নেয়ার পাশাপাশি এই অনুমানকে সত্য বলে ধরে নেয়া হয় যে, গত চার বছরেও পাচারের পরিমাণ কেবল বেড়েছেই তাহলে ভীত এবং উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। ১৪ দলীয় জোটের একজনরাজনীতিক সম্প্রতি বলেছেন, পাচার করা টাকা দশ লাখ কোটিরও বেশি হবে।  বাংলাদেশের মতো দরিদ্র ও উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রের জন্য এসব তথ্য-পরিসংখ্যান সকল বিচারেই আশংকাজনক। 

বলা দরকার, এমন অবস্থায় দেশের উন্নয়ন চেষ্টা বাধাগ্রস্ত না হয়ে পারে না। বাস্তবে সর্বাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছেও এবং এখনো হচ্ছেই। ২০১৫ সালে পাচার হওয়ার পরিমাণ উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পল্লী উন্নয়ন, পরিবহন এবং শিল্প ও ভৌত অবকাঠামো খাতে উন্নয়নের জন্য বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল এই পরিমাণ ছিল তার চাইতেও বেশি। একই কারণে ব্যবসা ও বিনিয়োগে আগ্রহীদের মধ্যেও ভীতি-আতংক কেবল বেড়েই চলেছে। তারা তাই দেশ থেকে অবৈধ পথে পাচার করছে লক্ষ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শিল্প-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির প্রতিটি খাতে সংকট ক্রমাগত আরো মারাত্মক হয়ে উঠছে। 

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, এমন অবস্থা কোনোক্রমেই চলতে দেয়া যায় না। টাকার পাচার বন্ধ করার পাশাপাশি পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হলে সরকারের উচিত অবিলম্বে পাচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। সরকারকে একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার জন্যও ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আগ্রহী শিল্প উদ্যোক্তারা সহজে শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে পারেন। এর কারণ, পাচারের যুক্তি দেখাতে গিয়ে অনেককেই দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করতে শোনা যায়। সেজন্যই বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য জমি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কাটিয়ে ওঠারও পদক্ষেপ নিতে হবে। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা দরকার, কাউকেই যাতে অবৈধ পথে টাকা পাচার করার কথা চিন্তা না করতে হয়। 

আমরা প্রসঙ্গক্রমে পাচার করা সমুদয় অর্থ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাই। সরকারের উচিত যেসব দেশে টাকা পাচার করা হয়েছে সেসব দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদন করা। কারণ, চুক্তি না থাকার কারণে সুইজারল্যান্ডের মতো বিভিন্ন দেশ ফিরিয়ে দেয়া দূরের কথা, কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি পরিমাণ টাকা পাচার করেছে এবং সে টাকা দেশের কোন ব্যাংকে রয়েছে এ সম্পর্কিত তথ্য পর্যন্ত জানাতে সম্মত হচ্ছে না। প্রতিটি দেশের এ সংক্রান্ত আইন রয়েছে। এজন্যই দেশগুলোর সঙ্গে সরকারের উচিত চুক্তি সম্পাদন করা। এর ফলেও টাকার পাচার বন্ধ না হলেও অনেক কমে যাবে। এভাবে সুচিন্তিত নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে টাকার পাচার বন্ধ করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধির স্বার্থেই এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ