ঢাকা, শুক্রবার 22 November 2019, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী প্রসঙ্গে

জিবলু রহমান: আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও দলের মূল্যায়নকে অনেকেই দুই ভাগে ভাগ করে থাকেন। একটি হচ্ছে ১৯৭৫ সাল পূর্ব আওয়ামী লীগ আর অপরটি ১৯৭৮ সাল উত্তর। আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। কাকতালীয় হলেও এ দেশের ইতিহাসে দিনটি উল্লেখযোগ্য। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আমবাগানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীকে হারিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা বাংলা দখল করে নিয়েছিল। ১৯৪৯ সালের এই দিনে যখন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা হলো, তখন কে ভেবেছিল যে এই দলের হাত ধরে একদিন বাংলা মুক্ত হবে?

ঢাকার নবাবপুরে মুসলিম লীগের কর্মীরাই আওয়ামী লীগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম লীগকে একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। ঢাকার কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেনের দোতলার হলঘরে ২৫০ থেকে ৩০০ প্রতিনিধির এক সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ৪০ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি তৈরি হলো। ‘আওয়ামী লীগ’ নামটা প্রস্তাব করেছিলেন মওলানা ভাসানী। প্রথম কমিটির নির্বাহীদের মধ্যে ছিলেন মওলানা ভাসানী (সভাপতি); আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমেদ খান, আলী আমজাদ খান ও আবদুস সালাম খান (সহ-সভাপতি); শামসুল হক (সাধারণ সম্পাদক); শেখ মুজিবুর রহমান (যুগ্ম সম্পাদক); খন্দকার মোশতাক আহমদ, এ কে এম রফিকুল হোসেন (সহ-সম্পাদক) এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান (কোষাধ্যক্ষ)। শেখ মুজিব তখন ‘নিরাপত্তা আইনে’ জেলে আটক ছিলেন।

তবে অনেকে মওলানা ভাসানীকে ছোট করতে গিয়ে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করে থাকেন। যেমন-‘...১৯৪৯ সালের ২৩ জুন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীরা ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে সম্মিলিত হয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন, যার নামকরণ করা হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা আবদুল হামিদ খানকে দলের সভাপতি ও শামসুল হককে দলের সাধারণ সম্পাদক করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান হন দলের যুগ্ম সম্পাদক...।’ 

১৯৫৫ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল সভায় দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে একে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণের প্রক্রিয়ায় পরে দলের নাম থেকে মুসলিম কথাটি বাদ দেওয়া হয়। যাঁর আদর্শের অনুসারীরা এই দল গঠন করলেন, তিনি (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর) কিন্তু তখন দলের নেতৃত্বে ছিলেন না। যদিও পরে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবেই তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বৈরুতে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু না হলে দলের ওপর তাঁর প্রভাব হয়তো আরও বিস্তৃত হতো।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৩ সালে দলের প্রথম কাউন্সিল সভায় শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ভাসানী-মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্রুত দেশের আনাচে-কানাচে সংগঠন গড়ে তোলে এবং ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ তখন শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে ‘যুক্তফ্রন্ট’ করেছিল। ফজলুল হকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ক্ষমতার সম্মিলনে এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ধরাশায়ী হয়।

১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী দলের একটি অংশ নিয়ে বেরিয়ে যান এবং ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) নামে নতুন সংগঠন তৈরি করেন। বলা যায়, তখন থেকেই আওয়ামী লীগে শেখ মুজিবের নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ পথকে চার পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্বটি ছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। মাঝে আওয়ামী লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস (১৯৫৬-৫৭ সালে) এবং প্রদেশে (পূর্ব পাকিস্তানে) কয়েক মেয়াদে প্রায় দুই বছর সরকার পরিচালনা করলেও বাকি সময় ছিল বিরোধী দলে। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিব আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা রূপরেখা ঘোষণা করলে এ দেশে রাজনীতির ব্যাকরণ আমূল পাল্টে যায়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ নামের একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্ম হয়। 

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বলা যায় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় পর্ব। দলটি ইতোমধ্যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। রাজপথের আন্দোলন থেকে পৌঁছে গেছে ক্ষমতার অন্দরমহলে। এই সাড়ে তিন বছরে দলটির অর্জন অনেক। আমরা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একটা সংবিধান পেলাম। বাংলাদেশ বিশ্বসভায় আপন মর্যাদায় স্বীকৃতি পেল। ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামো নতুন করে তৈরি হলো। কিন্তু দেশ পড়ে গেল রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সহিংসতার চক্রে। দলটি ক্রমেই হয়ে উঠল অসহিষ্ণু। বাকশাল নামে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হলো। ‘সুশাসন’ ক্রমে নির্বাসিত হলো। দলের মধ্যকার চাটুকার ও বশংবদ বুদ্ধিজীবীরা শেখ মুজিবকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। দেশটা যে তিন-চার বছরে অনেক বদলে গেছে, তিনি তা বুঝতেই পারেন নি। এই সুযোগে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতায় এলো। শেখ মুজিব সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হলেন।

১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্ট থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দলটি তৃতীয় পর্ব পার করল। সামরিক বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছিল। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ আবার দল গোছানো শুরু করে। ১৯৮০ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমানের আগ্রহে শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ প্রবাসজীবন ছেড়ে দেশে ফিরে ফিরিয়ে আনা হয় এবং আ’লীগের তিনি হাল ধরেন। ফলে দলটি আবার কোমর সোজা করে উঠে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগ এ সময় যুগপৎ সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ক্ষমতার অংশীদার হওয়া-এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল নেয়।

১৯৯১ সালে এ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রা শুরু হয়। সেই সঙ্গে শুরু হয় আওয়ামী লীগের চতুর্থ পর্ব। এই পর্বে আওয়ামী লীগ কখনো হয়েছে প্রধান বিরোধী দল, আবার কখনো এসেছে সরকারে। ‘এক-এগারো’-পরবর্তী সময়ে, যখন শেখ হাসিনাকে দল থেকে ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দলেরই কয়েকজন নেতা। পরে অবশ্য দল ওই সংকট কাটিয়ে উঠেছিল। শেখ হাসিনা একটা কথা বলেছিলেন, ‘আমি ফরগিভ করব, ফরগেট করব না।’ তিনি কথা রেখেছেন। ফলে দলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁর একক নেতৃত্ব। 

১৯৯০-পরবর্তী ২৫ বছরে আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদে সরকারে এসেছে এবং তা এখনো অব্যাহত আছে। শেখ হাসিনার ব্যাখ্যা : ‘...১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসতে দীর্ঘ ২১ বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত চড়াই-উত্তরাই পার হয়ে বন্ধুর পথ অতিক্রম করে আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের সেবা করার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের মানুষ উপলব্ধি করে, সরকার জনগণের সেবক, সরকারের একমাত্র কাজ জনগণের কল্যাণ। আশাহত, বেদনাক্লিষ্ট, শোষিত মানুষগুলো নতুনভাবে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। গৌরবময় বিজয়ের ইতিহাস জানতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত 

হয়ে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে শুরু করে। অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, সংস্কৃতি চর্চা দেশকে আবার গৌরবময় অধ্যায়ের পথে এগিয়ে নিতে থাকে।’ কিন্তু দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ে না আওয়ামী লীগের। ২০০১ সালে ১ অক্টোবরের নির্বাচন আবার কালো মেঘে ঢেকে দেয় আওয়ামী লীগের স্বপ্নের রূপালী আকাশকে। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় যায়। 

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারীতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জরুরি অবস্থা জারি হয়। অবশেষে ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায়। পাঁচ বছরে দেশ এগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক প্রোগ্রামের অংশ হিসাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। বিচারের রায় কার্যকর করা হচ্ছে। 

৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের নির্বাচনে পুনরায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উন্নয়নের গতিকে চলমান রাখার সুযোগ পেয়েছে। দেশবাসীর কাছে দেয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করার এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যেই উন্নত দেশ হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলা হচ্ছে। 

একটানা তিন টার্ম ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করবে আওয়ামী লীগ-এ তথ্য যেন নেতা-কর্মীদের কাছে স্বপ্নের মতো। আওয়ামী লীগ জরুরি সরকারের পরিকল্পনা মতো গদীনসীন হয়েছে-এটা অনেক প্রমাণ ও গবেষণায় ফলাফলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন যে বিএনপি জোটের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, সে বিষয়ে অনেকে মতামত প্রকাশ করে থাকেন। তথ্য-প্রমাণ যাই হোক, সবচেয়ে বড়ো কথা দীর্ঘদিন ক্ষমতার স্বাদ না পেয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পতাকা তলে বিএনপির সুবিধাবাদী অনেকে স্থান করে নিয়েছেন, বাস্তবতা হলো এখন তারা বেশ ভালো অবস্থানে আছেন। শুধু বিএনপির নয়, জামায়াতের অনেকেও তাদের স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ সচল রাখতে জয়বাংলা বলে একই পতাকার নীচে অবস্থান করছেন। 

এসব তথ্য অবশ্য আমার সংগ্রহ করা নয়। আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনকে সামনে রেখে সংবাদপত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন-এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ মাসেই শেষ হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম চার সংগঠনের সম্মেলন। ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা কাউন্সিল। এ লক্ষ্যে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলে বর্ধিত সভা ও কাউন্সিল করার সময় বহিরাগতদের নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কাউন্সিল ঘিরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উল্লাস থাকলেও ক্ষোভের পরিমাণ কম নয়।

রাজনৈতিক দলে সুবিধাভোগীদের অবস্থান নতুন নয়। আওয়ামী লীগের মতো বটবৃক্ষের তলে কিছু লোক লুকিয়েও আশ্রয় নিবে, তাদের স্বার্থসিদ্বি করবে-এটাই স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগে ‘সিক্সটিন ডিভিশন’ নামে শুরু হয়েছিল সুবিধাভোগীদের। মুক্তিযুদ্ধে তাদের কোনো রকম অবদান ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর সিক্সটিন ডিভিশনের দাপটে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও ত্যাগী নেতা-কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এই সুবিধাভোগীদের আর দেখা যায়নি। একই পরিস্থিতি তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। ১২ জুনের নির্বাচনের পর তৈরি হয়েছিল ‘থার্টিন ডিভিশন’। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ