ঢাকা, রোববার 1 December 2019, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৩ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের সভায় পুলিশি হামলা : গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায়শই বলেন যে, বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নাই। আন্দোলনের মাধ্যমে তারা বেগম জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করার কথা বলে। কিন্তু আন্দোলন তো পরের কথা মাত্র ৫০০ লোক নিয়ে রাস্তায় নামার ক্ষমতাও তাদের নাই। একথা ঠিক যে বিএনপি এতদিন রাস্তায় নামে নাই। সেটি নিয়ে বিএনপি ঘরানাও অসন্তুষ্ট। কিন্তু তাই বলে ৫০০ লোককেও বিএনপি রাস্তায়  নামানোর ক্ষমতা নাই, এটা বলে কি আওয়ামী সরকার বিএনপিকে উস্কে দিচ্ছে? উস্কানির কারণটা কি এই যে রাস্তায় নামলেই তাদের ওপর ক্র্যাকডাউন করা সম্ভব হবে? আসলেই তাই। আর সেটা প্রমাণও হয়ে গেলো সেদিন। ৫০০ নয়, সেদিন ৪ হাজার লোক বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য রাস্তায় নেমেছিলেন। এরা কিন্তু সকলেই বিএনপির কর্মী নয়। এদের সিংহভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রজন্ম এবং রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। তারা প্রেসক্লাবে বেগম জিয়ার মুক্তির দাবীতে একটি আলোচনা করেন এবং আলোচনা শেষে একটি মিছিল নিয়ে হাইকোর্ট ভবন পর্যন্ত যান। তারা স্লোগান দিয়েছেন। তাদের হাতে কোনো লাঠি ছিল না, ছিলনা কোনো ককটেল বা বোমা। ছিলনা কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বা ছুরি বা তরবারি। মিছিলটি ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। অথচ কোনো কথা নাই, বার্তা নাই, অকস্মাৎ সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলে করা হল পুলিশের হামলা। প্রথমে লাঠিচার্জ। তারপর ছোঁড়া হয় টিয়ার গ্যাস সেল। চারিদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এর মধ্যে হাইকোর্ট ভবনের ভেতর থেকে একদল আইনজীবী এসে তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাসে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমলে আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তারা বার মাসে তের পার্বনের মতো প্রতিমাসে একাধিক মিছিল করেছে। ঐসব মিছিল পুলিশী বাধার সম্মুখীন হলেই আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী ঘরানার সমর্থকরা করত নির্বিচারে ইষ্টক বর্ষণ। তাদের ইট পাথর ছুঁড়ে মারায় একাধিক পুলিশ গুরুতর আহত হয়েছে এবং তাদেরকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আওয়ামী ঘরানার কর্মীদের ইট পাটকেল নিক্ষেপে পুলিশ রক্তাক্ত হয়েছে এবং তাদের রক্তাক্ত ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সে জন্য, অর্থাৎ পুলিশের প্রতি ইট পাটকেল ছোঁড়ার জন্য কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বা কাউকে মামলাতেও ঝোলানো হয়নি।
কিন্তু সেদিন কি দেখা গেল? মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের প্রজন্ম মিছিল করলো। মিছিলটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তাদের কন্ঠে ছিল বেগম জিয়ার মুক্তির আওয়াজ, আর ছিল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন। অর্থাৎ এককথায় সমগ্র মিছিলের সমগ্র পদচারণায় ছিলনা কোনোরকম সন্ত্রাসী তৎপরতা বা সন্ত্রাসী তৎপরতার উস্কানি। তারপরেও এমন শান্তিপূর্ণ মিছিলে হল পুলিশের প্রচন্ড হামলা। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহ্ আল নোমান, সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ক্র্যাকপ্লাটুনের সদস্য উলফাৎ আজিজ, ডাকসুর সাবেক জি এস খায়রুল কবির খোকন প্রমুখ।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ একটি বিক্ষোভ মিছিলকেও সরকার ফ্যাসিস্ট কায়দায় দমন করে। শুধু তাই নয়, ঐ রাতেই মালয়েশিয়ার যাত্রী উলফাৎ আজিজকে রাত আড়াইটায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেফতার করা হয়। বৃহস্পতিবার এই ভাষ্য লেখার সময় পর্যন্ত তাঁর জামিন হয়নি। পরদিনের পত্রিকায় দেখা যায় যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর রায় সহ ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং নাম না জানা ৫ শত জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। প্রিয় পাঠক, চিন্তা করুন, কি ভয়াবহ অবস্থা। যে মিছিলের জন্য ছিলনা কোনো পূর্ব পরিকল্পনা, ছিলনা কোনো প্রস্তুতি, তেমন একটি মিছিলে তাৎক্ষণিকভাবে ৪ হাজার লোক সমবেত হন এবং তাদের ৫শত জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়।
॥ দুই ॥
কিছুক্ষণ আগেই বলেছি যে যেদিন এই মিছিলটি হয় সেদিন ঐ মিছিল পূর্ব আলোচনা সভার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা উলফাৎ আজিজ মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন। বিমানবন্দরে রাত আড়াইটার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ, সেটি এই কলাম লেখার সময় পর্যন্ত জানা যায়নি। একটি পত্রিকায় দেখলাম যে তাকে নাকি দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আইন হল এই যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলে সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কারণ জানাতে হয়। শুক্রবার পর্যন্ত দেখলাম উলফাতের গ্রেফতার এবং তার রিমান্ড ও কারণ জানা যায়নি।
উলফাৎকে গ্রেফতার করা হয়েছে কেন? কারণটি তো খুব পরিষ্কার। ঐ সমাবেশে উলফাৎ সভাপতিত্ব করেছিলেন। তাদের দাবী অত্যন্ত পরিষ্কার। তারা বেগম জিয়ার মুক্তি দাবী করছেন, এই সরকারের পদত্যাগ দাবী করছেন, এই পার্লামেন্টকে ভেঙ্গে দেওয়ার দাবী করছেন, ভেঙ্গে দিয়ে নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচনের দাবী করছেন। সেই নির্বাচন একটি নিরপক্ষে সরকারের অধীনে দাবী করছেন। এগুলো তো কোনো নতুন দাবী নয়। গত ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট, জামায়াতে ইসলামী এবং ২০ দলীয় জোট এই দাবী করে আসছেন। বিগত ১০ মাস ধরে বিরোধী দল এসব দাবী দাওয়া আদায়ের জন্য রাস্তায় নামেনি। রাস্তায় না নামার জন্যও তাদের আওয়ামী লীগের নিকট থেকে কম টিটকারি শুনতে হয়নি। আজ যখন বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপি এই প্রথম যখন রাস্তায় নামলো তখন তাদের ওপর নেমে এল জুলুমের স্টীম রোলার। তাই একথা ধারণা করা ভুল হবেনা যে আওয়ামী লীগ তাদেরকে উস্কানি দিচ্ছে রাস্তায় নামতে। কিন্তু রাস্তায় নামলেই পুলিশী জুলুম চালানো হচ্ছে।
শুধুমাত্র উলফাৎ আজিজকেই গ্রেফতার করা হয়নি। এ্যারেস্ট করা হয়েছিল রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিনকে এবং ৯০ এর ডাকসুর জিএস খায়রুল কবির খোকনকে। তবে রাতের খবরে দেখলাম, মেজর হাফিজ উদ্দিন এবং খায়রুল কবির খোকনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আগাম জামিনের জন্য মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর রায় প্রমুখ নেতা হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। হাইকোর্ট তাদের আগাম জামিন মঞ্জুর করেছে। দেখা যাচ্ছে, সকলকেই জামিন দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র উলফাৎকেই জামিন দেওয়া হয়নি। গণতান্ত্রিক নিয়মরীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমন ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অবশ্যই গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিরোধী।
॥ তিন ॥
২০১৫ সাল থেকেই সরকার সমস্ত বিরোধী দলের বিরুদ্ধে হার্ড লাইন নিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মাঝে মাঝে হার্ড লাইন নেওয়া হয়। কিন্তু সেটা সংবিধানে বিধৃত মৌলিক মানবাধিকার অক্ষুণ্ণ রেখেই। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে সরকার হার্ড লাইনের নামে যে পলিসি চালাচ্ছে সেটাকে হার্ড লাইন বললে কম বলা হবে। সেটা হল ডিটেক্টরদের লাইন। সেটা হল ফ্যাসিস্টদের লাইন। কিঞ্চিৎ মিছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার। মিটিং করতে গেলে, সভা করতে গেলে পুলিশের পূর্বাহ্নিক অনুমতি নিতে হবে, এমন কোনো কথা বাংলাদেশের সংবিধানে লেখা নাই। বরং রাজনৈতিক দল সমূহে কোন দিন, কোন সময়ে কোথায় সভা করবে সেটি পুলিশকে শুধুমাত্র ইনফর্ম করা হয় বা জানানো হয় মাত্র। এ জন্যই জানানো হয় যে যাতে করে সেই সভায় বা মিছিলে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত না হয়।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সভা বা মিছিল করার আগে পুলিশের অনুমতি ম্যান্ডেটরী হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তারা উচ্চ কন্ঠে হামেশাই বলত যে পারমিশন নিয়ে মিছিল বা সভা করার রাজনীতি করেনা আওয়ামী লীগ। মতিয়া, তোফায়েল, মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন যে দরখাস্ত করে রাজনীতিতে বিরোধ করেনা আওয়ামী লীগ। এবং তারা তখন পারমিশনের তোয়াক্কা করে নাই। বিএনপি আওয়ামী লীগের তুলনায় অনেক ভদ্র। অনেক পলিশড্। বিএনপি জামায়াত এবং ২০ দল আইন মান্য একটি দল। ৫ বছর হল তারা আইন মেনে রাজনীতি করেছে। ৫ বছর হল তারা দরখাস্ত করে, পারমিশন নিয়ে সভা সমিতি করেছে, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় অনুমতি দেওয়া হয়নি। অথবা অনুমতি দিলেও সেটা সভা আরম্ভ হওয়ার ৪/৫ ঘন্টা আগে দিয়েছে। তারপরেও দেখা গেছে যে বিএনপি বা ১৪ দলীয় জোটের সভায় জনস্রোত।
আর ঠিক এই বিষয়টিকেই আওয়ামী সরকার ভয় পায়। তারা দেখছে যে ৪ ঘন্টা আগেও যেখানে পারমিশন দিলে হাজার হাজার লোক হয়, সেখানে এক সপ্তাহ আগে অনুমতি দিলে লক্ষ লক্ষ লোক হবে। তাই পারমিশন দিতে এত কার্পণ্য। এই পটভূমিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ঠিকই বলেছেন যে ভবিষ্যতে পারমিশনের জন্য বিএনপি আর অপেক্ষা করবে না। তারা সভা বা মিছিল করার আগে পুলিশকে জানাবে মাত্র। জনগণের প্রত্যাশা, বিএনপি যেন তার কথায় অনড় থাকে। সমস্ত বিরোধী দল তাকে অকুন্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ