ঢাকা, বুধবার 4 December 2019, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৬ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ওষুধ-যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সাড়ে ৫ কোটি টাকা আত্মসাত

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর রাজধানীর পুরান ঢাকার আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন সন্তান সম্ভবা ছিন্নমুল এক মা। রেজিস্ট্রেশন না করার অজুহাতে যন্ত্রণায় কাতর ছিন্নমুল মা পারভীনকে রাস্তায় বের করে দেওয়া হয়েছিল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে অবশেষে রাস্তার ওপরেই সন্তান প্রসব করেন তিনি। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যপক সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। ওই সময় হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন ডা. ইশরাত জাহান। ঘটনাটি উচ্চ আদালতের নজরে আনা হলে আদালত তদন্তপূর্বক দায়ীদের ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই আলোচনায় ওই হাসপাতাল। নানা তর্কবিতর্ক তার পিছু ছাড়ছে না। নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির কারনে ডা. ইশরাত জাহানের বিরুদ্ধেই এবার দুর্নীতি দমন কমিশন ৫ টি মামলা করার সুপারিশ করেছে। তার সাথে যুক্ত আছেন আরও ৩২ জন। তারাও মামলার আসামী হচ্ছেন।
বিশেষায়িত এই হাসপাতালটিতে নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়ার লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ ২০০০ সালে পুনরায় শুরু হয় এর যাত্রা। সেবার মান বাড়াতে এর পেছনে প্রচুর অর্থব্যয়ও শুরু হয়। আর এ অর্থই অনর্থের মুলে।
বাজারমূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ উচ্চ মূল্যে ওষুধ, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজি সামগ্রী ক্রয় করে আত্মসাত করা হয়েছে সরকারের প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। ২০১৪-২০১৫ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত মোট চার অর্থবছরে বাজারদরের চেয়ে উচ্চ মূল্যে কেনা হয়েছিল ওই সকল সামগ্রী। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও মিলেছে অভিযোগের সত্যতা। যে কারণে ওই প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. ইসরাত জাহানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের ৩৩ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার সুপাশি করেছে কমিশনের অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিক। দায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় ওই অনুসন্ধান কর্মকর্তা পাঁচটি পৃথক মামলার অনুমতি চেয়ে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে কার্যাদেশ অনুযায়ী ঠিকাদারকে মেডিসিন সরবরাহের বিপরীতে ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭২০ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। অথচ খুচরা মূল্য ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল্য অনুযায়ী ওই একই মেডিসিনের সর্বোচ্চ মূল্য ১৬ লাখ ৪৫ হাজার ২৯৮ টাকা। বাকি টাকা অতিরিক্ত প্রদান করা হয়েছে। এভাবে বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্য্যন্ত চার বছরে একই প্রক্রিয়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাত হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দুদক ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে মোট পাঁচটি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দরপত্র ও সামগ্রীর ধরন অনুযায়ী অনুসন্ধান প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি মামলায় ১১ থেকে ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বমোট ৫৫ থেকে ৬০ জনকে আসামী করার সুপারিশ রয়েছে। যেখানে একাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা একাধিক মামলার আসামী। আসামীর তালিকায় রয়েছেন দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ও বাজার সদাই কমিটির সদস্যরা।
যাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে তারা হলেন- মনার্ক এস্টাব্লিশমেন্টের মালিক মো. ফাতে নূর ইসলাম, মেসার্স নাফিসা বিজনেস কর্নারের মালিক শেখ ইদ্রিস উদ্দিন (চঞ্চল), সান্তনা ট্রেডার্সের মালিক নিজামুর রহমান চৌধুরী, মাতৃসদন শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. ইসরাত জাহান, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. পারভীন হক চৌধুরী, সিনিয়র কনসালটেন্ট ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. মাহফুজা খাতুন, সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্স) ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. চিন্ময় কান্তি দাস, সাবেক মেডিক্যাল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. সাইফুল ইসলাম, মেডিক্যাল অফিসার (শিশু) ও বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য ডা. বেগম মাহফুজা দিলারা আকতার। মেডিক্যাল অফিসার ও বাজার দর যাচাই কমিটি সদস্য ডা. নাজরিনা বেগম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সদস্য সচিব-বাজার দর যাচাই কমিটি মো. জহিরুল ইসলাম,পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. জেবুন্নেসা হোসেন, সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ও বাজার দর যাচাই কমিটির সভাপতি ডা. রওশন হোসনে জাহান, মাতৃসদনের সাবেক সহকারী কো-অর্ডিনেটর (ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্স) ও পরিবার পরিকল্পনার অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. লুৎফুল কবীর খান, মেডিক্যাল অফিসার ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ডা. রওশন জাহান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হালিমা খাতুন, মাতৃসদনের বিভাগীয় প্রধান (শিশু) ও বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য ডা. মো. আমীর হোচাইন, সাবেক সমাজ সেবা কর্মকর্তা ও বাজার দর যাচাই কমিটির সদস্য মোছা. রইছা খাতুন, সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. কাজী গোলাম আহসান, সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. নাদিরা আফরোজ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নাছের উদ্দিন, সমাজ সেবা কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার, মেডিক্যাল অফিসার ডা. আলেয়া ফেরদৌসি, মেসার্স মোস্তাকিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী মো. ওয়াজিদ হোসেন, মেসার্স তসলিম এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. তসলিম আলম, মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেণ্টারের পরিচালক ডা. মো. মুনীরুজ্জামান সিদ্দীকী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (স্থানীয় সংগ্রহ) আবদুল লতিফ মোল্লা, মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেণ্টারের ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. শাহজাহান মিয়া, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (এমসিএইচ) ডা. ফাহমিদা সুলতানা ও সমাজ সেবা অফিসার মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের উপপরিচালক ডা. মাকসুদা বেগম। তাদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধি ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাজারদরের চেয়ে উচ্চ মূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী কেনা হয়। যেমন- ৮২ টাকা মূল্যের পলিস ক্যাথেটার ক্রয় করা হয়েছে ২২৭ টাকায়, ৩১৭ টাকার সার্জিক্যাল সুচারের মূল্য ধরা হয়েছে ৮৭৬ টাকা, ১০৭ টাকার এট্রোমেটিক ক্রোমিক ক্যাটগাটের ক্রয়মূল্য ৩৮২ টাকা, ৩২ টাকার সেলাই সেট ক্রয় হয়েছে ১৪২ টাকায়, প্রতিটি ব্লাড গ্লুকোজ এস্টিমেশন কিটের নির্ধারিত মূল্য তিন হাজার ৯৬০ টাকা হলেও কেনা হয় সাত হাজার ৫৯২ টাকায়; প্রতিটি এক্স-রে ডেভেলপার অ্যান্ড ফিক্সারের মূল্য এক হাজার ১০০ টাকা, কেনা হয় দুই হাজার ৫৮২ টাকায়। সলিউশন ফর হিউমেলিজারের নির্ধারিত মূল্য এক হাজার ৫৯২ টাকা, কেনা হয় তিন হাজার ৮০৬ টাকায়, প্রতিটি ডিসপোজেবল সিরিঞ্জের নির্ধারিত মূল্য ছয় টাকা ৬০ পয়সা, কেনা হয় ১২ টাকায়, সনি টাইপের ইউএসজি পেপারের নির্ধারিত মূল্য এক হাজার ৩২০ টাকা, কেনা হয় দুই হাজার ৪২২ টাকায়। এভাবে শতাধিক আইটেমে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কেনাকাটায় আত্মসাৎ করা হয় পাঁচ কোটি ২৮ লাখ টাকার বেশি। যার পিছনের কারিগর প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালী ঠিকাদার। যারা রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে স্বার্থ উদ্ধার করতে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ঠিকাদার হিসেবে ওষুধ সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- মনার্ক এস্টাব্লিশমেন্ট, মেসার্স নাফিসা বিজনেস কর্ণার, সান্তনা ট্রেডার্স, মেসার্স মোস্তাকিম এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স তসলিম এন্টারপ্রাইজ।
জানতে চাওয়া হলে মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সভাপতি ডা. ইসরাত জাহান গনমাধ্যমের সাথে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
জানতে চাইলে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে যেহেতু অনুসন্ধান চলছে, তাই এ অবস্থায় কোনো বক্তব্য দেওয়া যায় না। অনুসন্ধান শেষে কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ