রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০১০
Online Edition

দোয়েল পাখির বিশ্ব ভ্রমণ -আবদুল হালিম খাঁ

যাক, পাপিয়া হাসতে হাসতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে এলো। চারদিকের সবাই পাখা ঝাপটিয়ে আনন্দ উচ্ছবাস প্রকাশ করলো। পাপিয়া গান ধরলো : সুদূরের অতিথি গো কি দেবো তোমাদের গুণের উপমা আমাদের দীন-হীনতা নিজ গুণে করো ক্ষমা।। মনে শত স্বপ্ন এঁকে এসেছো সুদূর থেকে তোমাদের কথা আমাদের মনে চিরকাল রইবে জমা।। এসেছো দুয়ারে আর দেবো না যেতে দুধ কলা এনে দেবো যা খেতে বরণ করে নিচ্ছি অাঁচল পেতে ওগো প্রিয় অতিথি নিরুপমা।। গানের পর শালিক সাহেব মিতুকে কিছু বলার অনুরোধ জানালো। মিতু গলা সাফ করে একটু নড়েচড়ে বসে বললো : আজকের অনুষ্ঠানের সম্মানিত শালিক সাহেব, আমার জীবনের একমাত্র সাথী ও প্রেরণার উৎস জনাব টিটু সাহেব সভায় উপস্থিত ভাইবোনেরা আসসালামু আলাইম। প্রথমেই আমি কৃতজ্ঞতা জানাই জনাব শালিক দম্পতিকে। যাদের অপরিসীম দয়ায় ও আতিথিয়তায় আমরা বেঁচে আছি এবং আপনাদের সঙ্গে এখন এমন বিশাল সভায় কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছি। আপনাদের এই সংবর্ধনা সভার আয়োজনের জন্য আমরা যারপর নাই আনন্দিত। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা দেখছেন আমরা অতি ছোট্ট প্রাণী। চারদিন চার রাত না খেয়ে অনবরত উড়ে উড়ে এসে আপনাদের সঙ্গে এই দেখাসাক্ষাৎ। শরীরে এখনো দারুণ ব্যথা অনুভব করছি। আপনারা যা জানতে চান আমার সাথী বন্ধু ওপারের আমাদের দুঃখের কাহিনী বলবে। স্রষ্টা আপনাদের সবার মঙ্গল করুন। উপস্থাপক ও সভাপতি শালিকের কথা বলার আগেই বাজপাখি দাঁড়িয়ে বললো- সম্মানিত সভাপতি সাহেব, অনুমতি দিল আমি একটা প্রস্তাব করতে পারি। সভাপতি বললেন, হ্যাঁ, বলুন। বাজপাখি বললো, সমুদ্রের ওপার আমাদের অচেনা অজানা দেশ। সে দেশ সম্বন্ধে আমাদের অনেকের মনে প্রশ্ন জেগে ওঠেছে। তো সে বিষয়টার উপর টিটু সাহেব একটানা ভাষণ না দিয়ে একেজনের একেকটি প্রশ্নের উত্তর যদি দেন তবেই বোধ হয় আমরা জানতে পারবো ভালো। সবাই সমস্বরে বলে ওঠলো, হ্যাঁ হ্যাঁ, প্রশ্নের উত্তর দিলেই আমরা খুশি হবো। শালিক মিয়া এবার বললেন, ঠিক আছে। জরুরি বিষয় নিয়ে একেকজন প্রশ্ন করুন। সময়ের ব্যাপারে আশা করি খেয়াল রাখবেন। কথা শেষ হতে না হতেই সারস লম্বা ঘাড় উঁচু করে প্রশ্ন করলো, আচ্ছা টিটু সাহেব, আপনাদের বাচ্চা কাচ্চা কয়জন? তাদের নিয়ে এসেছেন? দুঃখিত, আমাদের কোনো বাচ্চা কাচ্চা নেই। বাচ্চা থাকলে কি এদেশে আসতে পারতাম! আমরা তো ওপারে বাসাই বাঁধতে পারিনি। বক বললো- কেন বাসা বাঁধেননি? বাসা বাঁধার মতো পরিবেশ সে দেশে নেই। কী রকম পরিবেশ সে দেশে? সে দেশের মানুষগুলো ভীষণ হিংস্র। আমাদের দেখলেই ঢিল ছোঁড়ে। হাতের কাছে পেলে ধরে মেরে ফেলে। কখনো খাঁচায় বন্দী করে কষ্ট দেয়। ছোট ছেলেমেয়েরা ভীষণ পাজী। আমাদের ধরে ঠেঙ সূতো দিয়ে বেঁধে খেলা করে। ওদের আনন্দের খেলা আমাদের জীবন-মরণ। মানুষ তোমাদের সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করে কেন? মানুষগুলো বিবেক-বুদ্ধিহীন। ওরা খ্যাপা জাতি। ওরা সন্ত্রাসী খুনি অত্যাচারী। ওরা শুধু আমাদের প্রতিই অত্যাচার করে না, ওদের স্বজাতির প্রতিও অত্যাচার করে, যুদ্ধ করে, হত্যা করে, লুটপাট করে, চুরি-ডাকাতি করে, ধ্বংস করে বাড়িঘর, দালান কোঠা, মিল কারখানা, কেটে ফেলে গাছগাছালি, ফলের বাগান। তাহলে তো ওরা দারুণ অসভ্য। হ্যাঁ অসভ্য। কিন্তু বড়াই করে সভ্যতার। টুনটুনি বসেছে সবার পেছনে। সামনে থেকে তাদের দেখাই যায় না। তাই একটা টুনটুনি ফুরুত করে উপরে ওঠে জিজ্ঞেস করলো, বেয়াদবি মাফ করবেন, আচ্ছা সে দেশে সভ্যতা শিক্ষার জন্য কলেজ-মাদরাসা নেই? টুনটুনির কথা শুনে পাখিরা এক সঙ্গে সবাই হেসে ওঠলো। মেহমান বললো- সারাদেশেই স্কুল-কলেজ-মাদরাসা আছে। কিন্তু তাদের পাঠ্যবইগুলো সভ্যতা, মানবতা, ন্যায়বিচার, দয়া মায়া ও শ্রদ্ধাবোধ শিক্ষার কোনো বিষয় নেই। সেই মত বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ে শিক্ষার্থীরা হয় দুর্নীতিবাজ, হাইজ্যাকার ও চোর ডাকাত। অই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক কবি বলেছেন- ‘ডাকাতে পাড়া'। তা হলে এখন চিন্তা করে দেখো অবস্থাটা কেমন। এবার কাক হেড়ে গলায় জিজ্ঞেস করলো- সমুদ্রের ওপার পাখিদের কোনো নিজস্ব দেশ নেই? পাখিদের দেশ মানে? যেদেশে শুধু পাখিরা বাস করে, মানুষ বাস করে না, যেদেশে? আমি সমুদ্রের ওপার সব ভূখন্ডই ঘুরে ঘুরে দেখেছি। পাখিদের কোনো দেশ দেখিনি। তবে অনেক দেশে চিড়িয়াখানা আছে। চিড়িয়াখানা কেমন খানা? সেখানে মানুষ সকল রকম পশুপাখি ও জীবজন্তু বন্দী করে রাখে। অর্থাৎ পশুপাখিদের জেলখানা সেটা। পশুপাখি বন্দী করে রাখে কেন? বাজ বললো, পশুপাখিদের খাবার দেয় না? খাবার দেয় বটে। সে খাবারে কর্মচারীরা দুর্নীতি করে। ওখানকার দুর্নীতি কেমন? পশুপাখিদের যে পরিমাণ খাবার দেয়া হয় সেখান থেকে কর্মচারীরা বড় রকমের ভাগ বসায়। পশুপাখিরা তো কথা বলতে পারে না। পশুর খাবার মানুষ খায়? হ্যাঁ খায়। মনে করো একটা বাঘের জন্য প্রতিদিন দশ কেজি গোশ্ত বরাদ্দ করা আছে। যারা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে তারা বাঘকে দু'তিন কেজি গোশ্ত আর দুটা হাড় দেবে। আর বাকি অংশ নিজেরা বাসায় নিয়ে খায়। এভাবে সকল পশুপাখির খাবারই তত্ত্বাবধায়করা ভাগ করে নিয়ে যায়। পশুপাখিদের অবস্থা কি হয়? বাঘ ও সিংহগুলো খাদ্যের অভাবে শুকাতে শুকাতো পেট চেপ্টা হয়ে যায়। শুইলে আর দাঁড়াতে পারে না। কোনো রকমে দাঁড়ালেও হাঁটতে পারে না। প্রায়ই দু'একটা বাঘ, সিংহ, হাতি, গন্ডার, ঘোড়া ও হরিণ মারা যাচ্ছে। সাপও মারা যাচ্ছে। সাপ মারা যাচ্ছে কেন? সাপের খাদ্যও যে মানুষ খায়! কবুতর প্রশ্ন করলো- সেদেশে শাস্তি আছে কেমন? আরে ভাই সেদেশে শান্তির শ'টি যে নেই। শান্তি থাকলে কি আমরা সে দেশ থেকে চলে আসি? কাকাতুয়া জিজ্ঞেস করলো- সেদেশের সব সম্পদ কি শুধু মানুষের দখলে? নাকি পাখিদের দখলে কিছু আছে? সব সম্পদ মানুষের দখলে। তারা সবকিছু এবং সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওরা ভীষণ স্বৈরাচার। টিয়ে আমতা আমতা করে বললো, শুনেছি মানুষ নাকি সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট। তা হলে তারা পশুপাখির প্রতি এতো খারাপ ব্যবহার করে কেন? ওদের মধ্যে অল্প কিছু লোক ভালো আছে। তাদের ন্যায়-অন্যায় ও মানবতাবোধ আছে। কিন্তু অধিকাংশ লোক খারাপ। তাদের হাতে ক্ষমতা। তারা যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে দেশে দেশে সন্ত্রাস ও যুদ্ধ করছে। তারা মাতাল-মাস্তান। কাঠঠোকরা বললো, শুনেছি তারা নাকি বিজ্ঞানে উন্নতি করছে। দিন দিন নতুন নতুন যন্ত্র ও ওষুধ আবিষ্কার করছে। ওদের উন্নতি না ছাই! যত আবিষ্কার করছে সে আবিষ্কারের যন্ত্র দিয়ে ওদের নিজেদের ধ্বংস করছে। যন্ত্রপাতি আবিষ্কারে কি মানবতার উন্নতি হয়? সভ্যতা ও মানবতা উন্নতির চাষ ওদের মধ্যে নেই। যেমন ধরো- নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার করছে। ওদের বদঅভ্যাসের কারণে আবার নতুন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যতই ওরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতিলাভ করছে ততই অসুখ-বিসুখ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধিকাংশ ডাক্তারই এখন রোগী। তারা রোগ নির্ণয় করতে না পেরে, ভুল ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে। এর ফলে রোগীদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। ওপারের সকল দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিক ভর্তি রোগী আর রোগী। কাকাতুয়া সামনের সারিতে আগেই এসে বসেছিল। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে সভাপতির অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা বিশাল সমুদ্র পেরিয়ে আমাদের পাখির দেশে আসলেন কেমনে? আর আমাদের দেশের খবরই বা পেলেন কেমনে? শুনুন ভাইবোনেরা, ছোটবেলা থেকে আমার মনে আল্লাহর এই সুন্দর ও বিচিত্র পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখার ইচ্ছে জেগেছিল। যখন যেদিকে যা দেখতাম তাই দারুণ ভালো লাগতো এবং আরো দেখার লোভ জাগে। এ লোভ আমার এমন নেশায় পরিণত হলো যে, সারাদিন এক জায়গায় বসে থাকতে পারতাম না। প্রতিদিন এক স্থান থেকে নতুন আরেক স্থানে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে উড়ে উড়ে বেরিয়েছি। এই ধরনের মানসিকতার কারণে কোথাও বাসা বাঁধতে পারিনি। বাসা বেঁধে ঘরসংসার শুরু করলে তো এতো দেশের এতো রূপ-সৌন্দর্য দেখা সম্ভব হতো না। এভাবে ভবঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে একরাতে পেয়ে যাই চলার পথের সাথী মিতুকে। মিতু আমার মনোভাবের কথা শুনে আমার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে। সেদিন থেকেই মিতু আমার সাথী বন্ধু। ওকে কাছে পেয়ে আমার সাহস ও চলার গতি আরো বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ভ্রমণ করে সমুদ্রের ওপারের সব দেশে ঘুরে ঘুরে দেখলাম আমাদের অর্থাৎ পাখিদের নিজস্ব কোনো দেশ নেই। ভাবলাম মানুষের দেশ আছে, পাখিদের দেশ নেই কেন? পাখিদের দেশ নিশ্চয়ই পৃথিবীর কোথাও আছে। আমরা দু'জনে সেই দেশের খোঁজে বের হলাম। সমুদ্রের ওপারে কত পাখিদের কাছে জিজ্ঞেস করেছি যে পাখিদের কোনো দেশ আছে কিনা, সমুদ্রের ওপারে যাওয়া যাবে কি না। কেউ আমাদের প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি। শেষমেষ চিন্তা করলাম আল্লাহ তো আমাদের সুন্দর দু'টি চোখ দিয়েছে, দু'টি ডানা দিয়েছে আর বুকের ভেতরে এতো আশা-আকাঙ্ক্ষা দিয়েছে-- চেষ্টা করলে নিশ্চয় আমাদের আশা ও স্বপ্নপূরণ করবে। সমুদ্রের পাড়ে এসে ভাবতে লাগলাম। নিশ্চয় সমুদ্রের ওপারেও দেশ আছে আর সেটা তো পাখিদের দেশও হতে পারে। তাই আশায় বুক বেঁধে গত সোমবার সকালে দু'জনে দিলাম উড়াল, আল্লাহ ভরসা করে। চারদিন চার রাত সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়লাম। সমুদ্রের উপর তো গাছগাছালি নেই। কোনো নৌকা জাহাজ ও পেলাম না- পা রেখে একটু জিরাবার জন্য। কী যে কষ্ট করেছি। কখনো মনে হয়েছে এই বুঝি পড়ে গেলাম। পাখা দু'টি অনবরত নাড়াতে নাড়াতে জ্যাম হয়ে এসেছিল। এপার আসার পর ডানা ও পায়ে কোনো শক্তি ছিল না। গাছের উপর বসতে গিয়ে ধুম করে পড়ে গিয়েছিলাম, আমার পরম শ্রদ্ধেয় শালিক সাহেবের বাসার কাছে। উনি এগিয়ে এসে আমাদেরকে উনার বাসায় নিয়ে আশ্রয় দেন, খাবার দেন। তার কাছে আমরা দারুণভাবে কৃতজ্ঞ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ