ঢাকা, শুক্রবার ২২ জুলাই ২০১১, ৭ শ্রাবণ ১৪১৮, ১৯ শাবান ১৪৩২
Online Edition

বঙ্গোপসাগরে আমাদের অধিকার সুরক্ষা করা এবং সাগরসম্পদ আহরণ প্রসঙ্গে

ইবনে সাঈজ উদ্দীনঃ
সারা বিশ্বেই সমুদ্রের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত খনিজ সম্পদের জন্য। স্থলভাগের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ বহু দেশেরই প্রান্তিক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তদুপরি স্থলভাগের তুলনায় সমুদ্রে দ্বিগুণেরও বেশি প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ মজুদ রয়েছে এবং রয়েছে মানুষের জন্য নানারকম খাদ্যের উৎস। সমুদ্র সম্পদের অনেক কিছুই এখনো মানুষের অজানা। এ কারণেই সমুদ্রে অনুসন্ধান অপরিহার্য হয়ে পড়েছে এবং বহু দেশই তা করে চলেছে। আজকের যুগে বিজ্ঞানী-গবেষকরাও জরিপ চালিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেছেন যে, সমুদ্রে তেল-গ্যাসের মতো অঢেল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ মজুদ রয়েছে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো সাগরে, সমুদ্রে খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত ও উত্তোলিত হচ্ছে। সম্ভাব্য সাগর এলাকায় অনুসন্ধান চলছে।

বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার এবং বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সম্ভাবনা। তেল-গ্যাস ছাড়াও খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই উপসাগর। এই সাগর এবং এর উপকূলে সঞ্চিত খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও পরিকল্পিত সদ্ব্যবহার সম্ভব হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান দৃশ্য বদলে যাবে। সামুদ্রিক সম্পদ বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে এ প্রসঙ্গে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ মাত্রার গলুকোজ পুষ্টি উপাদানের উৎস, চিকিৎসার জীবন রক্ষাকারী দুর্লভ স্পিরুলিনা থেকে শুরু করে মুক্তা, প্রবাল ইত্যাদি রত্নরাজি, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি ও দেড়শ' প্রজাতির অর্থকরী মৎস্য এবং তেল-গ্যাসসহ অঢেল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে আছে এই বঙ্গোপসাগরে।

ঘূর্ণিঝড়-সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আবহাওয়া পরিবর্তনে উপকূলীয় ভূমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন প্রকাশিত হচ্ছে, তেমনি এই উপসাগরের সম্পদের সম্ভাবনার কথা বহু আগে থেকে উচ্চারিত হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এই বিপুল সম্ভাবনাকে বিশেষ আমলে নিচ্ছি না। হয়তো এ কারণেই বঙ্গোপসাগরে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে কার্যকর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক তৎপরতার ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। এই উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশীরা আমাদের সমুদ্রসীমার অভ্যন্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালানোর মতো তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি দেশবাসী কোনোভাবেই মেনে নেবে না। কাজেই সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

‘বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য অতুলনীয় সম্ভাবনাময় খনি,' ষাটের দশকে জাতিসংঘে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সম্পদ অনুসন্ধানী জরিপ প্রতিবেদনে এই মন্তব্য করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আরো অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও এই উপসাগরের সম্ভাবনা নিয়ে একই রকম মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম বিশেষজ্ঞ মহলের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের সন্নিহিত সাগরে তেল-গ্যাসের বিপুল জোরালো ধারণা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত দীর্ঘ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত শুধু পর্যটনের জন্যই বিরাট সম্ভাবনাময় নয়, এখানে বিপুল পরিমাণ ধাতব খনিজ সম্পদ ও তেজস্ক্রিয় পদার্থের মজুদ রয়েছে। কক্সবাজার, ইনানি, টেকনাফ-বিস্তীর্ণ এই উপকূলেও ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার কোটি টাকার খনিজ সম্পদ। এখানে মজুদ জিরকন, রুটাইন, ইলমনাইটের মূল্যই ৩৮৭ লাখ কোটি টাকা। উপকূলীয় বালিতে মূল্যবান খনিজ মজুদের বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়।

বঙ্গোপসাগরে তিনটি বিশাল মৎস্যক্ষেত্র ছাড়াও তেল-গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশের জন্য যে বিপুল পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তা এখন আর শুধু অাঁচ-অনুমানের বিষয় নয়। ইতোমধ্যে উপকূল সন্নিহিত এলাকায় গ্যাস পাওয়া গেছে। মিয়ানমার ও ভারতও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সন্নিহিত এলাকায় বড় আকারের গ্যাস মজুদের সন্ধান পেয়েছে। এছাড়া ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের যে ১৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার মিয়ানমার এবং যে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার ভারত তাদের গ্যাস ব্লকে ও ওভারলেপিং করে নিয়েছে, সেখানেও গ্যাস পাওয়া গেছে। বঙ্গোপসাগরে আমাদের অধিকার সুরক্ষা করার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও জাতিসংঘের সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির বৃহত্তর স্বার্থে সাগর-সম্পদ আহরণে কার্যকর বাস্তবোচিত পদক্ষেপও গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের নাম থেকেই হয়েছে বঙ্গোপসাগর অথচ আমাদের নির্ধারিত সীমানা নিয়ে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে। অবশ্য আমাদের কিছু ভুলত্রুটি রয়েছে। তেল-গ্যাসসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের জন্য  অনুসন্ধানের অগ্রগতি নেই। অথচ মিয়ানমারের মতো ছোট একটি দেশ বঙ্গোপসাগরে ১টি ব্লকে সফল অনুসন্ধান কাজ শেষ করে দ্বিতীয় ব্লকের কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশ ২০০৫ সালে সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২৮টি ব্লক আছে বলে ঘোষণা দেয় কিন্তু ভারত ও মিয়ানমার এতে আপত্তি জানায়।

বন্ধুপ্রতীম দু'রাষ্ট্রই এই ব্লকের ওপর হস্তক্ষেপের ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে এমনকি ভারত ইতোমধ্যে বিতর্কিত অঞ্চলের দু'টি ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়। এজন্য আজ জরুরি হয়ে পড়েছে সমুদ্র-সীমানা নির্ধারণীর জন্য। জাতিসংঘ আইনে সমুদ্র সীমানা চিহ্নিত করতে ইকোডিসট্যান্স এবং ইকুইটি দু'ভাবে করা যায়। যদি ইকোডিসট্যান্স সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয় তাহলে দেশের বিশাল সম্পদ হাতছাড়া হবে। এজন্য ইকুইটি বা সমতার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু প্রতিবেশি দু'রাষ্ট্রই ইকোডিসট্যান্স পদ্ধতিতে বঙ্গোপসাগরের পূর্ব-পশ্চিমে রেখা টেনে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে চায়। যদি তাই করা হয় তাহলে মিয়ানমার অঞ্চলে ৮-১৩ এবং ভারতের দিকে ৭-১০টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে ভরপুর ব্লকগুলো চলে যাবে।

১৯৭৪ সালের তৈরি আইন বিজ্ঞানসম্পত ছিল না। এমনকি তা বিশেষজ্ঞদের দিয়েও তৈরি হয়নি। তাই এ আইনের সংস্কার দরকার। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা দরকার আর সমুদ্রগর্ভের সম্পদের জন্য আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃকই নয়; সমুদ্রমাতৃক দেশও বটে। আমাদের স্থলভূমির চেয়ে জলে বেশি সম্পদ রয়েছে। আমাদের এ সমুদ্র নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করে দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। আজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারণে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে জাতিসংঘ সমুদ্র আইন অনুসরণ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছতে হবে। সমুদ্রসীমা ও সম্পদের পহারাদারির জন্য কোস্টগার্ড ও নৌ-বাহিনীকে শক্তিশালী করা দরকার। এ বিষয়ে গবেষণার জন্য আলাদা সেল তৈরি করে তা মনিটরিং করা দরকার। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্র সৈকতে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থ আহরণের জন্য এবং সমুদ্রের পানি থেকে লবণ উৎপাদন করে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সমুদ্রসম্পদ ও সামুদ্রিক অঞ্চলে দেশীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ