ঢাকা, বুধবার 15 February 2012, ৩ ফাল্গুন ১৪১৮, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition

বাঘের আক্রমণে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে সুন্দরবন থেকে প্রতিনিয়ত বাঘ চলে আসছে লোকালয়ে

খুলনা অফিস : সাতক্ষীরা ও চাঁদপাই রেঞ্জের সুন্দরবন থেকে প্রতিনিয়ত বাঘ লোকালয়ে চলে আসছে। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ বাঘ তাড়াতে বন্দুকের সহায়তা নিচ্ছে। প্রতি মাসে বাঘের আক্রমণে গড়ে ৩-৪ জন নিহত হচ্ছে। বনবিভাগের রেকর্ড থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মাটিতে নুনের আধিক্য এবং খাদ্যাভাবসহ ৫টি কারণে বাঘ বন ছাড়ছে লোকালয়ে চলে আসে। এমন অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

চাঁদপাই ও সাতক্ষীরা রেঞ্চের মংলা ও শ্যামনগর উপজেলার গ্রামগুলোতে মাঝে মধ্যে বাঘ হামলা করছে। বাঘ মানুষ ছাড়াও গরু ছাগলের ওপর আক্রমণ করছে। গত ১০ বছরে বনসংলগ্ন এলাকার গ্রামবাসীদের পিটুনিতে অন্তত ১৫টি বাঘ প্রাণ হারিয়েছে। এমন ঘটনা প্রায় ঘটছে শ্যামনগর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক জানান, দ্রুতগামী চিত্রা হরিণ শিকার করা কেবল মধ্যবয়সী বাঘিনীর পক্ষেই সম্ভব। বয়স বেশি হলে বাঘ হরিণ শিকার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এজন্য বয়স্ক বাঘ হামলা করে মানুষের ওপর। এভাবে একবার মানুষের রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ খাবারের নেশায় বারবার লোকালয়ে হামলা করে।

মার্কিন বিশেষজ্ঞ ম্যাক ইন্টার বলেছেন, পাঁচটি কারণে সুন্দরবনের হিংস্র বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করছে। কারণগুলো হচ্ছে, প্রথমত সুন্দরবনের লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দ্বিতীয়ত প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাব, তৃতীয়ত বয়স্ক বাঘ ক্ষমতা হারিয়ে লোকালয়ে আসছে, চতুর্থত নদী ভরাট হওয়ায় লোকালয়ে আসা সহজ হয়েছে, পঞ্চমত শিকারিদের হামলায় প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে লোকালয়ে আসছে।

ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসের ‘লবণের অভাবে কি বাঘে মানুষ খাওয়ার লোভ বাড়ছে সুন্দরবনে' শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনের জলে ও মাটিতে লবণের ভাগ বেড়ে যাওয়ায় বাঘের স্বাভাবিক জীবন চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। বাড়ছে মানুষ খাওয়ার প্রবণতা। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মানুষের মাংস মিষ্টি। সে কারণে বাঘ মাঝেমধ্যে লোকালয়ে আসছে।

সুন্দরবন বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী গেল বছর বাঘের আক্রমণে ৩০ জন, ২০১০ সালে ৩৩ জন এবং ২০০৯ সালে ২৯ জন মানুষ নিহত হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সুন্দরবনের প্রতিবেশী চক্রের পরিবর্তন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, বনসংলগ্ন নদী ও খালে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অবৈধ হরিণ শিকার ও পাচারের কারণে বাঘের খাদ্য হ্রাস ইত্যাদি কারণে বাঘ ও মানুষের মধ্যে সংঘাত বেড়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান জানান, বাঘের বসবাসের নির্দিষ্ট সীমানা আছে। কোন সমস্যা দেখা দিলে বাঘের হিংস্রতা প্রকাশ পায়। এর মধ্যে খাদ্য সংকট অন্যতম। সাধারণ বাঘের খাদ্যের ৮০ শতাংশ যোগান আসে হরিণ থেকে। ৫শ' হরিণের প্রজননে যে বংশ বৃদ্ধি পায়, তা হচ্ছে একটি বাঘের সারা বছরের খাবার, কিন্তু সে অনুপাত অনেকটা কমে গেছে। আগে সচারচর হরিণ দেখা যেত। এখন দেখা যায় না বললেই চলে। তিনি বলেন, গণহারে হরিণ নিধনের কারণে বাঘের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তাই বিকল্প খাদ্য হিসেবে বাঘ সুন্দরবনে কর্মরত জেলে-বাওয়ালী ও লোকলয়ের অন্যান্য প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। বন সংরক্ষক (বন্য প্রাণী) ড. তপন কুমার দে জানান, প্রতিবেশ চক্র ভেঙে পড়ায় বাঘের খাদ্য সংকট দেখা দিলে এই প্রাণীটির অস্তিত্বের সংকটে পড়ায় বাঘ-মানুষ দ্বনদ্ব বাড়ছে। খুলনাঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. আকবর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, বাঘ বন ছেড়ে কেন লোকলয়ে আসছে তা নিয়ে কোন গবেষণা নেই। তবে মিষ্টি পানি ও খাবারের সন্ধানে বাঘ লোকালয়ে আসে। তার মতে, লোকালয়ে বাঘ আসা ঠেকানো কঠিন কাজ। তিনি আরও জানান, সুন্দরবনে বন্য প্রাণীর অবাসস্থল সংকুচিত হতে চলেছে। বিরূপ পরিবেশের কারণেও বাঘ মাঝেমধ্যে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। সুন্দরবন (পশ্চিম) বন বিভাগের ডিএফও জহির উদ্দিন আহম্মেদ জানান, সুন্দরবনে প্রতিটি বাঘের নির্দিষ্ট বিচরণভূমি দখল করলে পরাজিত বাঘ খাদ্য ও আশ্রয়ের খোজে লোকালয়ে আসে। আবার শিকার ধরতে ব্যর্থ বয়স্ক এবং অসুস্থ বাঘও আসে লোকালয়ে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৪৪টি বাঘ গণপিটুনিতে ও বিভিন্ন কারণে মারা যায়। বেশিরভাগ সময়ে বনবিভাগ পদক্ষেপ নিতে পারেননি। সুন্দরবন বিভাগের সংশ্লিস্ট সূত্রমতে, ১৯৮১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাঘের আক্রমণে ৩০৫ ব্যক্তি নিহত হয়।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃত সংরক্ষণ বিভাগের মুখপাত্র জানান, ১৯৬৩ সালে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ গাই মাউন্ট ফোর্ট ধারণা করেন বনে বাঘের সংখ্যা ১০০টি। ১৯৭৫ সালে বাঘ বিশেষজ্ঞ হেনডিক্স এর ধারণা, বনে ৩০০টি বাঘ থাকতে পারে। ১৯৮০ সালে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ পিটনেস বলেন, ৪৬০টি বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবন এবং ১৯৮২ সালে বন বিভাগের জরিপ অনুযায়ী এখানে বাঘের সংখ্যা ৪৫৩টি। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল ইউএনডিপি ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিসংস্থা এফএওএর বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৪ সালের শুমারি অনুযায়ী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ৩৭০টি। ২০০৪ সালের বাঘ শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০টি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ