ঢাকা, বুধবার 15 February 2012, ৩ ফাল্গুন ১৪১৮, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition

কুরআন বিরোধী নারী নীতি বাস্তবায়ন না করে বাতিল দাবি

স্টাফ রিপোর্টার : কতিপয় কথিত আলেমদের সাথে আলোচনা করে কুরআন বিরোধী নারী নীতি বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকার আহবান জানিয়েছেন আলেম সমাজ। তারা কুরআন বিরোধী এ নারী নীতি বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিবৃতিতে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ দাবি জানান।

বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ড নেতৃবৃন্দ বলেছেন, নারী জাতির প্রতি অবজ্ঞা চলছে, সর্বস্তরেই চলছে নারীর প্রতি অত্যাচার, অবিচার, অসম কার্যক্রম। এর সব কিছুই মানব রচিত আইনের কারণে। বাংলাদেশ সরকার আবার আর এক মানব রচিত সিডো কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত নারী নীতির সনদ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিয়েছিল। দেশের খ্যাতনামা দেশ বরেণ্য উলামায়ে কেরাম, পীর-মাশায়েখ, খুতাবায়ে এজামগণ-এর বিরুদ্ধে যা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তা সুনির্দিষ্ট করে আয়াত ও হাদিসের প্রমাণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সকল দায়িত্বশীল মন্ত্রী, এমপিদের নিকট প্রেরণ করে, ফলে সরকার কিছুটা নীরব ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। অথচ গতকাল সরকারের প্রধানমন্ত্রী দেশ বরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা আহমদ শফী, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ছারছিনার পীর ছাহেব, চরমোনাইর পীর সাহেবসহ অন্যান্য উলামাদের সাথে কোন পরামর্শ না করে যারা আলেমদের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে না তাদের নিয়ে মুমীন, মুসলমান, তৌহিদী জনতা, সাধারণ আলেম উলামাদেরকে ধোকা দেয়ার জন্যে এক গভীর ষড়যন্ত্র করছেন? দেশে বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ের আলেমদের মধ্যে ছোট খাটো মত পার্থক্য ভুলে গিয়ে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তার মধ্যে ফাটল সৃষ্টির জন্য যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে তা অবশ্যই বুমেরাং হবে। আমরা সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই কুরআন বিরোধী নারী নীতিমালা বাতিল করুন। অন্যথায় উলামায়ে কেরাম ঐক্যবদ্ধভাবে তৌহিদী জনতাকে সাথে নিয়ে দুর্বার গণআন্দোলন শুরু হবে। ঈমান রক্ষার আন্দোলন থামিয়ে রাখা যাবে না। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, মুফতি মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, মুফতি মাওলানা ফয়জুল্লাহ, মুফতি মাওলানা মহিউদ্দীন, মুফতি ড. আবু ইউসুফ, মুফতি মাওলানা নুর হুসাইন আল কাশেমী, মুফতি ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, মুফতি মাওলানা আবুল বাশার, মুফতি মাওলানা ডা. এম আব্দুল কাইয়ূম আল আযহারী, অধ্যাপক মুফতি মাওলানা রফীকুর রহমান মাদানী, মুফতি ড. সিকান্দার আলী মাদানী, মুফতি ড. তরিকুল ইসলাম মাদানী, মুফতি মাওলানা লুৎফর রহমান আল মাদানী, মুফতি মাওলানা নুরুল্লাহ আলমাদানী, মুফতি মাওলানা মোহাম্মাদ ইউসুফ আল মাদানী, ড. মুফতি নিজামুদ্দীন, মুফতি আবুল কালাম পাটোয়ারী, ড. মুফতি মাওলানা আবু ইউসুফ খান, মুফতি ড. মানজুর-এ-ইলাহী আল মাদানী, প্রফেসর মুফতি ড. আবুল কালাম আযাদ আল মাদানী, প্রফেসর মুফতি আব্দুর রহমান মাদানী, প্রফেসর মাওলানা আব্দুস সালাম মাদানী, প্রফেসর মুফতি ড. মাওলানা সাইফুল্লাহ মাদানী, প্রফেসর মুফতি মাওলানা জুনায়েদ মাদানী, প্রফেসর মাওলানা মুফতি ইসহাক মাদানী, হাফেজ মুফতি মাওলানা আব্দুর রহমান, মুফতি মাওলানা শাহ জালাল শরীফ, হাফেজ মুফতি মাওলানা আব্দুর রহমান, মাওলানা মুফতি ফয়জুল্লাহ প্রমুখ।

আহকামে শরীয়াহ হিফাজত কমিটির আহবায়ক হাফেজ মাওলানা মাহবুবুর রহমান ও সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুস সবুর মাতুববর এক বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে একটার পর একটা ইসলাম বিরোধী নীতি চালু করেই যাচ্ছে। বিশেষ করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা বাদ দিয়ে তদস্থলে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপন, কুরআন সুন্নাহ বিরোধী নারী নীতি প্রণয়নে ধৃষ্টতা দেখানো হচ্ছে। কতিপয় অখ্যাত আলেমদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় সভা করে দেশ ও জাতি তথা তৌহিদী জনতাকে ধোকা দিচ্ছেন। আমরা সরকারকে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলতে চাই ইতোমধ্যে দেশের আলেম-উলামা পীর মাশায়েখ ইসলামী আকীদা সংরক্ষণের জন্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদ নারী নীতিতে কোন কোন জায়গায় কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক তা সুনির্দিষ্ট করে সরকারের উপদেষ্টা এইচ টি ইমামসহ সবাইকে দেয়ার পরও গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কথিত আলেম দিয়ে মতবিনিময় ইসলামী ঐক্যের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে নেতৃবৃন্দ বিবৃতি প্রদান করেন।

শীর্ষ আলেমে দ্বীন সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদের সভাপতি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান বলেন, সংবিধান থেকে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলা, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন ও কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী নারী নীতি অনুমোদনসহ ইসলাম ধ্বংসের নানামুখী আয়োজন চলছে। এরই প্রতিবাদে সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদসহ দেশের সর্বস্তরের ইসলামপ্রিয় মানুষ এবং সকল মাকতাবে ফিকিরের উলামা কেরাম ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন চালিয়ে আসছে। তৌহিদী জনতা ও সর্বস্তরের জনগণ সরকার ও সরকারের বাম গোষ্ঠীর ইসলাম নির্মূলের ঘৃণ্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে যখন গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফুসে উঠেছিলো তারই প্রেক্ষিতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মধ্যস্থতায় ইসলামী দাবিসমূহ মেনে নেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। উলামা নেতৃবৃন্দের সামনে বার বার কসম খেয়ে ইসলাম বিরোধী নীতিসমূহ সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। অথচ সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে একের পর এক ইসলাম ধ্বংসের আইন করেই চলছে। যা এখনই বন্ধ হওয়া একান্ত জরুরী। এরই প্রেক্ষাপটে ইসলামী দলসমূহ বিক্ষোভ কর্মসূচি, মানববন্ধন, আলোচনা সভা, গোলটেবিল বৈঠক, গণমিছিল ও হরতাল পালন করে সরকারকে সংশোধনের জন্য হুশিয়ার করে। তাতেও সরকারের বোধদয় না হওয়ায় গত ২৮ জানুয়ারি জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে সরকারকে এক মাসের সময় সীমা বেধে দেয়া হয়েছে।

আমরা আশা করেছিলাম নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সরকার ইসলাম নির্মূলের চক্রান্ত বন্ধ করবে। অথচ হঠাৎ করে গত সোমবার কতিপয় কথিত আলেম নামধারীদেরকে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ডেকে নিয়ে (নারী নীতিতে কুরআন বিরোধী কোনো কিছু থাকলে তা সংশোধন হবে বলে যে আশ্বাস প্রদান করেছেন আমরা সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই নারীর প্রতি অবমাননাকর নারী উন্নয়ন নীতি নিম্নোক্ত ধারাসমূহ সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী।

নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ তে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী ধারাসমূহ :

ধারা : ১ এ বলা হয়েছে, সকল ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা  জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একান্ত অপরিহার্য।

ধারা : নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা।

ধারা : ১৬.১ এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ও গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

ধারা : ১৬.১২ এ বলা হয়েছে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

ধারা : ২৩ এ বলা হয়েছে, জাতীয় অর্থনীতির সকল কর্মকান্ডে নারীর সক্রিয় ও সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ।

ধারা : ২৩.৫ এ বলা হয়েছে, নারীকে সমান সুযোগ ও অংশিদারিত্ব দেয়া।

নারী নীতিমালা ২০১১-এর আলোচ্য ধারাসমূহে সমঅধিকার, সমান অধিকার ইত্যাদি বলে সরাসরি কুরআনের বিধান পরিবর্তনের দুঃসাহস দেখানো হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার বাণী: ‘‘ন্যায়সঙ্গতভাবে নারীদের আছে পুরুষদের উপর তেমন অধিকার যেমনটি আছে তাদের উপর পুরুষদের অধিকার। তবে নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা আছে এক ধাপ বেশি। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’’ (সূরা বাকারা, আয়াত ২২৮) ‘‘একজন পুরুষ একজন নারীর দ্বিগুণ সম্পদ পাবে।’’ (সূরা নিসা : আয়াত : ১১ ও ১৭৬) এ ছাড়াও পবিত্র কুরআন মজীদের সূরা নিসা আয়াত- ৪, ২৩, ২৪, ২৫ ও ৩৪। সূরা তালাক আয়াত-১, ৪, ৬ ও ৭। সূরা বাকারা আয়াত-২২৮ ও ২৮২। সূরা আহযাব আয়াত- ৩৩ এবং ৪ ঃ ১, ২ ঃ ১৮৭ ও ২২৩, ২২ ঃ ৫, ২৩ ঃ ১২ ও ১৪, ১৩ ঃ ২৬, ১৭ ঃ ৩০, ২৮ ঃ ৮২, ২৯ ঃ ৬২, ৩০ ঃ ২৭, ৩৪ ঃ ৩৬, ৩৯ ঃ ৫২, ৪২ ঃ ১৩ আয়াতসমূহের সাথে সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে মাতা, ভগ্নী, ও কন্যা হিসেবে সম্মানিত করেছে। সমঅধিকার নয় বরং তাদের ন্যায্য অধিকার দিয়ে সামগ্রিকভাবে নারীদেরকে হেফাজত করা হয়েছে।

ধারা : ১৬.৮ এ বলা হয়েছে, নারী পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করা।

ধারা : ১৭.১ এ বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষ যে সমঅধিকার, তার স্বীকৃতি স্বরূপ নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপ করা।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদে ‘‘বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইন বিলোপ করা’’ এর কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘন। আরো কতিপয় ধারা: ধারা : ৪ এ, ধারা : ১৭.২ এ, ধারা : ১৫ এ, ধারা : ১৬.১৫ এ, ধারা : ১৮.৪ এ, ধারা : ২১.১ এ, ধারা : ২২.৪ এ।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন পরিষদের সভাপতি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, সাবেক মন্ত্রী খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, খেলাফত আন্দোলনের আমীরে শরীয়ত মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, আইম্মাহ পরিষদ সভাপতি মাওলানা মহিউদ্দীন রববানী, সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদ যুগ্ম-মহাসচিব ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের আমীর ড. মাওলানা ঈসা শাহেদী প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ