ঢাকা, বুধবার 15 February 2012, ৩ ফাল্গুন ১৪১৮, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition

যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রহসন চলছে

লন্ডন থেকে সংবাদদাতা : বাংলাদেশে কথিত যুদ্ধাপরাধের নামে বিচারের প্রহসন চলছে বলে জানালো লন্ডনের আন্তর্জাতিক সেমিনারের বক্তারা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, কমিউনিটি অর্গানাইজেশন, আইনজীবী এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ গত সোমবার লন্ডন মুসলিম সেন্টারে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে এই নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়। বক্তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের চলমান দমন নিপীড়নের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেও তাদের কার্যকলাপ স্বৈরশাসকদের মতো। এই অবস্থা মেনে নেয়া যায় না।

মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ এই সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে মূল বক্তব্য পাঠ করেন ব্যারিস্টার নাজির আহমদ। সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সিয়েরালিয়ন যুদ্ধাপরাধক বিষয়ক ট্রাইবুন্যালের সদস্য জন ক্যামেঘ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিন্যাল ল ব্যুরোর সদস্য টবি ক্যাডমান, মেন্টাল হেলথ ট্রাইবুন্যালের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নজরুল খসরু। সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আবুবকর মোল্লা। পরিচালনা করেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।

জন ক্যামেগ  বলেন, আমি এসেছি বিচারের নামে বিরোধী নেতাদের ওপর যে নির্যাতন চলছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। কেননা আমি মনে করি, যদি আমরা এখন প্রতিবাদ না করি তাহলে শিগগিরই আমাদের জন্য কথা বলার সেখানে কেউ থাকবে না যখন নির্যাতনের চাকা আমাদের দিকেও ঘুরে যাবে।

টবি ক্যাডম্যান বলেন, আইনের কাজ হলো জনগণের রক্ষা করা। তাদেরকে নির্যাতন করা নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার কখনো কথিত ট্রাইবুন্যালকে বলছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইবুন্যাল, কখনো বলছে ইট ডমেস্টিক ট্রাইবুন্যাল। যদি আন্তর্জাতিক হয় তাহলে তাদের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। আর যদি আন্তর্জাতিক আইন মেনে না চলেন তবে অবশ্যই দেশীয় আইনে যে রক্ষাকবচ আছে তা অভিযুক্তদের পেতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের অবস্থা হচ্ছে না ঘরকা না ঘটকা। কোন কিছুইকেই তোয়াক্কা করছেন না তারা।

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের ব্যানারে হচ্ছে। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোন আইন মেনে চলছে না। মূলতঃ ১৯৫ জন বিদেশী যুদ্ধাপরাধীর বিচার করার জন্য এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। যে কারণে দেশীয় আইনে নাগরিকদের যে অধিকার রয়েছে তার প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হয়নি। নিজ দেশের নাগরিকদের বিচারের জন্য এই আইন তৈরি করা হয়নি। বর্তমান বিচারের অনেক ত্রুটি রয়েছে। মূলতঃ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এই বিচার হচ্ছে এটি নি©র্দ্বধায় বলা যায়। সে কারণেই আন্তর্জাতিক মহলের প্রহসনমূলক বিচারের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। তিনি বাংলাদেশের পুলিশী বর্বরতা, রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক গ্রেফতার এবং দেশকে একটি বিশৃংখলার দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বরাত দিয়ে সেমিনারে বলা হয়, বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘন এখন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।

ব্যারিস্টার নজরুল খসরু বলেন, বাংলাদেশে বিচারের প্রক্রিয়ার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বিচারকদের কেমন যেনো গা ছাড়া ভাব। কারণটি কি এই যে, তারা আগে থেকেই জানেন বিচারের রায় কি হবে। এখন শুধু কিছু লোক দেখানো প্রহসন চলছে মাত্র। তিনি বলেন, যারা আটক আছেন তাদের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ প্রমাণ হয়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এমনকি শাহরিয়ার কবির গংরা পর্যন্ত আটক বিরোধী নেতাদের যুদ্ধাপরাধী বলছে। এ থেকেই বোঝা যায় তাদের আসল উদ্দেশ্য কি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এর অপার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু নিজ দেশের জনগণের ওপর অত্যাচার আর নির্যাতনের পথ গ্রহণ করে শাসকশ্রেণীরা সে সম্ভানাকেই দূর করছে তা নয় বরং তাদের গৃহীত পন্থা গণতন্ত্রের জন্যও ভালো নয়।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশের চলমান মানবাধিকার লংঘন, বিরোধী দলের ওপর সরকারি দমন-পীড়ন এবং সাম্প্রতিক কালে আইনশৃক্মখলাবাহিনীর সদস্যদের হাতে বিনাবিচারে ব্যাপক প্রাণহানি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বর্তমান সরকার সারাদেশে আতংকের রাজত্ব কায়েম করেছে, হাজার হাজার নিরীহ জনগণকে গ্রেফতার করা হয়েছে মিথ্যা ও সাজানো মামলায়। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে।

বক্তারা আরো বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মহলের আপত্তি উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ দলীয় লোকদেরকে দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে চাইছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ যেকোন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পক্ষে। তবে এটি যদি বিরোধীদল নিধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাহলে তা আন্তর্জার্তিক গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। যেকোন ধরনের প্রহসনের বিচারের বিপক্ষে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ।

সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিরোধী দল নির্মূল এবং মানবাধিকার হরণের সরকারি অপতৎপরতা বন্ধের আহবান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ