ঢাকা, বুধবার 15 February 2012, ৩ ফাল্গুন ১৪১৮, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition

বাংলাদেশী তৈরী পোশাক শিল্প ভারতের দখলে চলে যাচ্ছে

এইচ. এম  আকতার, কাওসার আজম : ভারতের দখলে চলে যাচ্ছে দেশের তৈরী পোশাক শিল্প। ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ, আমেরিকান ও কানাডিয়ান নাগরিকরা অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে এসব পোশাক কারখানা দখলে নিচ্ছেন। গত এক বছরে অর্ধশতাধিক বৃহৎ তৈরী পোশাক কারখানার মালিকানা বদল হয়েছে। এসব কারখানা থেকে ৮০-৯০ ভাগ বাংলাদেশী শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতার মাধ্যমে বন্ধ থাকা আরো শতাধিক কারখানা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টর দখলে নিতে রীতিমতো আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে দিয়ে তারা একে একে দখল করে নিচ্ছে বড় বড় গ্রুপের পোশাক কারখানাগুলো। সংশ্লিষ্টরা জানায়, কয়েক বছর ধরে সাভার, আশুলিয়া, জয়দেবপুর ও কাঁচপুর এলাকায় গার্মেন্ট কারখানাগুলোয় শ্রমিক অসন্তোষ ও নাশকতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করে এবং কাজের পরিবেশও বেশ ভালো, এমন সব কারখানা ভাংচুরের শিকার হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব এলাকার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, এনজিও কর্মী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ চক্র এবং ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও এসব ভাংচুরে ইন্ধন দিয়ে থাকেন। এসব ভাংচুরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কারখানার জেনারেল ম্যানেজার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতারও প্রমাণ মিলেছে। মধ্যসারির ম্যানেজমেন্টের এসব পদে কর্মরতদের ৮০ শতাংশই বিদেশী। এদের মধ্যে ৭০ শতাংশ ভারতীয় নাগরিক। এভাবে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করে ইতোমধ্যে এসকিউ, ক্রিস্টাল, মাস্টার্ড, হলিউড, শান্তা, রোজ, ফরচুনা, ট্রাস্ট, এজাক্স, শাহরিয়ার, স্টারলি ও ইউনিয়নের মতো দেশসেরা সব গার্মেন্ট ক্রয় করে নিয়েছে। বিক্রির কথাবার্তা চলছে আরো শতাধিক কারখানার। বিক্রি উপক্রম এসব কারখানার ক্রেতারাও বিদেশী।

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার তৈরি পোশাক কারখানায় ২২ হাজারের মতো বিদেশী কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছে। এদের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি ভারতীয় নাগরিক। যোগাযোগ ও মার্কেটিংয়ে দক্ষ হওয়ায় বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প মূলত তাদেরই নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তারা পরিচালিত হন তাদের তৈরি করা ছক অনুযায়ী। এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ যে ভারতের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে, তার সবই ভারতীয়দের নখদর্পণে। তারাই মূলত ছক অাঁকেন বাংলাদেশের সেরা কারখানাগুলোকে কীভাবে ভারতীয়দের দখলে নেয়া হবে। তারাই বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়িক সম্ভাবনাগুলো জানিয়ে কারখানা কিনে নিতে উৎসাহিত করেন। মালিকানা পরিবর্তন হওয়ার আগে বিভিন্ন অজুহাতে কারখানাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নতুন মালিক এসে এগুলোর আধুনিকায়ন করেন উন্নত মেশিনারি দিয়ে। এর পর বাংলাদেশী ৮০- ৯০ ভাগ শ্রমিক ছাটাই করে ভারতীয় শ্রমিকদের নিয়োগ দেয়া হয় ফলে এসব কারখানায়।

বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের তালিকাভুক্ত বায়িং হাউজের সংখ্যা ৮৯১টি। এর বাইরে আরো কয়েকশ বায়িং হাউস আছে। বায়িং হাউজগুলোর ৮০ থেকে ৯০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন ভারতীয় নাগরিকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর অভিজাত এলাকাগুলোতে বাড়ী ভাড়া নিয়ে বায়িং হাউসের রমরমা ব্যবসা করছেন তারা। বিভিন্ন সময় পর্যটক হিসেবে এরা বাংলাদেশে এলেও আর ফিরে যান না। বিদেশী বায়ারদের হাতে নিয়ে তারা এক রকম জিম্মি করে ফেলেছেন বাংলাদেশের পোশাক খাতকে।

 সূত্র আরো জানায়, দেশের প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মধ্যে বিশ্বমন্দা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটে দেড় হাজার কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানা ভারতীয়রা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্রয় করে নিয়েছে। এভাবে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের বাজার চলে যাচ্ছে ভারতের হাতে। বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যের কলোনিতে পরিণত হচ্ছে।

বিজিএমইএ সূত্র আরো নিশ্চিত করেছে, দেশে এখন পর্যন্ত দক্ষ ফ্যাশন ডিজাইনার ও মার্চেন্ডাইজার তৈরির কোনো সরকারি ইন্সটিটিউট নেই। বিজিএমইএর নিজস্বব একটি ইন্সটিটিউট থেকে বছরে আড়াই হাজার প্রশিক্ষিত ফ্যাশন ডিজাইনার ও টেকনিশিয়ান বের হলেও চাহিদা রয়েছে এর দ্বিগুণ। ফলে বাধ্য হয়েই বিদেশী ফ্যাশন ডিজাইনার নিতে হয় গার্মেন্ট মালিকদের। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতাকে দায়ি করেন গার্মেন্ট মালিকরা।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেন, যোগ্য লোকের অভাবে বেশিরভাগ কারখানার মালিককেই ম্যানেজমেন্ট চালাতে হয় বিদেশীদের দিয়ে। শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণও থাকে তাদের হাতে।

জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক হাসান বলেন, পোশাক খাতে গ্যাস বিদ্যুৎ সঙ্কট ও ভাংচুরের কারণে অনেক মালিক এ ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। বিদেশীরা ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক কারখানা কিনে নিয়েছেন। বিদেশীরা কারখানা কিনে প্রথমেই অটোমেটিক মেশিন বসিয়ে লোকবল কমিয়ে ফেলে। এছাড়া বিদেশীদের বায়ার ধরার ক্ষমতা অনেক বেশি। আবার অনেক ভারতীয় আছেন যারা নিজেরা বায়ার হিসেবে কাজ করছেন। সে হিসেবে তারা বেশি দামে পোশাক বিক্রি করতে পারেন। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, প্রোডাকশন কস্ট ও মজুরি বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক কারখানাই টিকে থাকতে পারবে না। ফলে বাধ্য হয়ে হয় তারা কারখানা বন্ধ করে দেবেন অথবা বিক্রি করে দেবেন। আর ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ, আমেরিকান, কানাডিয়ান নাগরিক ও কিছু বায়িং হাউসের মালিক এ কারখানাগুলো কিনে নেবেন।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ র সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, নানা সমস্যায় জর্জড়িত দেশের তৈরী পোশাক শিল্প। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে এই শিল্প বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। নানাভাবে বিদেশী আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। ইতোমধ্যে শ্রমিক অস্থিরতায় অনেক গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ